‘সমাজের অবক্ষয় হলে কেউ ভালো থাকার কথা নয়’ | ড. মীজানূর রহমান শেলী

সায়েম সাবু : রাষ্ট্র, সমাজ যাচ্ছে কোথায়?

সায়েম সাবু : রাষ্ট্র, সমাজ যাচ্ছে কোথায়?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : সমাজ ক্রমাগত বদলায়। সমাজের বিবর্তন ঘটিয়েই আজকের এই অবস্থায়। আমাদের সমাজও বদলাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই বদলানোটা সঠিক প্রক্রিয়ায় ঘটছে কি না? আমাদের সমাজ বিবর্তন উন্নয়নের পথে ঘটছে কি না? অর্থনৈতিক উন্নয়নই সমাজ পরিবর্তনের একমাত্র সূচক নয়। আমাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ পরিশীলিত হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে।

সায়েম সাবু : এসব সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কী?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : রাজনীতিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সেই রাজনীতি নিয়েই মানুষ উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত। এমন পরিস্থিতি প্রলম্বিত হোক, তা কেউ চান না।

সায়েম সাবু : এখন তো স্থির অবস্থাই আছে। রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : এই রাজনীতিকে কোনোভাবেই স্থিতিশীল বলা যায় না। ’৯০-এর আন্দোলন ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসা আমাদের রাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন ছিল। নির্বাচনের মধ্যদিয়ে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। সভ্য সমাজে তা-ই হয়। কিন্তু আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রবেশ করেছি বটে, কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে স্বৈর মনোবৃত্তি রয়েই গেছে।

সায়েম সাবু : রাজনীতির অবনতি হলো কেন? ২০১৫ সালে এসে আমরা এভাবে ঠেকছি কেন?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : রাজনীতির রক্ষাকবচ ধ্বংস করা হয়েছে খুব কৌশলে। এবং এই কাজটি করার জন্য সবাই প্রতিযোগিতা করেছে। যে শর্তগুলো রাজনীতিকে পরিশীলিত করে তার কোনোটিই মানা হয়নি।

সায়েম সাবু : বাধ্য হয়েই মুক্তিযুদ্ধ। ঠেকে গিয়েই ’৯০-এর আন্দোলন। তার মানে বাঙালিও বাঙালিকে শাসন করতে পারছে না?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : আমি ঠিক সেভাবে বলব না। বাঙালি একাত্তরে ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। কিন্তু যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, তা পূরণ হয়নি। এখানেই মূল সমস্যা। উন্নয়ন আর গণতন্ত্র আমরা একই পথে রাখতে পারিনি।

সায়েম সাবু : গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন সব সময় কি একই রাস্তায় রাখা জরুরি?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : অবশ্যই জরুরি। টেকসই উন্নয়ন করতে হলে আপনি গণতন্ত্রকে কোনোভাবেই আলাদা করে রাখতে পারবেন না। টেকসই যে হয়নি, তা এখনই বোঝা গেছে। এবার প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করছেন। বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিদেশিরা আসছে না। যে দেশ গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করে উন্নয়নের কথা বলেছে, সে দেশই এক সময় ভেঙে পড়েছে। ইতিহাস তার সাক্ষী।

সায়েম সাবু : সিঙ্গারপুর, মালয়েশিয়া তো এ পথেই উন্নয়ন করেছে। বর্তমান সরকারের কেউ কেউ এমন উদাহরণ সামনে আনছেন।
ড. মীজানূর রহমান শেলী : সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে উন্নয়ন করেনি। তারা এমন কোনো আইন করেনি যে, গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারা নির্বাচন করেছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একই ব্যক্তি বারবার ক্ষমতায় এসেছেন। জনগণের সমর্থন নিয়েই তারা উন্নয়ন করেছেন। এখানে তা নয়। সরকার করে দেখাক যে, তাদের বিরোধী সবাইকে পিটিয়ে দমন করা হবে। পারলে ভিন্নমতাবলম্বীদের দেশ থেকে বের করে দিক।

সায়েম সাবু : সরকার তো নিয়ন্ত্রণ করছেও বটে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : সরকার এখনও নির্বাচনকে অস্বীকার করছে না। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যদিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে ঠিক, কিন্তু আইনের বড় কোনো পরিবর্তন করেনি। মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আছে। সরকার ভালো বুঝবে এই অনিশ্চয়তা কীভাবে দূর করতে হবে।

সায়েম সাবু : সরকার ভালো কাজের মধ্যদিয়ে এই অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে কি না?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : খারাপ পথে কোনো কিছু অর্জন করলে তাকে খারাপই বলতে হয়। খারাপ পথে খুব ভালো কাজ করা যায় না। আপনি অবৈধ পথে উপার্জন করে মসজিদ, মন্দিরে দান করলে কোনো লাভ হবে না। একইভাবে এই পথে ক্ষমতা ধরে রেখে আপনি মানুষের মন জয় করতে পারবেন না। সরকারের ক্ষমতা, কর্মকা- নিয়ে জনমনে কোনো প্রশ্ন থাকলে তার জবাব সরকারকেই দিতে হবে। তারাই এই অনিশ্চয়তা দূর করবে।
সরকার যদি মনে করে যে, বিরোধী দল এসব সংশয় তৈরি করছে তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে সরকার সে সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে কেন?

সায়েম সাবু : টেকসই হয় না জেনেও সরকারগুলো এ পথেই হাঁটে কেন?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : ক্ষমতার মোহ থেকেই সরকারগুলো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। ক্ষমতার বাইরে যারা যায় তারাই ইতিহাসের শিক্ষা টের পায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে যারা ক্ষমতায় থাকে তারা আমলে নিতে চায় না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আবার জনগণের সামনে যেতে ভয় পাওয়ার অর্থই হচ্ছে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। জনকল্যাণে কাজ করলে তো জনগণের ভোটকে ভয় পাওয়ার কথা নয়।
জনগণের মতামতকে আপনি আরেকটি মতামত দিয়ে যাচাই করতে পারেন। তাদের সঙ্গে তর্ক করতে পারেন। জনমতকে একেবারে চাপা দিতে পারেন না। সংবাদমাধ্যম কিছু করতে না পারলে, মানুষ সভা-সমাবেশ করতে না পারলে তখন গুজবের রাজত্ব তৈরি হয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহ না থাকলে মানুষ গুজবে বিশ্বাসী হয়। এটি সমাজের জন্য মারাত্মক বিপর্যয়।

সায়েম সাবু : বাংলাদেশ শুরু থেকেই এমন বিপর্যয়ে। রাষ্ট্র গঠনে কোনো ত্রুটি আছে কি না?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : রাষ্ট্র গঠনে ত্রুটি না থাকলেও প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকে। এমন ত্রুটি সারা দুনিয়াজুড়েই। ব্রিটিনের আজকের অবস্থায় আসতে ছয়শ বছর লেগেছে। রাজার হাতে বা একনায়কের হাতে রাষ্ট্রটিও একটি রাষ্ট্র। প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রটি চলছে কীভাবে।
বাংলাদেশের সৃষ্টি একটি গণতান্ত্রিক উচ্চ আকাঙ্ক্ষার মধ্যদিয়ে। ব্রিটিশ আমলেও জনপ্রতিনিধিরা গণতন্ত্রকে সম্মান করেছে। ভারত সেই সম্মান কিছুটা হলেও অক্ষুণ্ন রেখেছে। কিন্তু সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠন করেও আমরা গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারছি না। বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবই গণতন্ত্রের পথ থেকে ছিটকে পড়ছে। এর জন্য রাষ্ট্র গঠনের ত্রুটি দায়ী করা যায় না, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারাই মূলত দায়ী।
আপনি আদর্শের কথা বলে জনমতকে দমিয়ে কোনো কিছু প্রতিষ্ঠা দিতে পারবেন না। সে আদর্শ ধর্মই হোক আর জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই হোক। চাপিয়ে দেয়া মতবাদ মানুষ বেশি দিন ধরে রাখতে চায় না।

সায়েম সাবু : সমাজের এখনকার পরিবর্তন কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : রাজনীতি ভঙ্গুর হলে, দিকভ্রান্ত হলে সমাজও দিকভ্রান্ত হয়। রাজনীতির কারণে সমাজের চরম অবক্ষয় ঘটছে। তরুণ সমাজ রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত। তারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজের পরিবর্তন দেখতে চায়। সারা দুনিয়া একটি গ্রামের মতো হয়ে গেছে। এমন নষ্ট রাজনীতির কারণে তরুণরা হতাশ। জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকরা পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে, তরুণরা নয়। এ কারণে রাজনীতিকদের মিঠা কথায় তরুণরা বিশ্বাস রাখতে পারে না। তারা পরিবর্তন দেখতে চায় ইতিবাচকভাবে।

সায়েম সাবু : তরুণরাও তো গা ভাসিয়ে চলছে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : আপনি দুই মাস বা পাঁচ বছরের মধ্যকার পরিবর্তনের কথা বলছেন। কিন্তু সমাজ পরিবর্তন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তরুণরা আজ হতাশ, কাল যে সেই হতাশা কাটিয়ে উঠবে না তা বুঝবেন কেমন করে? প্রতারণা, ঠগবাজ রাজনীতির বিরুদ্ধে তরুণরা জাগবেই। যুগে যুগে তাই হয়েছে। বিপ্লব, পরিবর্তন কখন এসে যায়, তা সময় ধরে বলা মুশকিল।

সায়েম সাবু : এখনও তরুণরা জাগছে না। মানুষ দ্বি-দলীয় জোটের রাজনীতিতেই আস্থা রাখছে। তাহলে কি দেয়ালে পিঠ ঠেকানোর জন্য আরও পোড় খাওয়া দরকার, নাকি মানুষের গা সওয়া অবস্থা দাঁড়িয়েছে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : আপনি আরব বসন্তের কথা চিন্তা করেন। কেউ ভেবেছিল, সেখানে এমন পরিবর্তন আসবে এবং তা এই সময়ের মধ্যেই। ৪০ বছর, ৩০ বছর একনায়কতন্ত্র কায়েম করে রেখেছিল আরবের দেশগুলো। গণতন্ত্রের কথা কেউ বলতে পারেনি। আরব বসন্তে সব ভেঙে গেছে। রক্তপাত হলেও সেখানে গণতন্ত্রের বাতাস বইছে। মানুষ একটি কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসছে।

সায়েম সাবু : এমন বসন্ত আমরা ’৭১-এ পার করে এসেছি। এখন কেন আরব বসন্তের দিকে তাকাতে হবে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতীয় ঐক্যের ডাক। পাকিস্তানিরা গণতন্ত্রকে চাপা দিতে চেয়েছিল। গণতন্ত্রের জন্যই বাঙালি জীবন দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বাঙালি সেই গণতন্ত্র ধরে রাখতে পারেনি।

সায়েম সাবু : তার মানে বাঙালির শাসন আর গণতন্ত্র একসঙ্গে যায় না?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : বাঙালির শাসনের সঙ্গে গণতন্ত্র মিশে আছে। মিশে আছে বলেই এই অঞ্চলে বারবার বিদ্রোহ হয়েছে, হাঙ্গামা হয়েছে। স্বৈরশাসন স্থায়ী হতে পারেনি। মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাঙালিরাই প্রথমে বিদ্রোহ করেছে। পাল আমলে, সেন আমলে বাঙালিই বাঙালিকে শাসন করেছে। শত শত বছর ধরে তারা নিজেদের সমাজ পরিবর্তনে শাসন করেছে, রাজনীতি করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।
বলতে পারেন, জাতীয় কাঠামো এবং চেতনাকে আমরা এক করে রাখতে পারিনি। একটি রাষ্ট্রের শুরুর দিকে অনেক সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। আমরা সেই সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে দিনকে দিন সমস্যা আরও বাড়িয়ে চলছি।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ’৯০-এর আন্দোলন বেশি দিন আগের ঘটনা নয়, অথচ দুটি রাজনৈতিক জোটই তা ভুলে আছে। গণতন্ত্রের আন্দোলনকারীদের হাতেই গণতন্ত্রের সর্বনাশ হয়েছে। একটি সমাজ দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। তাতে এই দুই জোটেরই অবদান ছিল। সেই কাঠামো ভেঙে ফেলা কারও জন্যই শুভকর হলো না। ইতিহাসের অমোঘ বিধান লঙ্ঘন করার সাধ্য কারও নয়। পরিণতি যা হবার তা-ই হবে। সমাজের অবক্ষয় হলে কেউ ভালো থাকার কথা নয়।

সায়েম সাবু : অবক্ষয় চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছেছে কি না? একজন নারীর সম্ভ্রমহানির পরিবর্তে আরেকজন নারী প্রতিবাদও করতে পারছে না। পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছে। এমন ঘটনাতেও আমরা রাস্তায় দাঁড়াই না…
ড. মীজানূর রহমান শেলী : সরকার বলছে, সব নিয়ন্ত্রণে আছে, আদৌও আছে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। পুলিশ, প্রশাসন এখন সরকারের নিয়ন্ত্রিত কি না, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। ওই মেয়েটির ওপর হামলার জন্য অবশ্যই সরকার নির্দেশ করেনি। তার মানে বুঝতে হবে সরকারের মধ্যে অন্য সরকার থাকতে পারে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার সমন্বয় সাধন করে একটি রাজনৈতিক সরকার। সেই সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি, জনমতের সমর্থন যদি দুর্বল হয়, তাহলে সমন্বয় কাঠামো ভেঙে পড়ে। এখন তা-ই হচ্ছে। সব ঘটনাই আপনি বিচ্ছিন্ন বলে চালিয়ে দিতে পারবেন না। এমন কয়টি ঘটনাকে আপনি বিচ্ছিন্ন বলে চালাবেন?

সায়েম সাবু : মানুষের প্রতিবাদের ভাষাটাও ভোঁতা হয়ে আসছে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : আমি তা মনে করি না। প্রতিবাদ করার অপেক্ষায় রয়েছে। ব্রিটিশদেরকেও বিদায় নিতে হয়েছে। পাকিস্তানকেও বিদায় নিতে হয়েছে। রাজনীতির দুই-চার মাস এমন বিপর্যয় দেখে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সায়েম সাবু : একের পর এক ব্লগার হত্যাকা- ঘটছে। নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসন দৃশ্যত ব্যর্থ?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : জননিরাপত্তায় রাষ্ট্র নিজেই উদাসীন। ব্লগারদের হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল অনেক আগে থেকেই। প্রশাসন আন্তরিক হলে কূল-কিনারা বের করা খুব কঠিন বলে মনে করছি না। একটি ঘটনারও রহস্য উদঘাটন হবে না, তা হতে পারে না। রাষ্ট্রের এমন নীরবতায় পুরো জাতিকেই হতাশ করেছে।
এখানে আরেকটি বিষয় আলোকপাত করা দরকার। ব্লগাররা কী লিখছে সেটা নিয়েও সংশয়, সন্দেহ আছে। সরকার এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করে আগেই সতর্ক বা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত। সরকারের সমালোচনা করে লেখালেখি করায় ব্যবস্থা নেয়া হয়, আর একটি ধর্মের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে কেউ যদি লেখালেখি করে এবং সরকার যদি তাতে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তখন জনমনে অসন্তোষ দেখা দেয়। হত্যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু হত্যাকারীদের সুযোগ তৈরিতে সমাজ, রাষ্ট্র কোনো সহায়তা করছে কি না, সেটাও আমলে নিতে হবে।

সায়েম সাবু : তাই বলে, একজন লিখবে আরেকজন মারবে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : মানুষের মন পরিবর্তিত হয়। কিন্তু কিছু জায়গায় সে পরিবর্তন মানতে পারে না। ধর্ম, আদর্শ এমনই একটি জায়গা।

সায়েম সাবু : আদর্শের বিরুদ্ধে আদর্শ দিয়ে লড়াই করতে হয়। রক্তপাতে সমাধান আসে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : রক্তপাতে কখনও সমাধান আসে না। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অপরদিকে বড় একটি ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলে যখন সরকার কিছু করে না, তখন মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা হারায়। মৌলবাদীরা এই সুযোগটিই কাজে লাগায়। আইনের ব্যবহারে পক্ষপাতিত্ব থাকলে এমনটি হবেই। দুর্বৃত্তকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে, তা পক্ষপাতিত্বের মধ্য দিয়ে নয়।

সায়েম সাবু : এমন অবস্থায় কোনো চরমপন্থার উত্থানের আভাস পাচ্ছেন কি না?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : সারা দুনিয়াতে এভাবেই চরমপন্থার উত্থান ঘটে। আপনি মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিলে তারা ভিন্ন শক্তির ওপর আস্থা রাখবে। বিকল্প না থাকলে চরম বিকল্প সামনে আসবেই। আপনি শক্তি দিয়ে তা মোকাবেলা করতে পারবেন না। আইএস-আল কায়েদা শক্তি দিয়ে ঠেকানো যায়নি। যাবেও না। আদর্শের লড়াই শক্তিতে হয় না।

সায়েম সাবু : বাংলাদেশ কি ডেঞ্জার জোনে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : আমি মনে করি না বাংলাদেশ ডেঞ্জার জোনে আছে। তবে সাবধান হওয়ার ব্যাপার আছে।

সায়েম সাবু : পাশের দেশও এখন ধর্মরাষ্ট্র। হেফাজতে ইসলামের শক্তি তো ভিন্ন কিছু প্রমাণ করে?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভিরু, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। এই কারণেই আমি মনে করি না, হেফাজতে ইসলাম রাজনীতিতে বিশেষ কিছু করতে পারবে।

সায়েম সাবু : রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে সম্মিলিতভাবে হামলা করা হয়েছে। এটি তো ধর্মান্ধতাই?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : সাধারণ মানুষ সেখানে হামলা করেনি। বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতারা ওই হামলায়র নেতৃত্ব দেন। বরং সাধারণ মানুষ ঠেকিয়েছে, বৌদ্ধদের আশ্রয় দিয়েছে। এটিই সাধারণের চরিত্র।

সায়েম সাবু : তার মানে, অশুভ শক্তি গুরুত্ব পাচ্ছে না?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : সাধারণ মানুষ এই শক্তিতে বিশ্বাস করে না। এখন কেউ যদি রাষ্ট্রের দুবর্লতা নিয়ে সাধারণদের প্রভাবিত করে তাহলে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। এটি সাধারণের দোষ নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজের দোষ।
এখন যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। ইরানের শাহ্রা এত শক্তিশালী হয়েছিল যে, নরমপন্থা, মধ্যপন্থা, জাতীয়তাবাদী সবাইকে কঠোরভাবে দমিয়ে রাখল। কোনো মতবাদ তারা সহ্য করতে পারেনি। এরপরই মৌলবাদের উত্থান ঘটে। তখন অনেক উদারপন্থিই মোল্লাদের সঙ্গে যোগ দিল। নরমপন্থাকে নির্মূল করলে চরমপন্থার উত্থান ঘটবেই। মিসরের দিকে তাকালেই সব স্পষ্ট হয়ে যায়। গায়ের জোরে টিকে থাকা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ গায়ের জোরে হয়নি।

সায়েম সাবু : নানা কারণেই ‘বাংলাদেশ’ এখন বিশ্ব দরবারে আলোচনার বিষয়। ভারতের কাছে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। এ নিয়ে কী বলবেন?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : ভারত যা করছে তার নিজের স্বার্থে। নিজের স্বার্থ না থাকলে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তেমনি চীন, আমেরিকা বাংলাদেশকে নিয়ে যা খেলতে চাইছে, তা তাদের স্বার্থেই। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশে বিশ্বে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চল বিশ্বের কাছে এখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া আমেরিকা এবং ভারতের নীতি অভিন্ন। আবার চীন যেকোনো মূল্যেই হোক এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ রাখবেই।

সায়েম সাবু : বিশ্ব রাজনীতির এমন নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থন কোথায়?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : আরেকটু সময় লাগবে পর্যবেক্ষণ করতে। সবে শুরু। তবে দেশের ভিতর থেকে বিশৃঙ্খলা না হলে বাইরে থেকে সহজে কিছু করতে পারবে বলে মনে করি না। যা হবে ভিতর থেকেই।

সায়েম সাবু : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বলবেন?
ড. মীজানূর রহমান শেলী : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এখন যে সমস্যা, তা সাময়িক। মানুষ ঘুরে দাঁড়াবেই।।

[একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজ বিশ্লেষক হিসেবেই ড. মীজানূর রহমান শেলী বেশি পরিচিত। সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিডিআরবি)-এর চেয়ারম্যান। জন্ম ১৯৪৩ সালে মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে বি এ (অনার্স) এবং ১৯৬৩ সালে এম এ (মাস্টার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৪ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেও ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি)-এর সদস্য হিসেবে চাকরি নেন। ১৯৯০ সালে মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন সময়ে। যুক্ত আছেন সাংবাদিকতার সঙ্গেও। লিখেছেন অসংখ্য বই। সম্প্রতি ‘সাপ্তাহিক’ ম্যগাজিনের জন্য সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি নিয়ে তার দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ পাই। সেটি এখানে সবার সঙ্গে শেয়ার করলাম।]

১ thought on “‘সমাজের অবক্ষয় হলে কেউ ভালো থাকার কথা নয়’ | ড. মীজানূর রহমান শেলী

  1. উনি সবই বলেছেন, কেবল একটা
    উনি সবই বলেছেন, কেবল একটা কথাই বাদ পড়েছে- বিএনপি-জামাতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেই সামাজিক, রাজনৈতিকসহ সবধরনের অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব। এই কথাটি বলতে অযথা কতগুলো বাক্য ব্যয় করলেন।
    ♥ মানুষ কিশের বিরুদ্ধে গুরে দাড়াবে সেটা ভাল বুঝলাম না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *