একজন পূজাদি ও কিছু কথা…..!!!

মধ্য রাত । অনেক চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারলাম না । তাই ছাদে এসে একটা সিগারেট ধরালাম । অনেকদিন পর সারাদিনের ক্লান্তি আর ব্যস্ততা শেষে ঘুমন্ত রাতের শহরকে দেখছি । পুরানো দিনগুলো আমাকে ক্রমশ পিছনে টেনে নেয়ার জন্য যেন উঠেপড়ে লাগলো । সেই পুরানো সোডিয়ামের লাইট, রাতের নিস্তব্ধতা, ঘুমন্ত শহর আর ছাদের কার্নিশটা । একটা সময় ছিল যখন এইগুলোই ছিল বাস্তবতা আর বাকি সব রূপকথা । আর এখন এগুলো কেবলই ধুলোর আস্তরণে ঢাকা নেহাত অসম্পূর্ণ ডায়েরীর ছেঁড়া পাতার অংশবিশেষ । চাপা পড়া দীর্ঘনিশ্বাসটা নিজের অজান্তেই বেড়িয়ে এলো । কার্নিশটার কাছে গেলাম । ক্যাকটাসটা এখনও আগের মতোই আছে । হালকা বাতাসের ঝাঁপটায় ক্যাকটাসটা পায়ে এসে লাগলো । মনে হল কেউ চিমটি দিলো । মনে পড়লো পূজাদি’র কথা । পূজাদি এই ক্যাকটাসটা আমার জন্মদিনে দিয়েছিলো । আমি বলেছিলাম, “পূজাদি এটা কেন দিলে” ? উত্তরে পূজাদি একটা চিমটি দিয়েছিলো । আবার জিজ্ঞেস করলাম, “চিমটি দিলে কেনো” ? উত্তরে পূজাদি হেসে বলেছিল, “যখন আমি থাকব না তখন এটা তোকে চিমটি দিবে” । পূজাদি’র সাথে পরিচয়টা ছবির হাটে ইমনের চায়ের দোকানে । ঠিক কিভাবে পরিচয়টা হয়েছিল সেটা মনে করতে পারছিনা কিন্তু মনে পড়ছে সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত চলত আমাদের আড্ডা । আমি তখন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র আর পূজাদি শেষ করে বের হয়ে গিয়েছে । পূজাদি প্রায়ই আমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হতো । তখন ও বুঝতাম না পূজাদি আমার কাছে কি ?? এর পরের দিন গুলো ছিল ক্লাস শেষে ছবির হাট, ইমনের চায়ের দোকান, সন্ধায় বুড়িগঙ্গার পাড়ে অথবা বকুলতলায় গানের আসর কিংবা ফুলার রোডে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ানো দুজন এক সাথে । পূজাদি না থাকলে হয়তো কখনো কৃষ্ণচূড়া ফুল আর পিচঢালা রাজপথের সম্পর্কটাই বুঝতাম না, সার্পেন্টাইন লেকটাও যে কখনো কখনো বাতাসের সাথে অভিমানে চুপটি করে থাকে তাইই হয়তো জানা হতো না, অথবা হয়তো মানুষের মাঝে রঙের যে ব্যপ্তি আর বিশালতা, একই সাথে যে কার্পণ্যতা তাও হয়তো কখনো আমার আকাশে ডানা মেলতে পারতো না, যদি না পূজাদি আকাশটাকে আর গাংচিল গুলোকে নিজের মতো করে না সাজাতো । পূজাদির সম্পর্ক ছিল আজাদ ভাইয়ের সাথে । আজাদ ভাই ছাত্র-সংঘ করতো । পূজাদি এই মানুষটাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো ।
হঠাৎ আমার সেল ফোনটা কর্কশ স্বরে চেঁচাতে লাগলো । পকেট থেকে বের করে দেখলাম অপরিচিত নাম্বার । ধরলাম ফোনটা । ওপাশ থেকে সেই মায়াবী কণ্ঠ । পূজাদি ফোন দিয়েছে । অনেকক্ষণ কথা হল পূজাদি’র সাথে । পূজাদি হঠাৎ বলল কাউকে, “এই শুনছো !! কই তুমি ? তোমাকে না পিচ্চির কথা বলেছিলাম ? এসো কথা বলে যাও” । আমি বললাম, “পূজাদি আমি এখন যথেষ্ট বড় হয়েছি । এখনও আমাকে পিচ্চি ডাকবে” ?? পূজাদি, “অহ !! তাই, কত বড় হয়েসিস শুনি… চলে এসেছ… আচ্ছা পিচ্চি শোন নে তোর ভাইয়ার সাথে কথা বল” !! আমি হ্যালো বলার আগেই পূজাদি ভাইয়াকে বলল, “এটাই আমার ছোট্টবেলার প্রেমিক… হা… হা… হা…” । আমি বরাবরের মতো লজ্জা পেয়ে বললাম, “পূজাদি…তুমি আগের মতই আছো” । পূজাদি বলল, “তুই এত পিচ্চি কেন রে” ?
ফোনটার কর্কশ শব্দে আমি বাস্তবতায় ফিরলাম । ইদানীং এই ব্যাপারটা আমার সাথে প্রায়ই হয় । মাঝে মাঝেই টেলিপ্যাথির এই ব্যাপারটা আমাকে অলীক সম্ভাবনা অথবা পরাবাস্তবতার স্বাদ দিচ্ছে । এই অভ্যাসটাও পূজাদির । একদিন ভর দুপুরে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর পূজাদি এলো কেমন যেন লজ্জা মাখানো চেহারা নিয়ে । চেহারাটা তখন এতোটাই মায়াবি আর লাবণ্য ছিল মনে হচ্ছিলো আকাশ থেকে নেমে আসা অপ্সরী । দেরী করে আসাতে রাগ করেছি ভেবে পূজাদি কাছে এসে বসলো হাশিমুখে । ঐ মন্ত্রমুগ্ধ চাহনি আর হাঁসির আড়ালে রাগ কোথায় যে লুকিয়ে গেল আর খুজেই পেলাম না । কিছুক্ষণ পর লজ্জাবতীর মতো চুপসে ধীর কণ্ঠে পূজাদি জানালো পূজাদি মা হতে যাচ্ছে । আমি আনন্দে আত্মহারা হবো নাকি কান্নায় লীন হবো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না । আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পূজাদি বলল, “আমি তোর ভাইয়াকে খবরটা দিয়ে আসছি” । আমি দেখলাম একগুচ্ছ গোলাপ ফুল রাস্তায় খুশিতে নাচতে নাচতে যাচ্ছে । এতদিনের পরিচয়ে আজই প্রথম উপলব্ধি করলাম পুজাদিকে আমি প্রচণ্ড রকম … আর আজই প্রথম দেখলাম পূজাদি কতটা সুন্দর । মনে হচ্ছিলো গ্রীক দেবী আফ্রোদিতি । সেদিন অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ও পূজাদি আসেনি । তারপর অনেক চেষ্টা করেও পূজাদি’র সাথে দেখা করতে পারলাম না । অনেকগুলো দিন কেটে গেলো রিক্সার চাকা আর হাতঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে । অনেক চেষ্টা করেও পূজাদি’র সাথে দেখা করতে পারতাম না । তাই, একা একা ঘুরে বেড়াতাম আমাদের পরিচিত জায়গাগুলোতে । কিন্তু, খেয়াল করে দেখলাম পূজাদি’র হঠাৎ অনেকখানি চুপসে যাওয়ার সাথে আমাদের পরিচিত জায়গাগুলোও অনেকখানি চুপসে গেছে । ফুলার রোডে ফুল ঝরে পড়ে না, বকুলতলায় গানের আসর বসেনা, ইমনের চায়ের দোকানে আর যাওয়া হয়না, কার্জন হলের সামনে আর বসা হয়না । দিনগুলো কেমন যেন পানসে পানসে মনে হতো । এর কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন পূজাদি আমাকে ডেকে পাঠালো উনার বাসায় । আমি তড়িঘড়ি করে তৎক্ষণাৎ পৌঁছালাম তার বাসায় । ড্রয়িং রুমে বসে অপেক্ষা করছি আর মনে মনে ভাবছি রাগগুলো কিভাবে প্রকাশ করবো । একটা মহিলা এলো খাবারের ট্রে হাতে । আমি একপলক তাকিয়ে আবার ভাবছি পূজাদি আসেনা কেন ? মহিলাটা অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আমাকে যে লক্ষ্য করছে তা আমি বুঝতে পারলাম । কিছু বলবো বলবো এমন সময় উনি বলে উঠলো, ”পিচ্চি !! কেমন আছিস ? আমাকে ভুলে গেছিস না” ??? সদ্য ভুমিষ্ট হওয়া শিশুর ন্যায় আমি অবাক হয়ে পূজাদিকে দেখতে লাগলাম । এ আমি কাকে দেখছি ?? আগের সেই পদ্মপলাশ চোখ এখন হাঁসের পায়ের পাতার ছাপে পরিপূর্ণ, আগের সেই মায়াবী আর লাবণ্য মুখখানা এখন রুক্ষতা আর দুঃখের শেষ সীমার স্বাক্ষর । পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম আমি । কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললাম । পূজাদি কাছে এলো । বলল, “চল ছাঁদে যাই, অনেকদিন আকাশ দেখিনি” । আমি আর পূজাদি ছাঁদে গেলাম । পূজাদি বলল, “সিগারেট আছে তোর কাছে” ? আমি অবাক হলাম । পূজাদি সিগারেট ধরালো । আমি তাকিয়ে দেখছি পুজাদিকে । পূজাদি কাশতে কাশতে বলল, “জানিস আমার চয়নটা ভারী দুষ্ট হয়েছে । সারাটাদিন খেলা আর খেলা ।কোনো কথাই শুনতে চায়না । ভারী দুষ্ট । তুই যাওয়ার সময় ওকে বোকে দিয়ে যাস তো” । এইটুক বলে পূজাদি চুপ করে আকাশের দিকে তাকালো । আমি ভাবছি এ কোন পূজাদি’র সাথে আমি কথা বলছি ?? পূজাদি আকাশপানে চেয়েই বলল, “পিচ্চি !! জানিশ, ইদানীং এই অলীক সম্ভাবনার টেলিপ্যাথিটা আমাকে বড্ড যন্ত্রণা দিচ্ছে । চয়নটাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে রে, চুলে হাত বুলিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে, বুকে নিয়ে ছড়া শুনিয়ে ঘুম পাড়াতে ইচ্ছে করে … ” । হঠাৎ করে আকাশ ঝাঁপিয়ে মেঘবতী কান্না শুরু করলো । পূজাদি এখনও আকাশে তাকিয়ে । খানিকক্ষণ পর বুঝতে পারলাম এ বৃষ্টি মেঘবতীর একার কান্না নয়, এর সাথে পূজাদি’র আক্ষেপ ও জড়িয়ে আছে । আমি আর কিছু না বলে চলে এলাম । সেদিন আমিও মেঘবতীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করলাম । আজ বুঝি সেদিন যদি মেঘবতীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ না করতাম তাহলে হয়তো আর জীবনে কখনোও করা হতো না ।
পূজাদি’র মতো মানুষরা আজাদ ভাইদের ভালবেসে সর্বস্ব উজাড় করে অবশেষে চয়নদের মতো অলীক সম্ভবনার মায়াজাল তৈরী করে । আর আজাদ ভাইরা তাদের স্বার্থ পূরণ শেষে হারিয়ে যায় ব্যস্ত নগরীর কোলাহলে । পূজাদিরা তখন সমাজে নিকৃষ্ট প্রাণী কিংবা ভারী আবর্জনা সমেত বস্তাতে রূপান্তরিত হয় । হয় নিজের হাতে আজাদ ভাইদের ভালবাসার শেষ নিদর্শনকে উৎসর্গ করতে হয় সমাজের তরে অথবা সূর্যের উজ্জ্বল আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে মোমবাতি আর প্রদীপ শিখার আলো দুটোকে একসাথে বুজিয়ে দিতে হয় ।
কি এমন হতো যদি পূজাদি আজ ও আমার সাথে ছবির হাট, ইমনের চায়ের দোকান, সন্ধায় বুড়িগঙ্গার পাড়ে অথবা বকুলতলায় গানের আসর কিংবা ফুলার রোডে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতো ???
কি এমন হতো যদি পূজাদি আজ আমার সাথে অলীক সম্ভবনা অথবা পরাবাস্তবতার টেলিপ্যাথির স্বাদটা নির্মম অথচ সুন্দর বাস্তবতায় নিতো ???
কি এমন হতো যদি পূজাদি আজ তার চয়নকে দেখতে পেত, চুলে হাত বুলিয়ে আদর করতো, বুকে নিয়ে ছড়া শুনিয়ে ঘুম পাড়াতো ???
থাক !! ঘুম না আসলেও নীচে যেতে হবে … ক্লান্তি আর ব্যস্ততা শেষে ঘুমন্ত রাতের শহরটা আবার নিজের বীরত্ব প্রকাশের জন্য জেগে উঠবে একটু পর । আজাদ ভাইয়ের মতো স্বার্থপর সেজে আমিও হারিয়ে যাব নাগরিক কোলাহলে । ভুলে যাব পূজাদি’র কথা । আবার কখনো ছাঁদে আসা হলে ক্যাকটাসটা হয়তো আবার চিমটি কেটে পূজাদি’র কথা মনে করাবে … … … পূজাদিরা হয়তো বেঁচে থাকে ছোট্ট ক্যাকটাসের বিষাক্ত অথচ স্নেহময় কাঁটার ছোঁওয়ায় …………………………………………………………………।।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *