নারী শিশু ও নির্যাতন : একটি অন্ধকার রাষ্ট্রের হাতছানি!

বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই ঘৃর্ণ্য অপরাধের সূচনা হয় এরং পরে তা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। ধারনা করা হয় মানুষ গুহায় বসবাস করা ছেড়ে দেয়ার পর থেকেই নারীদের উপর নির্যাতন করা শুরু হয়। গুহায় দলবদ্ধভাবে থাকতে হতো বলেই হয়তো তাদের মনযোগটা কেবল প্রাণী শিকারের উপরেই ছিলো!

বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই ঘৃর্ণ্য অপরাধের সূচনা হয় এরং পরে তা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। ধারনা করা হয় মানুষ গুহায় বসবাস করা ছেড়ে দেয়ার পর থেকেই নারীদের উপর নির্যাতন করা শুরু হয়। গুহায় দলবদ্ধভাবে থাকতে হতো বলেই হয়তো তাদের মনযোগটা কেবল প্রাণী শিকারের উপরেই ছিলো!
সম্পূর্ণ নারী সমাজকেই হীন করে দেখা হয়েছে, দূর্বল ভাবা হয়েছে, পুরুষ নির্ভর ভাবা হয়েছে, কন্যাশিশুকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে, নারী বলিদান হয়েছে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা-অর্চনায়, মৃত স্বামীর সাথে তার জীবিত স্ত্রীকেও একসঙ্গে চিতায় পুড়ানো হয়েছে সনাতন ধর্মের সতীদাহ প্রথার সুকল্যানে! যা এখনো চলছে পুরো উদ্দোমে এই তথাকথিত আমাদের এই সভ্য সমাজেও। তবে হ্যাঁ, এখন আর সতীদাহ নেই, তবে শত শত সতীদের মন দাহ্য হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এখন আর কন্যাশিশুকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হয় না তবে তাদের প্রতি অবহেলার, অসমযতার কিংবা অবমূল্যায়নের কোন কমতি চোখ পড়ে না! এখন দেব-দেবীর পূজায় মেয়েদের আর বলি না দিলেও, নিজের ইচ্ছে আর সত্ত্বার বিরোদ্ধে নারীদের সারাজীবন বলি দিতে হয় শুধুমাত্র পিতা-মাতার ইচ্ছে পূরন করতে!

আর এখন দিন পাল্টেছে, সাথে সাথে মানুষের মন-মানসিকতা এবং রুচিতেও এসেছে অকল্পনীয় পরিবর্তন।
আমরা এখন বন-জঙ্গল ছেড়ে আধুনিক সভ্যতায় এসে পৌঁছেছি, মনন, রুচি, আচার-আচরন সবকিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে, অধিকাংশই পরিবর্তিত হয়েছে। শুধুমাত্র দুঃখজনকভাবে আমাদর ভেতরটা এখনো আদিই রয়ে গেছে। আমাদের শিকড় ঋনাত্নক পরিবর্তনের কোন স্পর্শই পায়নি এখনো। আদিম বন্য অনেক কিছুই রয়ে গেছে আমাদের মাঝে।

যখন ক্রীতদাস প্রথার আরম্ভ হয়েছিলো তখন শুধুমাত্র একটি শ্রেণীর মানুষ পুরুষ এবং নারী উভয়কেই ব্যবহার করেছে, অবর্ননীয় অত্যাচারের কথাতো সবারই জানা।
যদিও কারো ইচ্ছার বিরোদ্ধে বলপূর্বক কোন কাজ করনো কিংবা অত্যাচার করা সবর্দাই মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তবুও আজো আমাদের সমাজে চলছে এই অত্যাচার চাক্ষুসে অথবা অন্তরালে। নারীদের সর্বদাই অবমূল্যায়নের শিকার হতে হয়েছে। সাধারনত একজন নারী কখনোই একজন পুরুষের সমান সুযোগ পায় না। বৈষম্য থাকবেই।
একই কাজের পারিশ্রমিক লিঙ্গভেদে ভিন্ন রকম। যদি একটি কাজ একজন পুরুষ ৫০০ টাকার বিনিময়ে করে তাহলে একজন নারী একই কাজ এবং একই পরিমান পরিশ্রম করে বিনিময়ে পায় পুরুষের অর্ধেক বা তারচেয়েও কম!

আমরা যতই আধুনিক হচ্ছি, এই পার্থক্যটা ক্রমেই বেড়ে চলছে। যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, মানষিক ও শারীরিক নির্যাতন, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষন এমনকি ধর্ষনের পর খুন করে ফেলে রাখা হচ্ছে যত্রতত্র। দেখার যেন কেউ নেই। অবশ্য আমি, আমরা, সমাজ, সরকার কিংবা রাষ্ট কোনটাকেই আমরা দায়মুক্ত বলা যায় না। আমরা সকলেই এর জন্য দায়ী তবে সুস্পষ্টভাবে আমরা পুরুষরাই এর জন্য একটু বেশী দায়ী।
দিনকয়েক আগেও ঢাকায় ভারতের ন্যয় চলন্ত গাড়ীতে গনধর্ষন করে রাস্তার পাশে ফেলে যায় ধর্ষিতাকে। উদ্ধার হয় দুইদিন পর। সদ্য ধর্ষণের অমানবিক শিকার হয় পাহাড়ী বাঙ্গালী যাদের আমরা উপজাতি এমনকি কখনো কখনো আমরা নৃজনগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করি!
নারী সম্প্রদায় আজ কোথায় নিরাপদ কেউ বলতে পারেন? প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী হতে শুরু করে স্কুল, কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও এই অকথ্য নির্যাতনের বাইরে নয়। এমনকি সবচেয়ে উদ্বেগজনক ইস্যু হলো এখন কেবল রাস্তার বখাটেরাই এতে লিপ্ত নয়, পাশাপাশি আমাদের পিতৃতূল্য শিক্ষক নামক অমানুষরাও এতে লিপ্ত হচ্ছে চক্রবৃদ্ধি হারে যা সমগ্র জাতীর জন্য ন্যক্কারজনক এবং অগ্রহনযোগ্য!

এইতো পহেলা বৈশাখে বর্ষবরন অনুষ্ঠানে যৌন নির্যাতন ও শারীরিকভাবে আক্রমনের শিকার হন। অনেক সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, মিছিল এমনকি কনসার্টও হয়েছে। কিন্তু লাভ? কিছুই না। পুলিশের দ্বায়িত্বে অবহেলা ছিলো তা পাগলেও বুঝতে পারে। সিসিটিভি দ্বারা মনিটর করা হলেও ঘটনার সময় তারা ছিলো অটল, অবিচল! কে জানে হয়তো তারা উপভোগ করছিলো! সন্ধেহভাজন ছাড়া জড়িতো কাউকে গ্রেফতার তরে আইনের আওতায় আনতে আমাদের প্রশাসন সম্পূর্নরূপে ব্যার্থ!

জাতিংসংঘের একটি ফিল্ড রিসার্স অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রামের ও শহরের পুরুষরা জোরপূর্বক ধর্ষণে লিপ্ত হয়েছে যার পরসেন্টটেজ যথাক্রমে ১৪.১্র% এবং ৯.৫%! বিগত বছরে ধর্ষণ করেছেন গ্রাম ও শহরের পুরুষরা যথাক্রমে ২.৫%
এবং ০.৫%। তাদের মাঝে ৪৭.৩% গড়ে ৩.৭ টি ধর্ষণ করেছেন। আরো শঙ্কার বিষয় হলো তাদের ৪০ ভাগই ধর্ষণ করেছেন কৈশোর কালে অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগেই! ৬১.২% মানুষ মনে কেন তারা কোন ভুল করেন নি এবং অনুতপ্ত নয়।
একটুতো ধারনা পাওয়া গেলো। এবার আপনার চোখ দুটো দুমিনিটের জন্য বন্ধ করুন আর একটু ভাবুন দেশের কি অবস্থা!

থাক, তো ভেবে লাভ হবে না কোন। আমরা যারা পুরুষ তাদেরও লজ্জার বিষয় এটি। আমাদের ই তো এগিয়ে আসা উচিত এই নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরোদ্ধে, তাই নয় কি? এখন নাম মনে করতে পারছি না কে যেন বলেছিলেন, পৃথীবিটা
খারাপ মানুষদের জন্য ধ্বংস হবে না, ভালো হয়েও যারা নীরব থাকে, সহ্য করে বা প্রতিবাদ করেনা তাদের জন্যই হবে! এবং হচ্ছেও তাই। আমরা আরেকটা ভুল করি সেটি হলো গুটিকয়েক অপরাধীদের জন্য সম্পূর্ন একটি লিঙ্গের মানুষকে জেনারালাইজড করছি। অপরাধী তো অপরাধীই! সোজা কথায় আমি বলতে চাচ্ছি, কিছু সংখ্যক পুরুষ অপরাধীদের জন্য সমগ্র পরুষ জাতীকে দোষারোপ করা আসলে ঠিক না!

প্রসঙ্গ যৌতুক! নারী নির্যাতনের অন্যতম একটি মনবিকতা বিবর্জিত অস্ত্র হলো যৌতুক। ২০১৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ এই তিন মাসে ১৫ জন নারী শারিরীকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ৪০ জন নারী যৌতুকের জন্য জীবন দিয়েছেন, ৩জন আত্নহত্যা করেছেন এবং ৪০টি মামলা
দায়ের হয়েছে যার ৩মাত্র মামলার তদন্ত হলেও বাকি ৩৭টি মামলার ফাইলে নিশ্টই ধূলো জমে গিয়েছে ইতিমধ্যে!
জানুয়ারি-মার্চ,২০১৫ এই তিন মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১২৩ টি যাদের মধ্য ২১জন ধর্ষিতার বয়স ৭-১২ এবং ৭জন ভিক্টিমের বয়স ৬ কিংবা তারও কম! এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ১৫ জন!

যে হারে নারী নির্যাতনের সংখ্যা বাড়ছে তাতে আমাদের আর বসে বসে দেখা আর উপভোগ করার অবকাশ নেই। আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে, কারনগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং নারী নির্যাতনের হার কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। আর পুরুষ পুলিশের দ্বারা ঘর্ষণের শিকার হচ্ছে আরেক নারী পুলিশ। আমাদের পুলিশ(জনগনের বন্ধু!) অনেক প্রশ্নবানে জর্জরিত। তদন্ত চলছে, ২৪ ঘন্টায় অপরাধী গ্রেফতার করা হবে, বিষয়টি আমরা শুনেছি এবংখতিয়ে দেখছি এই কথামালা ছাড়া আর তেমন কিছুই প্রত্যাশা করা যায় না। আর এখানেও যদি তাদের সদস্যই নির্যাতন, ধষর্নের শিকার হন তাহলে তো সর্ষের মাঝেই ভূত থেকে যায়।
আমাদের মূল্যবোধ, মানষিকতা এবং চিন্তায় পরিবর্তন আনতে হবে। নারীদেরকে নারী না ভেবে আমাদের সহযাত্রী এবং বিশেষ করে মানুষ হিসেবেই ভাবতে শিখতে হবে। নারীদের প্রাপ্য সকল অধিকার আমদেরকেই নিশ্চত করতে হবে। সম্মান করতে হবে, বৈষম্য দূর করতে হবে।

বসে বসে দেখতে থাকলে ধর্ষণের তালিকায় ভারতের পাশে আসতে বেশী সময় লাগবেনা। ভারতের জনপ্রিয় দৈনিক দ্যা টাইমস্ অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধুমাত্র ধর্ষন ও নারী নির্যাতনের কারনে বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা ১৭% হ্রাস পেয়েছে যা ভারতের পর্যটন খাতে বিরাট ক্ষতি করছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিদেশী পর্যটক তো দূরের কথা, আমরা আমাদের ঘরের নারীদেরকেও নির্যাতনের থাবা থেকে রক্ষা করতে পারছি না।
৩।
আর যারা এর পেছনে নারীদের পোশাক কিংবা অঙ্গসজ্জাকে কারন হিসেবে উল্লখ করেন তদের জন্য আমার সুস্পষ্ট কথা, চিকিৎসা করান, হ্যাঁ আপনার। মানষিক ভারসাম্যহীনদের মধ্যে আপনি নিজেও একজন!
আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথাও আমাদেকে ভাবতে হবে এবং এখনি!
আমাদের দেখেই তারা শিক্ষা নেবে, আমাদেরকে অনুসরন করবে। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন।

আরেকটি কথা না বললেই নয়। আজ নারীরা কিছুটা হলেও তাদের অধিকার বলেন আর সমঅধিকার যাই বলেন, তারা কিছুটা হলেও সেচ্চার ও সচেতন হয়েছেন। অবশ্যই আমি এর প্রশংসা করি তবে তাদেরও মনে রাখতে হবে যে, তারা যেন এই অধিকারের কোন অপব্যবহার না করেন।

বন্ধ হোক নির্যাতন, বন্ধ হোক প্রতিযোগিতা,
চলো হাতে হাত রাখি আর দূর করি সকল প্রতিবন্ধকতা!

শেষ কথা হলো, আমাদের মনে রাখতে হবে সেই ঐতিহাসিক দুটো লাইন,
“পৃথিবীতে যাকিছু মঙ্গলময় আর কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর…!”

২ thoughts on “নারী শিশু ও নির্যাতন : একটি অন্ধকার রাষ্ট্রের হাতছানি!

  1. আসলেই….কবে এর নিস্তার হবে
    আসলেই….কবে এর নিস্তার হবে জানা নেই, অনেক সুন্দর পোস্ট লিখেছেন। ধন্যবাদ আপনাকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *