ঝরনা রাজ্যের পথে পথেঃ অপারেশন ‘হান্টিং ফলস’


ঝরনা রাজ্যের পথে পথে ঘোরার ব্রত নিয়ে বরষার শুরুতেই প্লান সাজালাম আমরা। মিরেরসরাই, সীতাকুন্ড, বান্দরবন মিলিয়ে ছোট বড় ঝরনার জলরাশিতে গা ভাসাবো। এই মিশনের একটা গালভরা নামও দিলাম ‘অপারেশন হান্টিং ফলস’।


ঝরনা রাজ্যের পথে পথে ঘোরার ব্রত নিয়ে বরষার শুরুতেই প্লান সাজালাম আমরা। মিরেরসরাই, সীতাকুন্ড, বান্দরবন মিলিয়ে ছোট বড় ঝরনার জলরাশিতে গা ভাসাবো। এই মিশনের একটা গালভরা নামও দিলাম ‘অপারেশন হান্টিং ফলস’।
প্রথম যাত্রা সহজ পথের চোখ জুড়ানো সুন্দর ঝরনা খৈয়াছড়া। মিরেরসরাই বড় দরগা থেকে এই পথের শুরু। খৈয়াছড়া স্কুলের উল্টো পাশের মূল রাস্তা থেকে পিচঢালা পথ চলে গেছে রেললাইন পর্যন্ত। সেখান থেকে মেঠোপথ আর খেতের আইলের শুরু। তারপর হঠাৎ করেই যেন মাটি সরে গিয়ে উদয় হলো একটা ঝিরিপথের। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরনই বলে দিচ্ছে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে। এরপরে শুধু ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাচ্ছি পানি পড়ার শব্দ।কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরতেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে ঝুপ করে হাজির হলো খইয়াছড়া ঝরনা।
এই ঝরনার ওপরে আরও আটটা ধাপ আছে। তড়িঘড়ি করে প্রায় খাড়া ঢাল ধরে হাঁচড়ে-পাঁচড় উঠে চললাম উৎসের দিকে। ঝরনার ষষ্ঠ ধাপে এসে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা। চোখের সামনে যা দেখছি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

সুপ্তধারা ঝরনা

চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের উত্তর পাশে অবস্থিত সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের মূল আকর্ষণ হল ‘সুপ্তধারা’ এবং ‘সহস্রধারা’ নামের ঝরনা। তবে নামের সঙ্গে কোনোটারই চারিত্রিক সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়না। সুপ্তধারা ঝরনা স্থানীয়ভাবে ছোট ঝরনা নামে পরিচিত।
তবে এটা ছোট কোনো ঝরনাই নয়। উঁচু পাহাড়ারের উপর থেকে অনবরত তিনটি ধারা বহমান এখানে। সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের ভেতর থেকে ঝিরি পথ ধরে যেতে হয় সুপ্তধারায়। তবে টানা বৃষ্টিপাত হলে ঝিরি পথে হাঁটা কঠিন। তখন কোমর পানিরও বেশি থাকে এ পথে। ইকোপার্ক থেকে নিচে নামার পরেই ঝিরিপথ। জায়গাও বেশ নির্জন। এ পথে প্রায় পনের মিনিট হাঁটার পর ঝরনাধারার শব্দ কানে ভেসে আসবে। একটু সামনে এগুলেই নিজের চোখকে হয়ত বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। পাহাড়ের আড়লো লুকানো এতো সুন্দর ঝরনা! এক পাশ থেকে সুপ্তধারার উপরেও ওঠা যায়। তবে সেটা খুবই বিপজ্জনক।

টিপড়াখুম ঝরনা

মিরেরসরাই নয়দুয়ারী এলাকা তখনও ঘুমে আচ্ছন্ন। আমাদের এবারের অভিযান এমন এক ঝরনার খোঁজে, যার খবর খুব বেশি মানুষের কাছে নেই। বেশ কয়েক দিন বৃষ্টিহীন থাকায় আশঙ্কা ছিল ঝরনাকে হয়তো তার যৌবনা রূপে দেখা নাও যেতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি সে আশঙ্কা দূর করল।
বৃষ্টি ভেজা কর্দমাক্ত গ্রামীণ পথ পেরিয়ে, ধানক্ষেত পেছনে ফেলে পূর্বদিকে সোজা সবুজ পাহাড়ের সারি। আমরা চলেছি সে দিকেই। ভোরের বাতাস গায়ে মাখতে মাখতে পেঁৗছে গেলাম পাহাড়ের কোলে টিপরাখুম। মূলত ত্রিপুরা আদিবাসীদের বাস এখানে, বেশ কয়েক ঘর বাঙালিও থাকে। সেখান থেকেই নাম টিপরাখুম। পাথরের মসৃণ দেয়াল নেমে এসেছে ঝিরি পথে। গড়িয়ে পড়ছে পানির ধারা। ঘণ্টাখানেক আগে বৃষ্টি হলেও খুব বেশি না হওয়ায় পানির ধারা জোরালো নয়। ভরা বর্ষায় এ রূপ আরও চোখ ধাঁধানো হতো নিশ্চয়ই।

বান্দরখুম ঝরনা

টিপড়াখুম ঝরনার উৎসমুখের পাশেই পাহাড় উঠে গেছে আকাশমুখী। পিচ্ছিল সে পথ ভয় ধরালেও অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ সে ভয় তাড়াল। ওপরে উঠে দেখা মিলল এ এলাকার স্কাই লাইনের। ভরা বর্ষা মৌসুম শেষ হয়েছে। কিন্তু রেশ কাটেনি। স্বাভাবতই সবুজে সবুজময় চারপাশ। এবার ট্রেইল ধরে এগোতে লাগলাম আমরা। যদিও দশ মিনিটের মধ্যেই আবার নামতে হলো ঝিরিতে।
ঝিরিতে বেশ পানি। পায়ের পাতা ছাড়িয়ে সে স্রোত মাঝেমধ্যেই উঠে আসছে হাঁটু পর্যন্ত। পিচ্ছিল পাথর সমস্যা করছিল খানিকটা। বেশ বড় কয়েকটা পাথর পেরুতেই খানিক দূরে গাছের ফাঁকে চোখে পড়ল বান্দরখুম ঝরনার ওপরের অংশ। সমবেত চিৎকার! প্রকৃতির নীরবতা ভঙ্গ করলেও করার কিছু নেই। সামনে সোজা আকাশের পানে উঠে যাওয়া দুই পাহাড়ের মাঝামাঝি নেমে এসেছে ঝরনাধারা। নেমে আবার নিচের পাথরে পড়ে ভাগ হয়ে গেছে তিনটি ধারায়।

সকাল ৯টা কি সাড়ে ৯টা বাজে। এরই মধ্যে দু-দুটি ঝরনা দেখা সারা। তবে বিস্ময়ের বাকি আছে তখনও। গাইড শাহাদত জানাল, কাছাকাছি আছে আরেকটি ঝরনা। নাম বাঘ বিয়ান।

বাঘ বিয়ান ঝরনা

এক সময় এ পাহাড়ি এলাকায় ছিল বাঘের ব্যাপক উপস্থিতি। মানুষের উপদ্রবে বাঘ পালিয়েছে, কিন্তু মুখে মুখে এখনও শোনা যায় সেসব গল্প। বাঘ বিয়ান ঝরনার নামটি রাজকীয় এ প্রাণীটি থেকেই আসা। ঝিরি ধরে আবার শুরু করলাম হাঁটা। ফেলে আসা ঝিরিপথে প্রচুর পাথর থাকলেও বাঘ বিয়ান ঝরনায় যেতে চোখে পড়ল মসৃণ ঝিরি পথ। যেন শান বাঁধানো পথে বয়ে চলেছে পানির ধারা। সূর্যের আলোয় তার রূপ এক কথায় মন ভোলানো। বাঘ বিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে আরেকবার বিস্মিত হওয়ার পালা।
এখানে পানির ধারা বান্দরখুমের চেয়ে কম। কিন্তু বিশাল দুই পাথুরে দেয়ালের মাঝ দিয়ে নেমে আসা এ ঝরনাধারা অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করবে। অসীম নীরবতার মাঝে অবিশ্রান্ত ঝিঁঝির ডাক ধ্যানমগ্ন হওয়ার একেবারে আসল জায়গা।

জাদিপাই ঝরনা

কেওক্রাডং থেকে ১০ মিনিটের রাস্তা পাসিং পাড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার ৬৫ ফুট উচ্চতায় এটি দেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম। দূর থেকে দেখলে মনে হবে গ্রামটি মেঘের ওপর ভাসছে। পাসিং পাড়া থেকে নিচের দিকে নামলেই আদিবাসী বম অধ্যুষিত জাদিপাই পাড়া। এখান থেকেই শুরু হলো আমাদের আসল অভিযান। গাইড তৌহিদ বলল এবার শুধু নিচের দিকে নামতে হবে!
নামছি তো নামছি। অভিকর্ষ বল নিচে টেনে নামাচ্ছে! বর্ষায় ঢালু পথ পিচ্ছিল হয়ে গেছে। জাদিপাই পাড়া থেকে প্রায় দেড় হাজার ফুট নিচে নেমে গেছে রাস্তা। রাস্তা বলে আসলে কিছু নেই। খাড়া পাহাড় বেয়ে নেমে যেতে হবে ঝরনামুখে। তার মধ্যে আবার ঝড়ের কবলে পড়ে মোটা মোটা কয়েকটি গাছ পথ আগলে আছে। আমরা যাওয়ার আগে কয়েক দিন ধরে টানা বর্ষণে জাদিপাই ভয়ঙ্কর সুন্দর হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের মাথা থেকে পানির বিশাল এক ধারা প্রায় ২০০ ফুট ওপর থেকে পড়ছে। পানির গর্জনে চারপাশের কিছুই কানে ঢুকছে না, এমনকি নিজের চিত্কার পর্যন্ত! উদ্ধত পাহাড়ের বুকে রঙধনু একে শীতল জলের ধারা বয়ে চলেছে অবিরাম। যত দেখি তৃষ্ণা মেটে না।

ঘড়িতে ১০টাও বাজেনি, এখানেই শেষ নয়। পরের মিশন দুর্গম পথের আরেক ঝরনা। পাসিং পাড়াতে চা, বিস্কুট, কলা খেয়ে রওনা হলাম সুংসং পাড়ার উদ্দেশে। এ পাড়া থেকে যাত্রা শুরু হবে বিস্ময়কর সেই দুর্গম ঝরনা জিংসিয়াম সাইতারের দিকে।

জিংসিয়াম সাইতার

কেওক্রাডংয়ে দাঁড়ালে অনেক নীচে চোখ পড়বে পাশাপাশি বেশ বড় দু’টি পাড়া। এর মধ্যে একটি সুংসাং পাড়া, আরেকটি রুমনা পাড়া। আমরা সেদিকেই যাবো। পাসিং পাড়া থেকে এ এলাকায় যেতে হলো খাঁড়া পাহাড় থেকে নামতে হবে।

সুংসং পাড়ায় নুডুলস খেয়ে রওনা হলাম। রুমানা পাড়ার আঙিনা ছুঁয়ে আমরা চলেছি এক বুনো ঝরনার উঠোনে। বলা হয়ে থাকে বান্দরবানে যে কয়েকটা ঝরনা দেখতে সবচেয়ে কষ্ট করতে হয় জিংসিয়াম সাইতার তার মধ্যে অন্যতম।

খাড়া পাহাড় বেয়ে ঘন্টাখানেক নামার পর সেকেন্ড স্টেপের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। এখান থেকে জুম খেতের ট্রেইল ধরে আরও নেমে গেলে ঝিরি পাওয়া যাবে। যেটি অল্প একটু গিয়ে এ ঝরনার থার্ড স্টেপ হয়ে নীচে পড়ছে। জিংসিয়াম সাইতার পথের দুর্গমতার কারণে সত্যিই এলিট ঝরনা!

জুমের পথ পেরিয়ে এক ঝিরিতে পড়লাম। এখান থেকে থার্ড স্টেপ নেমে গেছে। ঝিরিতে পানির স্রোত ভয়ংকর। দাঁড়িয়ে থাকতে এখানে রীতিমতো কসরত করতে হয়। কোনো মতো বাকিটুকু পেরিয়ে দাঁড়ালাম সেকেন্ড স্টেপের সামনে। পানির গতিবেগ দেখলে ভয় পেতে হয়। দিনের প্রথমভাগে জাদিপাইকে দেখেছিলাম দূর থেকে। এর শক্তিমত্তা বুঝিনি। কিন্তু হাত ছোঁয়া দূরত্বে জিংসিয়াম সাইতারের সেকেন্ড স্টেপের জল পতনের গতি এতই ভয়ানক মনে হলো নীচে দাঁড়ালে মাথাটা ফেটে যাবে।

সে ঝুঁকি আর নিলাম না। রংধনু এখানেও তার রং চেনাচ্ছে। ক্যামেরা বের করা যাচ্ছিলো না। জাদিপাই যদি ঝরনার রানী হয় জিংসিয়াম সাইতার অবশ্যই সেনাপতি।

কোন সন্দেহ নেই পুরো টিমকে সবচেয়ে ভয়ংকর পথটুকু পেরুতে হয়েছিলো জিংসিয়াম সাইতারের ফার্স্ট স্টেপে যেতে। ৭০, ৮০ ডিগ্রি খাঁড়া পিচ্ছিল পথের এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেলাম। তাকিয়ে দেখি রিজ লাইন এমনই সরু যে সেখানে এ পায়েও ঠিক মতো দাঁড়ানো যাবে না। একপাশে খাঁড়া পাথরের দেয়াল অন্যদিকে গভীর খাদ। পড়ে গেলে নির্ঘাত মৃত্যু। তৌহিদ তরতর করে জায়গাটাতে দড়ি বেঁধে এগিয়ে যেতে ইশারা করলো।

আমরা যখন ফার্স্ট স্টেপে তখনই দিনের শেষ সূর্য পশ্চিম থেকে ঝিলিক মারছিলো। ফেরার কথা খেয়াল হলো। একবার অন্ধকার নেমে এলে এখান থেকে বেরোনো কোনোমতেই সম্ভব না।

ত্লাবং

সুংসাং পাড়া থেকে মোটামুটি এক ঘণ্টার মতো লাগে এ ঝরনায় যেতে। ডবল ফলস নামে শহুরে আঙিনায় এটি বেশ পরিচিত। ত্লাবং মূলত রেমাক্রি খালের উৎস।

সুংসাং পাড়া থেকে রেমাক্রি খাল পর্যন্ত এ পথে শুধু নামা। অনেক উপরে এক বিশাল পাথরের চাইয়ে বসে দিনের প্রথম সূর্যের আলোয় দেখলাম ডবল ফলস। রূপের আলোয় ঝলমল করছে ঝরনা ধারা। বিশাল পাহাড়ের দুই কোণ থেকে আলাদা দু’টি ধারা নেমে এসেছে। জিংসিয়াম সাইতারের মতো ঠিক বুনো ভাব নেই। আবার গৃহপালিতও না। এর বিশাল পটভূমিকায় নিজেকে মনে হলো অনেক ক্ষুদ্র। এই আমাদের বাংলাদেশ। এর পথে প্রান্তরে কত না ঐশ্বর্য ছড়ানো আছে, যার খবর আমরা ক’জন জানি।
রোদ দ্রুত মাথার উপরে উঠছে। বেলা পড়ার আগেই আমাদের থাকতে হবে বগালেকে। ঝরনা থেকে সুংসাং পাড়া ফিরতে আরও কম সময় লাগলো। সেখানে আরেক দফা পেট পূজো সেরে আমাদের এখন উঠতে হবে পাসিং পাড়া। বাংলাদেশের উচ্চতম এ গ্রামে উঠতে হলে আমাদের বাইতে হবে এক বিশাল পাহাড়ের চড়াই।

বোনাস
হামহাম ঝরনা, কমলনঞ্জ

কুলুমছড়া, গোয়াইনঘাট, সিলেট

খৈয়াছড়া ঝরনার দ্বিতীয় ধাপ

সহস্রধারা ১ ঝরনা

নাম না জানা ঝরনা, মিরেরসরাই

স্টোন ক্যাসকেড, হরিনমারা ট্রেইল

সর্পপ্রপাত ঝরনা

বাওয়াছড়া ঝরনা

৫ thoughts on “ঝরনা রাজ্যের পথে পথেঃ অপারেশন ‘হান্টিং ফলস’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *