ভীত অহঙ্কার

এইচ এস সি তে খুব ভালো পরীক্ষা দিয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছিলাম একটা স্বপ্ন নিয়ে, “প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে” পড়ার স্বপ্ন! যাত্রাবাড়ীতে থেকে দিনের পর দিন ফার্মগেটে কোচিং করতে আসা, আবার যাত্রাবাড়ীতে ফিরে যাওয়া, তারপর রুটিন পড়ালেখা! বরিশালে কাটানো অলস জীবনে অভ্যস্ত আমি বেশিদিন সুস্থ থাকতে পারলাম না। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতেই শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো, তবুও একটা আশায় বুকে জোর পেতাম “প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে” যদি পড়ার সুযোগ পাই!


এইচ এস সি তে খুব ভালো পরীক্ষা দিয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছিলাম একটা স্বপ্ন নিয়ে, “প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে” পড়ার স্বপ্ন! যাত্রাবাড়ীতে থেকে দিনের পর দিন ফার্মগেটে কোচিং করতে আসা, আবার যাত্রাবাড়ীতে ফিরে যাওয়া, তারপর রুটিন পড়ালেখা! বরিশালে কাটানো অলস জীবনে অভ্যস্ত আমি বেশিদিন সুস্থ থাকতে পারলাম না। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতেই শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো, তবুও একটা আশায় বুকে জোর পেতাম “প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে” যদি পড়ার সুযোগ পাই!

বেশ ভালো পরীক্ষা দিলাম, সুযোগ ও পেয়ে গেলাম প্রথম সারির একটা বিষয়ে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগের কয়টা দিন খুব মজা করে কাটালাম; ক্লাস শুরু হলে তো শুধু পড়া আর পড়া, মজা করার আর সুযোগ পাবো না!
বন্ধু-বান্ধবদের সাথে অনেক গর্ব করে বলতে লাগলাম “প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে” পড়ব, দেশের সেরা আর বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানে পড়ব, আমার কত সৌভাগ্য!

আমি আমার সেই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে দুই বছর এর মাঝেই শেষ করে ফেললাম, হাহ! স্বপ্নের কী সুন্দর বাস্তবায়ন দেখছি! প্রথম দিকে রাস্তায় হাঁটার সময় কত্ত ভালো লাগতো আমি কত সৌভাগ্যবান সেটা ভাবতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটা জিনিষকে কত্ত শ্রদ্ধার সাথে দেখতাম, প্রত্যেকটা অংশের কত ধরনের যে ছবি তুলতাম! সকল শিক্ষক-ছাত্রকে অন্তর থেকেই ভক্তি, সম্মান আর শ্রদ্ধা জানাতাম! কেউ যখন জানতে চাইত কোথায় পড়াশুনা করি? বুক উঁচু করে বলতাম! বলার সময় কেমন যেন মনে হত বুকটা আক্ষরিক অর্থেই ফুলে উঠছে! আর আজ?

আজ যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, কোথায় পড়াশুনা করি? বুক ফুলিয়েই জবাব দেয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু নিজেই বুঝতে পারি, বুকটা ভিতরে সঙ্কুচিত হয়ে যায়, চোখের দৃষ্টি একটু হলেও অবনমিত হয়, কিন্তু কেন? নিজের স্বপ্নের পথেই তো আছি, ফলাফল ও তো বেশ ভালই করছি, তাহলে আর কী? নিঃসঙ্কচিত্তেই তো সবাই প্রশংসা করে, দাম দেয়, সমস্যাটা তাহলে কোথায়?

যে সমস্যার জন্য আজকে বুয়েট এর শিক্ষার্থীরা প্রকৌশলী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেও ভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে বাধ্য হয়, প্রাচ্যের একসময়ের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা পি এইচ ডি করতে ভারত যায়; বড় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়না, আমার ও সেই এক-ই সমস্যা।

পড়ার জন্য, পড়ার চাপে পিষ্ট হতে, বিশ্বমানের শিক্ষিত হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে, যে বিষয়ে অধ্যয়নরত আছি- সে বিষয়ে সত্যিকারের জ্ঞানী হতে এসেছিলাম, আর এখন দেখছি, বিজ্ঞানের বিষয়ে পড়তে এসে প্রায় সব ক্লাসেই ইতিহাস টাইপ বক্তৃতা শুনতে হচ্ছে, বিশ্বমানের তো দূরের কথা, উপমদেশীয় মানেরও হতে পারছিনা, যে বিষয়ে পড়তে এসেছি (অধিকাংশ সহপাঠীকেই দেখে বুঝতে পারছি) সেই বিষয়ের ন্যূনতম জ্ঞানও অনেকেই অর্জন করতে পারছেনা, তবে এতে কিন্তু তাদের জিপিএ বা সিজিপিএ তেও কোন সমস্যা হয়না! কারন, যাচাই করার লোক কই?

কোথায় কী কী অসঙ্গতি তা দেখার পরে তো হয় নিজেকে না হয় বাকি সবাইকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু তার একটাও যে আমার পক্ষে সম্ভব নয়, কারন, আমি যে ভীতু!

তবে নিজের মনে একটা কথা মাঝে মাঝে বলি সেই সব ব্যক্তিদের; যাদের জন্য এই অবস্থা। ওরা এত সাহস পায় কী করে, যে, দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের এই প্রতিষ্ঠানে নিয়ে এসে, মানবেতর জীবনযাপন করিয়ে তাদের স্বপ্নগুলোকে এভাবে গুড়িয়ে দেয়? কন সাহসে বিশ্বব্যাংক এ কাজ করার আশা নিয়ে যে ছেলে/মেয়েটি আসে, তাকে তার স্বপ্নের পরিধি দেশের ছোট কোন ব্যাংকে রুটিন একটা চাকুরি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে নিতে বাধ্য করে? বিশ্বনেতা হওয়ার মানসিকতা আর মেধা নিয়ে আসা মানুষটিকে তারা হলের নোংরা রাজনীতির বলির পাঁঠা বানায় কোন স্পর্ধায়? গবেষণাধর্মী বিষয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীকে শেষ পর্যন্ত শুধু কয়েকটা বই বা কিছু শীট পড়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখে কোন আক্কেলে? জানিনা প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার মত পর্যায়ে কোনোদিন যেতে পারব কিনা!

এত হতাশার পরেও যখন কারো সাথে আমার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কথা বলি, অহংবোধ নিয়েই বলি, কারন, জানি, ছাগল দিয়ে জমির চাষ করালে হয়ত ফসল পাবোনা, কিন্তু আমার জমি তো আর হারিয়ে যাবেনা! আমি ভালোবাসি আমার বিশ্ববিদ্যালয়কে, আজকের এইসব হতাশার মূলের মানুষগুলোকে বা পদ্ধতিটাকে না, আর আমার প্রতিষ্ঠান অহঙ্কার করার মতই একটা প্রতিষ্ঠান, মেধার কোন কমতি এখানে নেই, শুধু দরকার সত্যিকারের চাষির। আর যখন নিজের ব্যাপারে বলি, তখন অহঙ্কারটা কেমন ভীত হয়ে যায়, কারন, ভুল চাষির ভুল পরিচর্যার আমি যে একটা রুগ্ন ফসল কণা, অহংবোধ তো তার মানায় না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *