আমার কিছু সাদাসিধে কথা

স্যার,
সাদাসিধে কথা এতদিন আপনি লিখেছেন, আজ আপনার চরণ স্পর্শ করে আমি কিছু সাদাসিধে কথা নিবেদন করতে চাই।
.
বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে, পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে যদি একজন ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে ভেবে থাকেন তো সেই ব্যক্তি আপনি। আপনার মতো এক মহান ব্যক্তি যার কাছ থেকে বাঙালি জাতি আজীবন শুধু নিয়েই গেছে তার মূল্য এই জাতির সন্তানেরা, বিশেষ করে আপনার ছাত্ররাই এভাবে কেন পরিশোধ করল তার কারণ আমি বলছি। এই পরিস্থিতি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, যে কোনো শিক্ষাঙ্গনেই হতে পারত, অতীতে হয়েছে এবং হচ্ছে।
.

স্যার,
সাদাসিধে কথা এতদিন আপনি লিখেছেন, আজ আপনার চরণ স্পর্শ করে আমি কিছু সাদাসিধে কথা নিবেদন করতে চাই।
.
বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে, পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে যদি একজন ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে ভেবে থাকেন তো সেই ব্যক্তি আপনি। আপনার মতো এক মহান ব্যক্তি যার কাছ থেকে বাঙালি জাতি আজীবন শুধু নিয়েই গেছে তার মূল্য এই জাতির সন্তানেরা, বিশেষ করে আপনার ছাত্ররাই এভাবে কেন পরিশোধ করল তার কারণ আমি বলছি। এই পরিস্থিতি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, যে কোনো শিক্ষাঙ্গনেই হতে পারত, অতীতে হয়েছে এবং হচ্ছে।
.
আপনি অন্যান্য শিক্ষকের চেয়ে জনপ্রিয় বিধায় হয়তো এ নিয়ে অনেক বেশি প্রতিবাদ, নিন্দাবাদ, শ্লোগান, চিৎকার, সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি, লেখালিখি, টকশো-ঝড় হবে, কিন্তু সব দিয়েও কি আপনার সম্মান, আপনার স্ত্রী যিনি আমাদের মাতৃতুল্য এবং শিক্ষিকা তার সম্মান প্রত্যার্পিত হবে? আপনার হৃদয়ের ক্ষত কি মিলিয়ে যাবে?
.
যাবে না। এই স্বরচিত নরকে কারোরই সম্মান শেষ পর্যন্ত রক্ষিত হবে না, আজ আপনি কাল অন্য কেউ কপালে করাঘাত করবে। আপনি গলায় দড়ি দিয়ে মৃত্যুবরণ না করলে কে জানে হয়তো বা বঙ্গবন্ধুকে যেমন তার সন্তানতুল্য পাষণ্ডদের হাতে নির্মম মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে তেমনিভাবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে।
.
শ্রদ্ধেয় স্যার,
.
অপরাধ নেবেন না। প্রকৃত মানুষ হওয়ার যে পথ সেই পথ তো আমাদের জ্ঞানী-গুনীরাই বন্ধ করে রেখেছেন। আমরা আপনার কাছ থেকে ফিজিক্সের মজার খেলা শিখেছি, আইনস্টাইন শিখেছি, গণিতের আনন্দ পেয়েছি। কিন্তু আমাদেরকে সত্য-মিথ্যা, ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য শিক্ষা দিতে ভুলে যান নি তো?
.
আপনার ছাত্ররা গণিত অলিম্পয়েডে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আপনার মুখ উজ্জ্বল করেছে কিন্তু আপনি তাদেরকে মানুষ হওয়ার প্রথম পাঠটি যদি শিক্ষা দিতেন তাহলে আরো অসংখ্য ছাত্র শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল যারা আপনার লাঞ্ছনার আগে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিত।
হ্যাঁ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনপণ লড়াই করা প্রতিটি মানুষের জীবনের প্রথম কর্তব্য, এটাই মানুষ হওয়ার প্রথম পাঠ। অর্থাৎ আমার জীবন হবে মানবকল্যাণে নিবেদিত। অথচ আজ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি সর্বত্র কেবল আত্মপূজাই শেখানো হয়। মানুষ জন্ম নেয় নিজের জন্য, শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের চাকরির জন্য, উপার্জন করে নিজে ভোগ করার জন্য, বংশবিস্তার করে, এমনকি এবাদত বন্দেগি করে সেও নিজের জন্য এক কথায় পশুর জীবন।
.
নিজের গায়ে আঁচড় লাগে এমন কোনো কাজ কখনো সে করবে না। তাই যখন দুর্বৃত্তরা শিক্ষকদের উপর আক্রমণ করে কিংবা চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে তখন সমাজের প্রতিটি মানুষ চিত্রার্পিতের ন্যায় তাকিয়ে দেখে, বিবেকের দংশন যার অনুভূত হয় সে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
.
আপনি আপনার ছাত্রদেরকে মানুষের ধর্ম কী তা শিক্ষা দিতে ভুলে যান নি তো? আজকে শেখানো হচ্ছে বিজ্ঞানই ধর্ম। কিন্তু মানুষের প্রকৃত ধর্ম যে মানবতা, মনুষ্যত্ব সেই জ্ঞান তাদেরকে দেওয়া হয় নি। যার ভিতরে মানবতা নেই সে মানুষই নয়, সে দু পেয়ে জীব মাত্র। আজকে আমরা দু পেয়ে জীবদেরকে শিক্ষিত করতে চাই, কিন্তু যুগে যুগে দু পেয়ে জীবকে মানুষ বানিয়েছে ধর্মের শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ। সকল নৈতিক শিক্ষাই যে ধর্ম থেকে উৎসারিত এ সত্যকে নিশ্চয়ই অন্ধ ছাড়া কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
.
শিক্ষককে শ্রদ্ধা করতে হবে এই কথা গণিত বা ফিজিক্স বইয়ের কোন অধ্যায়ে লেখা আছে বলতে পারেন? এই শিক্ষা অনাদিকাল থেকে মানুষ লাভ করেছে ধর্ম থেকে। কিন্তু ধর্মের প্রতি আজ অ্যালার্জি সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে। ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে যে গুরুজনে শ্রদ্ধা-ভক্তি এবং কনিষ্ঠদের প্রতি স্নেহ মমতাও বিদায় নেবে সেটা কি আপনার বিবেচনায় ছিল না?
.
আসলে নৈতিকতার শিক্ষা, আত্মিক শিক্ষাই মানুষকে মানুষ করে গড়ে তোলে, ধর্মকে যখন আমরা বাদ দিয়েছি তখন আমরা আসলে দ্বার বন্ধ করে ভ্রমটারে অর্থাৎ ধর্মের নামে চলা বিকৃতি, অন্যায়গুলোকে রুখতে গিয়ে আলো তথা মঙ্গলময় সব কিছুর প্রবেশের পথও রুদ্ধ করে দিয়েছি।
.
বর্তমানের প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসগুলো অবশ্যই বিকৃত এবং তাতে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি। কিন্তু সেজন্য ধর্ম তথা স্রষ্টার অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সকল নৈতিকতা ও ধর্মের শিক্ষাকেই ত্যাগ করার প্রবণতা কে বা কারা সৃষ্টি করল তা কি আপনি জানেন না? পাশ্চাত্যের ধর্মহীন দর্শন প্রাচ্যের বিশ্বাসভিত্তিক মগজে ঢোকানোর এই বিষম প্রচেষ্টার কুফল তো এখন দৃশ্যমান। তবুও কি আমাদের ঘোর কাটবে না?
.
শিক্ষকের মর্যাদা আমরা বাদশাহ আলমগিরের জীবনে দেখতে পাই। পানি ঢেলে শিক্ষকের পা ধুইয়ে দেওয়াটাই গুরুভক্তি হিসাবে তিনি যথেষ্ট মনে করেন নি, তিনি চেয়েছিলেন শাহজাদা যেন নিজের হাত দিয়ে গুরুর চরণ স্পর্শ করে পা ধুইয়ে দেয়। এটা প্রকৃত ইসলাম হারিয়ে যাওয়ার প্রায় নয়শ বছর পরের মূল্যবোধ।
.
হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ঐতিহ্য মতে পালিত একটি উৎসব আছে যাতে “গুরু পূজা” সম্পন্ন করা হয়। ‘গুরু’ শব্দটি ‘গু’ এবং ‘রু’ এই দুটি সংস্কৃত শব্দ দ্বারা গঠিত; ‘গু’ শব্দের অর্থ ‘অন্ধকার’/‘অজ্ঞতা’ এবং ‘রু’ শব্দের অর্থ ‘যা অন্ধকারকে দূরীভূত করে’। অর্থাৎ, ‘গুরু’ শব্দটি দ্বারা এমন ব্যক্তিকে নির্দেশ করা হয় যিনি অন্ধকার দূরীভূত করেন। এই বস্তুবাদী দর্শনের যুগে গুরুরা সবাই স্রেফ শিক্ষকে পরিণত হয়েছেন। জ্ঞানবিক্রি তাদের পেশা। তারাও ঐ স্বার্থচক্রে বাধা।
.
আপনি জানেন যে, বাল্যকালে মানুষ বেদনা পায় বন্ধুদের থেকে, যৌবনে আঘাত পায় প্রেয়সীর থেকে, বৈবাহিক জীবনে কষ্ট পায় স্ত্রী থেকে আর বার্ধক্যে পীড়া লাভ করে সন্তানের থেকে। সেই পীড়া থেকে মানুষ মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পায় না। উপযুক্ত সময়ে সঠিক সংস্কার ও শিক্ষা না দিতে পারলে সন্তানই তার বার্ধক্যে উপনীত পিতার হৃদয়কে জর্জরিত করে দেয়। আত্মহত্যা করার মতো মনোবাঞ্ছা তখনই আসে।
.
একজন শিক্ষককে যখন অপর শিক্ষক সম্মান দিচ্ছে না, দাবি-দাওয়া আন্দোলনের নামে তার পথ রুদ্ধ করছে, বা কক্ষের মধ্যে বন্দী করে রাখছে তখন ছাত্ররা সেই শিক্ষকদেরকে সম্মান করবে এমন আশা করা দুরাশা নয় কি?
.
ধর্মের শ্বাশ্বত শিক্ষাগুলো আমাদেরকে মনে রাখতে হবে। মহারানী দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় জ্ঞানীদের মৌনতাই কুরুক্ষেত্রের অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ। কপট পাশা খেলার সময় রাজসভায় ভীষ্ম, বিদুর, সঞ্জয়, ধৃতরাষ্ট্র, দ্রোণাচার্য্য এমন কি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন এবং মৌন থেকে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতো অন্যায় হতে দিয়েছেন।
.
তারা সমাজধর্মের দিকে না তাকিয়ে যার যার ব্যক্তিগত ধর্মকে পালন করেছেন অর্থাৎ আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন। পরিণামে এই অন্যায় থেকে মহাযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। তাই হাজার অপরাধীর অপরাধের থেকে ধ্বংসাত্মক অপরাধ হলো জ্ঞানীর মৌনতা। কেননা জ্ঞানীদের দিকে মানুষ পথপ্রাপ্তির জন্য চেয়ে থাকে। তারা মৌন থাকলে গোটা সমাজই পথভ্রষ্ট হয়।
.
এবার আপনি অনুগ্রহ করে স্মরণ করুন, আপনার সামনে কী কী অন্যায় হয়েছে যেখানে আপনি মৌন ছিলেন? অতীতে অনেক শিক্ষকের অপমান বিভিন্ন ক্যাম্পাসে হয়েছে, জাহাঙ্গীরনগরের কথা সবারই মনে আছে। কলেজ থেকে ছাত্রদের দ্বারা অধ্যক্ষকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে, পোশাক-আশাক ছিড়ে বের করে দেওয়ার ঘটনাও আমাদের দেশে অনেকবার ঘটেছে। সেই অন্যায়ের প্রতিবাদে আমরা কাউকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখি নি। হয়তো শিক্ষকরা ভেবেছেন, আমার জীবনে এটা ঘটবে না।
.
আপনার একটি কথায় তরুণ সমাজ উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। অথচ নিজের সেই অতুল ক্ষমতাকে আপনি অপচয় করেছেন, বিপথগামী তরুণরা একাত্তরের চেতনাকে ব্যবসায় পরিণত করেছে, ফাঁকাবুলিতে পরিণত করেছে, আপনি সেটা দেখেও দেখেন নি। তবে কি আপনি কেবল জনপ্রিয়তা চেয়েছিলেন?
.
আপনার সব কথা ও কাজের সঙ্গে আমি হয়তো একমত নই কিন্তু আপনি এবং আপনার অগ্রজ বাংলা ভাষা ও বাঙালির অহঙ্কারের বস্তু। আপনারা বাংলাকে যা দিয়েছেন তার ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। তাই আপনার লাঞ্ছনা পুরো জাতির লাঞ্ছনা। এই বেদনা আমি নিজের অনুভবে ধারণ করেছি। কিন্তু নিরর্থক নিন্দাজ্ঞাপন, বিচার চাই ইত্যাদি বলে প্রতিবাদের আস্ফালন আমি করতে রাজি নই।
.
বরং আমি চাই পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ পরিহার করে এমন একটি আত্মিক ও ব্যবহারিক জীবনের ভারসাম্যযুক্ত শিক্ষা এ জাতির সন্তানদেরকে দেওয়া হোক যা প্রথমে তাদেরকে মানুষ করবে, নৈতিক চরিত্রে বলিয়ান করবে, তাদেরকে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি দেবে, ন্যায়-সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়ে সংগ্রাম করার প্রেরণা দেবে। পাশাপাশি তাদেরকে জ্ঞানে বিজ্ঞানে অগ্রণী করবে। আত্মিক শিক্ষা না থাকলে বিজ্ঞান শিখে তারা পারমাণবিক বোমা বানাবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে মানবজাতির অকল্যাণে ব্যবহার করবে।
.
এই ভারসাম্যযুক্ত শিক্ষা ছাত্রদেরকে দেওয়া হলে কয়েকজন সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে শত শত ছাত্র শিক্ষকদের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াবে। নিরুপায় পুলিশকে সন্ত্রাসীদের সামনে হাতজোড় করতে হবে না। অন্যথায় সব শিক্ষাই হবে বালুচরে প্রাসাদ নির্মাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *