তরবারী না ঢাল হিসেবেই ব্যবহৃত হোক তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা

হঠাত করে প্রবীর শিকদারকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটির ‘নেতিবাচক’ দিকটি শিক্ষিত নাগরিক সমাজের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রবীর শিকদারের মত একজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাকে হাতকড়া পড়িয়ে আইনটি অনেকটাই নিজেই নিজের হাতে কড়া পড়িয়েছে।


হঠাত করে প্রবীর শিকদারকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটির ‘নেতিবাচক’ দিকটি শিক্ষিত নাগরিক সমাজের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রবীর শিকদারের মত একজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাকে হাতকড়া পড়িয়ে আইনটি অনেকটাই নিজেই নিজের হাতে কড়া পড়িয়েছে।

শুরুতেই বলে রাখা ভাল যে, কঠোর সময়ে কঠোরতম আইনের জন্ম হয়। মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্র এবং ইউরোপ জুড়ে ‘টুইন টাওয়ার’ ট্র্যাজেডির পর অনেক কঠোর, আপাতঃ অগ্রহণযোগ্য আইনের জন্ম হয়, যার মধ্যে শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয় আটক, সন্ত্রাসে উতসাহ দিয়ে সন্ত্রাস করিয়ে আবার সেই বানানো সন্ত্রাসীকে আবার সন্ত্রাস আইনে গ্রেপ্তার করা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অবাধ গণতন্ত্রের দেশেও এই সমস্ত ‘কালো’ আইন সে সব দেশের মানুষকে মেনে নিতে হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে।

বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি আইনটি ২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোটের সময়কালে প্রনীত হলেও এর প্রয়োগ শুরু হয় যুদ্দাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীদের অস্ত্র সন্ত্রাস এবং তথ্য সন্ত্রাস শুরু হওয়ার পর। ২০০৬ সালেও এই আইনের ৫৭ ধারার থাবা ইস্পাতের মত ধারালো ছিল তবে সেই থাবায় দস্তানা পরানো ছিল। এরপরেও ২০০৬ সালে ৫৭ ধারা ততটা দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি মুলতঃ দুটি কারণে; এক, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যপক বিস্তার তখনো ঘটেনি আর সামাজিক মিডিয়া যেমন ফেইস বুক এবং ব্লগ এসবের প্রসার আমাদের দেশে তখন তেমন ছিল না। দুই, ৫৭ ধারায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন ছিল অতএব ইচ্ছা হলেই এই আইনের অধীনে গ্রেপ্তারের সুযোগ ছিল না।
কিন্তু এই আইনের প্রাসঙ্গিকতা বাড়ে তখনই, যখন স্বাধীনতা বিরোধী জামাত-শিবির-যুদ্ধাপরাধী চক্র তাদের বিশাল ফান্ড, তথ্য প্রযুক্তি আর সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনাল’ বিরোধী জনমত গঠনে মিথ্যা তথ্য, ছবি পরিবেশন করা শুরু করে। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম যখন সরকারের অনুমতি নিয়ে মতিঝিলে সমাবেশ করার পর ঐ স্থান ত্যাগ করতে অস্বীকার করে তখন পুলিশকে একশনে যেতে হয়, এবং শুধুমাত্র সাউন্ড গ্র্যানেড ফাটিয়ে প্রায় বিনা রক্তপাতে রাজপথ উদ্ধার করে। হেফাজতকে সামনে রেখে বিএনপি-জামাতের ইচ্ছা ছিল তাহলিল স্কয়ার ধরণের কিছু একটা করে সরকারের পতন ঘটিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করা। ঘটনার পরদিন থেকেই ফেইসবুক এবং অন্যান্য গণমাধ্যমে শত শত মানুষের লাশের ছবি দেখিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে উত্তেজনার সৃষ্টি করে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র; পরে দেখা যায় এই সমস্ত ছবি হাইতি’র ভূমিকম্পে নিহত মানুষের ছবি। পবিত্র কাবা শরীফ, মসজিদে কু’বা, মসজিদে নববীর ইমাম সাহেবদের কা’বা শরীফে ‘গিলাব’ পরানোর ছবি ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ইলেক্ট্রনিক সংস্করণে ছাপিয়ে বলা হয় এটি মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মত একজন ‘মহান আলেমের’ মিথ্যা বিচারের প্রতিবাদে বিশ্বের সবচাইতে বড় চার মসজিদের ইমামদের অবস্থান ধর্মঘটের ছবি। ছবির সাথে ইমাম সাহেবদের অনেক বানানো বক্তব্য খোদ আমার দেশের অনলাইন সংস্করণে প্রচারিত হয়। এই সব মিথ্যা, ভন্ড ছবি এবং তথ্য প্রচার করে সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ, ধর্মপ্রাণ ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে একধরণের জনমত গড়ে তোলা হয়। রানা প্লাজার ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের কবর দেয়ার দৃশ্য ‘আল জাজিরা’ টিভিতে দেখিয়ে বলা হয় এগুলো মতিঝিল ঘটনায় ধর্মপ্রাণ হেফাজত কর্মীদের লাশ। আল জাজিরা’র সংশ্লিষ্টতায় এটা বুঝা যায় যে, এই ইলেক্ত্রনিক প্রচারণা পেট্রোডলার আর আই এস আই এর যুগপত মদতে পরিচালিত শেখ হাসিনা’র সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিশাল ষড়যন্তের অংশ। গোয়েবলসের চাইতে ঘৃণ্য এই প্রচারণায় তখন অংশ নেয় ‘অধিকার’ নামের একটি এনজিও’ আর তার সেক্রেটারী সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি এবং বিএনপি-জামাত আমলের ডেপুটি এটর্নী জেনারেল এডভোকেট আদিলুর রহমান শুভ্র প্রমুখ। এরা হেফাজতের ঘটনায় পুলিশ কর্তৃক শত শত মানুষ হত্যার রিপোর্ট করলে সরকার তাদের কাছে নিহত মানুষের তালিকা চায়। সেই তালিকা দিতে তারা ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করা হয়। এই সময়ে ২০১৩ সালেই আইসিটি (সংশোধনী) আইন ২০১৩ পাশ হয় যাতে এই আইনে দোষীর জন্য ৭ থেকে ১৪ বছরের কারাদন্ড রাখা হয় এবং মামলা করতে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিধান তুলে দেয়া হয়।

আমাদের স্বাধীনতার শত্রুরা পাকিস্থানী-মধ্যপ্রাচ্যের অর্থে মিথ্যা ছবি আর তথ্য ছাপিয়ে শেখ হাসিনা’র সরকারকে ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী বানানোর ভয়ঙ্কর খেলায় নেমেছিল তার অনেকটাই বানচাল হয়ে যায় আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার প্রয়োগ এবং প্রয়োগের ভয়ে। বাশের কেল্লা, পাতার কেল্লা নামধারী অসংখ্য ব্লগে ধর্মীয় উস্কানীমূলক প্রচারণা, শেখ হাসিনা ছবি বিকৃত করে প্রচার এবং ঘৃণা ছড়ানো অনেকখানী কমে যায় ৫৭ ধারার প্রয়োগ এবং প্রয়োগের ভয়ে।

কিন্তু প্রবীর শিকদারের গ্লানিকর গ্রেপ্তার এবং এর পুর্বে কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারার প্রয়োগ এই ধারার উপযোগীতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার বলে সর্বজন স্বীকৃত সেই সরকার সমর্থক সাংবাদিকরাও বলছেন, যে কোন কিছু প্রিন্ট আকারে লিখলেই যে কেউ মামলা করতে পারে এবং কমপক্ষে সাত বছরের জেল অবধারিত যে আইনের কারণে সে আইন অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

কেউ কেউ বলছেন, দেশপ্রেমিকরা এবং ‘অতি বুদ্ধিমান’রা এই ইস্যুতে নিজেদের মধ্যে বিবাদ করে জ্ঞ্যাত কিংবা অজ্ঞ্যাতসারে প্রকারান্তরে সরকারকে দুর্বল করছে বা করার প্রয়াস নিচ্ছে। এই কথাটার সাথে কিছুটা দ্বিমত পোষন করতে হয়। বিরোধী দল যখন দুর্বল থাকে সরকারের মধ্যেই একটা মেকানিজম থাকতে হবে যারা সরকারের বিভিন্ন অংশকে স্বেচ্ছাচারী হওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং ভূল ভ্রান্তিগুলো ধরিয়ে দেবে। একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেসব দেশে থাকে সেসব দেশে দলের ভেতরে সমালোচনা দূরে থাকুক, সরকার প্রধানের অসুস্থতাকেও মিডিয়া থেকে লুকানো হয়; এসব দেশে সরকার যতটাই শক্তিশালী ততটাই দুর্বল কারণ তারা মনে করে তাদের সরকার প্রধান অসুস্থ বলে প্রচার হলে কিংবা কোন ভুলের সমালোচনে হলে বিদ্রোহীরা ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ যে দেশের সরকারে আসীন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা আমাদের মতই মানুষ সুতরাং আমাদের মতই অসুস্থতা, ভূল ভ্রান্তি তাদের আক্রান্ত করতে পারে! কিন্তু সেই অসুস্থতা, ভূল ভ্রান্তি সংশোধন করে আরো নিখুতভাবে দেশ পরিচালনায় দেশপ্রেমিক এবং আবেগপ্রবণ জনতার তোলা অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর, ঐক্যের বিভক্তি এবং সর্বোপরি সরকারকে দুর্বলকারী মনে করার কোন কারণ নেই।

শুরুতেই লিখেছি, কঠোর সময়ে কঠোরতম আইনের জন্ম হয়। কঠোর আইন অন্যায় প্রতিরোধে ব্যবহ্রিত হলে সমালোচনা হয় কম; ভূল জায়গায় আর যথেচ্ছ ব্যবহার হলে কঠোর আইন আপন শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়। যে ৫৭ ধারা মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার খরচ করা ৭১এর শত্রুদের, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বাগে আনতে সক্ষম হয়েছিল সেই ৫৭ ধারা বেহিসেবী ব্যবহারে ভোতা হতে উপক্রম হয়েছে। যে যুব-শিক্কিত-প্রগতিশীল সমাজের নিরঙ্কুশ সমর্থনে বঙ্গবন্ধু কন্যা আজ দেশকে প্রগতির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে, সেই যুব এবং শিক্ষিত সমাজের কাছে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে হেয় করার প্রয়াস সফল হতে দেয়া যায়না।

৫৭ ধারা একটি অত্যন্ত সবেদনশীল অস্ত্র, যে অস্ত্র তরবারী এবং ঢাল দুভাবেই ব্যবহার করা যায়। এই অস্ত্র সরকারের দুরদৃষ্টিসম্পন্ন বিচক্ষণ নেতৃত্বের হাতে রাখাই উত্তম। অপরিপক্ক, অপরিণামদর্শী এবং ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে এই অস্ত্র তুলে দিলে প্রবীর শিকদার ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে, তাই এই আইন প্রয়োগে উচ্চ পর্যায়ের অনুমতি গ্রহণে বাধ্যবাধকতার বিধাণটি ফিরিয়ে আনা জরুরী সাথে সাথে সর্বনিম্ন শাস্তির বিধানটি শিথিল করা উচিত বলে মনে করি। কঠোর সময়ে যার জন্ম, সময় হলে তা আবার বিদায়ও নিতে পারে, তবে তার সময় এসেছে কিনা তা সরকারের বুদ্ধিদীপ্ত ও সংবেদনশীল মহলটির বিবেচ্য।
(কিছু বানান ‘অভ্র’ এর ফন্টজনিত কারণে ঠিক করতে পারছিনা বলে দুঃখ প্রকাশ করছি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *