জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সঙ্কট সমাধানে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা- পঞ্চম পর্ব

উইন্ড পাওয়ার বা বায়ু শক্তি


উইন্ড পাওয়ার বা বায়ু শক্তি

যে বাতাসের সাহায্যে ঢেউ তৈরি হয় এবং একটু আগে ওয়েভ এনার্জি উৎপাদন এবং ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল সেই বাতাসের শক্তি সরাসরি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে যে পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় তাই হল উইন্ড পাওয়ার। বাতাসের এই শক্তি মূলত সৌর শক্তির একটি ধরন। কারন বায়ুমণ্ডলে বাতাস তৈরি হবার পেছনে সূর্যই একমাত্র শক্তি হিসেবে কাজ করে। সূর্যের তাপের কারনে কোন একটি স্থানের বাতাস উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আশেপাশের ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে সেই উত্তপ্ত বাতাসের চাপের পার্থক্য তৈরি হয়। কারন উত্তপ্ত বাতাস হাল্কা আর ঠাণ্ডা বাতাস ভারি। গরম হয়ে যাওয়া বাতাস ঐ স্থানে বসে থাকেনা। উপরের দিকে উঠে যায়। সেই জায়গায় যে শূন্যতা তৈরি হয় সেখানে আশেপাশের ঠাণ্ডা বাতাস প্রচণ্ড বেগে এসে ভরে যায়। বাতাসের এরকম ক্রমান্বয়ে গরম হওয়া এবং উপরে উঠে যাওয়া ও ঠাণ্ডা বাতাসের সেই শূন্যস্থান দখল করার এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। ক্রমাগত বাতাস প্রবাহের ফলে আমাদের শরীরে বাতাসের অনুভুতি লাগে। বাতাসের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যদি টারবাইন ঘুরানো যায় তাহলে সেই টারবাইনের যান্ত্রিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ব্যপারটা বিদ্যুতের সাহায্যে সিলিং ফ্যান অথবা যেকোনো পাখা ঘুরানোর ঠিক উল্টো। ফ্যানের একপাশে বিদ্যুৎ শক্তি প্রয়োগ করলে তা থেকে অন্য পাশে যান্ত্রিক শক্তি উৎপাদন হয়, যার সাহায্যে পাখা ঘুরে এবং আমরা বাতাস পাই, এখানে একইভাবে প্রাকৃতিক বাতাস ব্যবহার করে পাখা ঘুরানো হয় যা অন্য পাশে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সেই বিদ্যুৎ দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত কাজে ব্যবহারও করা যায়। এ বিদ্যুৎ কোন ধরনের দূষণ তৈরি করেনা। ইউরোপে অনেক আগে থেকেই উইন্ড মিল বা উইন্ড টার্বাইনের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। উইন্ড মিল ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ কুপ থেকে পানি উত্তোলন সহ শস্য নিড়ানির কাজ করা হত। বর্তমানে উইন্ড পাওয়ারের ব্যবহার বিশ্বব্যপি এত বেড়েছে যে নবায়ন যোগ্য শক্তি গুলোর মধ্যে জলবিদ্যুতের পর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে উইন্ড পাওয়ার।
২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বে স্থাপিত মোট উইন্ড পাওয়ারের পরিমান ১,৭৬,৪৭০ মেগাওয়াট। যার ৭৩ ভাগই ইউরোপে। সবচেয়ে বেশী জার্মানিতে তার পর আছে স্পেন এবং ডেনমার্ক(৬৬,৬৭)। বর্তমানে বাংলাদেশে মুহুরি নদীর কাছাকাছি বিপিডিবি এর করা ০.৯৯ মেগাওয়াটের একটি উইন্ড পাওয়ার প্রকল্প আছে(৬৫)। বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট যে মুহুরি প্রকল্প থেকে উইন্ড পাওয়ারের মাধ্যমে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব(৬৩)।
ভু-প্রাকৃতিক অবস্থানগত কারনে বাংলাদেশে উইন্ড পাওয়ারের সম্ভাবনা ব্যাপক। বঙ্গপসাগরের ৭২৪ কিঃমিঃ উপকুল রেখা জুড়ে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরে প্রচুর মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। যা ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিন ও দক্ষিন পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে এশিয়ার দিকে আসে। সাগরের পানির উপর দিয়ে দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ করে যখন এটি বঙ্গপসাগরের V আকৃতির উপকূল রেখার দিকে প্রবাহিত হয় তখন এর গতি বেড়ে যায়। মোটামুটি ৬ মি/সে থেকে ৮ মি/সে বেগে একই গতিতে যদি দীর্ঘ সময় ধরে বাতাস পাওয়া যায় তাহলে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযুক্ত বলে ধরা হয়। এছাড়াও উইন্ড টার্বাইনের বর্তমান প্রযুক্তিগত উন্নয়নের(৬১,৬২) ফলে ২ মি/সে থেকে ৫ মি/সে এর বাতাস থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু মাত্র দক্ষিনাঞ্চলের বাতাসের কি অবস্থা তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং অন্য কয়েকটি গবেষণা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসের গতিবেগের কয়েকটি তালিকা থেকে বুঝা যাবে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসের গতিবেগ।
স্থান উচ্চতা (মি) গড় গতিবেগ – মি/সে
কক্সবাজার ২৫ ৩.৭৯২
চরফ্যাশন ২৫ ৪.৪৩৩
চট্টগ্রাম ২৫ ৪.৩৬৭
কুয়াকাটা ২০ ৩.১৩৫
কুয়াকাটা ৩০ ৪.১৪৬
কুতুবদিয়া ২০ ৩.৬৪২
সীতাকুণ্ড ২০ ৩.০১৫
সীতাকুণ্ড ৩০ ৩.৫৫৪

২৫ মিটার উচ্চতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বাতাসের বেগ (মি/সে)।
স্থান/ মাস পতেঙ্গা কক্সবাজার টেকনাফ চরফ্যাশন কুয়াকাটা কুতুবদিয়া চান্দনা (গাজীপুর) সেন্টমারটিন

জানুয়ারি ৩.২৫ ২.৩৩ ১.৯৯ ২.৮০ ৩.১৮ ৩.৩৭ ২.৭৪ ৫.০৮
ফেভ্রুয়ারি ২.৬৬ ১.৯৯ ১.৯০ ২.৬৯ ৩.৩৭ ৩.২৯ ২.৯৫ ৪.৭১
মার্চ ৩.১৩ ২.৪২ ২.২৬ ৩.৫৪ ৪.৮৪ ৩.৫৩ ৩.২৭ ৪.২৯
এপ্রিল ২.৮৮ ১.৮৪ ১.৬৫ ৩.২৯ ৪.৯৩ ৩.১১ ৪.৩১ ৩.৫৮
মে ৪.৯৬ ৩.৯৭ ৩.০৯ ৪.৮১ ৬.২৮ ৪.৮৯ ৪.২৩ ৫.৭৫
জুন ৫.৮৩ ৪.৬৪ ৩.২৬ ৫.৭৬ ৭.৩১ ৫.৯০ ৪.২০ ৫.৯৬
জুলাই ৫.৬৭ ৪.৮০ ৪.৩৩ ৫.২২ ৭.৩৪ ৬.১৭ ৩.২০ ৫.৩৩
অগাস্ট ৫.১৩ ৪.৩১ ৪.০৩ ৫.১৭ ৪.৮০ ৫.৩৪ ৩.৩১ ৫.৯৬
সেপ্টেম্বর ৩.৩৬ ৩.৬৯ ৩.৪৬ ৩.১৪ ৩.৭৭ ৩.৫৮ ২.৭৬ ৪.৭৯
অক্টোবর ৩.২০ ৩.৭৪ ৩.৩০ ৩.৭০ ২.১৮ ৩.৯৮ ২.২১ ৪.১৭
নভেম্বর ২.৬১ ২.৯৩ ২.২৯ ৩.৮০ ১.৯৮ ৩.২৩ ২.৩৩ ৩.৭৯
ডিসেম্বর ২.৯৭ ১.৭৮ ১.৪৪ ৩.৯০ ৩.৩৫ ৩.৩৮ ২.২৯ ৪.০৮
গড় ৩.৮০ ৩.২০ ২.৭৫ ৪.০ ৪.৪৪৪ ৪.১৭২৫ ৩.১৫ ৪.৭৯

টেবিল ৩(৬৪) – ৫০ মিটার উচ্চতায় চারটি স্থানের বাতাসের বেগ(মি/সে)। এই চারটি স্থান মূলত পুরো উপকূলবর্তি এলাকাকে প্রতিনিধিত্ব করে।
স্থান/ মাস মুহুরি বাঁধ মগনামা ঘাট পার্কি সৈকত কুয়াকাটা,
পটুয়াখালী
জানুয়ারি ৫.১০ ৫.৩০ ৪.৯০ ৫.৮০২
ফেভ্রুয়ারি ৫.৩০ ৪.৮০ ৫.১০ ৫.৫০
মার্চ ৭.০ ৭.৩০ ৭.৬০ ৭.৭০
এপ্রিল ৭.৭০ ৭.৯০ ৭.৮০ ৮.৩০
মে ৮.১০ ৮.২০ ৮.২০ ৭.৯০
জুন ৭.২০ ৮.০ ৭.৬০ ৬.৯০
জুলাই ৭.৪০ ৮.৪০ ৮.১০ ৭.৭০
অগাস্ট ৬.৮০ ৭.৭০ ৭.৪০ ৭.৫০
সেপ্টেম্বর ৬.৭০ ৭.১০ ৬.৯০ ৬.৯০
অক্টোবর ৬.২০ ৬.৮০ ৬.৪০ ৬.৩০
নভেম্বর ৫.৬০ ৫.৯০ ৫.৬০ ৫.৫০
ডিসেম্বর ৪.৯০ ৫.৪০ ৫.১০ ৪.৮০
গড় ৬.৫০ ৬.৯০ ৬.৭২৫ ৬. ৭৩৩

আন্তর্জাতিকভাবে উইন্ড পাওয়ার উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করা হয়, তা হল যদি কোন যায়গায় বাতাসের গতিবেগ ৬ মি/সে হয় তাহলে সে স্থানের বাতাস বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযুক্ত। ফলে যেখানে বাতাসের গতিবেগ কম সেখানে বর্তমানে প্রচলিত উন্নতমানের উইন্ড টারবাইন এবং যেখানে বাতাস পর্যাপ্ত পরিমানে আছে সেখানে গতানুগতিক উইন্ড টারবাইন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। শেষের টেবিলটিতে দেখা যাচ্ছে যে চারটি জায়গা পুরো বাংলাদেশের উইন্ড পাওয়ারের প্রতিনিধিত্ব করে সে চারটি জায়গাতেই বাতাসের বার্ষিক গড় বেগ ৬ মি/সে এর চেয়ে বেশী। একটি গবেষণা থেকে জানা যায় বাতাসের গতিবেগ ৬.৭৩৩ মি/সে হলে ৫০ মিটার উপরে (২৫০ কিলোওয়াট রেটেড) ৮টি টারবাইন বসালেই বছরে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব(৬৩)। টেবিল তিনটি বিশ্লেষণ করলে আরও স্পষ্ট হয় যে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়টা বাদ দিয়ে বছরের বাকি সময় উইন্ড টারবাইন ব্যবহার করে বাণিজ্যিক ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কারন এই সময়ে বাতাস খুবই শান্ত থাকে অথবা থেমে যায়। এমনকি জাতীয় গ্রিডে সংযোগ না দিয়েও উপকূলবর্তী এলাকা সমুহে এবং দ্বীপ অঞ্চলে যেখানে জাতীয় গ্রিডের সংযোগ দেয়াটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কার্যত অসম্ভব সেসব যায়গায় উইন্ড পাওয়ার দিয়ে বিদ্যুতের সম্পূর্ণ প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।

বর্জ্য বা আবর্জনা থেকে শক্তি (Waste To Energy -WTE)

আবর্জনা থেকে যে শক্তি পাওয়া যায় অনেকেই একে নবায়নযোগ্য শক্তি বলতে নারাজ। কিন্তু তত্ত্বগত ভাবে এটি নবায়নযোগ্য শক্তি। কারন মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের শক্তির উৎস সূর্য। সূর্যের কারনেই মানুষ বিভিন্ন কাজ করে বেঁচে থাকতে পারে এবং বর্জ্য উৎপন্ন হয়। বর্জ্য বা আবর্জনা বলতে এখানে মূলত মানুষের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ফলে যে বর্জ্য উৎপন্ন হয় তাকেই নির্দেশ করা হচ্ছে। সেটা গৃহ পালিত পশুর মল-মুত্র থেকে শুরু করে গ্রাম, শহরের নাগরিক কর্মকাণ্ডের ফলে উৎপন্ন সমস্ত বর্জ্যই। আমরা এই আলোচনায় দুই ধরনের বর্জ্য নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব। যার মধ্য দিয়ে এর সম্ভাবনার কথা স্পষ্ট হবে।
বর্জ্যের মূল উৎসগুলোর মধ্যে গার্হস্থ এবং বানিজ্যিক এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। গার্হস্থ বর্জ্যের মধ্যে মানুষ সহ গৃহপালিত পশুপাখির বর্জ্য, উচ্ছিষ্ট খাদ্যদ্রব্য, শাকসবজির ফেলে দেয়া অংশ, কাঠ, কাগজ, প্লাস্টিক, কাঁচ এবং বিভিন্ন রকমের ফেলে দেয়া ধাতব জিনিস উল্লেখযোগ্য। একই জিনিস গুলো রেস্তোরা, দোকান, অফিস, হোটেল এবং রাস্তা থেকেও পাওয়া যায়। এর বাইরে আছে গরু, মুরগি সহ বিভিন্ন রকমের খামারের বর্জ্য। ব্যবহার করার মত শক্তি সংগ্রহ করতে হলে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরন করতে হয়। প্রক্রিয়াজাতকরনের বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমেই বর্জ্য থেকে শক্তি সংগ্রহ ও ব্যবহার করা যায়। যেখানে সেখানে বর্জ্য ফেলে রাখলেই শক্তি পাওয়া যায়না। জাইকার পরিচালিত বিভিন্ন ধরনের আয়ের মানুষদের মধ্যে পরিচালিত জরিপ থেকে জানা যায় বাংলাদেশে মানুষ প্রতি গড়ে ৩৪০ গ্রাম গার্হস্থ বর্জ্য এবং ৩৬৪.৫ গ্রাম বাণিজ্যিক বর্জ্য উৎপাদন করে(৬৮)। গবাদিপশু থেকে আসে গড়ে ১০ কেজি এবং পোলট্রি থেকে গড়ে ১০০ গ্রাম(৬৯)। যা থেকে বছরে সর্বমোট ৪.৫০ বিলিয়ন ঘনফুটের বেশী গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। যদি শুধুমাত্র ঢাকা শহরের হিসেব করি তাহলে দেখা যায় এ শহরে প্রায় তিন কোটি মানুষের বাস। সেই হিসেবে বছরে এখান থেকে ৬ কোটি ১৩ লাখ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। যা থেকে প্রতি বছর ২,৭৩,২০,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় এবং যদি যান্ত্রিক দক্ষতা জনিত সমস্যা হিসেবে নেই তাহলে প্রতিদিন ৭১৬.৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব(৬৮)। বাস্তবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন প্রতিবছর ১৮,২৫,০০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে। যা ভারতের আগুয়াদা ইনফ্রা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ১৯ গুন বেশী। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৯১,২৫০ টন সংগৃহীত বর্জ্য দিয়ে প্রতিদিন ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়(৭০)। এই তথ্য থেকে সহজেই হিসেব করা যায় যে শুধুমাত্র ঢাকা শহরের বর্জ্য দিয়েই অনায়াসে ১৯০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। একটি হিসেব মতে বর্তমানে ঢাকায় প্রতিদিন ৩৫০০ টন বর্জ্য উৎপাদন হয় এবং ২০১৫ সাল নাগাদ ঢাকা শহরের প্রতিদিন উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমান হবে ৮০০০ টন এবং তা প্রতি বছর প্রায় তিন বর্গ কিলোমিটার জায়গা দখল করবে(৭১)। ফলে একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে এ বিশাল পরিমান বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন ছাড়াই যথাযথ ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা প্রয়োজন। তা নইলে পরিবেশ বিপর্যয় সামাল দেয়া কষ্টকর হবে। আর প্রক্রিয়াজাতকরনের উপজাত হিসেবেই আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি যা উভয়দিক থেকেই লাভজনক। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট চাহিদা ৭.৫ গিগাওয়াট। এই চাহিদার ঘাটতি পূরণে বর্জ্য বিরাট ভুমিকা রাখতে পারে।
বিভিন্ন পদ্ধতিতে বর্জ্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করা হয়। প্রথমত বর্জ্য জ্বালিয়ে যে তাপ পাওয়া যায় তা থেকে বাস্পভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত জৈবিক পদ্ধতি। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে বর্জ্যে পচন ঘটানো হলে তা থেকে মিথেন গ্যাস পাওয়া যায়। এই মিথেন গ্যাস গৃহস্থালি রান্না সহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া বড় উম্মুক্ত স্থানে বর্জ্য জমা করে সেখান থেকেও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে মিথেন গ্যাস সংগ্রহ করা যায়। সংগৃহীত এই গ্যাসও শক্তি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যায়। যদি বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করা না হয় তাহলে তা প্রাকৃতিক পরিবেশে পচে গিয়ে মিথেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে। যা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ দূষণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরনের কিছু অসুবিধাজনক দিক আছে যেমন
• পরিবেশ দূষণ
• দুর্গন্ধ
• উম্মুক্ত পদ্ধতিতে বর্জ্য ফেলে রাখলে তা থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গত হওয়া।
• দুষিত পানি আসেপাশের নদী, খাল, বিলে দূষণ তৈরি করা।
• জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা।
সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সমস্ত অসুবিধাগুলো অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।বেশ কিছু সুবিধাজনক দিক ও আছে তা হল
• তাপ উৎপাদন হয় যা থেকে বাস্প তৈরি করা যায়
• বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরনের পর মোট বর্জ্যের ১০ ভাগ ছাই হিসেবে থেকে যায়। যা মোট বর্জ্যের পরিমান কমতে সাহায্য করে।
• প্রক্রিয়াজাত করার ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কম জায়গা লাগে।
• উপজাত ছাই কংক্রিট, এসফালট্ রাস্তা তৈরির ভিত হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
• বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের উপজাত কে কৃষি জমিতে উৎকৃষ্ট সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
• মিথানল ও মিশ্র এলকোহল পাওয়া যায়। যা গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
• এসিটিক এসিড পাওয়া যায় যা প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহার হয়।
• এক কোষী প্রোটিন পাওয়া যায় যা মাছ, মুরগি ও গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্জ্য ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল যে বর্জ্য কোন কাজেই আসত না, ফেলে রাখলে পরিবেশ দূষণ করত তা খুব ভাল ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরন এবং তা থেকে ব্যবহারযোগ্য শক্তির উৎপাদন। অন্যান্য উৎস থেকে বর্জ্য বেশী মনোযোগ আকর্ষণ করবে একারনে যে এ থেকে প্রচুর দরকারি জিনিস উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করনের পরিবেশগত সুবিধা, ভুমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, অন্যান্য জৈব উৎসের তুলনায় কম দূষণ তৈরি এবং লাভজনক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারনে।
বর্তমানে ঢাকার অদূরে মাতুয়াইল এলাকায় একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থার উদ্যোগে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরনের প্রকল্প চলছে। যা প্রতিদিন ১২০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে। এখানে বর্জ্যের জৈবিক উপাদানগুলো জ্বালিয়ে তার পর অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে মিথানল প্রস্তুত করা হয়। যা জেনারেটরের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও এখানে কিছু কিছু জৈবিক উপাদান যেমন কাঠ, কাগজ, সবজি ও খাবারের উচ্ছিষ্ট আলাদা করে পচিয়ে কৃষি কাজে ব্যবহার করার জন্য জৈবিক সার উৎপাদন করা হচ্ছে। এছাড়াও বর্তমানে দেশে প্রায় ২০,০০০ বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট আছে। বাস্তবে আমাদের যে পরিমান বর্জ্য আছে তা দিয়ে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের মাধ্যমে পুরো গ্রামীণ এবং শহর অঞ্চলের বেশ কিছু এলাকার গার্হস্থ প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। প্রতিটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসাতে ২০০ বর্গফুট জায়গা দরকার হয় এবং প্রতিদিন ৩০ কেজি গবাদিপশু অথবা মুরগির বর্জ্য প্রয়োজন হয়। এধরনের একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে যে গ্যাস পাওয়া যায় তা থেকে সহজেই তিনটি পরিবারের রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস উৎপাদিত হয়। যার স্থায়িত্ব ৩০ বছর। এছাড়াও বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের গ্যাস উৎপাদনের পর যে উচ্ছিষ্ট বর্জ্য থাকে তা উৎকৃষ্ট মানের জৈবিক সার। এই সার কৃষিকাজে ব্যবহার এবং যেসব পুকুরে মাছ চাষ করা হয় সেখানে মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আগেই জেনেছি বর্তমানে দেশের ৬ ভাগ মানুষ গ্যাসের সুবিধা ভোগ করছে এবং ৭০ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। আমরা যদি গৃহপালিত পশুপাখি সহ দেশের বিভিন্ন স্থানের গরু ও মুরগির খামারের বর্জ্য ব্যবহার করে এধরনের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসাতে পারি তাহলে গ্যাসের সুবিধা প্রাপ্ত অংশ বর্তমানের বহুগুণ বেশী হবে। এখানে রাষ্ট্রেরও সাশ্রয় হবার ব্যপার আছে। তা হল বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের কারনে দেশ জুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করার জন্য যে পাইপ লাইন টানতে হয় তার প্রয়োজন হবে না। একইসাথে দেশের জনগনের জীবন মানে ব্যপক পরিবর্তন আসবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

শেষ পর্বের লিংক
http://www.istishon.com/?q=node/5086

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *