অরণ্যের দিনরাত্রি # ১০ম পর্ব # হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান @ কক্সবাজার

অরণ্যের দিনরাত্রি সিরিজের নবম পর্ব লিখেছিলাম প্রায় দেড় বছর আগে। এর মাঝে যে অরণ্যে ভ্রমণ হয় নি তা নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভ্রমণ হয়েছে কিন্তু ছবি তোলা হয় নি। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছবি তোলা হয়েছে কিন্তু লেখালেখি করবার মুড আসে নি। এইবার মুড আসতেই ঝটপট ভ্রমণ কাহিনীটা লিখে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। বলা তো যায় না মুড আবার কখন চলে যায়।


অরণ্যের দিনরাত্রি সিরিজের নবম পর্ব লিখেছিলাম প্রায় দেড় বছর আগে। এর মাঝে যে অরণ্যে ভ্রমণ হয় নি তা নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভ্রমণ হয়েছে কিন্তু ছবি তোলা হয় নি। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছবি তোলা হয়েছে কিন্তু লেখালেখি করবার মুড আসে নি। এইবার মুড আসতেই ঝটপট ভ্রমণ কাহিনীটা লিখে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। বলা তো যায় না মুড আবার কখন চলে যায়।

হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের অবস্থান কক্সবাজার জেলার হিমছড়িতে। উদ্যানটি ১৯৮০ সালে কক্সবাজার শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে ১৭২৯ হেক্টর (১৭.২৯ বর্গ কিলোমিটার) জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। হিমছড়ির একপাশে রয়েছে সুবিস্তৃত সমুদ্র সৈকত আর অন্যপাশে রয়েছে সবুজ পাহাড়ের সারি যা বাংলাদেশের অন্যান্য জাতীয় উদ্যান থেকে এটিকে অনন্য করেছে।

হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান মূলত চিরসবুজ ও প্রায় চিরসবুজ ক্রান্তীয় বৃক্ষের বনাঞ্চল। এই বনাঞ্চলে মোট ১১৭ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে যার মধ্যে ৫৮ প্রজাতির বৃক্ষ, ১৫ প্রজাতির গুল্ম , ৪ প্রজাতির তৃণ, ১৯ প্রজাতির লতা এবং ২১ প্রজাতির ভেষজ গাছ রয়েছে। এই বনকে হাতির আবাসস্থল হিসেবে মনে করা হয় এবং হাতির পাশাপাশি এখানে মায়া হরিণ, বন্য শুকর ও বানরও দেখতে পাওয়া যায়। এ ছাড়া হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের প্রাণী সম্ভারে রয়েছে ৫৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৬ প্রজাতির উভচর এবং ময়না, ফিঙ্গে ও তাল বাতাসিসহ প্রায় ২৮৬ প্রজাতির পাখি।

আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সবথেকে সুন্দর রাস্তা হচ্ছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। একপাশে সমুদ্র এবং অন্যপাশে পাহাড় বেষ্টিত এই রাস্তায় ভ্রমণের অনুভূতি একদমই স্বর্গীয়। যদিও রাস্তাটি গণপরিবহনের জন্য এখনও পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় নি, তবে সিএনজি কিংবা অটোরিকশা হরদমই চলছে। জুন মাসের এক বিকেলবেলায় এমনই এক অটোরিকশা নিয়ে রওনা দিলাম হিমছড়ির উদ্দেশ্যে।

হিমছড়ি পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগবে না। রাস্তার পাশে নামলেই হিমছড়ির বিখ্যাত ঝর্নার ছবি সম্বলিত সাইনবোর্ড চোখে পড়বে। এই ছবি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে যাবেন না যেন। কেন, সেটা পরে বলছি।

মিনিটখানেক দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই অনেকগুলো বাচ্চা ছেলে আপনাকে ঘিরে ধরবে। উদ্দেশ্য আপনার গাইড হওয়া এবং ছবি তুলে দেওয়ার বিনিময়ে কিছু অর্থ উপার্জন। গাইড হিসাবে তাদের চাহিদা খুবই সামান্য। আমি ক্লাস টু তে পড়ুয়া রাশেদ নামের এক পিচ্চিকে গাইড হিসাবে সাথে নিলাম। চার্জ মাত্র ৫০ টাকা। ২০ টাকা প্রবেশ ফি দিয়ে রাশেদকে সাথে নিয়ে উদ্যানে প্রবেশ করলাম। আমাদের প্রথম গন্তব্য হিমছড়ির বিখ্যাত বড় ঝর্ণা। ঝর্ণায় যাবার রাস্তাটা কিন্তু চমৎকার।

পথে চমৎকার একটা সেতু পড়বে। এখানে দাঁড়িয়ে একটু ফটোসেশন করাই যায়।

যা বলছিলাম, রাস্তার পাশে ঝর্ণার ছবি দেখে যদি আপনি আবেগে আপ্লুত হয়ে থাকেন; তাহলে বাস্তবে ঝর্ণার অবস্থা দেখে নিশ্চিত বিশাল ধাক্কা খাবেন। ছবি নাকি কথা বলে। আসলেও কি তাই?

ঝর্ণা নাকি আগে ছবির মতই ছিল। কয়েক বছর আগে পাহাড় ধ্বসে ঝর্ণার উৎস এবং গতিপথ দুটোই বদলে যাওয়াতেই এই দুরবস্থা। অবশ্য বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বেশ বাড়ে। মূল উদ্যানের সৌন্দর্য দেখতে হলে আপনাকে পাহাড়ে চড়তে হবে। পাহাড়ে উঠবার জন্য সিঁড়িও আছে, পায়ে চলা পথও আছে। আপনার যেটা পছন্দ।

যতই উপরে উঠবেন প্রকৃতির সৌন্দর্য ততই আপনার সামনে প্রস্ফুটিত হবে। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা বসার জায়গাগুলো অসাধারণ। এর ভিতরে বসে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দারুণ লাগে।

এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার জন্য আছে ইটের রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আপনি পাহাড়ের এক প্রান্তে পৌঁছে যাবেন।

চলার পথে ক্ষণে ক্ষণে থেমে নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার পাশাপাশি মুগ্ধ নয়নে চারপাশের সবুজ প্রকৃতি অবলোকন করতে পারবেন।

পাহাড়ের গভীরে প্রবেশ করবার খায়েশ জাগল মনে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার পায়ে হাঁটা পথ আছে। এমন একটা পথ ধরেই এগিয়ে চললাম। মূল উদ্যান থেকে বের হওয়ার একটা বিকল্প পথ আছে। একটা পাহাড় এবং জঙ্গল পাড়ি দিয়ে স্থানীয় আর্মি ক্যাম্পের পাশ দিয়ে বের হতে হয়। ইচ্ছে ছিল সেই পথেই ফিরব। কিন্তু আমার পিচ্চি গাইড বাঁধা দিল। কারণ এই জঙ্গলে মাঝে মাঝেই বুনো হাতির আগমন ঘটে। তাদের সাথে দেখা হওয়া যে সুখকর কোন বিষয় হবে না সেটা তো জানা কথা। আরেকটা কারণ হচ্ছে সন্ধ্যা হতে খুব একটা বাকি ছিল না। সন্ধ্যায় পাহাড়ে ছিনতাইকারীদের হাতে আটকা পড়বার সম্ভাবনা আছে। অতএব ঝুঁকি না নিয়ে জঙ্গলে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করেই আঁশ মেটালাম। ভবিষ্যতে ঐ বিকল্প রাস্তা দিয়ে পাহাড় পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছে জমা রাখলাম মনের গহীনে।

ওহ, আমার গাইডের সাথে তো আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল না। কখনও হিমছড়ি ঘুরতে গেলে ওর নাম বললেই সবাই দেখিয়ে দিবে।

ইট বিছানো রাস্তার শেষ মাথায় পাহাড়ের চূড়ায় একটা ছোট্ট ওয়াচ টাওয়ার আছে। আরও আছে একটা ক্যাফে। ক্যাফেটা বন্ধ ছিল এবং ক্যাফের চারধারে কয়েকটা বিকল্প ক্যাফেও ছিল। ক্যাফের ছাদে উঠে নিচে তাকাতে দারুণ লাগে। আরেব্বাহ, এ তো দেখছি অনেক উপরে উঠে গেছি। হিমছড়ি বাজারটাকে অনেক ছোট দেখাচ্ছিল।

সবথেকে চমৎকার দৃশ্য এই জায়গা থেকেই দেখা যায়। পাহাড় এবং অরণ্যের এমন দ্বৈত যুগলবন্দী আপনাকে সত্যিই মুগ্ধ করবে।

পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে তাড়াতাড়ি। হিমছড়িও এর ব্যাতিক্রম নয়। পাহাড় চূড়া থেকে সূর্যটাকে টুপ করে সমুদ্রে ডুবে যেতে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, Life is really beautiful.

৯ম পর্ব # রামসাগর জাতীয় উদ্যান @ দিনাজপুর

৮ম পর্ব # রেমা–কালেঙ্গা বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, হবিগঞ্জ

৭ম পর্ব # মাধবকুণ্ড ইকো পার্ক, মৌলভীবাজার

৬ষ্ঠ পর্ব # লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মৌলভীবাজার

৫ম পর্ব # সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, হবিগঞ্জ

৪র্থ পর্ব # যমুনা ইকো পার্ক, সিরাজগঞ্জ

৩য় পর্ব # রাতারগুল জলাভূমির বন, সিলেট

২য় পর্ব # দুলাহাজরা সাফারি পার্ক, কক্সবাজার

১ম পর্ব # বর্ষীজোড়া ইকো পার্ক, মৌলভীবাজার

২ thoughts on “অরণ্যের দিনরাত্রি # ১০ম পর্ব # হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান @ কক্সবাজার

  1. হিমছড়ি অনেক আগে গেছিলাম।
    হিমছড়ি অনেক আগে গেছিলাম। প্রকৃতির বৈচিত্রতার কারণে ঐখানে থেকে যেতে ইচ্ছে করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *