যুগান্তরের অভিজিৎ রায়

আজ থেকে প্রায় ২৪০০ বছর পূর্বে সভ্যতাকে আলো দিতে এই পৃথিবীতে এসেছিলেন কিংবদন্তী দার্শনিক ও মহান শিক্ষক সক্রেটিস। তাঁর দুনিয়া বদলে দেয়া চিন্তাজগৎ গ্রীকদের তৎকালীন আদর্শ ও ধর্মানুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দেখা দেয়। ফলাফলস্বরূপ তাঁকে হেমলক বিষপানে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু সক্রেটিস বিস্মৃত হন নি। রেখে গেছেন তাঁর দর্শন।

আজ থেকে প্রায় ২৪০০ বছর পূর্বে সভ্যতাকে আলো দিতে এই পৃথিবীতে এসেছিলেন কিংবদন্তী দার্শনিক ও মহান শিক্ষক সক্রেটিস। তাঁর দুনিয়া বদলে দেয়া চিন্তাজগৎ গ্রীকদের তৎকালীন আদর্শ ও ধর্মানুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দেখা দেয়। ফলাফলস্বরূপ তাঁকে হেমলক বিষপানে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু সক্রেটিস বিস্মৃত হন নি। রেখে গেছেন তাঁর দর্শন।
তার পর, ৩৭০ খৃস্টাব্দে সভ্যতার আরেক আলোকবর্তিকা হয়ে জন্মেছিলেন হাইপেশিয়া, বিশ্বের সর্বপ্রথম নারী গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। আলেক্সান্দ্রিয়ায় স্থাপন করেন নিজের একটি পাঠশালা। গণিত, দর্শন ও বিজ্ঞান শেখার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন সেটিকে। যথারীতি, তৎকালীন খৃস্টান ধর্মান্ধদের সেটি সহ্য হল না। হবার কথা নয়। হাইপেশিয়া মানুষকে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে শেখালেন, প্রশ্ন করতে শেখালেন, বিতর্ক করতে শেখালেন। তারপর একদিন খৃস্টান ধর্মযাজক ‘সিরাল’-এর অন্ধ অনুসারীরা তাঁকে রাস্তায় পেয়ে বসে। মুক্তচিন্তার ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়টি সূচিত হয় সেদিন। হাইপেশিয়ার চুলের মুঠি ধরে সহস্র জনতার মধ্য দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয়ে। সিরালের অনুসারীরা চিৎকার করে বলতে থাকে- ‘জন্মের শিক্ষা দিয়ে দে এই মহিলাকে।’
উৎসুক জনতার ভিড়ের মধ্যে দেখা গেলো, হাইপেশিয়াকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে সিজারিয়ামের মেঝেতে। দুইপাশ থেকে দু’জন এসে টেনে ছিঁড়ে ফেললো হাইপেশিয়া’র পরনের কাপড়। বিবস্ত্র হাইপেশিয়া লজ্জায় মুখ লুকাবার জন্য খুঁজে পেলেন না কোনো আড়াল। একদল এসে পাথর দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে তুলে ফেললো তার শরীরের সমস্ত চামড়া। ততক্ষণে হাইপেশিয়ার আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু চার্চের সাথে বিরোধ সৃষ্টিকারী এই অহংকারী নারীর জন্য শুধু এতটুকু শাস্তি যথেষ্ট নয়। হিংস্র মানব সন্তানেরা হায়েনার মত চারপাশ থেকে টেনে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললো হাইপেশিয়া’র শরীর। মৃত্যুর অন্ধকারে তলিয়ে যায় আলেক্সান্দ্রিয়ার বাতিঘর।
আরো বহু বছর পর সভ্যতাকে আলো দিতে এসেছিলেন আরো একজন কিংবদন্তী, জিওর্দানো ব্রুনো। সপ্তদশ শতকের এই ইতালীয় গণিতবিদ ও মুক্তচিন্তক প্রথমবারের মত ঘোষণা করলেন মহাবিশ্ব এত ছোট নয়, যতটা আমরা ভেবে থাকি। এই মহাবিশ্ব সুবিশাল। ওই যে দূর আকাশে যে মিটিমিটি তারাদের আমরা দেখতে পাই, ওরাও আমাদের সূর্যের মত একেকটি সূর্য! সেই দূরের সূর্যগুলোর চারপাশে থাকতে পারে আরো বহু পৃথিবী। সেইসব পৃথিবীতে থাকতে পারে প্রাণ! কী সব ‘গাঁজাখুরে’ (!) কথাবার্তা। যথারীতি ধর্মান্ধদের এসব পছন্দ হল না। ফলাফল? আগুনে পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হল ব্রুনোকে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিপ্লব ঘটাতেই জন্মেছিলেন ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলাই। যেই আকাশ নিয়ে যুগ যুগ ধরে মানুষ কল্পনার পসরা সাজিয়েছিলো, বানিয়েছিলো নানা কিংবদন্তী, সেই আকাশকেও মুষ্টিবদ্ধ করবার প্রয়াসে তৈরি করলেন বিশ্বের প্রথম উন্নত টেলিস্কোপ। মানুষের মাঝে চিরকাল রহস্যময় হয়ে থাকা সুবিশাল মহাশূণ্যকে এবার বিজ্ঞানের ছাঁচে ফেলেই তিনি শুরু করলেন তাঁর নির্মোহ পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ। আবিষ্কার করলেন, ধর্মান্ধদের দাবির মত এই পৃথিবীটা মোটেও মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে না! বরং পৃথিবীসহ বাকি সকল গ্রহই প্রদক্ষিণ করছে সূর্যকে। সৌরবিশ্বের কেন্দ্রে আছে সূর্য! তাঁর এই অনন্যটি আবিষ্কারটি খৃস্টান চার্চের ওপর বজ্রাঘাতের মত পড়ে! ধর্মান্ধরা তাঁকে মৃত্যুভীতি দেখাতে শুরু করেন। তাঁকে বাধ্য করা হল তাঁর বক্তব্য ফিরিয়ে নিতে। শুধু বিজ্ঞানকে ভালবেসেছিলেন বলেই তাঁকে বেছে নিতে হয়েছিলো আজীবন কারাগার…

এ দেশেরই এক অনন্যসাধারণ ও ক্ষণজন্মা কথাসাহিত্যিক এবং ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ। শুধু বিজ্ঞানকে ভালবেসেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাকে মলাটবদ্ধ করে রচনা করেন ‘মহাবিশ্ব’। ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, সামাজিক-বিজ্ঞানের অনুসন্ধানের আলোকে বাংলা ভাষায় রচনা করলেন নারীবাদের ওপর একটি পূর্নাঙ্গ বই- ‘নারী’। তারপর একদিন, বইমেলা থেকে ফিরবার পথে তাঁকে চাপাতি হাতে আক্রমণ করে বসে একদল নরপশু। ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত হলেন হুমায়ুন আজাদ। মৃত্যুবরণ করলেন জার্মানির মিউনিখে…

বাংলার মাটিতে (কিংবা বিশ্বের মাটিতে) নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে মুক্তবুদ্ধির মানুষদের কণ্ঠরোধ করবার প্রয়াস! গত ১২ সেপ্টেম্বর ছিলো ডঃ অভিজিৎ রায়ের জন্মদিন। হ্যা, সেই অভিজিৎ রায়, যাকে বইমেলা থেকে বেরুবার পরই চাপাতি দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছিলো এ কালের ধর্মান্ধরা। তারপর হত্যা করা হল একে একে আরো বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান লেখক ও ব্লগারকে। বই প্রকাশের অপরাধে হত্যা ও আহত করা হল সাহসী প্রকাশকদের। হত্যাকারীদের পরিচয় আমরা জানি। যুগ যুগ ধরে ওদের সবচেয়ে কমন পরিচয়টি হল- ওরা অন্ধ। হোক সেই ক্যাথলিক চার্চ, ধর্মযাজক, ক্রুসেডর, এ কালের শিবসেনা, মুসলিম ফতোয়বাজ কিংবা জঙ্গিগোষ্ঠি। ওরা জ্ঞানকে অবরুদ্ধ করে রাখতে চায়, টেনে ধরে রাখতে চায় বুদ্ধিবৃত্তির লাগাম। কিন্তু ওরা জানে না জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকে অবরুদ্ধ করে রাখা এত সহজ নয়। যুগে যুগে মুক্তচিন্তকেরা আসবে। কখনও সক্রেটিস বা হাইপেশিয়ার বেশে, কখনও জিওর্দানো ব্রুনো, গ্যালিলিও বা কোপার্নিকাসের বেশে, কখনও বা হুমায়ুন আজাদ কিংবা অভিজিৎ রায়ের বেশে। তোমরা হত্যা করবে, ওরা আবার ফিরে আসবে। আবার। এবং আবার…
বেরসিকের মত জ্ঞানের মশাল হাতে, সভ্যতাকে একটু আলো দেবে বলে……

৭ thoughts on “যুগান্তরের অভিজিৎ রায়

  1. সমস্যাটি ইসলামকে নিয়ে
    সমস্যাটি ইসলামকে নিয়ে নয়,সমস্যাটি ধর্মান্ধতাকে নিয়ে।
    মনে পড়ে কোপারনিকাস আর গ্যালিলিওর কথা যারা সত্য উদঘাটনের জন্য কু-সংস্কার মুক্ত আধুনিক সমাজ গড়ে তোলবার চেষ্টায় ধর্মীয় যাযকদের দ্বারা সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন!
    মনে পড়ে রাজা রাম মোহনের কথা,যিনি নোংরা সতীদাহ প্রথা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য তামাম হিন্দু সমাজের কাছে প্রবল বিরোধিতা ও ঘৃণা সহ্য করতে হয়েছিল!
    মনে পড়ে বিদ্যাসাগরের কথা? যিনি বহু সামাজিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বিধবা বিবাহ প্রথা চালু করেছিলেন ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন!
    এখন দেখুন যে কজন মহাপুরুষের নাম ও ঘটনা আমি উল্লেখ করলাম তারা তখনকার সময়ের সমাজে কেউ ঘৃণিত হয়েছেন বা কেউ সমালোচিত হয়েছেন বা কেউ প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েছেন বা কেউ সাজাও প্রাপ্ত হয়েছিলেন!
    কিন্ত দেখুন আজ আমরা তাদের দেখানো পথেই চলছি! সেই সমস্ত মহাপুরুষদের কে মাথায় তুলে রেখেছি।
    ঠিক সেই রকম যুগে যুগে দেশে দেশে ধর্মান্ধতার কলুষতা দূর করার জন্য সমাজ সংস্কারকরা আসেন ও আমাদের পথ দেখান এক আধুনিক ও কু-সংস্কার মুক্ত সমাজ গড়ার আহ্বান জানান।
    বর্তমানে মালাল ইউসুফ জাই,অভিজিৎ রায় এর মত সমাজ সংস্কারকেরা এসেছেন,চেষ্টা করছেন আধুনিক সমাজ গড়ার। আর এর জন্য যে বিরোধিতা হবেনা,রক্তপাত হবেনা তাকি ভাবা যায়!
    এই সমাজ পাল্টাবে,আধুনিক কু-সংস্কার মুক্ত সমাজ গড়ে উঠবেই, গণ জোয়ার আসবেই,তখন অন্ধকার মুছে যাবেই।
    এই ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপ্ন,কু-সংস্কার মুক্ত আধুনিক সমাজ গড়ে তোলবার স্বপনই তো দেখেছিলেন প্রয়াত প্রণম্য শেখ মুজিবর সাহেব।
    এগিয়ে আস বাংলাদেশের তরুন সমাজ,তোমরাই তো সোনার ও প্রানের বাংলা গড়ার কাণ্ডারি।
    আর কতদিন ধর্মান্ধতার বদ্ধ কূপে আবদ্ধ থাকবে???!!! আর কত দিন???

  2. অন্ধকারের পথচারী ধর্মধারীদের
    অন্ধকারের পথচারী ধর্মধারীদের চাপাতির কোপ কিংবা অন্ধ আক্রোশের দাবানল কোন কিছুই সত্যকে আলোর মুখ দেখা থেকে যুগ যুগ ধরে রহিত করতে পারেনি,পারবেও না…..

    1. সহমত।
      সভ্যতা এগিয়ে গেছে

      সহমত।
      সভ্যতা এগিয়ে গেছে এভাবেই। কলম আর অস্ত্রের যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে বরাবরই কলম জয়ী হয়েছিলো। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না…
      শুভ কামনা জানবেন।

  3. ১জন ভারতীয় যুক্তিশীল মানুষ
    ১জন ভারতীয় যুক্তিশীল মানুষ হিসাবে আজীবন আমি আপনাদের পাশে আছি।
    আপনারা নিঃস্বার্থ ভাবে লড়ে যান।
    “এগিয়ে চলো, নিজের লক্ষ্যে না পৌঁছুনো পর্যন্ত থেমো না”
    -স্বামী বিবেকানন্দ

Leave a Reply to সুমন মন্ডল Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *