মুক্তিযুদ্ধে বিজয় সম্পর্কে একজন সেক্টর কমাণ্ডারের কিছু প্রশ্ন!

নোট : মূল লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের রজতজয়ন্তী : কিছু প্রশ্ন’। লেখাটি দৈনিক জনকণ্ঠে ১৯৯৬ সালের ৮ ডিসেম্বর ছাপা হয়। লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধে ৭ নং সেক্টরের অধিনায়ক কর্নেল কাজী নূর-উজ্জামান। কর্নেল জামান নামে যিনি অত্যধিক পরিচিত। জাতির সঙ্কট মুহূর্তে তিনি অবসর থেকে ফিরে এসে সেক্টরের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন। অপরাপর সেক্টর প্রধানদের তুলনায় কর্নেল জামান এই যুদ্ধের গুরুত্ব আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এর প্রমাণ দেয় তার রচনাগুলো। যদিও শাসকশ্রেণীর সঙ্গে মতের বনিবনা না হওয়ায় তার নাম ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে দেয়ার চেষ্টা চলছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার আন্দোলনের প্রাথমিক যুগে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন থেকে শুরু করে একে পরিচালনা ও বিকশিত করার কাজে সব সময়ই ছিলেন অগ্রভাগে। এমনকি ‘জাহানারা ইমাম যে জাহানারা ইমাম হতে পেরেছেন, সে ক্ষেত্রেও কর্নেল জামানের ভূমিকাই প্রধান’ বলে মতপ্রকাশ করেছেন ওই আন্দোলনের সংগঠকেরা। আসুন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যুদ্ধের এই অধিনায়কের প্রশ্নগুলো জেনে নেই। এই প্রশ্নগুলো আমাদের বর্তমানের সঙ্গে খুবই সম্পর্কিত। কারণ এখান থেকেই আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে কী অবস্থায় ছিল তা সম্পর্কে এবং কর্নেল জামান প্রায় ২০ বছর আগে সাম্প্রদায়িকতা, গদি দখলের রাজনীত, নারী নির্যাতন, পুলিশি নির্যাতন, ফ্যাসিবাদ ও বাকশালতন্ত্রের মতো এদেশের যে বাজে সূচকগুলোর উল্লেখ করেছিলেন, তা আজ কিভাবে বিকশিত হয়েছে এবং নতুন অনেক নিপীড়ন যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি তখনকার তুলনায় আজ কোন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাবেন।


সেক্টর কমাণ্ডার কাজী নূর-উজ্জামান

।। মুক্তিযুদ্ধের রজতজয়ন্তী : কিছু প্রশ্ন ।।

১। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিজয় দিবস পালনের বিরোধিতা করে এসেছি শুরু থেকেই। কেন? কারণ পাকিস্তানি ও রাজাকারদের প্রভাব এ দেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
২। কিন্তু সব দিক চিন্তা করে আমি এই দিবসের বিরোধিতাও করিনি। ‘স্বাধীনতাযুদ্ধ’ জাতির জন্য একটি মহান যুদ্ধ ছিল সর্বস্তরের জনসাধারণের অংশগ্রহণের কারণে। নতুন প্রজন্মের এ কথা জানা দরকার।
৩। যুদ্ধ হয়েছিল জনগণের সার্বিক মুক্তির আশায়। কিন্তু সফল হয়নি, সফলতার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
৪। ৭১-এ সমস্ত দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল ও জনগণ ভাসানীর আদর্শে এবং মুজিবের রাজনৈতিক নেতৃত্বে বিপ্লবী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।
৫। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জাতিসংঘের সৌজন্যে ও হস্তক্ষেপে পাকিস্তান কর্তৃক বাঙালিদের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তরিত হয়নি।
৬। ক) বিপ্লবী যুদ্ধের পর বিপ্লবী সরকার গঠন করা সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। মুক্তি সংগ্রামীরা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তাজউদ্দীনের সমর্থক ছিল।
খ) আজ শেখ মুজিবের আদর্শের কথা পার্টির সদস্যরা উচ্চারণ করে চলেছে এবং এ দেশের পত্রিকাসমূহে প্রচার করা হচ্ছে। ভাসানীর আদর্শ সরকারি সমর্থন না পেলেও মানুষ জানত এবং এখনো জানে, তিনি স্বাধীন ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশে বিশ্বাসী ছিলেন। তাজউদ্দীন যে বিপ্লবী সরকার গঠনের আদর্শ পোষণ করতেন এবং বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন, তাও মুক্তিযোদ্ধাদের অজানা ছিল না। তবে শেখ মুজিবুর রহমানের যে আদর্শের কথা আজকে ব্যপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তার পরিচয় আমাদের জানা নেই। লোকান্তরিত লোকের আদর্শ মানুষের কাছে তুলে ধরতে হলে, সে ব্যক্তির জীবনের কর্মকাণ্ড ও কার্যক্রম তুলে ধরতে হবে। কেবল তার অতীতের কিছু উক্তি ও বক্তব্য তার নামে প্রকাশ করলে সে সবের সারমর্ম মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব নয়। তবে শেখ মুজিব সাহেব যে বাংলাদেশের স্বাধীকার বা স্বাধীনতার জন্য রাজনৈতিকভাবে সংগ্রাম করে গিয়েছেন, এ বিষয়ে মানুষের মনে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এ স্বাধীনতার আদর্শ ও লক্ষ্য সর্বসাধারণের কাছে পরিস্কার নয়।
৭। ক) যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রক্ষণশীল প্রভাবের সঙ্গে প্রগতিশীল নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব অজানা নয়। ইন্দিরা গান্ধীর রাজনীতি বামপন্থীরা ও প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ ও চিন্তাকে নিষ্ক্রিয় ও দমনে সুচিন্তিত ও সরকারিভাবে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছিল।
খ) মুজিব বাহিনী (বিএলএফ) গঠনে জেনারেল ওসমানী ও আমি নিজেও তার নির্দেশে প্রথম থেকেই জড়িয়ে পড়ি। ৭১-এর এপ্রিল মাসে আগরতলায় যুব সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে বাছাই করা ছেলেদের ভারতে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য আমরা অনেকে মনোনীত করেছিলাম। পরবর্তীকালে যে উদ্দেশ্যে বাহিনী গঠন করা হয়েছিল তা আমরা তো বটেই তাজউদ্দীন, জেনারেল মানেক’শ, জেনারেল অরোরা, জেনারেল লেহান প্রমুখ ভারতীয় সামরিক বাহিনীর নেতৃবৃন্দেরও জানা ছিল না। বিএলএফ গঠন করা হয়েছিল ভারতীয় রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষে একটি বাংলাদেশি সশস্ত্র বাহিনী রূপে। রক্ষী বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া আমার জানা নেই। আমার অনুমান তাজউদ্দীনের মতোই শেখ মুজিবুর রহমান এ বাহিনী সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। এর পরিণামে একটি অনভিজ্ঞ ও উচ্চাভিলাসী কিছুসংখ্যক ৭১-এর ছাত্রনেতা, দেশের রাজনীতিতে বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী মহলের পরিকল্পনায় সাহায্যকারী সংগঠক হিসেবে গড়ে ওঠে। রক্ষিবাহিনী সরকারকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়। এ দেশের মাস্তান বাহিনী গড়ে ওঠার উৎস এই দুই প্রক্রিয়া থেকে শুরু হয় বলে আমি বিশ্বাস করি।
৮। সরকারি কর্মচারী ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় যারা নিরাপদ আশ্রয়ের লোভে সীমান্ত অতিক্রম করেছিল, তারা পাকিস্তানি প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রেখেই পদোন্নতি ও ভাগ্যোন্নতির পরিকল্পনায় সময় অতিবাহিত করেছিল। আমলা সম্প্রদায়ের মধ্যে দেশ গড়ে তোলার কোনো নতুন চিন্তাভাবনা বা কৌশল অবলম্বনের প্রয়াস দেখা যায়নি।
৯। নিয়মিত সামরিক বাহিনীর অফিসার ও সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা কি ছিল তা অনুমান করা কঠিন। তবে এদের মধ্যে যারা অধিনায়কত্ব করেছিলেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি আইএসআই ডিরেক্টেরিয়েটের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য ছিলেন। এদের কীর্তিকলাপ আজ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। ক্ষমতা দখলের মনোভাব এরা পোষণ করতেন।
১০। ক) শেখ মুজিবের বাকশালী চিন্তাধারার সঠিক মূল্যায়ন আজো হয়নি। তবে তিনি যে প্রক্রিয়া চালু করার প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেই একই প্রক্রিয়া ক্যুদেতা ও কাউন্টার ক্যুদেতার মাধ্যমে রক্ষণশীল রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর নেতৃবৃন্দ সামরিক শাসনকালে চালু করেছিল সামরিক আইন বলে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়েই।
খ) শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল না। আন্তর্জাতিক চিন্তাভাবনায় তিনি পুঁজিবাদের সপক্ষেই ছিলেন। ৭২-৭৫-এ রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়া বা তার মনে নতুন চিন্তাভাবনার উদ্রেক হয়েছিল। তিনি দেশ ও মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতেন না, এ বিশ্বাস আমার রয়েছে। বাকশালী আদর্শে এই দেশকে কোন পথে নিয়ে যেতেন তা অবগত হওয়ার আগেই তিনি নিহত হন।
গ) শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় গোয়েন্দা বিভাগ ও আমলারা বিশ্ব-পুঁজিবাদী স্বার্থ বজায় রাখার কৌশল প্রয়োগের মধ্যে তাকে ভুল তথ্য এবং দেশি-বিদেশি ঘটনাবলীর বিকৃত বিশ্লেষণ পেশ করে জনগণের কাছ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়। এ তরিকা বা কায়দা বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আমি মনে করি। অনেক নগণ্য রাজনৈতিক বিষয় গোয়েন্দা ও আমলা সম্প্রদায় মিডিয়ার সাহায্যে বড় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে উন্নয়ন ও জনকল্যাণের বিষয়গুলো প্রাধান্য না দিয়ে নন-ইস্যুগুলো দিয়ে সরকারকে বিচলিত রাখছে।
১১। দেশ, মাটি ও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, সে বিষয়টি কোনো শাসন আমলেই আদৌ প্রাধান্য দেয়া হয়নি।
১২। স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই একটি স্বার্থান্বেষী এবং লুটেরা সম্প্রদায় গঠিত হয়। আজ তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বই বিপণ্ণ করার চক্রান্ত করছে। জনসাধারণের সার্বিক মুক্তির পথ অনুসরণ করতে পারেনি এবং আধিপত্যবাদীদের নির্দেশে সে পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
১৩। ক) জনগণের বিশ্বাসভাজন হয়ে এবং তাদের সঙ্ঘবদ্ধ শক্তির সাহায্যের ওপর নির্ভর করে আজো এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনো পার্টি ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করার সাহস দেখাতে পারেনি।
খ) বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের জনকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করার সদিচ্ছা প্রকাশ করা হচ্ছে- এটি একটি শুভ লক্ষণ। তবে এ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে পেয়ে থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে রক্ষণশীল সম্প্রদায়, পাকিস্তানি আদর্শে দীক্ষিত এবং ধর্মান্ধতার প্রভাব থেকে এখনো মুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি।
১৪। ক) অন্যদিকে রক্ষণশীল রাজনৈতিক শাসনামলে এ দেশে যে ধর্মান্ধতার বীজ বপন করা হয়েছিল তা এখনো সক্রিয় রয়েছে। বরং ধর্মান্ধতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাম্প্রদায়িকতা দেশ থেকে দূর করা যাচ্ছে না।
খ) হত্যার বিচার সংক্রান্ত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করা হলেও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনাকাঙ্খিত পরিবর্তনসমূহের বিষয়গুলো এখনো রহিত করার পদক্ষেপ নেবার ইচ্ছার অভাব লক্ষণীয়।
১৫। ক) বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিত্তবানদের সহায়তা ছাড়া দখল করা সম্ভব নয়। দেশি ও বিদেশি গোয়েন্দাচক্রের প্রভাব অক্ষুণ্ন রয়েছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এ প্রক্রিয়া থেকে জনগণ সহজে এবং অদূর ভবিষ্যতে মুক্তি পাবে না।
খ) জনগণের প্রতিনিধিত্ব আদর্শবান সমাজসেবীদের হাতেই ন্যস্ত হওয়া উচিত। এ আদর্শ চালু করতে না পারলে দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন আসবে না; স্বার্থান্বেষী লুটেরা সম্প্রদায়ের হাতেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে যাবে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এ প্রবণতা অবাঞ্ছিত ও অগ্রহণযোগ্য।
১৬। আমি ১৯৪৩ সালে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করি। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহার, দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতির বহু কথা আমার জানা আছে। এসব কথা লিখে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাভূত করার যে লক্ষ্য অর্জিত হয়েছিল, তা ম্লান করা যায় না।
১৭। তেমনি ৭১-এর যুদ্ধকালীন অবস্থায় আওয়ামী লীগের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে মহান মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার কোনো কারণ দেখি না।
১৮। আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা উত্তরকালে তাদের গণবিরোধী কার্যকলাপের জন্য সর্বসাধারণের সমর্থন হারিয়ে ফেলে বহু খেসারত দিয়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং দ্বিতীয়বার সুযোগ প্রাপ্তির জন্য দেশের মানুষের কাছে আবেদন রেখেছিলেন। এরই ফলশ্রুতিতে আজ তার পার্টি আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
১৯। বাংলাদেশে বলতে গেলে কেবল আওয়ামী লীগই একটি গণভিত্তিক পার্টি। স্বাধীনতা পূর্বকালের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে মনে রেখেই দেশের মানুষ ১৯৯৬-এর নির্বাচনে এই পার্টিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আর একটিবার সুযোগ দিয়েছে। এ বিষয়টি মনে রেখে এবং জনগণের শক্তির ওপর নির্ভর করে এ পার্টিকে এখন দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন আনার সাহসের পরিচয় দিতে হবে।
২০। আওয়ামী লীগ কি এখন মানুষের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবে? নাকি কেবল তাদের গদি রক্ষার জন্য দেশের মানুষের সাথে প্রতারণা করে কাজ করবে? এটিই এখন দেখার বিষয়।
২১। রজতজয়ন্তী পালনকালে গণভোটে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন সরকারকে দেশের আমূল আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের বলিষ্ঠ অঙ্গীকারের ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বে অর্থাৎ দেশকে মর্যাদাপূর্ণ ও উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বসাধারণের এ আশা পূরণের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার নির্ভয়ে কাজ করে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা অটুট রেখে অগ্রগতির পথ অবলম্বন করে এ পার্টির গণভিত্তি আরো দৃঢ় করে তুলতে পারবে কি?
২২। ৭১-এ দেশবাসী স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমর্থন করেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের রজতজয়ন্তী পালনকালে আমার মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের দেশ গড়া দ্বিতীয় পর্বে এ পার্টি আবার জনসমর্থন লাভ করতে পারবে। যদি তারা পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন আমলা, চাটুকার বুদ্ধিজীবী এবং বিদেশ-পরিচালিত দেশীয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারে এবং যদি ৭১-এর গণহত্যাকারীসহ সকল হত্যার বিচার সাংবিধানিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে জনগণ তাদের একদিন স্মরণ করবে। ৭১-এর যুদ্ধকালে এ দেশের ইয়াসমিনরা পাক হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এখন দেশের নিরাপত্তা বাহিনীও একই কাজ করছে। যুদ্ধকালে ‘শান্তি বাহিনী’ ও রাজাকার সদস্যরা নূরজাহান ও সখিনাদের লাঞ্ছিত করেছিল। আজ দেশের কাঠমোল্লারা শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে তাদের নির্যাতন করছে। সাধারণ মানুষ ৭১-এর শত্রুশাসিত দেশে সুবিচার পায়নি। আর আজা স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীকালে অসহায় মানুষ জমি জবর দখল ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে নিঃস্ব ও ফেরারি হিসেবে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে। এ অবস্থায় রজতজয়ন্তী পালনকে ‘স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী’ নামে আখ্যায়িত করাই সঠিক হবে। দেশের মানুষ এখনো তাদের সার্বিক মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যদি জনগণের শক্তির ওপর নির্ভর করে সার্বিক মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে এ পার্টি আবার ৭১-এর ন্যায় সকল স্তরের মানুষের পূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন লাভ করতে পারবে। দেশবাসী ‘মুক্তিযুদ্ধের রজতজয়ন্তী’ পালনের অপেক্ষায় রইল।

দৈনিক জনকণ্ঠ
৮ ডিসেম্বর, ১৯৯৬
।।

৫ thoughts on “মুক্তিযুদ্ধে বিজয় সম্পর্কে একজন সেক্টর কমাণ্ডারের কিছু প্রশ্ন!

  1. লেখাটি অবশ্যপাঠ্য। লেখক
    লেখাটি অবশ্যপাঠ্য। লেখক অসাধারণ মূল্যায়ন করেছেন আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়, সাম্প্রদায়িকতা, গদি দখলের রাজনীত, নারী নির্যাতন, পুলিশি নির্যাতন, ফ্যাসিবাদ, শেখ মুজিব, সামরিক বাহিনী, বিদেশি প্রভাব ও দেশ গঠন সম্পর্কে।

    ৭১-এর যুদ্ধকালে এ দেশের ইয়াসমিনরা পাক হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এখন দেশের নিরাপত্তা বাহিনীও একই কাজ করছে। যুদ্ধকালে ‘শান্তি বাহিনী’ ও রাজাকার সদস্যরা নূরজাহান ও সখিনাদের লাঞ্ছিত করেছিল। আজ দেশের কাঠমোল্লারা শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে তাদের নির্যাতন করছে

    ২০ বছর আগে তিনি যে বাংলাদেশের চেহারা দেখাতে গিয়ে এ কথাগুলো লিখেছেন, সেই বাংলাদেশ আজ জগদ্দল পাথর হয়ে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে।

    যদিও আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব সম্পর্কে তার কিছু অতিরিক্ত আশাবাদের প্রমাণ এখানে মেলে, তবে তার পাশাপাশি এমন কিছু ইস্যুতে তাদের সমালোচনা করেছেন যা আজ আওয়ামী লীগের চরিত্রের অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। ৭ নং সেক্টরের অধিনায়ক নূর-উজ্জামানকে আজ জাতি ভুলতে বসেছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যারা রাজনীতি করেন, কর্নেল জামান তাদের শিরোমণি হওয়ার কথা।

  2. অনেক ভালো লেগেছে। আসলে
    অনেক ভালো লেগেছে। আসলে চেতনাবাজদের চেতনাকে অকপটে স্বীকার করেন নি বলে হয়তো চেতনাবাজরা ৭ নং সেক্টরের অধিনায়ক নূর-উজ্জামানকে সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে! জাতি বলবো না এই কারণে, তা হলো- বাঙালি জাতির সিংহভাগই চেতনাবাজ নয়, যদিও চেতনাবাজরা ঘাড়ে বসে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে ।

  3. মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ একই
    মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ একই সূত্রে গাঁথা। আওয়ামী লীগের মধ্যে দল হিসেবে যেমন নানা দুর্বলতা ও পশ্চাৎপদতা আছে, মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই তারা ঘটিয়েছে।

  4. লেখাটি অবশ্যপাঠ্য।
    অসাধারণ

    লেখাটি অবশ্যপাঠ্য।
    অসাধারণ মূল্যায়ন করেছেন|
    বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য
    অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ন একটি লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *