‘সরকারী রাজনীতিকে’ যে কারনে আমি ঘৃনা করি

গত দুদিন ধরে ফেসবুকে দেখলাম, সুব্রত শুভ, রাসেল ভাই আর আল্লামা শয়তান ওরফে নেমেসিসের গ্রেপ্তারের খবরে সবাই সরকারের প্রতি তাদের ক্ষোভ রীতিমতো উগরে দিয়েছে। কিন্তু গতকাল যখনই আসিফরে গ্রেপ্তার করা হলো, তখনই সেই ক্ষোভের বদলে একটা নির্লিপ্ত/সন্তুষ্ট ভাব। এর কারন কি? কারন হলো, আসিফ মহিউদ্দিন এমন একটা নাম, যে কিনা আস্তিকদের তো বটেই এমনকি নাস্তিকদেরো বিত:শ্রদ্ধ করে দিয়েছে। লেখা চোর, কুৎসা রটনা, মানুষের দুবর্ল জাগায় বেহুদা আঘাত ইত্যাদিসহ আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগের অভাব নাই। আর বাক স্বাধীনতার নামে সে এতদিন যা করে এসেছে, সেগুলা কিছুতেই নাস্তিকত্যবাদের চর্চা নয়। সেগুলো নিলর্জ মিথ্যাচার, ভন্ডামি আর সীমালঙ্খন। আর নাস্তিকতার নামে মূলত: ইসলাম বিদ্বেষ।

সুস্থ ও স্বাভাবিক আর্থ-সামাজিক পরিবেশের জন্য এই উভয় প্রকারই হুমকি সরূপ। কিছু কিছু আস্তিক যেমন নাস্তিকদের প্রতি ধর-মার-কাট টাইপ মনোভাব লালন করে, তেমনি কিছু কিছু নাস্তিককেও দেখেছি প্রোফাইলে মিলিট্যান্ট এথিষ্ট দিয়ে রাখতে। আমি উভয়কেই একটা সময় এড়িয়ে চলতাম, পছন্দ করতাম না। কারন যে ক্ষতিটা হয়েছে, হচ্ছে তাদের জন্য, সেটা কল্পনাতীত। এবং এই ক্ষতি পোষাবার কোন ক্ষমতা আমাদের আছে কিনা আমার জানা নেই। যেমন: এই আস্তিক-নাস্তিক ক্যাচালের খপ্পড়ে পড়ে পুরো আন্দোলনটাই কেচেঁ যেতে বসেছে। এবং এর দায়ভার আমি চাপাবো একজনের উপর সে হচ্ছে আসিফ মহিউদ্দিন।

যাই হোক, আসিফকে ধরেছে, আমার কোন মন্তব্য নাই এই ব্যাপারে। সে যেটা ডিজার্ভ করে সেটাই পাবে। তার পরিনতি নিয়ে আমি মোটেই ভাবিত নই। আল্লামা শয়তান ওরফে নেমেসিস কিছুটা কট্টরপন্থী নাস্তিক, কিন্তু যতটুকু তাকে চিনেছি, তিনি উগ্র নন। সামু ব্লগ থেকে তাকে চিনি ২০০৮ সাল থেকে। দুয়েকবার ফোনেও কথা হয়েছে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তার অনেক ব্যক্তিগত বিষয় আমার সাথে শেয়ার করেছেন একটা সময়। তাকে নিতান্তই একজন ছন্নছাড়া গোছের মানুষ বলে মনে হয়েছে। মাঝে কয়েক বছর ধরে তার সাথে কোন যোগাযোগ নেই। এমন নির্বিষ একজন মানুষকে বড়জোর জিজ্ঞাসাবাদ করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া যেতো। অথচ সেই মানুষটাকে বিনা নোটিশে চোরের মতো ধরে চোরের মতই মিডিয়ার সামনে উপস্থিত করা হয়েছে।

রাসেল পারভেজ ভাই, এক নামে সবাই যাকে ডটু রাসেল নামে চিনে, যিনি সামু ব্লগের মুটামুটি প্রথম দিককার ব্লগার। ব্লগে ঢুকার পর থেকেই দেখেছি, এটিমের অন্যান্য যোদ্ধাদের সাথে তাকেও কাধে কাধে মিলিয়ে ছাগুদের বিরুদ্ধে লড়তে।
সামু ছাড়ার পর আমারব্লগে লেখালেখি শুরু করলেন। সেখানেই সে বলে উঠলেন – “বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষৎত প্রজন্ম পাকিস্থানের প্রতি ঘৃনাবোধ নিয়ে বড় হচ্ছে। তিনি এই ঘৃণাবোধকে প্রজন্মের মাঝে আর লালন করার পক্ষপাতী নন”। এমন বক্তব্যের পর সঙ্গত কারনেই এটিমসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকেরা তাকে এড়িয়ে চলা শুরু করে। বেচারা একটা পোষ্ট দেন বা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, সেখানে কেউ কমেন্ট তো দূরের কথা একটা লাইকও দেয় না। আমার দেখে মায়াই লাগতো, আবার রাগও হতো তার উপর, উনি কিভাবে পারলেন ওমন একটা কথা বলতে। পিয়াল ভাই, জেবতিক ভাইরা তাকেঁ বোঝাবার কম চেষ্টা করে নাই। কিন্তু সে তার মতবাদ থেকে সরে আসে নাই কখনো। ব্লগে তার সাথে আমার শেষ কনভারসেশন হয়েছে, আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে আমার একটা পোষ্টে।

তাকে যতটুকু চিনি, তিনি অবশ্যই একজন নাস্তিক। কিন্তু তার কোন লেখায় আমি কখনই বিন্দুমাত্রও মিলিট্যান্ট বা এক্সট্রিমিষ্ট টাইপের কিছু দেখি নাই। ডটু রাসেল ভাই গালি দিতে যেমন পারঙ্গম ছিলেন, তেমনি ছিলো তার ভাষার অনবদ্য গাথুঁনি। বাংলা ব্লগ জগতে যে কয়জন লোককে উচ্চমানের শুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করে ব্লগ লিখতে দেখেছি, তাদের ভেতর একজন হলেন ডটু রাসেল। নিতান্তই সাধাসিধা পোষাকে চলাফেরা করা রোগা পাতলা শরীরের ডটু ভাইকে প্রায়ই দেখতাম মিডিয়া সেল অথবা জাদুঘরের সামনে একটা সস্তা টি শার্ট আর একটা হাওয়াই চপ্পল পড়ে দাড়িয়েঁ কারো সাথে বলছে। সেই রাসেল ভাইকেও বিনা নোটিশে চোরের মতো হাতকড়া পরিয়ে চোরের মতো মিডিয়ার সামনে এনে দাড়ঁ করানো হয়েছে।

সুব্রত শুভর সাথে পরিচয় ফেসবুকে এসে। বেচারা নিতান্তই অল্প বয়েসী, ঢ্যাঙ্গা ও সুদশর্ন একটা ছেলে। ফেসবুকে তার বেশীরভাগ স্ট্যাটাস থাকে ক্ষোভ/বিদ্রুপ মিশ্রিত। সেই ক্ষোভ/বিদ্রুপ থাকতো দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি, ধর্মের প্রতি, প্রজন্মের প্রতি, এমনকি নিজের প্রতিও। তবে ইসলামের ব্যাপারে তার কিছু বায়াসড চিন্তা ভাবনা ছিলো। এর মানে হলো, ইসলামের ব্যাপারে তার জানা শোনা/পড়া/দেখা কম, আমি তাই মাঝে মাঝে তার স্ট্যাটাসে গিয়ে বলতাম ইসলাম নিয়ে কিছুদিন স্টাডি করে তারপর সমালোচনা করো, তবে সেটা আরো যুক্তিগ্রাহ্য ও গ্রহনযোগ্য হবে। প্রায়ই শুভর ভুল গুলো ধরিয়ে দিতাম। ভদ্র ছেলে ছিলো বেশ, ভুল ধরিয়ে দিলে বিনা বাক্যে মেনে নিতো।

মাঝে হুট করেই একদিন তার একটা পোষ্টে তুমুল ঝগড়া, শুভর সাথে নয়, শুভর একজন বন্ধুর সাথে, সেখান থেকে শুভর সাথে হৃদ্যতা শুরু, তার সম্পর্ক গড়ে দিতে উপযাজক হয়ে তার ভালবাসার মানুষের কাছে তার কথা পাড়লাম। কাজ হলো মাস কয়েক পর। শুভর সাথে প্রথম দেখাটাও আমার যেচে। ফোন নাম্বার নিয়ে শাহবাগে দেথা করলাম। চা-বিড়ি খেলাম, এক সাথে আড্ড দিলাম বেশ কিছুক্ষন। তারপর শুভ আমন্ত্রন জানালো তাদের হলের পূজো দেখাবার। এক সাথে ৫০/৬০ টা দেব দেবীর পূজো। এই লোভ সামলানো আমার জন্য কঠিন ছিলো। আমি আমন্ত্রন রক্ষা করেছিলাম। ঈশ্বরে অবিশ্বাসী হলেও এই ছেলের ভদ্রতাবোধের কারনেই হয়তো, প্রথম থেকেই ওকে ভালো লাগতো। এই নিরীহ ছেলেটাকেও, একই রাতে একই ভাবে, চোরের মতো গ্রেফতার করে চোরের মতই উপস্থাপন করা হলো মিডিয়ার সামনে তথা গোটা দেশের সামনে।

ছবিতে দেখা গেছে, ডটু ভাই বাম পাশে দাড়িয়েঁ বিদ্রুপের হাসি হাসছেন, আর ডান পাশে নেমেসিস ওরফে বিপ্লবদা লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছেন চোরের মতো দাঁড় করানো হয়েছে বলে। আর তাদের মাঝখানে এই ছেলেটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। আজ সরকারের রাজনীতির বলির পাঠাঁ হয়ে যে অপমানিত তাকে/তাদেরকে হতে হলো, সেই অপমান কি কোনদিন ভুলতে পারবে তারা? এই অবিচারের রেষ কি কোনদিন মুছে যাবে?

সবশেষে বলি, সবাই তাদের মুক্তি চাইছে। কিন্তু আমি চাই না। আমি তাদের শুভাকাংখি বলেই তাদের মুক্তি চাই না। আমি চাই এরা বাকী জীবন ডিবি পুলিশের কড়া হেফাজতে থাকুক। নাহলে এদের হেফাজতের দায়িত্ব নিবে হেফাজতে ইসলামী। এদের নাম ধাম পরিচয় চেহারা ঠিকানা সবই প্রকাশ করে দিয়েছে এদেশের মিডিয়া আর প্রশাসন। জেলখানার বাইরের দুনিয়া তাই এদের জন্য সমূহ বিপদের স্থান।

আমি শংকায় আছি, হয়তো আগামী কাল পরশুর ভেতর আমার নামও লিষ্টে চলে আসবে, আমাকেও সরকারী রাজনীতির বলি হতে হবে, আমাকেও বিনা নোটিশে চোরের মতো হাতে হাতকড়া আর কোমড়ে দড়ি দিয়ে বেধেঁ নিয়ে যাবে, আমাকেও চোরের মতো মিডিয়ার সামনে উপস্থিত করা হবে। তখন আমাকেও নিয়েও কেউ একজন এইভাবে লিখবেন। তখন আমার জন্যও জেলের বাইরের জীবনটা হয়ে যাবে বিপদ সংকুল…

ব্যাক্তিগতভাবে আমি একজন আস্তিক মানুষ। ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী। শুধু তাই না, এ কথা আমি নির্দ্বিধায় স্বীকার করি যে, আমি একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম (মানে একজন মুসলমান হিসাবে ইসলামের রীতি নীতি যতটুকু মানার কথা, ততটুকু মানার চেষ্টা করি)। কিন্তু আমি উগ্র, কট্টরপন্থী এবং ধর্মান্ধ আস্তিকদের যেমন বিরুদ্ধাচারণ করি, তেমনি উগ্র, কট্টরপন্থী এবং ধর্মান্ধ নাস্তিকদেরও বিরুদ্ধাচারণ করি।

কিন্তু আমি উগ্র আস্তিক বা নাস্তিকদের যতটা ঘৃণা করি, তার চাইতেও অনেক বেশী ঘৃণা করি এই সরকারী রাজনীতিকে। বাংলাদেশের সাধারন জনগনের জন্য একজন উগ্র আস্তিক বা একজন উগ্র নাস্তিক যতটা না বিপদজনক, সরকারী রাজনীতি তার চাইতেও অনেক বেশী বিপদজনক। তাই আমি সবচেয়ে ঘৃনা করি এই রাজনীতিকে।

৬ thoughts on “‘সরকারী রাজনীতিকে’ যে কারনে আমি ঘৃনা করি

  1. চমৎকার বলেছেন। কিন্তু এভাবে
    চমৎকার বলেছেন। কিন্তু এভাবে একের পর এক নিরীহ মানুষকে শুধুমাত্র নাস্তিক হওয়ার কারনে হয়রানী করা হবে সেটাও আমি সমর্থন করতে পারিনা। দেশের সংবিধান তাকে নাস্তিক হওয়ার অধিকার দেয়। দেশটা যদি ইসলামী পজাতন্ত্র হতো সেটা ভিন্ন আলাপ। আপনার লেখা ফেসবুকে কিছু কিছু পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। ইস্টিশনে লেখা শুরু করেছেন দেখে খুব ভালো লাগল। নিয়মিত চাই আপনাকে। ইস্টিশনে আপনাকে স্বাগতম।

    1. জ্বি ঠিক বলেছেন, আমি কোন
      জ্বি ঠিক বলেছেন, আমি কোন ধর্মবিশ্বাস লালন এবং চর্চা করবো সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কোন কাঠ মোল্লার কোন অধিকার নাই সেটা ঠিক করে দেবার। সহমত আপনার সাথে।

      হা হা হা। আমি এমন কেউকেটা কেই নই ভাই। আমি খুবই সাধারন মানুষ, মাঝে সাঝে টুকটাক ছাইপাশ লিখি। ইষ্টিশানে নিয়মিত লেখার ইচ্ছে নিয়েই গতকাল রেজি: করেছি। 🙂 ভালো কথা, আপনাদের এই ব্লগটাও কি সাম্প্রতীক ব্ল্যাক আউটে অংশ নিয়েছিলো?

      ধন্যবাদ আপনাকে ডা: আতিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *