বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে @ টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ

“দাঁড়াও পথিক বর যথার্থ বাঙালি যদি তুমি হও। ক্ষণিক দাঁড়িয়ে যাও, এই সমাধিস্থলে। এখানে ঘুমিয়ে আছে, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। এ দেশের মুক্তিদাতা, বাংলার নয়নের মণি।”


“দাঁড়াও পথিক বর যথার্থ বাঙালি যদি তুমি হও। ক্ষণিক দাঁড়িয়ে যাও, এই সমাধিস্থলে। এখানে ঘুমিয়ে আছে, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। এ দেশের মুক্তিদাতা, বাংলার নয়নের মণি।”

এই আহ্বান আপনি পাবেন টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে গেলে। অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করতে যাব। সুযোগ পাচ্ছিলাম না। এইবার যখন গোপালগঞ্জ গেলাম তখন ভাবলাম আর মিস করা যাবে না। অতএব চললাম টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে।

গোপালগঞ্জ শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে টুঙ্গিপাড়া গ্রামের অবস্থান। গ্রামটি পাটগাতি ইউনিয়নের অধীন। কিন্তু এ গ্রামের নামেই উপজেলা সদরের নাম হয়েছে টুঙ্গিপাড়া। ১২৭ বর্গকিলোমিটারের আয়তনের এই উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশী, ছেলেবেলার খেলার সাথিরা তাঁদের প্রিয় মিয়া ভাইকে জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করেন।

গ্রামের ভিতরকার রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে আচমকা আপনি উপস্থিত হবেন সুদৃশ্য সমাধি কমপ্লেক্সের সামনে।

১৯৯৯ সালের ১৭ মার্চ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০১ সালের ১০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাধিসৌধের উদ্বোধন করেন। ৩৮.৩০ একর আয়তনের এই সমাধিসৌধের নির্মাণে খরচ হয় ১৭ কোটি ১১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। সমাধি কমপ্লেক্সের মধ্যে রয়েছে পাঠাগার, গবেষণাকেন্দ্র, প্রদর্শনী হল, পাবলিক প্লাজা, প্রশাসনিক ব্লক, মসজিদ, উন্মুক্ত মঞ্চ, স্যুভেনির শপ ও তথ্যকেন্দ্র।

প্রথমে আমরা যাব লাইব্রেরী এবং প্রদর্শনী কক্ষ যেই বিল্ডিঙে আছে সেইখানে।

লাইব্রেরীর অবস্থান নিচতলায়। ছিমছাম এবং গোছানো ছোট্ট এই লাইব্রেরী দেখলেই আপনার ইচ্ছে হবে কিছুক্ষণ বসে থাকার। বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে লেখা বেশিরভাগ বইয়ের সংগ্রহই এইখানে আছে।

মূল সংগ্রহশালা দোতলায়। ছবির সংখ্যাই বেশি। বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত ফ্রেমে বন্দী করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়াও আছে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিভিন্ন খণ্ডচিত্র।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু প্রায় দশ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ১৮ মিনিটের ঐ ভাষণে তিনি বাঙালির মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের আহবান জানান। এই ভাষণে তিনি বললেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।” ঐতিহাসিক সেই ভাষণের ছবিটি বড় করে বাঁধানো আছে।

সংগ্রহশালায় আছে সেই কফিনটি যেটিতে করে নৃশংসভাবে হত্যার পর বঙ্গবন্ধু’র নিরব নিথর দেহ বহন করে আনা হয়েছিল টুঙ্গিপাড়ায়।

সংগ্রহশালা থেকে বের হয়ে আসলাম। নিচেই আছে একটা মুক্তমঞ্চ। মাঝে মাঝে পিকনিক পার্টি আসলে এখানেই খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন করে। একইসাথে এখানে সেমিনার কিংবা আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

নামাজের ওয়াক্ত চলছিল। লাইব্রেরীর পাশেই চমৎকার একটা মসজিদ। এখানেই যোহরের নামায আদায় করে নিলাম।

নামাজ শেষে এগিয়ে চললাম সমাধির দিকে। চমৎকার রাস্তাটা সোজা চলে গেছে সমাধি পর্যন্ত। রাস্তার দুইপাশে ফুলের গাছে। চারপাশে বসার জায়গাসহ টলটলে পানির সুন্দর একটা পুকুর। ভর দুপুরের সূর্য মাথার উপর আগুন ঝরাচ্ছিল। সেই আগুনের বাষ্প থেকে নিস্তার পেতে অনেকেই গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।

সমাধিসৌধের দুই পাশের উদ্যান ছাড়িয়ে হাজার গজ এগোনোর পর বঙ্গবন্ধুর কবর। সিরামিক ইট, সাদা-কালো টাইলস দিয়ে নির্মিত নয়নাভিরাম সমাধিসৌধের স্থাপত্যশৈলীতে ফুটে উঠেছে বিউগলের সুর ও বেদনার চিত্র।

সমাধির একটু আগে চমৎকার একটা কৃত্রিম ঝর্ণা তৈরি করা হয়েছে। ঝর্ণার গায়ে লেখা আছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা সেই অমর কবিতার দুটো লাইন।

যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

সমাধির প্রবেশমুখে দাঁড়াতেই বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক বাড়িটি চোখে পড়ল। তিনতলা এই বাড়িটিতে এখন কেউ থাকেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়ায় আসলে এখানেই উঠেন। এই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধুর শৈশব কেটেছে। যদিও তখন এখানে কোন বিল্ডিং ছিল না। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল বাড়ির ভিতর থেকে ঘুরে আসি। কিন্তু ভিতরে যাওয়ার অনুমতি পাব কোথায়?

অতঃপর আমরা সমাধিতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিলাম।

সমাধির ভিতরে বঙ্গবন্ধু’র কবর, পাশেই তাঁর বাবা-মায়ের কবর আছে। সাদা পাথরে নির্মিত গোলাকার একগম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধের চারপাশের দেয়ালে জাফরি কাটা। এই জাফরি দিয়ে সূর্যের আলো আসে। সেই আলোয় উদ্ভাসিত হয় বঙ্গবন্ধুর কবর। বঙ্গবন্ধুর কবরের কাছে আসতেই শরীরটা কেমন জানি শিরশির করে উঠল। এইখানেই শুয়ে আছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী শেখ মুজিবুর রহমান। বিবিসি বাংলা জরিপ চালিয়েছিল সারা বিশ্বের বাঙালীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বাঙালী কে সেটা বের করবার জন্য। শ্রেষ্ঠ ২০ জন বাঙালীর মধ্যে প্রথম তিনজন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে কিন্তু বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে বিতর্ক থাকাটা দুঃখজনক। আওয়ামী লীগের বিতর্কিত কাজের দায়ভার অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর উপর পড়ে না। কিন্তু একটা মহল সবসময়ই বঙ্গবন্ধুকে ছোট করবার চেষ্টা করে এসেছে এবং এখনও করছে। যদিও তাতে কোনই লাভ হয় নি। সত্য সবসময়ই প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে বিস্মৃত করবার সকল চেষ্টাই তাই দূরীভূত হয়ে গেছে। এই প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে অনেক বেশি জানে, অনেক বেশি শ্রদ্ধা করে। চাইলেও সেই শ্রদ্ধার জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুকে কেউ নামাতে পারবে না। যতদিন বাংলাদেশ বেঁচে থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধুও মানুষের মনে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।

লেখা শেষ করবার আগে বঙ্গবন্ধু’র বর্ণাঢ্য জীবনপঞ্জি সংক্ষেপে উল্লেখ করলাম –

● গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম গ্রহন করেন।
● ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে ফজিলাতুন্নেসা কে বিয়ে করেন।
● ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন।
● ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ তার প্রস্তাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় ।
● ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন – পূর্ব পাকিস্থান আওমি মুসলিম লীগ গঠন।
● ১৯৫৩ সালের ১৬ নভেম্বর – তিনি এর সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন।
● ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ – ২৩৭ আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পায় ২২৩ টি।
● ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল – মন্ত্রীসভা গঠন ।
● ১৯৫৪ সালের ৩০ মে – পাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী এই মন্ত্রীসভা বাতিল করেন।
● ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ – ৬ দফা গৃহীত হয় আওমিলিগের কাউন্সিল অধিবেশনে।
● ১৯৬৬ সালের ৩ জনুয়ারি – আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। শেখ মুজিবর রহমান কে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সিএসপি অফিসারকে আসামি করা হয়। অভিযোগঃ পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা।
● ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি – রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবর রহমান ও অন্যান নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।
● ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি – ছাত্রলীগ এর বঙ্গবন্ধু উপাদি প্রদান ও সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন।
● ১৯৭০ সালের ৮ অক্টোবর – নৌকা প্রতীক বরাদ্দ লাভ। (১৯৫৪ এর নির্বাচন এ যুক্তফ্রন্ট এর প্রতীক ছিল নৌকা)
● ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর – নির্বাচনঃ আওমিলিগ এর ১৬৭ আসন লাভ। পাকিস্থান পিপলস পার্টি পায় ৮৮ আসন।
● ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর – প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় ২৯৮ আসন লাভ।
● ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ – রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ।
● ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ – রাত ১২:৩০ – গ্রেফতারের আগে ওয়্যারলেস এ স্বাধীনতার বার্তা চট্টগ্রাম এ জহুর আহমেদ চৌধুরী কে প্রেরন ও এম এ হান্নান কত্রিক পাঠ। পরে, ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান ওই ঘোষণা পুনঃ পাঠ করেন। বঙ্গবধু গ্রেফতার ও করাচী প্রেরণ।
● ১৯৭১ সালের ২৫ মে – স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গঠন।
● ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি – বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত। বিশেষ বিমানে লন্ডনে প্রেরণ।
● ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল – গণপরিষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
● ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর – গন পরিষদের খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদন।
● ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর – সংবিধান কার্যকর। গণপরিষদ বাতিল।
● ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর – জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ।
● ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি – সংবিধান এ চতুর্থ সংশোধনী। সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
● ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি – বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওমি লীগ) গঠন।
● ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট – বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন।

৬ thoughts on “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে @ টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ

  1. প্রাঞ্জল বর্ণনা। তথ্যপঞ্জিটা
    প্রাঞ্জল বর্ণনা। তথ্যপঞ্জিটা অনেকেরই কাজে লাগবে। টুঙ্গিপাড়া যাওয়ার ইচ্ছে অনেকদিনের। কিন্তু যাওয়া হলো না। দুইবার সুযোগ থাকা স্বত্ত্বেও যাত্রা শুরু করার শেষ মুহুর্তে কোন না কোন কারনে স্থগিত করতে হয়েছিলো। আফসোসটা থেকে গেল। আপনার ভ্রমণ-বর্ণনা যাওয়ার ইচ্ছেটাকে আরো উস্কে দিলো।

    1. ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১ নাম্বার
      ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১ নাম্বার নিয়ম হচ্ছে, প্রথম সুযোগেই বেরিয়ে পড়তে হবে। পরে যাব এই চিন্তা মাথায় আনলে আর ভ্রমণ হবে না ভ্রাতা। অতএব বেরিয়ে পড়ুন।

    1. একটা ছোট্ট মোটেল আছে। আর
      একটা ছোট্ট মোটেল আছে। আর পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে বিশাল জায়গা নিয়ে একটা কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে। এই বছর মনে হয় লাগবে শেষ হতে। তবে গোপালগঞ্জ থেকেই দেখে আসতে পারেন। খুব বেশি দূরত্ব তো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *