সিপাহী বিপ্লবের ইতিহাস এবং একজন মেজর জিয়া

১৯৪৭ সালে যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা নির্ধারণ করে ভারত ভাগ হয়েছিল, পাকিস্থান নামের এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সেই দ্বিজাতি তত্ত্ব যে এদেশের মানুষের কোন মঙ্গল বয়ে আনতে পারেনি তা অচিরেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। এই তথাকথিত দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্থানের মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছিল নানা রকম অসঙ্গতি আর অসন্তোষের।ভাষা আন্দোলন এবং ষাটের দশকের ঘটনা প্রবাহের ধারাবাহিকতায় এলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বাহ্নেই শোষক পাকিস্তানী প্রশাসন বুঝতে পেরেছিল এদেশের সহজ-সরল মানুষগুলোকে আর শাসন-শোষন করা যাবেনা।বাঙ্গালী জেগে উঠেছে। এদেশে পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের পতন অনিবার্য।এটা কেবল কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।এই পরাজয়কে সহজে মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা।তাই হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসর বিশ্বাসঘাতক স্বাধীনতাবিরোধী চক্র–জামাত,আল বদর, আল শামস, রাজাকারদের নজিরবিহীন নৃশংসতা এবং এক ভয়ংকর নীলনকশা বাস্তবায়নের একটি প্রামাণ্য দলিল করে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসম্বর বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য।১৪ই ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক জঘন্য বর্বর ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল।৩০ লাখ শহিদের রক্ত এবং ৪ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন হলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত ও মুসলিম লীগের এদেশীয় একশ্রেণীর বাঙালি রাজাকার আলবদর বাহিনী গঠন করে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস বাঙালির বিরুদ্ধে সীমাহীন গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগি্নসংযোগের মতো নির্মম মানবতাবিরোধী অপরাধ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জামায়াত ও মুসলিম লীগের বড় নেতারা পালিয়ে গেল, কেউ কেউ গ্রেফতারও হলো।দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১০ মাসের মাথায় বিশ্বনন্দিত একটি সংবিধান তৈরি হলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হলো নতুন যাত্রা।

দেশি-বিদেশি পরাজিত শত্রুরা নানা ছদ্মাবরণে সংগঠিত হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতিসত্তার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল স্তম্ভ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ১৫ আগস্টের ওই ঘাতকদের নির্দেশেই জেলের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে, যারা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের ওপর বাংলাদেশকে ধরে রাখতে পারতেন। ৩ নভেম্বরের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় ৭ নভেম্বর।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষমতালিপ্সু অফিসারদের ক্ষমতা দখল-পুনর্দখলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের এই দিনে ‘সিপাহি-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থান’ ঘটেছিল।৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় দিন।সেনাবাহিনীতে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিরোধ তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলছিল, তারই উদগিরণ ঘটে ৭ নভেম্বর এবং একই সঙ্গে জনমনে ও সেনাবাহিনীতে সবকিছু স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। তাই ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলে দাবি করা হয়।১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হবার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। কিন্তু খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতার নেপথ্যে ছিলেন ১৫ই অগাষ্টের ঘটনার মুল নায়কেরা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশারফ এই ব্যাপারটি মেনে নিতে পারেননি।বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল মেজরের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য এবং সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডকে ফিরিয়ে আনার জন্য তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) এবং ঢাকায় অবস্থিত ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজ বাসায় বন্দি হন। খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদচ্যুত হন। বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজররা সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু খালেদ মোশাররফের কিছু অদূরদর্শিতার কারণে মাত্র চার দিনের মাথায় ৭ নভেম্বর আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের কারিগর ছিলেন মুলত কর্ণেল তাহের।

কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের সে সময় চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। কর্নেল তাহের ছিলেন জিয়াউর রহমানের একজন বিশেষ শুভাকাংখী। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। সৈনিক-অফিসার বৈষম্য তার পছন্দ ছিলনা। তার এই নীতির জন্য তাহের সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মাঝেও দারুন জনপ্রিয় ছিলেন। কর্নেল তাহের বিশ্বাস করতেন জিয়াও তারই আদর্শের লোক।ঢাকাতে তার অনুগত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের পাল্টা প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা রওনা হন, এ সময় তার সফর সঙ্গী ছিল শত শত জাসদ কর্মী। কর্নেল তাহেরের এই পাল্টা অভ্যুত্থান সফল হয় ৭ই নভেম্বর। কর্নেল তাহের, জিয়াউর রহমানকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। ঐ দিনই পাল্টা অভ্যুত্থানে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জেনারেল খালেদ মোশাররফকে হত্যা করে।

কথা ছিল, জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে আনা হবে। তারপর জাসদের অফিসে তাঁকে এনে তাহেরদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হবে। পরে সিপাহী-জনতার এক সমাবেশ হবে। সেখানে বক্তব্য রাখবেন জিয়া আর তাহের। কিন্তু মুক্ত হওয়ার পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জিয়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে সম্মত হন না। উর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা তাঁকে পরামর্শ দিতে থাকেন। তাহের জিয়াকে ভাষণ দিতে বলেন। জিয়া ভাষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তাহের বুঝতে পারেন জিয়া তাঁদের সাথে আর থাকছেন না। তিনি পুনরায় সংগঠিত হতে থাকেন। কিন্তু জিয়া বুঝতে পারেন ক্ষমতায় টিকতে হলে তাহেরসহ জাসদকে সরাতে হবে। সেই অনুযায়ী গ্রেফতার হতে থাকেন জাসদের সব নেতারা। তাহেরও গ্রেফতার হন। শুরু হয় এক প্রহসনের এক বিচার। গোপন আদালতের সেই বিচারে ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যে আলোকিত উজ্জ্বল সূর্য আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম তা ৭ নভেম্বরের কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। তাই ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব বললে প্রকৃত অর্থে বিপ্লব শব্দটিকে অবমাননা ও ছোট করা হয়। কেননা ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে তা একেবারেই বেমানান।
৭ নভেম্বর – সিপাহী বিপ্লবের সত্যি ইতিহাস এবং জিয়াকে কেন মীর জাফর বলা হয় জানতে নিচের লিঙ্ক ক্লিক করুন…..

৭ নভেম্বর – সিপাহী বিপ্লবের সত্যি ইতিহাস জানি আসুন৭ নভেম্বর – সিপাহী বিপ্লবের সত্যি ইতিহাস জানি আসুন জিয়াকে কেন মীর জাফর বলা হয় জেনে নিন।

Posted by James Bijoy on Friday, November 6, 2015

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *