দেশই মানুষ, মানুষই দেশ -২

হতাশাবাদীদের হৈহৈ হুররের মধ্যে আশাবাদীরা আর হালে পানি পায় না। নৈরাশ্যবাদীরা বিভিন্ন মাধ্যমে এত প্রবল যে, আশাবাদীরা মিনমনি সুরেও জনগণকে আশার বাণী শোনাতে সাহস পায় না। এই অবস্হাকে আমরা তুলনা করতে পারি, গ্রামের সেই দুই ইংরেজী শিক্ষকের গল্পের সঙ্গে। একদা নেকিপুর আর বদিপুর নামক পাশাপাশি দুই গ্রামে দু‘জন ইংরেজী মাস্টার লজিং থাকতেন। দুই গ্রামের লোকজনই গর্ব করে বলে বেড়ায় যে, তাদের মাস্টার অন্য গ্রামের মাস্টারের চেয়ে বেশী ইংরেজী জানে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে তুমুল বাদ-প্রতিবাদ-ঝগড়া-ফাসাদ হতে থাকে। এলাকার লোকজন ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে প্রস্তাব দিলো, দুই মাস্টারের মধ্যে ইংরেজী বাতচিতের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে। তারা নিজেরাই দেখে নেবে কোন্ গ্রামের মাস্টার বেশী ইংরেজী জানে! নির্দিষ্ট দিনক্ষণে এলাকার হাজার হাজার ছেলেবুড়ো গ্রামের ময়দানে জড়ো হলেন দু‘জনের ইংরেজী লড়াই উপভোগ করার জন্য। লড়াই শুরু হলো। এক মাস্টার আরেক মাস্টারকে পাল্টাপাল্টি প্রশ্ন করছেন। দু‘জনের সমর্থকরা পেছনে সমানে চিল্লাচ্ছেন। প্রতিটি উত্তরের সঙ্গে তারা উল্লাসে ফেটে পড়ছেন। কেহ কারে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান। এক সময় বদিপুর গ্রামের অপেক্ষাকৃত ধূর্ত মাস্টার অন্য মাস্টারের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়লেন ‘বলুন দেখি, আই ডোন্ট নো অর্থ কি?‘ নেকিপুর গ্রামের সহজসরল মাস্টার নিশ্চিন্তমনে উত্তর দিলেন ‘আমি জানি না‘। হাজার হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা একসঙ্গে চীতকার দিয়ে লাফিয়ে উঠলো ‘সে জানে না, সে জানে না !‘ নেকিপুর গ্রামের মাস্টার মশাই হট্রগোলের মধ্যেও তার উত্তরের ব্যাখ্যা দিতে চা্‌ইলেন। কিন্ত জনতার রায় হয়ে গেছে। তিনি উত্তর জানেন না, তিনি হেরে গেছেন। অনেক চেষ্টা করেও নেকিপুরের মাস্টার পাবলিককে বোঝাতে পারলেন না যে, তার উত্তর সঠিক ছিলো। পরদিন রাত পোহাবার আগে, কাকপক্ষী জাগার আগেই নেকিপুর গ্রামের মাস্টার মশাই বেঁচেবর্তে যাওয়া ইজ্জ্বতআব্র আর তল্পিতল্পা নিয়ে এলাকা থেকে কেটে পড়েন। একই দশা হয়েছে আজ দেশ নিয়ে খোয়াব দেখা ইতিবাচক স্বাপ্নিকদের। দেশ নিয়ে যারা আশাবাদী হতে চান, তাদের কণ্ঠও আজ ‘বাস্তবতা‘ এবং ‘পরিস্হিতির শিকার‘ – এই দোহাই পাড়নেওয়ালাদের শোরগোলে হারিয়ে যাচ্ছে।

এই বিলাতে লাখ লাখ বাঙালির বাস। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী দেশ থেকে এখানে পড়তে আসে। এই প্রবাসেও তাদের অধিকাংশ সুযোগ পেলেই দেশ নিয়ে অালাপ-আলোচনায় মেতে উঠে। লন্ডনে রয়েছে বেশ কটা বাংলা পত্রপত্রিকা আর টেলিভিশন চ্যানেল এবং অসংখ্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠন। দেশের নানাবিধ বিষয়ে প্রতিদিন এখানে ডজন ডজন সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাদের সবারই কর্মকান্ডের মূল বিষয়বস্ত বাংলাদেশ। আমরা যদি দেশ থেকে লন্ডনে অাসা বাঙালি তরুনদের ক‘দিনের ফোনালাপ রেকর্ড করি বা আড়িপেতে শুনি, তাহলে দেখব তাদের একটা বড় অংশের আলোচনার মূল বিষয়বস্ত হলো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্হিতি। কিন্ত আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় এসে থমকে যায় – সেটা হলো সবাই একমত যে, দেশের এই পরিস্হিতি ( যেমন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের ব্যর্থতা এবং তার খেসারত ) মেনে নেয়া যায় না। অন্যদিকে দেশের জন্য এত আবেগ, এত ভালোবাসা, এত আলাপ-আলোচনা সত্ত্বে প্রায় ৯৯% শেষ পর্যন্ত সহমত পোষণ করে যে, এরপরও কারো করার কিছু নেই। দেশ নষ্ট হয়ে গেছে, এ ব্যাপারে তারা সবাই মোটামুটি একমত। তারা শুধু অদূর ভবিষ্যত নয় – দূর ভবিষ্যতেও পরিবর্তনের কোন স্বপ্ন দেখেন না। যদি কোনভাবে জানা যেত, দেশের কত পার্সেন্ট মানুষ স্বপ্ন দেখে যে, মাত্র ২৬ বছর পর ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উচ্চ আয় তথা উন্নত দেশের সারিতে যোগ দেবে, যেটা তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা কয়েক বছর যাবত বলে অাসছেন। তাই যদি হয় তবে, আজ ২০১৫ সালে কেন দেশের হাজার হাজার হতদরিদ্র মানুষ ভাগ্যের অন্বেষণে অথৈ দরিয়ায় নিরুদ্দেশ যাত্রা করবে? আর দেশের মানুষ এবং প্রবাসে প্রায় কোটিখানেক বাঙালির মাথা কেন আজ বিদেশীদের সামনে হেঁট হবে? আমার এক বন্ধু সেদিন বললো, কিভাবে কয়েক সপ্তাহ ধরে তার কর্মস্হলে বিদেশী কেউ এলে সে বিবিসি টিভি চ্যানেল পাল্টে দিত । কারণ বিবিসিতে সারাক্ষণ লিড নিউজ ছিলো ভাগ্যান্বেষণে ডিঙি নৌকায় করে বাঙালির সমুদ্র যাত্রা !

দুনিয়ার অসংখ্য মণীষী , চিন্তাবিদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জটিল বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। সেজন্যই বলা হয় Great minds think alike. এরকম একটা বিষয় হলো – অবাধ অন্যায়-অবিচার ধীরে ধীরে সমগ্র সমাজকে গ্রাস করে। আর এ সম্পর্কে ব্যাপক জনগোষ্টির নিরবতার কারণে তার দ্রুত বিস্তার ঘটে। অনেকে বলেন ‘নিরবতা হলো সামাজিক ন্যায়বিচারের শক্তিশালী শত্রু‘। এই লেখার শুরুতে উল্লেখিত রাজনীতিবিদ যিনি মনে করেন, দেশ ভালো আছে, তবে মানুষ ভালো নেই – তাদের মত নেতাদের এতে পোয়াবারো হয়। তারা বোমা আর ভয়তাল দেখিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে পারে তাদের – যারা দেশের মাটি ও মানুষের মধ্যে কোন তফাত খোঁজে পান না। দেশের মাটি ও মানুষের সম্পর্ক এতই গভীর , এতই অবিচ্ছেদ্য, স্বতন্ত্রভাবে তা বিবেচনা করার প্রশ্ন অর্থহীন, অবান্তর এবং বিভ্রান্তিমূলক। এই বোধ যদি দেশের রাজনীতিবিদদের অন্তত একটা উল্লেখযোগ্য অংশের ( অাধমরা প্রবীণদের মধ্যে তা আর আশা করি না, নবীনদের মধ্যে যদি এর উন্মেষ ঘটে ) মধ্যে না থাকে, তবে সেই সমাজ জাতি খুব বেশী দূর এগোতে পারে না। (সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *