বন্ধু মাসুদ এবং হেফাজতি মাসুদ

চট্রগ্রামের খাতুনগঞ্জে হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালীন বেশ কয়েকজন পেয়ারের দোস্ত ছিল। এরা এখন প্রত্যেকেই হাফেজ। এদের মধ্যে আমার সবচেয়ে খুব কাছের বন্ধু ছিল মাসুদ রানা। আমি পড়াশুনা পুরোটা শেষ না করেই শৈশবেই হুজুরের মাইরের চোটে মাদ্রাসা ছেড়েছিলাম! হুজুরটা কেমন জানি একরকম সাইকো ছিল বলে আমার ধারনা। আমাকে মেরে ব্যপক মজা পেত বলে মনে হতো!


চট্রগ্রামের খাতুনগঞ্জে হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালীন বেশ কয়েকজন পেয়ারের দোস্ত ছিল। এরা এখন প্রত্যেকেই হাফেজ। এদের মধ্যে আমার সবচেয়ে খুব কাছের বন্ধু ছিল মাসুদ রানা। আমি পড়াশুনা পুরোটা শেষ না করেই শৈশবেই হুজুরের মাইরের চোটে মাদ্রাসা ছেড়েছিলাম! হুজুরটা কেমন জানি একরকম সাইকো ছিল বলে আমার ধারনা। আমাকে মেরে ব্যপক মজা পেত বলে মনে হতো!

ক্বারিয়ানায় আমি টপ হলেও মুখস্ত বিদ্যায় আমি খুবই দুর্বল ছিলাম। যে কারনে ক্রমাগত হুজুরের নির্যাতনের শিকার হতাম। তাই শেষ পর্যন্ত পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি পুরো ক্বুরআনের হাফেজ না হলেও মাসুদ এখন হাফেজ। অন্য একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক! মাদ্রাসা থেকে যখন পালিয়ে আসছিলাম, তখন সেই আমাকে পালাতে সহযোগিতা করেছিল!

মাঝখানে দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না। বছরদুয়েক আগে হঠাৎ করেই চট্রগ্রামের খুলশিতে মসজিদে নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় কাকতালীয়ভাবে সাক্ষাৎ হয়। ঐ সময় গেট দিয়ে বের হচ্ছিল মাসুদ। সেদিন বেশ আলাপ হয়েছিল। এরপর অনেকটা সময় কেটে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে ফোন করতো। যোগাযোগ রক্ষা হতো। সে যে একটা মাদ্রাসায় চাকুরী পেয়েছে, সেটাও জানিয়েছিল ঐ সময়।

গত শনিবার মতিঝিলের সমাবেশের আগের দিন শুক্রবার সে আবার ফোন দেয়। কুশল বিনিময়ের পর জিগেস করে আমি কোথায় আছি। তারপর রাতে থাকা যাবে কিনা, সেটা জিগেস করে! আমি বন্ধু হিসেবে থাকার ব্যবস্থা করলাম। রাতে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ হলো। আমি হাফেজিয়া শেষ না করায় সে আমাকে বেশ তিরস্কার করলো। সে কি জন্য ঢাকায় আসছে, জিগেস করতেই সে জানালো, শাহবাগী, ব্লগার, নাস্তিকদের ফাঁসির দাবিতে মতইঝিলের সমাবেশে যোগ দিতে সে ঢাকা এসেছে। তার সঙ্গী সাথীরা মোহাম্মদপুরের এক মাদ্রাসায় উঠেছ।

আমি জিগেস করলাম, ব্লগ- ব্লগার এগুলা কি জানিস? শাহবাগের মানুষগুলো কিভাবে নাস্তিক? উত্তরে সে যা বলেছিল তার সার সংক্ষেপ দাড়ায়। “ব্লগার হইলো নাস্তিকদের একটা পার্টি। এটা হলো নাস্তিকদের ইন্টারনেট সংস্করন।” সরকার এই নাস্তিকদের সহায়তা করছে। কিন্তু ইন্টারনেট কি ? এটা কিভাবে ব্যবহার হয় সে সম্পর্কে তার কোন ধারণা নাই। আমি তখন তাকে ল্যাপটপ থেকে ব্লগের চেহারা দেখালাম। ইন্টারনেট কি হালকা পাতলা বোঝালাম। ব্লগ-ব্লগার সবই বোঝালাম। তাতে কি বুঝল ও, আমি জানি না। জিগেস করলো, ” এটা তো তাইলে বড়লোকগো জিনিস! সব আজগুবি কারবার।” আমি হাসলাম। শেষমেষ ঘুমাইলাম আমরা।

সকালে যাওয়ার আগে ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে আমরা চা খেলাম! সে মতিঝিলে গেল বটে। কিন্তু ব্লগ-নাস্তকদের সম্পর্কে যে ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে সে এসেছিল- তার অনেকটাই আমি ভেঙে দিয়েছি বলে মনে হলো। বিদায় নেওয়ার সময় চট্রগ্রামে যাওয়ার দাওয়াত দিল। আমি প্রতিশ্রুতি দিলাম। রাতে হুজুরের সাথে থেকে পরদিন সকালে সে ঢাকা ত্যাগ করবে বলে জানাল।

১১ thoughts on “বন্ধু মাসুদ এবং হেফাজতি মাসুদ

  1. এই ধরনের ঘটনাগুলো পড়লে আমার
    এই ধরনের ঘটনাগুলো পড়লে আমার কেবলই তারেক মাসুদের কথা মনে পড়ে যায়। উনি খুব গভীরে গিয়ে চিন্তা করতেন, যেখানে আমরা বেশীরভাগ সারফেস লেভেল নিয়েই মেতে থাকি। ধন্যবাদ সুন্দর লেখাটির জন্য।

    1. ভেতর থেকে না ভাবলে শিকড়ে
      ভেতর থেকে না ভাবলে শিকড়ে পোছানো যায় না। শিকড়ে না পৌছালে পরিপূর্ণভাবে শিকড় কাটা সম্ভব না।
      গভীরে যেতে হবে। আরো গভীরে।

      সাথে যদি রুপঙ্করের গানটা ধরতে পারেন, তাহলে মনে বেশ জোস পাবেন!

      “গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও |
      গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও |
      এই বুঝি তল পেলে , ফের হারালে … প্রয়োজনে ডুবে যাও …”

  2. “ব্লগার হইলো নাস্তিকদের একটা

    “ব্লগার হইলো নাস্তিকদের একটা পার্টি। এটা হলো নাস্তিকদের ইন্টারনেট সংস্করন।”

    হেফাজতিদের জ্ঞান এই পর্যন্তই….
    ইদানিং আপনার লেখাগুলো সুখপাঠ্য হচ্ছে।

  3. আমি জিগেস করলাম, ব্লগ- ব্লগার

    আমি জিগেস করলাম, ব্লগ- ব্লগার এগুলা কি জানিস? শাহবাগের মানুষগুলো কিভাবে নাস্তিক? উত্তরে সে যা বলেছিল তার সার সংক্ষেপ দাড়ায়। “ব্লগার হইলো নাস্তিকদের একটা পার্টি। এটা হলো নাস্তিকদের ইন্টারনেট সংস্করন।” সরকার এই নাস্তিকদের সহায়তা করছে। কিন্তু ইন্টারনেট কি ? এটা কিভাবে ব্যবহার হয় সে সম্পর্কে তার কোন ধারণা নাই। আমি তখন তাকে ল্যাপটপ থেকে ব্লগের চেহারা দেখালাম। ইন্টারনেট কি হালকা পাতলা বোঝালাম। ব্লগ-ব্লগার সবই বোঝালাম। তাতে কি বুঝল ও, আমি জানি না। জিগেস করলো, ” এটা তো তাইলে বড়লোকগো জিনিস! সব আজগুবি কারবার।” আমি হাসলাম। শেষমেষ ঘুমাইলাম আমরা।

    ম্যান হাস্তে হাস্তে গড়াগড়ি অবস্থা।

    যাউকজ্ঞ্যা কথা হইল

    রাতে হুজুরের সাথে থেকে পরদিন সকালে সে ঢাকা ত্যাগ করবে বলে জানাল।

    পুরা টেনশনে ফালায়া দিলেন মিয়া।

    1. বদলানোর হার জানা যায়- এমন
      বদলানোর হার জানা যায়- এমন মেশিন আমিও খুজছি! প্রিয়জনের কাছে, এই কথাটা বারবার শুনতে হয়!
      “সিয়াম, তুমি অনেক বদলে গেছ!!”
      মেশিন পাইলে জানায়েন! কি হারে বদলাইতেসি, এইডা জানা খুব ইমার্জেন্সী!!! :ক্ষেপছি:

  4. আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি সে
    আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি সে সময় আমার গ্রামে একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। খুব ইচ্ছা ছিল, স্কুলের পাশাপাশি মাদ্রাসায় পড়ে পবিত্র কোরআনের হাফেজ হব। সে লক্ষ্যে একদিন মাদ্রসায় হাজির হলাম। যথারিতি হুজুরের কাছে আমার আকাঙ্খার কথা প্রকাশ করলাম। উত্তরে হুজুর আমাকে জানালেন, স্কুলে পড়লে হাফেজিয়ায় পড়া যাবে না। এখানে পড়লে এখানেই থাকতে হবে। আমি বললাম আমার পক্ষে এখানে থাকা নম্ভব নয়। আমি স্কুল শেষ করে মাদ্রাসায় পড়তে আসবো। আমাকে পড়া শিখিয়ে দিবেন আমি বাড়িতে মুখস্থ করে পরদিন আপনার কাছে পড়া দিব। এতে হয়ত আমার সময় অন্যদের চেয়ে বেশি লাগবে তাতে আমার অসুবিধা নাই। তবুও আমি কোরআন শরীফ মুখস্থ করে হাফেজ হতে চাই। আমার নিজের উপর অনেক আস্থা ছিল। কারণ ততদিনে আমি ঐ মাদ্রাসাটি মক্তব থাকা অবস্থায় আরবী পড়া মুটামুটি শিখেছিলাম। আরবী পড়ার সময় আমি লক্ষ্য করেছি এক-একটি ছোট আকারের সুরা মুখস্থ করতে আমার মুটামুটি ৩-৪ বার পড়লেই মুখস্থ হয়ে যেত। কিন্তু হুজুর কোন ক্রমেই আমার ইচ্ছা পুরণ করতে দিলেন না। যা হোক আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি এরুপ কোন শিক্ষা চালু করা সম্ভব হতো, তাহলে অবশ্যই হেফাজতের মত কোন লং মার্চকে মোকাবিলা করতে হতো না….

  5. “ব্লগার হইলো নাস্তিকদের একটা

    “ব্লগার হইলো নাস্তিকদের একটা পার্টি। এটা হলো নাস্তিকদের ইন্টারনেট সংস্করন।”

    আর কিছু বলার নায়। অশিক্ষা আর অন্ধকারই ঐ মূর্খদের হাতিয়ার!!
    লিখতে থাকুন; হেফাজতিররা দাবড়ানির উপর থাক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *