প্রবন্ধের সার্থকতা

প্রবন্ধ বলতে আমরা বাস্তবতা ও কাল্পনিকতার মিশেলে অনুভূত সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নাতিদীর্ঘ আলোচনার শিল্পপ্রকাশকে বুঝে থাকি। অর্থাৎ লেখক দৃশ্যমান জগতের বৈচিত্র্যে আমোদিত হয়ে ব্যাক্তিক চিন্তাধারার সমন্বয়ে মানুষের জীবনযাপন, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি ইত্যাদির অংশবিশেষকে আপন প্রকাশভঙ্গিতে সাহিত্যের যে-অংশে নাতিদীর্ঘরূপে প্রস্ফুটিত করেন, তা-ই প্রবন্ধ। লেখক কতটুকু বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাধর্মী, তা স্বচ্ছভাবে ফুটে ওঠে তাঁর লেখায়। প্রচ্ছন্ন চিন্তাও তিনি তুলে ধরবেন তাঁর প্রবন্ধে, নিজেকে প্রকাশ করবেন প্রশস্ত মনোবৃত্তির উদার মুক্তির আয়তনে।


প্রবন্ধ বলতে আমরা বাস্তবতা ও কাল্পনিকতার মিশেলে অনুভূত সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নাতিদীর্ঘ আলোচনার শিল্পপ্রকাশকে বুঝে থাকি। অর্থাৎ লেখক দৃশ্যমান জগতের বৈচিত্র্যে আমোদিত হয়ে ব্যাক্তিক চিন্তাধারার সমন্বয়ে মানুষের জীবনযাপন, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি ইত্যাদির অংশবিশেষকে আপন প্রকাশভঙ্গিতে সাহিত্যের যে-অংশে নাতিদীর্ঘরূপে প্রস্ফুটিত করেন, তা-ই প্রবন্ধ। লেখক কতটুকু বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাধর্মী, তা স্বচ্ছভাবে ফুটে ওঠে তাঁর লেখায়। প্রচ্ছন্ন চিন্তাও তিনি তুলে ধরবেন তাঁর প্রবন্ধে, নিজেকে প্রকাশ করবেন প্রশস্ত মনোবৃত্তির উদার মুক্তির আয়তনে।

প্রবন্ধ হতে হবে প্রবন্ধের মতোই। প্রবন্ধকে সার্থকরূপে প্রতীয়মান করতে একজন প্রাবন্ধিকের যে-গুণগুলি থাকা আবশ্যক, সেগুলি হলো:

回 বিষয়বস্তু গভীরভাবে বোঝা: কোন্ বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রবন্ধ লেখা হবে, তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক অবস্থার ঊর্ধ্বে উঠে কল্পলোকের দূরদৃষ্টি দিয়ে প্রতিটি জিনিসকে সূক্ষ্মভাবে দেখতে হবে, এখানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রাবন্ধিকের মূল পার্থক্য। সাধারণ চোখ বাস্তবতাকেই পুরোপুরি দেখে না, দেখে আংশিক করে – অপরপক্ষে একজন প্রাবন্ধিক তুচ্ছ একটা বিষয়কেও দেখবেন অতলে তলিয়ে, যা থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্ব তাঁর চিন্তাক্ষম উন্নত মস্তিষ্কে তৈরি করবে বিচিত্র রং-সুরের ঝঙ্কার।

回 যথাযথ প্রকাশভঙ্গি: যে-ধরনের ধ্যানই আসুক না কেন, তা প্রকাশ করার যথাযথ ভাষা একজন আদর্শ প্রাবন্ধিকের থাকা চাই। সংজ্ঞায়ই আছে: “পাঠকমনকে আনন্দ দেওয়া ও মোহিত করাই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য, প্রকাশ করতে হবে সাবলীলভাবে।” যদি প্রকাশ ব্যতিরেকে সাহিত্যিক হওয়া যেত, তবে জগতের সবাই সাহিত্যিক হতে পারত। নিজ আত্মাকে কে কতটুকু বুঝাতে পারল তা মুখ্য বিষয় নয়, বরং ভাষায় কে কতটুকু প্রকাশ করতে পারল সেটাই দেখার বিষয়।

回 সহজবোধ্য ভাষারীতি: ভাষারীতির দিকে নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমেই বঙ্কিমচন্দ্রের উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্য; তিনি তাঁর “রচনার শিল্পগুণ” প্রবন্ধে বলেছেন: “প্রাঞ্জলতা রচনার বড় গুণ। তুমি যাহা লিখিবে, লোকে পড়িবামাত্র যদি তাহা বুঝিতে না পারিল তবে তোমার রচনা বৃথা হইল।” লেখা তো পাঠকদের জন্যেই, তাই খেয়াল রাখতে হবে কীভাবে লিখলে অধিকাংশ লোক অনায়াসে বুঝতে পারবে। এজন্যে জটিল, দ্ব্যর্থক, দুরূহ শব্দ যথাসম্ভব বর্জন করে বহুলপ্রচলিত ও সহজবোধ্য শব্দকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

回 ধরন ও উদ্দেশ্যের দিকে খেয়াল: সাহিত্যের উদ্দেশ্য হলো পাঠককে জাগানো, তাকে আনন্দ দেওয়া। প্রবন্ধ যেহেতু সাহিত্যের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ মাধ্যম, তাই জাগাবার ও উদ্দীপ্ত করবার কাজটি সে সরাসরিই সাধন করবে। এটি করতে পারা না-পারার ওপর প্রবন্ধের সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করে। ধরনের দিক থেকে প্রবন্ধও কবিতার মতোই, মন্ময় ও তন্ময় এ দু ভাগে বিভক্ত। এ দু ধরনের নিয়মও সুনির্দিষ্ট। তন্ময়: বস্তুনিষ্ট প্রবন্ধে লেখকের মূল বিষয় বাস্তব জগৎ। এখানে লেখক চিরন্তন সত্য, বৈশ্বিক দৃশ্যমানতাকে বিচার করেন বাস্তবতার নিরিখে।
পানসে ভাব দূর করে সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে এখানে বাস্তবতার সঙ্গে শিল্পীমনের সংযোগ ঘটালেও তা কেবল জ্ঞানবোধকে জাগ্রত করে, লেখকের আত্মভাবপ্রধান কোনোকিছু তন্ময়ে স্থান পায় না। মন্ময়: মন্ময় ঠিক বিপরীত। এখানে লেখকের চিন্তার স্বাধীনতা অবাধ, চালকের আসনে। লেখক এখানে যৎকিঞ্চিৎ সত্যতাকেও বিশাল কল্পরাজ্যের মালা পরাবেন, কখনও-বা বিসঙ্গত উপমার প্রয়োগ ঘটাবেন ইচ্ছেমতো।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো তন্ময়তা জীর্ণশীর্ণ। এটা পাঠককে অজানা তথ্য দিয়ে তাঁর জ্ঞানবোধকে ভরপুর করলেও স্থায়িত্ব নেই এর। একে তো তন্ময় পরিবর্তনশীল, আজ যা সত্য কাল তা সত্য না-ও হতে পারে। তখন তন্ময়তা নিষ্প্রয়োজন প্রতিপন্ন হয়। আরেকটা জিনিস হলো, জ্ঞানের ব্যাপার একবার জানলেই হলো, এরপর তার আর চাহিদা থাকে না। অপরপক্ষে মন্ময়তার দীর্ঘস্থায়িত্ব আছে। চিরকাল পড়লেও বিস্বাদ ঠেকবে না, প্রতিবারই নতুন মনে হবে।

回 আবেদনময়তা ও পাঠকগ্রহণযোগ্যতা: আবেদনময়তা প্রবন্ধের বড় গুণ। লেখার আগে ভাবতে হবে লেখাটি সমাজে কাটবে কি না, স্থায়িত্ব পাবে কি না ইত্যাদি। নির্দিষ্ট সময়সংশ্লিষ্ট লেখা সে-সময়ের পরেই মরে যায়, ‘নীলদর্পণ’ এখন তেমন বিকোয় না আর। সৃষ্টিশীল জীবনমুখী লেখা – যেগুলি সবসময়েই চলবে এ ধরনের লেখা লিখতে হবে। আনুষঙ্গিক কোনো ত্রুটির কারণে লেখা পাঠকগ্রহণযোগ্যতা না পেলে রচনা ব্যর্থ। তাই এটাও মাথায় রাখা উচিত।

回 সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার: লেখকের মোটামুটি সবরকমের শব্দ জানা থাকতে হয়, নয়ত কোথায় কোনটি লাগবে, প্রয়োগ ঠিক হবে কি না এ নিয়ে বিভ্রান্তি-সংশয়ে পড়তে হতে পারে। সাদামাটা বিষয়েও একজন আদর্শ প্রাবন্ধিক তাঁর অজস্র শব্দের সমারোহে চমৎকারিত্ব সৃষ্টি করতে পারেন।

সারকথা, প্রবন্ধকে সার্থকতার স্তরে উন্নীত করতে এসব গুণের সমন্বয় ঘটাতে হবে। উপর্যুক্ত কৌশলগুলি আয়ত্তে আনতে পারলে শব্দপূত মনোহর প্রবন্ধ সহজেই ধরা দেবে, সম্ভব হবে সার্থক প্রবন্ধ রচনা।
___________________________________

শাহবাগ, জকিগঞ্জ। এপ্রিল ০১, ২০১৪।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *