একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং তার মা ।

রুমি আজাদ সহ আরও কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছে আর যুদ্ধ নিয়ে সবাই আলোচনা করছে। একজন বলে উঠলো -আচ্ছা, এতো যে যুদ্ধ যুদ্ধ করতেছো, যুদ্ধ আরম্ভ হলে কে কে যুদ্ধে যাবা?
হাবিব আলম বলে, আমি যাবো।
কাজী কামাল বলে, আমিও যাবো।
জুয়েল বলে, আমি সবার আগে থাকবো।
রুমি বলে, আমাকেতো যেতেই হবে । উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই…।

রুমি আজাদ সহ আরও কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছে আর যুদ্ধ নিয়ে সবাই আলোচনা করছে। একজন বলে উঠলো -আচ্ছা, এতো যে যুদ্ধ যুদ্ধ করতেছো, যুদ্ধ আরম্ভ হলে কে কে যুদ্ধে যাবা?
হাবিব আলম বলে, আমি যাবো।
কাজী কামাল বলে, আমিও যাবো।
জুয়েল বলে, আমি সবার আগে থাকবো।
রুমি বলে, আমাকেতো যেতেই হবে । উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই…।
আজাদ তুই কি করবি? আজাদ বলে আমি মাকে গিয়ে বলবো, মা আমি যুদ্ধে যাবো , তুমি না কর না। মা যদি অনুমতি দেন আমি অবশ্যই যাবো। না দিলে কি করবো সেইটা বলতে পারি না। তোরা তো জানিসই আমার মা বেঁচে আছে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে। আজাদ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে পুরোটা আড্ডা নীরব হয়ে যায়। কারন সবাই জানে আজাদের ব্যাপারটা। সবাই জানে এই স্কাটনের কোন বড়লোক বাড়ির ছেলে আজাদ। শুধু মায়ের সম্মান রক্ষার জন্য মায়ের সঙ্গে মগবাজারের বাসায় একা পড়ে আছে।


শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ

যুদ্ধ শুরু হল আজাদের অনেক বন্ধু যুদ্ধে গেল, অপারেশন করতেছে, অস্রশস্র তার বাড়িতে রাখতেছে। এমনকি সাফল্যও আসতেছে। এমন কথা তার বন্ধুদের মুখে শুনে আজাদ বলল সামনের অপারেশনে আমাকে অবশ্যই নিবি, আমিও যাবো।
জুয়েল বলে, যেতে চাইলে যাবি কিন্তু আগে খালাম্মার পারমিশন লাগবে। আজাদ বলল মা ঠিক পারমিশন দিবে। ঘরে অস্রশস্র রাখতেছি , তাতে যখন আপত্তি করে নাই।
সেই রাতেই ভাত খেতে খেতে আজাদ মাকে বলে, মা, এরা এরপর যেই অপারেশনে যাবে, আমি সেইটাতে যেতে চাই। এত বড় জোয়ান ছেলে, ঘরে বসে থাকে, আর দেশের মানুষ মার খায়, এটা হতে পারে না।
মা কথার জবাব দেন না।
আজাদ বলে -“এই দেখ মার এপ্রুবাল আছে। মা আপত্তি করল না।”
মা বলেন, আমি কালকে তোকে ফাইনাল কথাটা বলব। আজকের রাতটা সবুর কর।
ঠিক আছে। কিন্তু দেখো মা, না করো না।
মা সারা রাত বিছানায় ছটফট করেন, কি বলবেন ছেলে কে। যুদ্ধে যাও। পরে যদি কিছু হয়। আজাদ বহু সাধনার ধন। তার প্রথম সন্তান ছিল একটা মেয়ে, সেই মেয়ে বসন্ত হয়ে মারা গেল। আজাদের পরেও আরেক সন্তান এসেছিলো সেও বেঁচে নেই। আজাদ তার সর্বস্ব। তাকে বুকে আগলে না রেখে কি তিনি পারেন?
আজাদের মা আজ সত্যিই অগ্নি পরীক্ষা দিচ্ছেন, কি করবেন তিনি। তিনি পারবেন তার ছেলে কে আগলে রাখতে? কিন্তু দেশ যখন তার ছেলেকে চাচ্ছে। আজাদের মা যতটুকু খবর রাখেন তাতে তিনি মনে করেন এই জুলুম নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না। তিনি ছেলেকে মানুষ করেছেন কি নিজে ছেলের আয়-রোজগার আরাম করে ভোগ করবেন বলে? কক্ষনো নয়। এ কথা তিনি আজাদকে লিখেছিলেন, ছেলেকে তিনি মানুষ করেছেন মানুষের যা কিছু কর্তব্য তাই করবে বলে। দেশ আর দশের কাজে লাগবে বলে।
অবশেষে আজাদ কে ডেকে মা বলল “ঠিক আছে তুই যুদ্ধে যেতে পারিস, আমার দোয়া থাকলো”
আজাদ মনে করেছে মা রাগের মাথায় অনুমতি দিয়েছে, আজাদ প্রশ্নও করেছে মা তুমি কি অন্তর থেকে পারমিশন দিচ্ছ নাকি রাগের মাথায়?, মা বলল -‘আরে রাগ করবো কেন, দেশ স্বাধীন করতে হবে না।’

আজাদ যুদ্ধে গেল। দুটো অপারেশনে অংশ নিল। তাদের বাড়িতে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হলো। গেরিলারা আশ্রয় নিল। ১৯৭১ সালের আগস্টের ৩০ তারিখ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঘেরাও করল ঢাকার কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয়-বাড়িতে। আজাদদের বাড়িও ঘেরাও করলো গোলাগুলি হলো,কেউ পালিয়ে গেলেন কিন্তু আজাদ, ক্রিকেটার জুয়েলসহ অনেকেই ধরা পড়ল।

আজাদের মা আজাদের সঙ্গে দেখা করেছে রমনা থানায় এক সিফাইকে গুষ দিয়ে, তারপর জাহানারা ইমাম গেলেন আজাদের মার সঙ্গে দেখা করতে, তিনি জানতে চাইলেন কি কথা বললেন? কেমন আছে আজাদ? আজাদের মা বলল “বইনরে। বড্ড মারছে আমার আজাদরে। আমি কইলাম বাবা কারো নাম বল নাই তো? সে কইলো, না মা, কই নাই। কিন্তু মা যদি আরো মারে? ভয় লাগে যদি কইয়া ফেলি?” আমি কইলাম, ‘বাবা, যখন মারবো, তুমি শক্ত হইয়া সহ্য কইরো’ ।

আজাদের মার সাথে যেদিন শেষ দেখা হয়েছিলো সে দিন আজাদ ভাত খেতে চেয়েছিল, বলল “মা, কত দিন ভাত খাই না। আমার জন্য ভাত এনো তো। খুব ভাত খেতে ইচ্ছা করে।” মা ভাত নিয়ে গেলেন রমনা থানায়, গিয়ে দেখলেন, ছেলে নেই।

…… সেই থেকে অপেক্ষা করেছিলেন আজাদের মা, এই বুঝি ফিরে এসে ভাত চাইবে তার ছেলে। না, আর ফেরেননি আজাদ। তাই মা-ও আর কোনো দিন ভাত মুখে তোলেননি। ১৪ বছর শুধু রুটি খেয়ে থেকেছেন মা। ঘুমিয়েছেন মেঝেতে। কারণ ছেলে যে তার শুয়ে ছিলো নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এম.পি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলের মেঝেতে।

১৯৮৫ সালের ৩০ আগস্ট না ফেরার দেশে চলে যান শহীদ আজাদের মা। তাঁর কবরের নাম ফলকে নাম-পরিচয়ের জায়গায় লেখা হয় মায়ের পরিচয়:মোসাম্মৎ সাফিয়া বেগম,”শহীদ আজাদের মা।”

আজাদের ধরা পড়ার দিনটিও ছিলো ৩০ আগস্ট। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করেন টগবগে তরুণ আজাদ।

জাহানারা ইমামের ৪ আগস্টের দিনলিপির কিছু অংশ……

ঢাকার বিচ্ছুদের কাজ কারবার ক্রমেই দুঃসাহসিক হয়ে উঠেছে। এই তো গতকাল সন্ধার আগে দিয়ে স্টেট ব্যাংকের গেটে , মিলিটারি পুলিশের নাকের ডগায়, পথচারীদের চোখের সামনে , কয়েকজন বিচ্ছু বোমা ছুঁড়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে। একটাকেও ধরতে পারে নি মিলিটারিরা । ছেলেগুলো জানের ভয় বলতে কিছু নেই। গ্রেনেডের মতই জানটাকেও হাতের মুঠোয় নিয়ে চলে ওরা। স্বাধীন বাংলা বেতারে শুনি যুদ্ধক্ষেত্রে যারা যুদ্ধ করছে , তারাও এমনি অসম সাহসী। ‘মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী’ -জানের কোন পরওয়া নেই, ‘জীবন – মৃত্যু, সত্যিই ওদের পায়ের ভৃত্য।’

স্বাধীন বাংলা বেতারে গান বাজছেঃ

তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে
আমরা ক’জন নবীন মাঝি হাল ধরেছি শক্ত করে রে ।
তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে।

জীবন কাটে যুদ্ধ করে
প্রাণের মায়া সাঙ্গ করি
জীবনের স্বাদ নাহি পাই।।
ঘর-বাড়ির ঠিকানা নাই
দিন-রাত্রি জানা নাই
চলার ঠিকানা সঠিক নাই।

জানি শুধু চলতে হবে
এ তরী বাইতে হবে
আমি যে সাগর-মাঝি রে।

ঘরবাড়ি ঠিকানাবিহীন, দিন রাত্রির বোধবিহীন, অথই দিকচিহ্নহীন জানবাজ ঐ নবীণ মাঝিদের কথা মনে করে আমি ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদতে লাগলাম।

দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছর পর আজ রুমি আজাদের স্বপ্নের সাথে বর্তমান বাস্তবতা যদি বিচার করি তাহলে দেখি, সেই ৪৪ বছর আগের স্বপ্ন আজও বিদ্যমান, তাহলে কি জন্য তাদের জীবন দেশের উৎসর্গ করে গেল? এই উত্তর কি পাওয়া যাবে কারো কাছে? তারা তো নিশ্চিত মৃত্যু জেনেই যুদ্ধে গিয়েছিলো। নিজের কিংবা নিজের পরিবারের জন্য তো জান নি। তাই আজ রুমি আজাদ-রা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক, তাদের সাহসই আমাদের পারে নতুন কিছু ভাবাতে, নতুন কিছু চিন্তা করতে।

মান্নাদে’র একটা গান মনে পড়ছে। . . . . “ক’ফোটা চোখের জল ফেলেছো যে তুমি ভালোবাসবে। পথের কাঁটায় পায়ে রক্ত না ঝরালে কি করে এখানে তুমি আসবে “।
আজ শহীদ আজাদের কথা আমরা অনেকেই ভুলতে বসেছি। ভুলতে বসেছি মা-ছেলের আত্মত্যাগের কথা। আর কতটা বিসর্জন দিলে সারাদেশ একসাথে একটা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে মনে রাখবে? আর কত বছর আজাদের মা ভাত না খেয়ে থাকলে তাকে জাতীয় ভাবে স্মরণ করা হত।

সেক্টর-২ এর কমান্ডার ছিলেন খালেদ মোশাররফ, এই সেক্টরের অধীনেই রুমি-আজাদরা প্রশিক্ষন নেয় এবং ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দিয়ে গেরিলা অপারেশন চালায়। খালেদ মোশাররফ বলেছিলেন “কোন স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না”। আসলেই তো!

সহায়ক বইঃ
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের -একাত্তরের দিন গুলি। এবং
আনিসুল হকের -মা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *