আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে: উদ্দেশ্য যখন ময়ূরপুচ্ছধারণ

সম্প্রতি বিশিষ্ট কলামিস্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বাংলাদেশের অতীত এবং ভাষার বিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আল্লাহর ৯৯ নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিল। এগুলো আমরা বাংলা ভাষায় এডপ্ট করেছি। যেমন আবু হুয়রায়রা নামের অর্থ হচ্ছে বিড়ালের বাবা, আবু বকর নামের অর্থ হচ্ছে ছাগলের বাবা। এভাবে আমরা অনেক নাম রাখি।” তার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি বিশিষ্ট কলামিস্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বাংলাদেশের অতীত এবং ভাষার বিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আল্লাহর ৯৯ নাম কাফেরদের দেবতাদের নাম ছিল। এগুলো আমরা বাংলা ভাষায় এডপ্ট করেছি। যেমন আবু হুয়রায়রা নামের অর্থ হচ্ছে বিড়ালের বাবা, আবু বকর নামের অর্থ হচ্ছে ছাগলের বাবা। এভাবে আমরা অনেক নাম রাখি।” তার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, ইসলামের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী কথা বলাই বর্তমানে বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিরোনাম হওয়ার শর্টকাট পথ। কিন্তু আমি মনে করি না যে তিনি শিরোনাম হওয়ার জন্য এমনটি বলেছেন। কারণ, তিনি স্বনামে বিখ্যাত। তবে এটাও ঠিক যে, অনেক নামী দামী লোকও মাঝে মাঝে নিজেকে জানান দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন। আবার কারো ভেতরে যদি ধর্মবিদ্বেষ থেকে থাকে তবে তারা শত লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও সহায়ক পরিবেশ পেলে তা মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে।

পবিত্র রমজান মাসে এ-রকম একটি ইসলাম-বিদ্বেষী বক্তৃতা দিয়ে তিনি কী অর্জন করতে চাইলেন? তিনি কি তৃতীয় শ্রেণির বুদ্ধিজীবীদের মতো নিছক বাকস্বাধীনতা (Freedom of expression) উপভোগ করতে চাইলেন? নাকি শুধুই একটি গোলোযোগ সৃষ্টি করতে চাইলেন? নিশ্চয়ই তিনি এতটা দায়িত্বহীন নন তবে তার অভিব্যক্তির মধ্যে আমি সারবত্তা ও ন্যূনতম প্রজ্ঞা (Wisdom of impression) দেখতে পাচ্ছি না। যেমন তিনি আরবিকে কাফেরের ভাষা বলেছেন। আসলে এই কথার কোনো যুক্তি আছে কি? আরবি মধ্যপ্রাচ্য, আরবভূমি, আফ্রিকার একটি বিরাট অঞ্চলের মানুষের ভাষা। এই ভাষায় আবু জেহেল, আবু লাহাব প্রভৃতি কাফের মোশরেকরা কথা বলেছেন বলে আরবি কাফেরদের ভাষা হয়ে যায়নি, এই ভাষায় আল্লাহর অনেক নবী রসুল ও তাঁদের সাহাবী যারা মো’মেন ছিলেন তারাও কথা বলেছেন। কোর’আন হাদীস আরবি ভাষায় লিখিত। কেউ যদি বলেন, অনেক রাজাকার বাংলায় কথা বলেন। তাহলে কি আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা দূষিত হয়ে যাবে? ভাষা একটি প্রাকৃতিক সম্পদের মতো। এতে গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের একক অধিকার থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং এই নির্বোধ উক্তিটি তার পাণ্ডিত্যের সঙ্গে যায় না। অনেকেই হয়তো একে অর্থহীন বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা বলবেন।

সে যাই হোক, কারো নাম নিয়ে কটূক্তি করা নিম্নরুচির পরিচায়ক হয়ে থাকে। অনেক মহান ব্যক্তির নাম সুন্দর অর্থবোধক নাও হতে পারে। কারণ তার নামটি তিনি রাখেন নি, এজন্য তার নামের দায় তার উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আল্লাহর ৯৯ নামের মধ্যে গফুর বা গাফফার একটি। আইয়্যামে জাহেলিয়াতে আরবে যে দেব-দেবীর পূজা করা হতো, শ্রদ্ধেয় লেখকের দাবী মোতাবেক নিশ্চয়ই সেই দেব-দেবীদের কোনোটির নাম গফুরও ছিল যা পরবর্তীতে ইসলামে অ্যাডপ্ট বা আত্তীকৃত হয়েছে। সুতরাং আব্দুল গাফফার চৌধুরির নিজের নামটির অর্থ দাঁড়ায় গফুর নামক একটি দেবতার দাস। তিনি হয়তো খেয়াল করেন নি যে, তার নিজের বক্তব্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিষয়টি কৌতুকপ্রদ নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমি কৌতুক করছি না, কারণ প্রথমত নামটি তিনি নিজে রাখেন নি, যারা রেখেছেন তারা আব্দুল গাফফার বলতে ‘সর্বক্ষমাশীলের দাস’ অর্থাৎ মহান আল্লাহর বান্দা অর্থেই রেখেছেন। নিঃসন্দেহে অতি উত্তম সেই নামকরণ।

আর আবু বকর (রা.) এর পূর্ণ নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে আমির। তাঁর ডাক নাম (যে নামে তাকে ডাকা হতো) ছিল আবু বকর যার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ছাগলের অভিভাবক অর্থাৎ রাখাল। (আরবিতে আবুন শব্দের অর্থ অভিভাবক, পিতা, মালিক, বিরাট) ইত্যাদি। সনাতন ধর্মের বিশিষ্ট অবতার বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের ডাকনাম গোপাল, গোবিন্দ ইত্যাদির অর্থও সেই একই অর্থাৎ গরুর রাখাল। কবি নজরুল সাম্যবাদীর মধ্যে লিখেছেন, “এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা/এই মাঠে হল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।” রসুলাল্লাহর প্রথম জীবিকা ছিল মেষ চালনা এবং তিনি বলতেন, “আল্লাহ এমন কোন নবীকে পাঠান নি যিনি মেষ চালাতেন না।” সুতরাং রাখাল এমন কোনো নিন্দনীয় অপনাম নয় যা নিয়ে ঘৃণাবিস্তারের সুযোগ রয়েছে।

আর হুরায়রা শব্দটি হিররাতুন এর তাসগীর । হুরায়রা অর্থ ছোট বিড়াল ।
আবু হুরায়রা অর্থ বিড়ালের মালিক । তিনি বিড়ালকে জামার আস্তিনে ঢুকিয়ে রাসু্লের দরবারে হাজির হয়েছিলেন । রাসুল তাকে আদর করে ডাকলেন ইয়া আবু হুরায়রা । রসুলের ভালোবাসায় আবু হুরায়রা তখন থেকেই নিজের নাম বাদ দিয়ে এই নামেই নিজেকে পরিচয় দিতে লাগলেন । তার কাছে এটা বড় ছিলো না যে তিনি বিড়ালের পিতা হয়ে যাচ্ছেন । বরং তার কাছে মুখ্য এটাই ছিল যে এই নামে প্রিয়তম রাসুল আমাকে ডেকেছেন ।

আল্লাহর রসুল যাঁদের মধ্যে আবির্ভূত হন অর্থাৎ আরবগণ কিন্তু নবী ইব্রাহীমকে (আ.) নিজেদের জাতির পিতা বা মিল্লাতা আবিকুম ইব্রাহীম (সুরা হজ্ব ৭৮) বলে বিশ্বাস করতেন এবং নিজেদেরকে তাঁর ধর্মের অনুসারী বলে বিশ্বাস করতেন। প্রত্যেক নবী-রসুল আল্লাহর যে সিফত বা গুণাবলীগুলো প্রকাশ করেছেন, সেগুলো অভিন্ন। ভাষার তারতম্য থাকলেও অর্থ একই। যেমন পরমেশ্বর আল্লাহকে বাংলায় স্রষ্টা বলা হয়, আর আরবিতে বলা হয় খালেক। কালের বিবর্তনে ইব্রাহিমের (আ.) ধর্ম বিকৃত হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহর বিভিন্ন সিফত মোতাবেক সাকার প্রতিমা গড়ে তার সন্তুষ্টির তরে উপাসনা করা বিচিত্র নয়। জানা যায়, কাবা শরীফে স্থাপিত ৩৬০টি প্রতিমার মধ্যে স্বয়ং ইব্রাহীমেরও (আ.) একটি প্রতিমা ছিল। এতে কি এটা প্রমাণিত হয় যে, ইব্রাহীম (আ.) পৌত্তলিকদের একটি দেবতার নাম? অনেক গবেষকের মতে, প্রাচীন মিশরে ও আরবে আল-ইলাহ নামে একটি Moon-god এর পূজা হতো, তারা মনে করেন এই ইলাহ শব্দটিই ইসলামের কলেমাতে ব্যবহৃত হয়েছে, ইলাহ মানে হুকুমদাতা (পডুন: The moon-god Allah by Robert Morey)। এ কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহর পবিত্র নামগুলো কোনো প্রতিমার উপর আরোপ করলে আল্লাহর নাম অপবিত্র হয়ে যায় না। ইলাহ আল্লাহর জাতি নাম যা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা সামান্য উচ্চারণভেদে বিভিন্ন সেমেটিক ভাষায় ব্যবহার করে থাকেন। যেমন ইলাহ থেকেই এসেছে সুরিয়ানী শব্দ এলি, ঈসা (আ.) আল্লাহকে এলি নামেই ডাকতেন, হিব্রুতে এটিই হয়ে গেছে এলোহি। পৌত্তলিকদের কাজই তো হচ্ছে স্রষ্টার মূর্তি গড়া। সুতরাং তারা যে আল-ইলাহ নামে মূর্তি গড়বে এতে কী এমন নিগূঢ় তত্ত্ব আছে তা আমি বুঝি না। তথাপি এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার একটিই কারণ থাকতে পারে, বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর জ্ঞানহীনতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি বিশেষ শ্রেণিকে উত্তেজিত করে রাস্তায় টেনে নামানো আর মানুষের জীবন ও সম্পদ বিপন্ন করার জন্য অপ্রয়োজনীয় প্ররোচনা দান (useless and unnecessary provocations)।

আমি মনে করি জনাব চৌধুরীর এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে মনস্তত্ত্ব কাজ করছে তা অতি সরল। যে সব মুসলিম বংশোদ্ভূত মানুষ পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে থাকেন তাদের মধ্যে নিজেদের আত্মপরিচয় নিয়ে একটি বিরাট হীনম্মন্যতা কাজ করে। বিশ্বময় মুসলিমরা ঘৃণিত ও ধিকৃত হচ্ছে, তাদেরকে সর্ব উপায়ে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। তাই অনেকেই চান তার সত্তা ও ব্যক্তিত্ব থেকে ইসলামের নামগন্ধ মুছে ফেলতে। এর জন্য তারা পশ্চিমা ঢঙে ইসলামের বিরুদ্ধে লেখালিখি করেন, বক্তব্য দেন ঠিক যেভাবে কাক ময়ূরপুচ্ছ লাগিয়ে ময়ূরের দলভুক্ত হয়ে নাচানাচি করে। মুসলিম কম্যুনিটি থেকে ভেসে আসা এই কাকতুল্য মানসিক দাসদেরকে কূটনীতিক প্রয়োজনে লুফে নেয়, সম্মান দেয় ইউরোপ আমেরিকার মিডিয়া ও সরকারগুলো। অতঃপর তাদেরকে ব্যবহার করে ইসলামেরই বিরুদ্ধে। তসলিমা, রুশদি, মালালা এদেরকে এই তালিকায় রাখা যেতে পারে।

কেউ যেন মনে না করেন আমি তাদের অপমান করার উদ্দেশে এটি বলছি, আমি তাদের অবস্থানের সমালোচনা করছি। সমালোচনা আর অপমান এই দুইয়ের পার্থক্য নিশ্চয়ই সকলে বুঝবেন। তবে এসব কলাকৌশল করে সাময়িকভাবে উদরপূর্তি চললেও পরিণামে বাঁচা যাবে না। কেননা আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। যারা ইসলামকে নিজেদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে নিয়েছে তারা ভালো করেই জানেন যে, এগুলো আসলে ময়ূরপুচ্ছধারণকারী দাঁড়কাক। এ পরিচয় তারা কোনোকালেই বিস্মৃত হবে না, তারা এত নির্বোধ নয়। প্রমাণ দিচ্ছি। যারা চৌধুরী সাহেব বা তসলিমা নাসরিনের পর্যায়ে যেতে পারেন না, অর্থাৎ সাধারণ মুসলিম নাগরিকগণ তারা সেই দেশগুলোর অধিবাসীদের মূলধারার সঙ্গে মিডিয়ার সৃষ্ট ইসলামভীতির (Islamophobia) দরুন সারাজীবন কাটিয়েও মিশতে পারেন না। তাদেরকে সব সময়ই বর্ণবাদী প্রথানুযায়ী পতিত, নিম্নবর্গের ব্রাত্যজন (Outcast) করে রাখা হয়। এই হতাশা থেকেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে বহু মুসলিম বংশোদ্ভূত মানুষ জঙ্গিবাদের দিকে পা বাড়াচ্ছে বলে বহু প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তাদের মতো এমন প্রথিতযশা চিন্তাশীলরা যে মাঝে মধ্যে নিরাপদ দূরত্বে বসে কিছুদিন পর পর একেকটি ধর্মবিদ্বেষী মন্তব্য করেন, তারা কি এটা ভাবেন না যে, এর পরিণামে সৃষ্টি হতে পারে বিরাট অসন্তোষ, বিক্ষোভ, দাঙ্গা হাঙ্গামা, হতে পারে হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও ইত্যাদি? তাদের ভাষায় এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা যতই ধর্মান্ধ, অশিক্ষিত, কূপমণ্ডূক হোক, এদের ধর্মবিশ্বাস যে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ফ্যাক্টর এ কথা থিংক-ট্যাংকরা ভুলে যান কীভাবে? তিনি অসচেতনভাবে এ কথা বলেন নি, কারণ তার বক্তব্যে লতিফ সিদ্দিকির প্রসঙ্গও এসেছে। তিনি বলেছেন যে, লতিফ সিদ্দিকীর মন্তব্য নিয়ে জাতির মধ্যে বিরাজিত ক্ষোভ এখনো প্রশমিত হয় নি। তথাপিও তিনি এমন মন্তব্য করলেন। তিনি কি একবারও চিন্তা করে দেখেছেন যে, যে কোনো রাজনীতিক বা ধর্মীয় বিক্ষোভ, সহিংসতা সামাল দিতে গিয়ে সরকারের কী পরিমাণ অর্থ, সময় নষ্ট করতে হয়? দেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়? সাধারণ মানুষের কী প্রচণ্ড ভোগান্তিতে পড়তে হয়? এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুগত একজন বুদ্ধিজীবী। সুতরাং তার এই উক্তি তার নেত্রীকে কতটুকু চিন্তিত ও বিচলিত করে তুলেছে সেটা তিনি জেনে নিতে পারেন।
এই কথিত মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবীরা অনেক জ্ঞানী-গুণী সন্দেহ নেই, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাদের এই জ্ঞানকে তারা মানুষের কল্যাণে না অকল্যাণে ব্যবহার করছেন? তাদের কথায় কি মানবজাতি শান্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে নাকি অশান্তির বিষবাষ্প ঘনিয়ে উঠছে তা পাঠক-সমাজই বিবেচনা করবেন।

৪ thoughts on “আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে: উদ্দেশ্য যখন ময়ূরপুচ্ছধারণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *