বৈশাখ অথবা জ্বরের গল্প।

দিনটা ঠিক কি ছিল মনে নাই। ধরি শনিবার। শনিবারে শনি আছে তাই। পয়লা বৈশাখ। দারুণ পরিবেশ। উপজেলা কোয়াটার এলাকাটা নিজের মাঝেই বেশ চমৎকার। পরিপাটি। রাস্তাগুলো এমনিতেই দারুণ লাগে মুহিবের। সবসময় ভাবে একটা সাইকেল হলে সে প্রতিদিন এই পিচের উপরে সাইকেল চালাবে। আজকে তো আবার পয়লা বৈশাখ। একটু অন্যরকম করেই সেজেছে সবকিছু।

দিনটা ঠিক কি ছিল মনে নাই। ধরি শনিবার। শনিবারে শনি আছে তাই। পয়লা বৈশাখ। দারুণ পরিবেশ। উপজেলা কোয়াটার এলাকাটা নিজের মাঝেই বেশ চমৎকার। পরিপাটি। রাস্তাগুলো এমনিতেই দারুণ লাগে মুহিবের। সবসময় ভাবে একটা সাইকেল হলে সে প্রতিদিন এই পিচের উপরে সাইকেল চালাবে। আজকে তো আবার পয়লা বৈশাখ। একটু অন্যরকম করেই সেজেছে সবকিছু।
কিন্তু ঠিক সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারেনি মুহিব। দেরী হয়ে গেল। তাও তারাতারি গোসল সেরে বাহিরে যেতে নিলে মা ডেকে ছোটো বোনের দায়িত্বও তার উপর চাপিয়ে দিলেন। ভালো না লাগলেও করার কিছু নাই। অনুর হাত ধরে বাসা থেকে বেরুলো। নতুন সাদা পাঞ্জাবি গায়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজেই সব উপভোগ করে যাচ্ছে মুহিব। মা বলল যে বাবা আর মা কিছুক্ষণ পরেই আসবেন। কিন্তু কিছুক্ষন আর হয় না। এটা মুহিবের কাছে খুব ভালই হল। কোন চাপ নাই । নিজের মনে ঘুরে ফিরছে। কিন্তু একটা ঝামেলা। অনু। কি করা যায়? বুদ্ধি করে ওকে কোয়াটার মিলনায়তনের চিত্র অংকন প্রতীযোগীতায় ঢুকিয়ে দিয়ে কেটে পড়ল। বেশ কিছুক্ষণ এ রাস্তা ও রাস্তা ঘুরতে থাকল। রাস্তা লাল-সাদা-সবুজ রঙ্গে ভরা। মানুষগুলো যে এতো সুন্দর তা কি আগে জানত মুহিব? মানুষের প্রেমে পড়তে লাগল ও। বৈশাখকে নতুন করে জানল। মানুষ আর প্রকৃতি একাকার হয়ে পরে কেমন করে আজ বুঝল।
আর হাঁটা যাচ্ছে না। ক্লান্তি আসছে। কাটানোর জন্য একটা দেয়ালে উঠে বসল। সামনের রাস্তা দিয়ে এক ঝাক নাম না জানা মেয়ের দল হেঁটে গেল। মুহিব ওদের হাতের মেহেদীর রঙ্গে কখন হারিয়ে গেল বুঝতেই পারে নি। সেই আঁকা বাঁকা নকশাগুলোর থেকে ফিরে আসতেই অনুর কথা মনে পরল। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। অনু হয়তো একা একা ভয় পাচ্ছে। আর মুহিব অনেকখানিই চলে এসেছে একা একা। তারাতারি করে মিলনায়তনের দিকে হাঁটা দিল। এবার হেঁটে ফেরার পথে সবুজ আর তেমন করে তাকে আটকাতে পারল না।
এসে দেখে অনু তার বন্ধুদের সাথে বেশ মজাতেই আছে। ওকে কাছে ডাকতেই ছুটে আসল। জানতে পারল প্রতিযোগিতায় ১ম, ২য়, ৩য় হতে না পারলেও বিশেষ একটা উপহার পেয়েছে। তাই অনু এতো খুশি।
ভালই হল পেয়েছে, নাহলে তো কি জানি করত? আর ভাইয়া নেই এটা নিয়েও চিন্তিত হয়ে পরত।
এদিকে বেশ দুপুর হয়ে পরেছে। ঘড়িতে দেখে প্রায় তিনটে বাজে। বাসায় যেতে হবে। পেটে ইদুর-বেড়াল-বাঘ-ভাল্লুক সবাই ম্যারাথন খেলছে।
অনুর হাত ধরে বাসার দিকে হাঁটা দিল মুহিব।
ওরা দোতালায় থাকে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই চমকে গেল।
আরে নানু! তুমি কখন এলে?
নানুর আজকে আসার কোন কথাই ছিল না। নানুকে আজকের দিনে এখানে দেখে মনটা নেচে উঠল। নানুকে সবসময় এরকম দিনগুলো নিয়ে মুহিব কটু কথাই বলতে শুনেছে। নামাজি মানুষ। আর নানা মারা যাবার পরে এসব বিষয়ে তেমন একটা মনও নেই তার। নানু মুহিবের কথার কোন উত্তর দিল না। শুধু ঘরে যাতে বলল।
ঘরে ঢোকার পথে মুহিব দেখে সিঁড়ির উপরে এক লম্বা চুল, মাথায় টুপি, সাদা জুব্বা পরা হাতে তজবি আরেক হাতে একটা ঝাড়ু হাতে একটা দাড়িয়ালা বুড়ো বসে বিড়বিড় করে কি যেন বকে যাচ্ছে। ভয় পাবার মতই হুটহুট করে কেপে উঠছে।
কিছুই বুঝতে পারলনা। কি হচ্ছে।
বাসার ভেতরটা ঠিক আগের মত নেই। পানির জগটা নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কাঁচের একটা গ্লাশ মেঝেতে পরে টুকরো টুকরো হয়ে আছে। শোবার ঘরটা থেকে বিছ্রি একটা গন্ধ আর ধোঁয়া বের হচ্ছে। সেই ধোঁয়া নাকে লাগতেই মাথাটা ঘুরে উঠল মুহিবের। মনে হল কেউ জোর করে একমুঠ শুকনো মরিচের গুড়া অর নাকে ছিটিয়ে দিয়েছে। চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসল।
মা কোথায়। ভয় পেয়ে গেল মুহিব।
মা, মা , কই তুমি ?
এক দৌড়ে শোবার ঘরে ঢুকল মুহিব। পেছন থেকে নানু বাঁধা দেবার চেষ্টা করল। অনুকে নানু ধরে রেখেছেন। কিন্তু মুহিব কিছু না শুনেই ঘরে ঢুকে গেল। দেখে মা বিছানায় শুয়ে আছেন। ঠিক বিছানায় না। শরীরটার খানিকটা বিছানায় আর বাকিটা নিচের দিকে ঝুলে আছে। চুল গুলো চারিদিকে ছড়ানো। মাকে বেশ কয়বার ডাকার পরেও সারা দিলেন না। মায়ের মুখটা লাল হয়ে আছে। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। বাবাকে খোঁজার জন্য ঘুরে তাকাতে গিয়ে খাটের দুই কোণে দড়ি বাঁধা দেখতে পেল। খাটে কে আবার দড়ি বেঁধেছে ঠিক মাথায় ধরল না। তারাতারি করে বাবাকে খুঁজতে বের হতে দেখে বাবা সিঁড়ির কাছে নানুর পাশে। সামনে ওই ভুতের মত লোকটা।
জীন, জীন, কালা জীন, যাইব না, এতো সহজে যাইব না………………।
যা যা আনতে কইছি নিয়া আসেন যান। আমি সব ঠিক করতাসি। যান দাড়ায়ে আসেন ক্যান।
বাবাকে ডাকলে বাবা না শুনেই বেরিয়ে পরলেন। এদিকে মাও কোন সারা দিচ্ছেন না, নানুও কিছু বলছেন না। গাধার মত ঘন্টাখানিক ছুটোছুটির পর বাবা আসলেন, হাতে কি কি জানি ছিল ঠিক মনে নাই। বাবাকে জিজ্ঞেস করতে পারার আগেই, নানু একটা ব্যাগ হাতে করে মুহিব আর অনুর হাত ধরে নিচে নেমে একটা রিক্সায় উঠে বসলেন।
চল নানু আমরা নানু বাসা ঘুরে আসি।
আম্মুর কি হইসে?
কিছু না, তোমার আম্মুর একটু জ্বর আসছে তো?
ঐ লোকটা কে নানু?
উনি ডাক্তার।
ধুর ডাক্তার এমন হয় নাকি?
উনি বিদেশী ডাক্তার।
নানু বাড়ি যাবার লোভটা সেদিন ঠিক সামলাতে পারেনি মুহিব। তখন ও ছিল ক্লাশ ফাইভে। পঞ্চম শ্রেণী।
কিন্তু আজকে মুহিব বোঝে, আজকে জানে বিদেশী ডাক্তারকে। কিন্তু অতীতকে কিছুতেই বদলাতে পারে না ও। কোন চেষ্টাতেই কিছু হয় না।
মাঝে মাঝে অন্যমনষ্ক হয়ে পরলে মনে আসে “জীন, জীন, কালা জীন, যাইব না, এতো সহজে যাইব না………………।”
মার জ্বরও আর ঠিক হল না। জ্বর শুধু চলে গেছে, কিন্তু একা না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *