ধর্ম,ধর্মীয় অনুভূতি ও অন্যান্য

“ব্লগে লিখুন সমস্যা নেই,কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কিছু লিখবেন না”-নিলয় নীল হত্যার পর সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক।


“ব্লগে লিখুন সমস্যা নেই,কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কিছু লিখবেন না”-নিলয় নীল হত্যার পর সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক।

উক্তিটি এখন তিনি করলেও ধারাটি বেশ কিছুসময় ধরেই চলে আসছে সুশীল মুখোশ পরে থাকা একটি সম্প্রদায়ের মাঝে,কপট,ভণ্ড চরিত্রের একটি গোষ্ঠীর মাঝে,তারা একই সময়ে নদীর দু’কোল পাড়ি দিতে চায়।যখন ধর্মের অসঙ্গতি তাদের সামনে তুলে ধরা হয় তখন তাদের ধর্মানুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়,আবার প্রতিবাদ জানায় ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের কার্যকলাপের(আমি নিশ্চিত নই তাদের প্রতিবাদ লোক দেখানো কিনা)।বলছিলাম ওই আইজিপির বক্তব্যের ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত’ প্রসঙ্গে।ধর্মানুভূতিতে আঘাত সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হবে ধর্ম সম্পর্কে।
গোড়া থেকে শুরু করা যাক,ধর্ম কী? ধর্ম-উচ্চারণ করতেই কেমন জানি গা শিউরে উঠা ভাব,মানুষের মাঝে বিভেদ,মসজিদ,মন্দির,গীর্জার সারি চোখের সামনে ভেসে উঠে,মস্তিস্ক চোখের সামনে তুলে ধরে অসংখ্য লাশ,রক্তিম মর্ত্যলোক।ধর্ম বলতে সাধারণত বোঝায়ঃ বৈশিষ্ট্য,নীতি,আদর্শ ইত্যাদি।যেমনঃ- আগুনের ধর্ম দহন,সময়ের ধর্ম নিরবিচ্ছিন্নতা এবং মানুষের ধর্ম মানবতা।কিন্তু Religion(প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম)বলতে আমরা সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে বুঝি না।বিবর্তনের পর মানবজাতি রিলিজিয়ন ছাড়াই অতিবাহিত করেছে দীর্ঘকাল,ছিলো না মানুষের মাঝে বিভেদ,ছিলো না স্বয়ং ঈশ্বর।মানুষ ধীরে ধীরে চিন্তা করতে শিখলো,অচিন্তনীয় সুন্দর সূত্রে বাঁধা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে তারা বিস্ময়াভিভূত হলো,রাতের মেঘমুক্ত ঝলঝলে আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে তারা বিস্মিত হলো,তারা দেখলো সূর্য অকৃত্রিম বন্ধুর মতো আলোর ফোয়ারা দিয়ে যেতে,আবার সূর্য যখন মেঘে ঢেকে যায়,অথবা ভয়ঙ্কর সুদীর্ঘ রাত নামে তখন তারা সূর্যকে ভাবতে থাকে দেবতারূপে।সূর্যকে সন্তুষ্ট রাখতে পারলেই তাদেরকে সূর্য আলো দিবে,এজন্যে তারা নানা ধরণের আয়োজনে অংশ নিতো।কখনো আবার সমুদ্র মহারাগে গর্জন করতে করতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো,তারা চেষ্টা করতো সমুদ্রকে সন্তুষ্ট করতে বিভিন্ন পদ্ধতিতে।ছিলো বহুঈশ্বরবাদ,এর অনেক সময় পরেই মানুষ গোহা থেকে বের হয় সমাজ গঠন ক’রে মানুষের চিন্তা চেতনার বিবর্তনে সৃষ্টি হয় স্বর্গের ঈশ্বর অর্থাৎ একেশ্বরবাদ। মানুষই তার প্রয়োজনে দেবতা সৃষ্টি করেছে আবার ছুঁড়ে ফেলেছে,মানুষই নিজের প্রয়োজনে আকাশের ঈশ্বর সৃষ্টি করেছে।মানুষ ঈশ্বরের স্রষ্টা,ঈশ্বর মানুষের নয়।
মানবসৃষ্ট এই ঈশ্বরই হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবজাতির জন্যে অভিশাপ।মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করলে এই ঈশ্বরকে নিয়েই গড়ে উঠতে থাকে ধর্মের বাজারের রমরমা ব্যবসা,এতে লাভ হতো মোড়লদেরই,তারা দেব-দেবী,ঈশ্বরের নাম দিয়ে নিজেদের মতো ক’রে কিছু নিয়ম তৈরি করতো এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব ঐ নিয়মগুলো মেনে নিতে বাধ্য করতো। মূলত এই নিয়ম বা বিধি নিষেধ থেকেই উৎপত্তি ধর্মের। সমাজকে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলে রাখার জন্যেও ব্যবহার করা হতো তথাকথিত বিধির নিয়ম অর্থাৎ ধর্মকে।প্রক্রিয়াটি একটি উদাহরণে আরো স্পষ্ট করা যায়ঃ

বাল্যবয়সে দেখতাম আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে বিরোধ লেগেই থাকতো,খুব তুচ্ছ কারণে ভাই-ভাই বিরোধ,চাচা-ভাগ্নে বিরোধ,এসবের নির্মম শিকার হতে হতো ছোটদেরও। একবার আমার বাবার ছোট ভাইয়ের সাথে তাঁর বিরোধ হয়,এর পরের দিন আমি চাচার লাগানো ইউক্যালিপটাস গাছের দিকে যেতেই বাবা বললেনঃওই গাছ স্পর্শ করলে আমার হাত পচে যাবে(উল্লেখ্য ওটা আমার প্রিয় গাছ ছিলো,আমার সমবয়সী ছিলো গাছটি,তাই আমি তার সাথে সময় কাটাতাম,কথা বলতাম,খাওয়াতাম)।আমিও নির্বোধ বালকের মতোই বাবার নিষেধাজ্ঞাকে অপ্রিয় সত্যরূপে গ্রহণ করলাম,আমি লুকিয়ে গাছটিকে দেখতাম,দূর থেকেই কথা বলতাম,কিন্তু হাত পচে যাওয়ার ভয় থেকে আমি গাছটির কাছে যেতাম না।আমার অন্ধ বিশ্বাস সত্ত্বেও এতে ভালো দিকটা ছিলো আমার গাছে হাত দেওয়ার কারণে আবার তাদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে উঠতে পারে নি।কিন্তু মারাত্মক ভুলটা ছিলো বাবার মিথ্যারূপিত ত্রাসের পদ্ধতি।
অনুরূপভাবে তৎকালীন মোড়লরাও আশ্রয় নিয়েছিলো এক মস্ত ভুল পদ্ধতির,যার পরিণতি একুশ শতকে এসেও আমরা ভুগছি।
এই পদ্ধতিতেই ধর্মের উদ্ভব হলেও তা কোনোকালেই সার্বজনীন থাকে নি,গ্রিক পুরাণের পরস্পরের শত্রু দেবতার মতো আমাদের ধর্মপ্রচারকরা নতুন তত্ত্ব-নিয়ম প্রচার করেছে,ঘটেছে ধর্মের বিবর্তন।
যাহোক এবার মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক,আইজিপির বক্তব্যে।তিনি বলেছেনঃ “ব্লগে লিখুন সমস্যা নেই কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কিছু লিখবেন না।”
এই ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মানুভূতি প্রকৃত অর্থে কী?এতে আঘাত লাগে কীভাবে?ধর্মানুভূতির স্বরূপ কী?
ধর্মানুভূতি- ধর্মের প্রতি যে অনুভূতি।অর্থ বিবেচনায় ধর্মানুভূতি থাকতে পারে সবকিছুর,আইজিপি বা ডিবি অফিসারেরও থাকা উচিৎ ধর্মানুভূতি তা অবশ্য ইসলাম বা অন্য ধর্মের প্রতি নয়,রাষ্ট্রিয় আইনের প্রতি,আমাদের প্রশাসন বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও থাকা উচিৎ ঐ আইনের প্রতি বিশেষ ধর্মানুভূতি অথবা সংক্ষেপে আইনানুভূতি,কিন্তু তা যে নেই তার প্রমাণ আমরা গত কয়েকমাস ধরে অনবরত হত্যাকাণ্ড,প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি থেকে পেয়েছি।সুতরাং তাদের ধর্মানুভূতি আঘাত হলেও কিছু যায় আসে না।কিন্তু এই যে আঘাত কীভাবে লাগে?
আগুনের ধর্মানুভূতি দহন,দাবানল যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন আগুন নেবানোর চেষ্টা-আগুনের ধর্মানুভূতিতে আঘাত।
তাহলে? কী করবেন? দাবানল আরো ছড়িয়ে যেতে সাহায্য করবেন?হ্যাঁ,আপনারও যদি ধর্মানুভূতি স্পর্শকাতর হয়,তাই করা উচিৎ।
আইজিপি সাহেব শুধু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিতে বলেই ক্ষান্ত হন তিনি বাংলাদেশের একমাত্র আইন(তথ্য প্রযুক্তি আইন)এর ভয়ও দেখিয়েছেন,বলেছেন ধর্মানুভূতিতে আঘাতকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা,দিয়েছেন তাঁদের ১৪ বছর কারাবাসের হুমকী।
এবার দেখে নেওয়া যাক ধর্মানুভূতিতে আঘাত কারা দেয়?
কথিত আছে,আব্রাহাম(মুহাম্মদিয় ধর্মমতে ইব্রাহিম)কে একবার বাড়ি রেখে তার মূর্তি উপাসক বাবা-মা’রা কোথায় যায়।আব্রাহামকে বলা হয়েছিলো মূর্তি পাহারা দিতে।কিন্তু সে করলো কী? কোড়াল দিয়ে(সে সময় কোড়াল ছিলো কিনা আমি জানি না)মূর্তিদের হাত-পা-ধড় আলাদা করে দিলো।এই কাহিনীটি ময়লানা সাহেবরা উচ্চ আওয়াজে ব’লে বেড়ান।কিন্তু আব্রাহাম কি এতে তার পিতার ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয় নি?যদি দিয়েই থাকে,ধর্মানুভূতিতে আঘাতের দায়ে তাকে কেন দোষী করা হবে না?
এবং এই ঘটনাটি কেন ময়লানারা গর্ভভরে বলে বেড়ান?আব্রাহামের বিচার হতে না পারলেও হোক তাদের বিচার।
অতি স্পর্শকাতর ধর্মানুভূতির অধিকারী মুসলিমদের নবি আঘাত করেছিলো আরবিয় পৌত্তলিকদের ধর্মানুভূতিতে,ইসলামিক বক্তারা সুযোগ পেলেই কথা বলেন অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করতেও বাকি রাখেন না মা-কালিকে,দূর্গাকে!
কেন বিচার হবে না তাদের? বন্ধ ক’রে দেওয়া হোক সমস্ত ওয়াজ মাহফিল,যেখানে ধর্মানুভূতিতে আঘাতের চর্চা হয়,একই কারণে বন্ধ ক’রে দেওয়া সমস্ত মসজিদ-মন্দির-গির্জা,ডাস্টবিনে নিক্ষেপ ক’রা হোক কোরান-বাইবেলসহ সকল ধর্মগ্রন্থ,যা অন্য ধর্মের অনুসারীদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে।

ধর্মানুভূতির গুজব ছাড়ুন।সোচ্চার হোন মানবতার পক্ষে।যে ধর্ম বা মতাদর্শ মানবতার বিরুদ্ধাচার ক’রে কণ্ঠ তুলুন সে ধর্মের বিরুদ্ধে।
সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত হোকঃ

সবার উপরে মানুষ সত্য,তাহার উপরে নাই

৬ thoughts on “ধর্ম,ধর্মীয় অনুভূতি ও অন্যান্য

  1. আপনি ইব্রাহীম আর মুহাম্মদের
    আপনি ইব্রাহীম আর মুহাম্মদের কথা বলেছেন। ইব্রাহীম মুর্তি হাত-পা আলাদা করেছিলেন আর মুহাম্মদ নাস্তিক প্যাগানদের ধর্মিয় উনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন। কিন্তু এসবের জন্য তাদেরকে কিন্তু চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। ইব্রাহীমকে আগুনে ছূড়ে ফেলা হয়, আর মুহাম্মদকে মক্কা থেকে মদীনায় বিতাড়িত করা হয়। মক্কা তাকে অপমান আর লাঞ্চনা সইতে হয়েছিল। নাস্তিক, প্যাগানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছর লড়াই আর যুদ্ধ করে তার মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছিল। ইব্রাহীম আর মুহাম্মদের অনুসারী এখন পৃথিবীতে ২ বিলিয়ন মানুষ।

    এখন সেই মুহাম্মদ আর ইব্রাহীমের মতবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুসলিমদের ধর্মিয় উনুভূতিতে আঘাত করে নিজেদের মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে, নিজেদের কিন্তু মুহাম্মদ আর ইব্রাহীমের জায়গায় ভাবতে হবে। উনুভূতিতে আঘাতের পরিণতী সবসময়ই ভয়াবহ। যেটা মুহাম্মদ আর ইব্রাহীমের জীবনে আমরা দেখতে পাই।
    তাই দু-চারজন ব্লাগার খুন হলে তারস্মরে কান্না-কাটি করলে তো হবে না। অনুভূতিতে আঘাতের পরিণতীটাও মাথায় রাখতে হবে।

  2. ইসলামিক বক্তারা সুযোগ পেলেই

    ইসলামিক বক্তারা সুযোগ পেলেই কথা বলেন অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করতেও বাকি রাখেন না মা-কালিকে,দূর্গাকে!

    হিন্দু রাষ্ট্র ভারতে যখন মন্দিরে ঢাকের বাড়ি, উলুদ্ধনী আর মুর্তি পূজা চলে তখনো কিন্তু সেখানকার মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। ভারতে অনেক প্রদেশেই মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত করে গরু কোরবাণি নিশিদ্ধ হয়েছে। পশ্চীমা দেশে গীর্যায় যখন যীশুকে আল্লাহর যায়গায় বসিয়ে পাদ্রী বয়ান দেয়, তখনও মুসলমানদের অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু হিন্দু রাষ্ট্র ভারতে মুর্তি পূজা থামবে না, পশ্চিমা দেশে পাদ্রীর বয়ানও নিশিদ্ধ হবে না।
    ঠিক তেমনি এদেশেও মুর্তিপূজা আর পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে হুজুদের বয়ান থামবে না। যদি কেঊ থামাতে চায় তবে সেটি অযৌক্তিক , এবং সংঘাতের জন্ম দেবে। যারা সেটা সহ্য করতে পারবে না, তাদের উচিত এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়া অথবা সংঘাতেরর জন্য তৈরী থাকা।

    1. আমি তার কথাও উল্লেখ করেছি,তাই
      আমি তার কথাও উল্লেখ করেছি,তাই দাবি জানিয়েছি সব ধর্মগ্রন্থ নিষিদ্ধের,যদি ধর্মানুভূতিতে আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা না থাকে!

  3. আজ যে বিজ্ঞানের বড়াই করছেন,
    আজ যে বিজ্ঞানের বড়াই করছেন, সেই বিজ্ঞান যে মহাগ্রন্থ থেকে উৎপত্তি, সেই সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষার ধর্মগ্রন্থ, আমরা মুসলমানরা যাতে শরীর পবিত্র না করে স্পর্শ করি না, সেই সর্বশ্রেষ্ঠ গন্থ পবিত্র কোরআন’কে আপনি ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলতে বলে যে অনুভূতিতে আঘাত করলেন(নাউযুবিল্লা)! তার কি শাস্তি হওয়া উচিৎ আপনি মনে করেন?

    1. আমার শাস্তি চাপাতির কোপে
      আমার শাস্তি চাপাতির কোপে মৃত্যু!
      ভয় করি নাগো,

      উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
      ভয় নাই ওরে ভয় নাই
      নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
      ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *