জংগিবাদ দমনে ধর্মের উৎখাতই কি জরুরী?

ধর্মকে পুজিঁ করেই জন্ম হয় উগ্রতা, জংগিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। এ জন্য ধর্মকেই উচ্ছেদ করতে হবে, ধর্মের মুলোৎপাটন করতে হবে এটা বর্তমান সময়ে অনেকেই বলে থাকেন। কিন্তু এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য তা ভেবে দেখা একান্ত উচিত বলে আমি মনে করি। তবে এর আগে বলে নেই, ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম থেকে জন্ম নেওয়া জংগিবাদ আল-কায়েদা, তালেবান মোটামুটি স্তিমিত হওয়ার পর বর্তমানে আইএস একটা শক্তিশালী মহীরূহ রূপ ধারণ করেছে। সচেতন ব্যক্তিমাত্রই তাদের শক্তি-সামর্থ, অর্থ, লোকবল, বিস্তৃতি কতদূর গড়িয়েেছে সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। আজকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের সমান একটা এরিয়া কব্জা করেছে। তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা হিসেবে তারা এই উপমহাদেশেও প্রবেশ করবে ২০২০ সালের মধ্যে।

এই অবস্থায় যখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে যেহেতু ধর্ম থেকে এ সমস্যার উৎপত্তি তাই ধর্মকেই নির্মূল করতে হবে তখন তা আমার কাছে আকাশ-কুসুল কল্পনা এবং আত্মঘাতী রোমান্টিকতা ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে সমস্যা সমাধানের পথে না গিয়ে এসব কর্মকাণ্ড হচ্ছে ভিন্ন দিকে সময় ব্যয় করা।

ধর্ম আজকের সৃষ্টি নয়। কোন কোনটার জন্ম তথ্য মতে হাজার হাজার বছর আগে। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী। সুতরাং তাদের হাত থেকে ধর্মকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টায় সফলতার জন্য মানুষকে অন্তত হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে বা আদৌ সেটা সম্ভব কিনা তা নিয়েও নিশ্চিত হওয়া যায় না। অর্থাৎ মানুষের ধর্মবিশ্বাসের সাথে লড়াই করতে হবে দীর্ঘ সময়। কিন্তু আমাদের সামনে যথেষ্ট সে সময় রয়েছে কী? আমাদের সমস্যা বর্তমান সময়েই হাজির নয় কী? হ্যাঁ, সমস্যা বর্তমান। অতএব বাস্তব সমস্যাকে এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং যার বাস্তবায়ন অনিশ্চিত সেটা নিয়ে পড়ে থাকা বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়। ততদিনে আমাদের হাড়-গোড় দিয়ে উৎকৃষ্ট জৈব সার তৈরি হয়ে যাবে।

তাই আমার প্রস্তাব হচ্ছে ধর্মকে উৎখাতের পেছনে আমরা যে সময় ব্যয় করছি সেই শক্তি, বুদ্ধি ও যুক্তি ব্যবহার করে কিভাবে ধর্মের নামে গজিয়ে উঠা এই অপশক্তিকে রুখে দেওয়া যায় তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে ধর্ম এবং ধর্মোজাত ব্যাখ্যা থেকে যেমন জংগিবাদের জন্ম হয়েছে, তেমনি সেই একই ধর্ম থেকে সুফিবাদেরও জন্ম হয়েছে। সেই ধর্ম থেকে পীরতন্ত্রেরও জন্ম হয়েছে। সুতরাং ধর্মকে আমরা কোন পথে ব্যবহার করব সেটা আমাদের হাতেই নির্ভর করে। আমি বিশ্বাস করি, ধর্ম থেকে একতরফা জংগিবাদের জন্মদান, এক তরফা পীরতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র, ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার কোনটাই সম্ভব নয় যদি আমরা ধর্মকে তার আসল পথে চলত দেই। ধর্ম ভারসাম্য একটি ব্যবস্থা। এখন কেউ এর কোন একটা অংশকে টেনে যদি ভিন্নখাতে নিয়ে যায় তখন ধর্মকে বাদ দিয়ে নয়, সেই ধর্মকে ব্যবহার করেই আমরা এর বিকৃত ব্যবহার রোধ করতে পারি।

এখন কথা হচ্ছে আমরা কোন পথ ধরব সেটা নির্ধারণের পর আলোচনা করা যায় আমরা কীভাবে ধর্মকে জংগিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করব। আগে প্রশ্ন, আমরা ধর্মকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *