দেশ নিয়ে আর কোনো স্বপ্ন দেখি না….

অভিজিৎ দা খুন হওয়ার আগে আমার লাইফটা অন্যরকম ছিলো। হ্যা, আমি ক্লাস সিক্স থেকেই প্রচলিত বিশ্বাসগুলোকে অবিশ্বাস করা শুরু করি। তখন যেটা ছিলো তা হলো মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারার একটা ক্ষমতা। কিন্তু নিজের চিন্তার পক্ষে যুক্তি দাঁড়া করানোর ক্ষমতা আমার ছিলো না। এরপরে নিজের মধ্যেই এই মুক্তচিন্তার ব্যাপক চর্চা শুরু করেছিলাম। যার ফলে ক্লাস এইটে উঠার পরপর ই আমি আমার এই অবিশ্বাসের পিছনের যুক্তিটা দাঁড়া করাতে পেরেছিলাম। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গেলে কোনো বিশ্বাসের মাপকাঠির বাইরে থেকে বলবো ফ্রি থিঙ্কার – মুক্তচিন্তক।


অভিজিৎ দা খুন হওয়ার আগে আমার লাইফটা অন্যরকম ছিলো। হ্যা, আমি ক্লাস সিক্স থেকেই প্রচলিত বিশ্বাসগুলোকে অবিশ্বাস করা শুরু করি। তখন যেটা ছিলো তা হলো মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারার একটা ক্ষমতা। কিন্তু নিজের চিন্তার পক্ষে যুক্তি দাঁড়া করানোর ক্ষমতা আমার ছিলো না। এরপরে নিজের মধ্যেই এই মুক্তচিন্তার ব্যাপক চর্চা শুরু করেছিলাম। যার ফলে ক্লাস এইটে উঠার পরপর ই আমি আমার এই অবিশ্বাসের পিছনের যুক্তিটা দাঁড়া করাতে পেরেছিলাম। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গেলে কোনো বিশ্বাসের মাপকাঠির বাইরে থেকে বলবো ফ্রি থিঙ্কার – মুক্তচিন্তক।

কিন্তু এরপরেও আমার এই চিন্তাজগতটা শুধু নিজের মধ্যেই ছিলো। কখনো মনে হয় নি কোথাও কোনো সমস্যা আছে। স্কুল লাইফে পার্থ নামে আরেক মুক্তচিন্তক ছেলের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো। নিজেদের মধ্যে এসবের নানান দিক নিয়ে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। বই শেয়ার করা, লেখকদের নিয়ে তর্ক করা কিংবা হাস্যকর প্রথাগুলো নিয়ে মজা করা সব ই হত। তবে পুরোটাই নিজেদের মধ্যে এবং বাইরে সেটা প্রকাশের দরকার ও বোধ করি নাই।

এরকম ই ছিলো ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার পর্যন্ত। মাঝখানে শাহবাগ আন্দোলন হলো। তার একটা প্রভাব নিজের মধ্যে পরলো। আমার মত অনেক ছেলে মেয়ে তখন দেশের জন্য দুইচার লাইন লিখতে চেষ্টা করতো। তারা যে সবাই প্রথাবিরোধী বা নাস্তিক ছিলো তা না। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম হেফাজাতি জামাতিরা আমাদের সবাইকে নাস্তিক ঘোষনা করে আন্দোলন গড়ে তুললো! এতে হঠাৎ করে যেটা আবিষ্কার করলাম আমার মত লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে আমার আশেপাশেই আছে। সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা ছিলো যে ছেলেমেয়েগুলো অজ্ঞেয়বাদী বা সংশয়বাদী ছিলো তারা এই বিশাল মুক্তচিন্তকদের ভীরে এসে তাদের বিশ্বাসকে ছুরে ফেলার একটা সাহস, অনুপ্রেরণা পেলো। এতে অনলাইনে একটা শক্ত ভীত গড়ে উঠতে থাকলো আস্তে আস্তে। যদিও আমি কখনো কারো সাথে মিলে কখনো নির্দিষ্ট কোনো বিশ্বাসের সমালোচনা করি নি এবং তখন ও আমি কোনো রকম সমালোচনা ই করা শুরু করি নি। কারন তখন ও দেশটার যে করুন অবস্থা তা অনুধাবন করতে পারি নি।

ব্যাপারটা তখন ই চেঞ্জ হয়ে গেলো যখন অভিজিৎ রায় খুন হলো। হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম এ দেশটা পাকিস্তানের মত হয়ে যাচ্ছে। আরেকজন অভিজিৎ রায়কে জন্ম দিতে বাঙলাদেশকে শত বছর অপেক্ষা করতে হবে। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যখন শুধু মাত্র নিজস্ব মত প্রকাশের জন্য রাস্তায় খুন হয়ে পরে থাকতে হয় তখন বুঝতে হয় সেই দেশ ধ্বংসের পথে। পাকিস্তান তাদের শ্রেষ্ট সন্তানদের রক্ষা করতে পারেনি ফলে আজকে পাকিস্তানের এই অবস্থা। বাঙলাদেশকে আমরা কেউ সেরকম দেখতে চাই না। কিন্তু অভিজিৎ রায় হত্যার পরে এটা প্রমাণিত হয়ে গেলো যে বাঙলাদেশ বাঙলাস্তানে পরিনত হতে যাচ্ছে। আর ঠিক তখন ই আমি আমার লেখাগুলোতে পরিবর্তন আনলাম।

হ্যা, আমি লিখেছি মৌলবাদ যে মূল থেকে সৃষ্ট সেখান থেকে। আগা কেটে গোড়ায় পানি ঢেলে যে কোনো লাভ নাই সেটা সবাই বুঝে। আজকে আমাদের সরকার ঠিক সে কাজটাই করছে। অথচ আমাদের সোনার বাঙলাদেশ গড়ার স্বপ্নটাও তারাই দেখিয়েছে। আমি দেখেছি চোখের সামনে ফ্রেন্ডলিস্টের একটা সবুজ বাতি নিভে যেতে। দেখেছি আরো অনেক মুক্তচিন্তকদের রাস্তায় খুন হতে। যাদের কারনে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন জগতে প্রবেশ করতে পেরেছিলাম তাদেরকে দেশ ছেরে পালাতে। আজ আমার ফ্রেন্ডলিস্টের একটা বড় অংশ বিদেশে চলে গেছে। কেউ কেউ আগের মত লিখছে কেউ কেউ আমার মত থেমে গেছে। হ্যা, আমি থেমে গেছি, কারন পিছুটান। তবে সবচেয়ে বড় কারনটাই হচ্ছে দেশ নিয়ে আর স্বপ্ন দেখতে পারছি না। আজ আমি জানি এই দেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, মিশর, লিবিয়া, সুদান, ইয়েমেনের মত লাখ লাখ স্লিপার সেলে ভরা। এই দেশের পরিনতিও তাই হবে যা হয়েছে আর দশটা মুসলিম কান্ট্রির। তাই যে পারছে জান নিয়ে পালাচ্ছে বাকিরা আমার মত চুপ।

আমি চুপ কারন আমি দেখেছি আমার সহজ সরল প্রশ্নগুলোর জবাব কেউ দিতে পারেনি। অথচ তাদের ঘৃণা আমার আকাশকে কালো করে দিয়েছে। কিছু কিছু ব্যাপারে নাকি প্রশ্ন করাও যাবে না, চিন্তাও করা যাবে না। মরুভূমির বালিতে মাথা গুঁজে খালি বলবো শান্তি আর শান্তিতে ভরা সব কিছু! সবাই সেরকমটাই আশা করে। অথচ তারা বুঝে না যে তারা কি করছে!! তারা যেটা জানে না সেটা হচ্ছে আজকে একজন মুক্তচিন্তক খুন হয়েছে তারপরদিন আরেকজন খুন হবে দাড়ি না রাখার অপরাধে। আজকে আমরা দেখছি ইতালীয় নাগরিক খুন বাঙলাদেশে। অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম বাঙলা দেশে আসতে ভয় পায় জঙ্গিরাষ্ট্র বলে। বাঙলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু রইলো? আজকে আপনি মৌলবাদের সমালোচনা করতে নিষেধ করছেন কাল আপনার গায়ে বোমা পড়বে হিজাব নাই বলে। তখন গান গাইলে বোমা পরবে, ছিনেমা বানালে বোমা পরবে, ক্রিকেট ম্যাচে হামলা হবে, মসজিদে মসজিদে হামলা হবে। এই সহজ ব্যাপারটা সবাই বিভিন্ন দেশে দেখছে অথচ কেউ কিছু বুঝতেছে না। সব দোষ খালি অভিজিতের, শালা নাস্তিক।

এখন থেকে আমিও আর কিছুই লিখবো না, অনেক আগে থেকেই কমিয়েছি। অভিজিৎ দা হত্যার আগে যেমনটা ছিলাম তেমন থাকবো। যেই দেশের ভালোর জন্য দু লাইন লেখার জন্য হুমায়ুন আজাদের মত মানুষদের খুন হতে হয়েছে, জাফর ইকবালের মত লোকের জীবন প্রত্যেকটা মুহূর্তে হুমকিতে ভরে যাচ্ছে, হাজার হাজার মুক্তচিন্তককে থামাতে আইন করা হচ্ছে, তাদের কে অকারনে ঘৃণার পাত্র বানানো হচ্ছে সেই দেশের জন্য লিখে কি হবে? লিখে দশজনকে চেঞ্জ করবেন! সেই দশজন ও তো দেশে থাকতে পারবে না। এই দেশ হবে বর্বরদের দেশ। আর সে জন্য দায়ী থাকবে এ দেশের কোটি কোটি মানুষ ই। কয়েকজন মুক্তচিন্তক খুনের মাশুল বাঙলাদেশ শত বছর বসে দিবে।

🙂

১ thought on “দেশ নিয়ে আর কোনো স্বপ্ন দেখি না….

  1. কয়েকজন মুক্তচিন্তক খুনের

    কয়েকজন মুক্তচিন্তক খুনের মাশুল বাঙলাদেশ শত বছর বসে দিবে।

    এটাই হলো নির্মম সত্য। দেশ নিয়ে যখন মানুষ স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেবে, দেশটা নরকে পরিণত হবে। আজকের মুক্তচিন্তকদের জন্য মানুষ আক্ষেপ করবে। খুঁজেও একজন মুক্তচিন্তক কেউ পাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *