কবিতার জন্মদাত্রী

অনেকদিন থেকে একটা মানুষের কবিতা পড়ি । ভাল লাগতো তখন থেকেই । ভাল লাগা থেকেই কিছুদিন কথা হয়েছিল । হঠাত একদিন তাকে বললাম “তুমি যে কত অসাধারন কবিতা লিখ এটা জানো”। উত্তরটা এসেছে একদিন পরে “আমি কবিতার জন্মদাত্রী” ।কথাটা শুনে থমকে গিয়েছিলাম , কবিতার জন্মদাত্রী ।

অনেকদিন থেকে একটা মানুষের কবিতা পড়ি । ভাল লাগতো তখন থেকেই । ভাল লাগা থেকেই কিছুদিন কথা হয়েছিল । হঠাত একদিন তাকে বললাম “তুমি যে কত অসাধারন কবিতা লিখ এটা জানো”। উত্তরটা এসেছে একদিন পরে “আমি কবিতার জন্মদাত্রী” ।কথাটা শুনে থমকে গিয়েছিলাম , কবিতার জন্মদাত্রী ।
তার সব কবিতা কষ্টের কবিতা , কষ্ট নিয়ে এত ভাল কবিতা সে ছাড়া মনে হয় আর একজন লিখেছেন হেলাল হাফিজ । তাকে একদিন বললাম, এত এত লেখা এই ছোট্ট মানুষটার ভিতরে কিভাবে বসবাস করে আমায় একটু বলবে । সে বললো, “মানুষ যখন অতি কষ্টে অথবা অতি সুখে থাকে তখন যা ইচ্ছে করতে পারে,আমিও তাই” । আমি বললাম ,আচ্ছা তুমি কখনো সুখের কবিতা লিখোনা কেন ? সে বললো ,কষ্টের মরুভূমিতে যার বাস সেখানে সুখের বৃষ্টি হলে সেই জল অতি দ্রুত কষ্টে খা খা করা বালুগুলো শুষে নেয় ,তাই আমার আর সুখের কবিতা লেখা হয়না ।
হঠাত কাকতালীয়ভাবে সেদিন সেই লেখিকার সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল । মন খারাপ ছিল বলে অইদিন বিকেলে রমনার লেকের পাড়ে গিয়ে বসেছিলাম । একটু পরেই নীল শাড়ি,কপালে লালটিপ ,হাতে কাচের চুড়ি পড়া লেখিকাকে হেটে যেতে দেখলাম পাশ থেকে । কেমন যেন বিষন্ন একটা চেহাড়া । আমি ডাক দিতেই থমকে দাড়াল । কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে একটা মুচকি হাসি দিয়ে পাশে এসে বসলো ।
বসার পরে তার প্রথম কথা ছিল, তোমার কাছে লাইটার আছে একটা সিগারেট ধরাবো । লাইটার দেয়ার পরে প্রথম চেষ্টাতেই সিগারেটটা ধরাল ।সিগারেট ধরানোর ভংগি দেখেই বুঝলাম এ মানুষটি দীর্ঘদিন থেকেই সিগারেট খায় ।তার সাথে আমার প্রথম দেখা অথচ তার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ করলাম না । খুব আয়েশী ভংগিতে সিগারেটটি টানছে । এত সুখ নিয়ে সিগারেট খেতে আমি এর আগে কখনো দেখিনি কোন মানুষকে ।
সিগারেট শেষ করার পরে তার মুখে প্রথম কথা ফুটলো ,আচ্ছা আমাকে একটূ গাজা খাওয়াতে পারবে ? আমি নির্বিকার ভংগিতে লেখিকার দিকে তাকিয়ে থাকলাম । সে বলল, কি এভাবে তাকিয়ে আছো কেন ?এত অবাক হওয়ার কি আছে ?আমি মেয়ে বলে অবাক হচ্ছ ?কষ্টের কি কোন ছেলে মেয়ে আছে ?
আমি বললাম , কি হয়েছে তোমার আমাকে কি বলা যায় ? সে বলল, বলতে পারি এক শর্তে । আমি বললাম, কি শর্ত ? লেখিকা বললো , আমার কোন কাজে বাধা দিবেনা এবং আজকের পর আমার সাথে কোনরুপ যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেনা । আমি বললাম, আমি রাজি তুমি বল । সে বলল বিস্তারিত বলতে পারবো না ।আমি বললাম,যতটুকু ইচ্ছে ততটুকুই বল ।
লেখিকা “আমি স্কুল জীবন শেষ করে যখন কলেজে পা রাখলাম তখন জীবনটা অনেক আনন্দের ছিল , সকালে বের হয়ে সারাদিন ক্লাশ, আড্ডা দিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতাম । কলেজে ভর্তির কিছুদিন পরেই একটা ছেলে নজরে পড়লো । আমার থেকে এক বছরের বড় । মুখে খোচা খোচা দাড়ি ,হাতে সারাক্ষন সিগারেট আর সবসময় পিঠে একটা ব্যাগ । খুব খেয়াল করে দূর থেকে দেখতাম ছেলেটিকে । একদিন পাগলামী করে একটা বড় চিঠি লিখে বন্ধুর মাধ্যমে তাকে পাঠালাম । চিঠিতে ভাললাগার কথাটা উল্লেখ ছিল । সে তার পরদিনই আমার সাথে দেখা করল । আমার ভাললাগায় সায় দিল ,ভাললাগাটা ভালবাসায় পরিনত হয়ে গেল । ভালই চলতে ছিল ।
চার মাস পরে তার জন্মদিন আসলো সে আমাকে অনুরোধ করলো যেভাবে হোক আমি যেন তার জন্মদিনের পার্টিতে থাকি । ভাল যেহেতু বাসি রাখতেই হবে কথা । পার্টির আয়োজন করলো তার এক বন্ধুর বাসায় । বন্ধুরা মজা করে আমাদের দুজনকে এক রুমে আটকে চলে গেল । সে আমাকে চাইল ,আমি না করলাম ,কিন্তু সে শুনলোনা জোর করতে শুরু করলো , আমি আর তেমন ভাবে বাধা দিলাম না । কারন ভালবাসি যে । এরকম বিভিন্ন সময়ে বলা যায় আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই চারবার শারীরিক সম্পর্ক হল ।
গত এক বছর ধরে আমি জানতে পারি সে আরেকটা মেয়েকে ভালবাসে । তাকে এই বিষয়টা জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যায় । দিনের পর দিন তার ফোন ওয়েটিং থাকে । কষ্টের কারনে সিগারেট ধরি । সাত-আট দিন আগে আমার সাথে দেখা হয়েছিল তার ।আমার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার পর সে কোথায় যায় সেটা দেখার জন্য আমি তার পিছু নেই । সে একটা জায়গায় গিয়ে দাড়াল ,আমি দূর থেকে তাকে দেখে যাচ্ছি ।কিছুক্ষন পরে একটা মেয়ে আসলো ,তাকে নিয়ে রিক্সায় উঠে চলে গেল ।
সেদিন থেকে আমি তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই ।গতকাল আমাকে ফোন দিয়ে অনেক আজেবাজে কথা বলেছে যোগাযোগ করিনা এজন্য । আর বলেছে আমি তার সাথে যোগাযোগ না রাখলে তার কাছে আমার কিছু বাজে ছবি নাকি আছে সেগুলো ফেসবুকে দিয়ে দিবে । আমি বলেছিলাম তোর যা ইচ্ছে তাই কর আমি আর তোর সাথে যোগাযোগ রাখবোনা ।
আমি জানতাম যে আমার কোন বাজে ছবি ওর কাছে নেই কারন আমি অই ধরনের কোন ছবি তুলিনি , কিন্তু আমি জানতাম না ও সেই জন্মদিনের ঘটনাটা আমার অজান্তে ভিডিও করে রেখেছে । গতকাল রাতে ও সেখান থেকে একটা বাজে ছবি নিয়ে ফেসবুকে দিয়েছে । তারপর থেকে যে কত মানুষের কথা শুনতে হয়েছে তা আমি জানি ।আমি বাসা থেকে বের হয়ে এসেছি । কি করবো কোথায় যাব কিছুই জানিনা ।হয়তো মরে যাব ।
তুমি কথা দিয়েছ আমাকে কোন বাধা দিবেনা ,তাই আমাকে কোন জ্ঞান দিতে আসবে না ।আমি গেলাম ।ভাল থেক তুমি ।আর ভুল মানুষকে ভালবেস না” ।
সেদিনের পর আর আমি সেই লেখিকার সাথে কোন যোগাযোগ করিনি । আজ সকালে পত্রিকা খুলতেই তৃতীয় পৃষ্টায় ছবিসহ তার আত্মহত্যার ঘটানাটা চোখে পড়লো । নিজের অজান্তে চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো । কবিতার জন্মদাত্রীর কবিতা আমার আর পড়া হবেনা ।

১ thought on “কবিতার জন্মদাত্রী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *