ইন্দোনেশিয়ার জেলে ইব্রাহীমের মহত্ত্ব এবং আমাদের লজ্জ্বা

সপ্তাহ দু‘য়েক আগে একদিন রাতে বিবিসি ওয়ার্লড সার্ভিস শুনছি। উপস্হাপক ম্যাথিউ ব্যাানিস্টারের কণ্ঠ বুঝতে পেরে একটু মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। তাঁর উপস্হাপনার স্টাইল, বাচনভঙ্গী আর বিষয়বস্ত নির্বাচন চমতকার। আমার প্রিয় উপস্হাপক। হঠাত শুনি তিনি বাংলাদেশী ‘বোট-পিওপলের‘ কথা বলছেন। এ বিষয়ে তিনি দোভাষীর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার এক জেলে মোহাম্মদ ইব্রাহীমের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন। ইব্রাহীম কিছুদিন আগে এরকম কিছু ‘বোট-পিওপল‘ উদ্ধারে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ‘বোট-পিওপল‘ কথাটা এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটা টার্ম। ৮০‘র দশকে ভিয়েতনামী ‘বোট-পিওপলরা‘ আমেরিকা যেত। ইন্দোনেশিয়া থেকেও বিভিন্ন দেশের মানুষ নৌকায় অষ্ট্রেলিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে। আর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে এশিয়া-আফ্রিকার গরীব মানুষদের স্বপ্নলোক ইউরোপ পৌঁছার চেষ্টা চলছে দশকের পর দশক ধরে। সেটা করতে গিয়ে সাগরে ডুবে মরা হাজার হাজার মানুষের করুন কাহিনী আজ মানবজাতিকে, বিশেষ করে, ইউরোপের মানুষকে এক জটিল প্রশ্নের মুখোমুখী দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্নটি হলো : ভাগ্যের অন্বেষণে বিদেশ পাড়ি দিতে সাগরে নৌকাডুবির শিকার এই হতভাগাদের নিয়ে তারা কি করবে? তারা কি তাদের আদৌ উদ্ধার করবে? নাকি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে? অথবা উদ্ধার করে তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? এই উদ্ধার ততপরতা কি আরো সাগরপাড়ি উতসাহিত করবে? কিছুদিন আগে এ্কই প্রশ্নের মুখোমুখী হয়েছিলেন মোহাম্মদ ইব্রাহীম।

ঘটনার দিন রাতে ইব্রাহীম সুমাত্রার অদূরে সাগরে মাছ ধরছিলেন। এমন সময় অন্য এক নৌকার মাঝি তাকে কিছুদূরে এক নৌকাডুবির খবর দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ইব্রাহীম তার নৌকা নিয়ে ঘটনাস্হলে ছুটে যান। যাওয়ার পথে ওয়ারলেসে আশেপাশের অন্যান্য মাছ ধরার নৌকাগুলোকে উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করেন। অনেকেই তার আবেদনে ছুটে আসেন। তিনি ঘটনাস্হলে গিয়ে হতবাক হয়ে পড়েন। শতশত নারী-পুরুষ-শিশু পানিতে ভাসছে। কেউ কেউ অর্ধমৃত, বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তারা সবাই মিলে মোট ৮০০ জনকে উদ্ধার করেন। তার নিজের নৌকায় তুলেন ২০০ জনকে। তারপর তাদের তীরে নিয়ে আসেন।
হতভাগা মানুষদের কাছ থেকে ইব্রাহীম জানলেন, যে তাদের কেউ বাংলাদেশী, কেউ বার্মিজ রোহিংগা। তাদের মোট সংখ্যা ছিলো ১৫০০। এর মধ্যে ৭০০ মানুষ সাগরে ইতিমধ্যেই তলিয়ে গেছে। নৌকাডুবির কারণ দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি। এক গ্রুপে ছিল বাংলাদেশীরা, অন্য গ্রুপে রোহিংগারা। নৌকাডুবির আগের ক‘দিন তাদের খাদ্যসংকট দেখা দেয়। খাদ্য নিয়ে দুই গ্রুপে তুমুল মারামারি এক পর্যায়ে নৌকা ডুবে যায়।

ম্যাথিউ ব্যানিস্টারের প্রশ্নের উত্তরে ইব্রাহীম বললেন, এই সময় হলো তাদের মাছ ধরার মৌসুম। তিনি যখন নৌকাডুবির খবর পান, তখন তার নৌকা ছিলো মাছবোঝাই। ঘটনাস্হলে গিয়ে শতশত ডুবন্ত অসহায় মানুষ দেখে তিনি নৌকা থেকে মাছ সাগরে ফেলে দেন, যাতে বেশী সংখ্যক মানুষকে নৌকায় তুলতে পারেন। অনেক মাঝি তাকে ডুবন্ত মানুষদের উদ্ধারে নিরুতসাহিত করেন, তাদের একদিনের মাছ লস হবে আশংকায়। কিন্ত ইব্রাহীম সবাইকে বোঝান যে, এই হতভাগারাও তাদের মত ‘মানুষ‘। শেষ পর্যন্ত তারা সবাই মিলে তাদের তীরে আনতে সক্ষম হন। ইতিমধ্যেই উপকূল নিরাপত্তাকর্মীদের খবর দেয়া হয়। তারাও ইব্রাহীমকে এই উটকো উদ্ধারকাজের জন্য বকাঝকা করে। কিন্ত ইব্রাহীমের একটাই কথা, ‘এরাও আমাদের মত মানুষ।‘ জেনেশুনে তারা কিভাবে এদের মৃত্যুর মুখে ফেলে আসতে পারে ?

উদ্ধারকৃত বাঙালি এবং রোহিংগারা বেঁচে থাকার আনন্দে, কৃতজ্ঞতায় ইব্রাহীম এবং তার সঙ্গীদের জড়িয়ে ধরেন। নিজেরা গরীব জেলে হওয়া সত্ত্বে তারা তাদের জন্য খাবার এবং কাপড়চোপড়ের ব্যবস্হা করেন। পুলিশকে খবর দেয়া হয়। পুলিশ এসে তাদের নিয়ে যায়। ম্যাথিউ ইব্রাহীমের কাছে জানতে চান, ভবিষ্যতে যদি তিনি আবারও সাগরে নৌকাডুবির খবর পান, তাহলে কী করবেন? ইব্রাহীম অকপটে জবাব দেন, অাবারও তিনি তাদের উদ্ধারে ছুটে যাবেন। তার মতে, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে ‘মানুষ‘। মানুষের বিপদে অন্য মানুষ এগিয়ে আসবে – এটাই ইব্রাহীমের কাছে বড় ধর্ম। ধর্ম-বর্ণ-জাতি পরিচয় তার কাছে বড় নয়।

ইব্রাহীমের কথা শুনে আমি চমকিত হলেও একবারে অবাক হইনি । সমাজে অামরা যাদের ক্ষুদ্র, নীচ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, তারাই অনেক সময়, তাদের মহত্ত্ব দিয়ে ভদ্রলোক মহতদের লজ্জ্বায় ফেলে দেন। বাস্তবতা হলো, আমরা যাদের রাষ্ট্র চালানোর জন্য নির্বাচিত করি , তাদের মধ্যে মানবিকতা বা মহত গুণাবলী দু:খজনকভাবে অনুপস্হিত। হাজার হাজার বাঙালি ভাগ্যের অন্বেষণে সাগরে নিরুদ্দেশ যাত্রা করছে। অথচ আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এই সত্যটা স্বীকার করতেও প্রস্তত নয়। এদের জন্য কিছু করা বা এই অমানবিক মানব পাচার বন্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া তো দূর হস্ত। লজ্জ্বার বিষয় হলো , সেই সময় কয়েক সপ্তাহ ধরে এই কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার হেডলাইনে ছিলো। সেদিন লন্ডনে অামার এক বন্ধু এ নিয়ে তার লজ্জ্বার কথা জানালো। তার অফিসের রিসিপশনে রয়েছে বিশাল টেলিভিশন। বিবিসি এই বাংলাদেশী এবং রোহিংগা হতভাগাদের খবর বেশ কিছুদিন ফলাও করে প্রচার করেছিল । বন্ধুর অফিসের সহকর্মীরা এ নিয়ে দু:খপ্রকাশ এবং আলাপ-আলোচনা করছিলো। তো সে আমাকে পরে বললো যে, সে সুযোগ পেলেই টিভি চ্যানেল পরিবর্তন করে দিত, যাতে বিদেশীদের সামনে এই খবর দেখতে না হয়।

সমৃদ্র দিয়ে মানবপাচারের ঘটনা উদঘাটন হওয়ার পর সরকারের বিভিন্ন সংস্হা যদি ততপর হত,তাহলে বারবার এই ট্রাজেডি ঘটতে পারত না। অনেকে মনে করেন, এদের অধিকাংশই রোহিংগা, বাংলাদেশী নয়। আমারও প্রথমদিকে তাই মনে হত। কিন্ত বিবিসিসহ অন্যান্য মিডিয়ার রিপোর্ট হচ্ছে, এদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশী নাগরিক। এটা অামাদের জাতীয় লজ্জ্বা। সরকারের দিকে চেয়ে বসে থাকলে এ লজ্জ্বা থেকে মুক্তি মিলবে না। সচেতন ব্যক্তি, গোষ্ঠি এবং সংগঠনসমূহকে এ ব্যাপারে আরো বেশী সোচ্চার হতে হবে। আর এসব অসহায় সহজসরল গরীব মানুষকে আদমপাচারের বিপদ সম্পর্কে সচেতন করার জন্য চালাতে হবে ব্যাপক প্রচারণা। যে দেশের তথাকথিত বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মাত্র ২৬ বছর পর ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উচ্চ আয় তথা উন্নত দেশে পরিণত হবে , সেই দেশের মানুষ কেন আজ ২০১৫ সালে ভাগ্যের অন্বেষণে অথৈ দরিয়ায় অগস্ত্য যাত্রা করবে? কে দেবে এর উত্তর? কেউ দেবে না। আমাদের প্রত্যেককেই এর উত্তর খুঁজতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *