মন্ত্রী-এমপির গাড়ির ভ্যাট ছাত্রসমাজ দিবে না?

পাশ্চাত্য দয়া করে আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতা দিয়ে গেল তাদেরই হাতে শিক্ষিত একটি শ্রেণির হাতে, যারা চলনে বলনে, পোশাকে, ভাষায়, চিন্তায় অর্থাৎ সব দিক দিয়ে তাদেরই মত। শুধু গায়ের রঙ ব্যতীত। এই শ্রেণিটির জন্ম কিভাবে তা আমাদেরকে একটু খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। ব্রিটিশরা যখন এই দেশ শাসন করতে এল তখন দেখল এই অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে দিলে তাদেরকে শাসন কিংবা শোষণ এর কোনটাই করা সম্ভব নয়। এ জন্য তারা চিন্তা করে দেখল যে, তাদের মধ্যে সর্বদা বিভেদ সৃষ্টি করে রাখতে হবে যাতে ওরা ওরা ব্যস্ত থাকে এবং আমাদের শাসন-শোষণের প্রশ্নে তারা নিরব থাকতে বাধ্য হয়। এ জন্য তারা হিন্দু-মুসলাম ইত্যাদি সম্প্রদায়গত বিভাজন সৃষ্টিতে ইন্ধন যোগাতে লাগল। এমনকি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও তারা এক গভীর ষড়যন্ত্র করল। কারণ, তারা ভালোই জানত যে একমাত্র শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই মানুষের মগজধোলাই করে অনুগত রাখা যায়।

ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তারা অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রাষ্ট্রীয় অনুদান বন্ধ করে দেয়। অপরদিকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে যেখানে ইউরোপীয় কায়দায় শিক্ষা প্রদান শুরু হয়। তাদের প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠানে মাত্র কয়েক যুগ আগের ব্রাহ্মণদের সন্তানরা হঠাৎ করে ধর্ম-কর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করা শুরু করে এবং একই সাথে নাস্তিক হয়ে উঠা শুরু করে ( এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ বইটি পড়ার অনুরোধ করছি)। সেখানকার ছাত্রদের শেখানো হলো ইউরোপের রাজা-রানীদের ইতিহাস, শেকেসপিয়ার, কীটস, ইলিয়টীয় ইংরেজি সাহিত্য, সাধারণ গণিত, কিছু কিছু বিজ্ঞান ইত্যাদি। এই মানের পড়ালেখা করেও তারা কিন্তু কখনো একটি নির্ধারিত পদের উর্ধ্বে উঠতে পারত না। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ততো আরো বহু দূরের কথা।

অপরদিকে মুসলমানরা প্রথমে ব্রিটিশদেরকে মেনে নিতে পারেনি। তাই তাদেরকে গ্রহণও করেনি। কারণ ব্রিটিশরা আসার আগে ক্ষমতা তাদের হাতেই ছিল। তাই তারা বিদ্রোহের চেষ্টা করে। কিন্তু উপর্যুপরি দমন-পীড়নের মুখে তারা পরাজিত হয়ে ধীরে ধীরে পতনের দিকে ধাবিত হতে থাকে। অবশেষে তারা দেখল যে হিন্দুরা ব্রিটিশদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে। তাই তারাও বাধ্য হয়ে অনেকের চেষ্টায় তারা ধীরে ধীরে সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করে। তবে ব্রিটিশরা মুসলমানদের জন্যও আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা অর্থাৎ মাদ্রাসা চালু করে যার সিলেবাস ও কারিকুলাম তারা নিজেরাই তৈরি করে। এমনিক তারা নিজেরাই অধ্যক্ষের পদ দখল করে মুসলমানদেরকে ইসলাম শিক্ষা দিতে শুরু করে (পড়ুন: আলীয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, মূল- আ: সাত্তার, অনুবাদ- মোস্তফা হারুণ, ইসলামী ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ এবং Reports on Islamic Education and Madrasah Education in Bengal by Dr. Sekander Ali Ibrahimy (Islami Foundation Bangladesh)।

দুই মুখী এই শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের কারণে দুই ধরনের শিক্ষিতদের মধ্যে শুরু হয় দূরত্ব, যে দূরত্ব আজও বিদ্যমান। মাদ্রাসা শিক্ষায় যে ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয় তাতে দুনিয়াবী কিছু করে খাওয়ার মত কিছু শেখানো হয়নি। শেখানো হয়েছে খুটিনাটি মাসলা-মাসায়েল, নামায পড়া, দাড়ি-টুপি, হায়েস-নেফাস, ঢিলা-কুলুপ, বিবি তালাকের ফতোয়া ইত্যাদি। এছাড়া ও ছিল বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় যা আগে থেকে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করে রেখেছিল। যখন তারা শিক্ষা শেষ করে বাইরের দুনিয়ায় পা বাড়াল তখন তারা দেখল এই সব মাসলা-মাসায়েলভিত্তিক মসজিদের ইমামতি, কোরান শিক্ষাদান, মানুষের বাড়ি বাড়ি দাওয়াত খাওয়ার মত পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া তাদের সামনে ভিন্ন কোন উপায় নেই। প্রশাসন চালানো, রাষ্ট্রীয় কাজ-কর্ম পরিচালনার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতরা তুলনামূলকভাবে মোটামুটি প্রশাসন চালানোর মত কেরানীমানের শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।

এটা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার এই উপমহাদশীয় ইতিহাস হলেও ইউরোপের অন্যান্য ছোট ছোট দেশ পৃথিবীর নানা স্থানে যে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল সেগুলোর ইতিহাসও মোটামুটি একই রকম।

নিজেদের মধ্যে দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধ করে দুর্বল হয়ে পড়ার পর যখন ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার সময় হয় তখন তারা বাধ্য হলো রাষ্ট্র ক্ষমতা ঐ সাধারণ কেরানীমানের শিক্ষিতদের হাতে হস্তান্তর করে যেতে। কারণ এর বাইরে আরবী শিক্ষিত মুসলমানরা রাষ্ট্র চালাতে মোটেও সক্ষম ছিলো না- সেটা আগেই বলা হয়েছে। অপর একটি ভাগ অবশ্য ছিলো যারা সংখ্যার দিক দিয়ে প্রায় পচানব্বই শতাংশ, তারা একেবারে অজ্ঞ, গণ্ডমূর্খ সাধারণ জনতা। এদের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা।

এই কেরানীমানের শিক্ষায় শিক্ষিত ইউরোপীয়দের অনুকরণকারী শ্রেনিটিই হচ্ছে আজকে তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতাশালীরা। এরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেল তখন ইউরোপীয়দের প্রবর্তীত ব্যবস্থার বাইরে অন্য কোন ব্যবস্থা থাকতে পারে তা মোটেও ভাবতে পারেনি। কারণ, ইতোমধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে ইউরোপীয়রাই শ্রেষ্ঠ এই ধারণা মন-মগজে গেঁথে দিয়েছে। সুতরাং তারা সেটাই হুবহু এদেশীয় জনগণের উপর চাপিয়ে দিল। পরিবর্তন শুধু এটুকুই যে আগে সাদ চামড়ার ইউরোপীয়রা শাসন করত আর এখন এদেশীয় বাদামী চামড়ার মানুষেরা শাসন করে।

এখন তারা যখন শাসকের আসনে বসেছে তখন তাদেরকেও বিত্তশালী ইউরোপীয়দের মত ঠাট-বাট, জৌলুস দেখাতে হবে। তাদেরকেও চকচকে গাড়ি, আলিশান অফিস, স্যুট-কোট, টাই ইত্যাদি পরিধান করতে হবে। সুতরাং পূর্ব প্রভূদের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা যেমন সুসজ্জিত প্রাসাদে বাস করেন এরাও তাই করতে লাগলেন। তাদের আইন পরিষদের সদস্যরা যে মানের জীবন-যাপন করে তাই করতে লাগলেন। পাশ্চাত্য দেশগুলির জনসাধারণ এই শোষিত জনগণের চেয়ে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বহু উপরে। তাদের পক্ষে তাদের সরকারের ঐ জাক-জমক জোগান দেয়া কঠিন নয়। কিন্তু প্রাচ্যের গরীব জনসাধারণ, যাদের পরনের কাপড় নেই, পেটে খাবার নেই, তাদের পক্ষে তা অসম্ভব। কিন্তু ঐ অসম্ভবকেই তাদের সম্ভব কোরতে হচ্ছে আরও না খেয়ে থেকে, আরও উলঙ্গ থেকে। আগে না খেয়ে টাকা যোগাত বিদেশি প্রভুদের, এখন আরও না খেয়ে থেকে কর দেয় নিজেদের নির্বাচিত সরকারকে। বিদেশী প্রভুদের যত কর দিতো, আজ নিজেদের নেতাদের জাক-জমক, আড়ম্বর বজায় রাখতে তার চেয়ে অনেক বেশী কর দেয়। দেশি নেতাদের পাশ্চাত্যের ঠাট নকল করাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সেই সঙ্গে গরীব জনসাধারণের ওপর করের বোঝাও বাড়ছে।

তো তাদের এই ভোগ-বিলাসীতা, ঠাঁট-বাট, দামি দামি গাড়ি, উচ্চ বেতনের কর্মচারী/উপদেষ্টা পোষা, লাখ লাখ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য, সেনা সদস্যদের পেছনে উচ্চমাত্রার খরচের টাকা আসবে কোত্থেকে? কে মেটাবে তাদের খর-পোষ? অর্থমন্ত্রী কি পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে এসব ব্যয় নির্বাহ করবেন? তাতেই বা কার ভাগে কতটুকু পড়বে? সুতরাং শিক্ষা খাতে ভ্যাট আরোপ করা হবে না তো কি হবে? হ্যাঁ, পাশ্চাত্যের আদলে এই সব রাষ্ট্রীয় ব্যয়, মন্ত্রী-এমপি, রাজকর্মচারীদের বাড়ি-গাড়ির খরচ মেটাতে মানুষের নিঃশ্বাসের উপরও ভ্যাট আরোপ করা একান্ত জরুরী।

৩ thoughts on “মন্ত্রী-এমপির গাড়ির ভ্যাট ছাত্রসমাজ দিবে না?

  1. বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন শতভাগ
    বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন শতভাগ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার মত মৌলিক অধিকারকে রাষ্ট্র এবং শিক্ষাব্যবসায়ীরা যেভাবে ধনীদের অধিকার হিসাবে দাঁড় করাচ্ছেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরা ভবিষ্যতে শিক্ষাকে বিলাসীতা হিসাবেই দেখবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *