টিএসসির নারী নিপীড়ন : হাসান আজিজুল হক স্যারের বিশেষ সাক্ষাৎকার

‘রাষ্ট্র গঠনের মধ্যেই ভুল আছে। রাষ্ট্র গঠনে ত্রুটি আছে বলেই সমাজ গঠন হয়নি। ’৭১ সালের পর রাষ্ট্রটিকে যেভাবে গঠন করার কথা, সেভাবে গঠন করা যায়নি। মূলত এখানেই সমাজের অধঃপতন।’ বলছিলেন, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। বর্ষবরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনাকে উপলক্ষ করে রাষ্ট্র, সমাজ ও নানা বিষয় নিয়ে সম্প্রতি তার মুখোমুখি হই। নাতিদীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারটি অনলাইন কমিউনিটির জন্য তুলে ধরলাম।

‘রাষ্ট্র গঠনের মধ্যেই ভুল আছে। রাষ্ট্র গঠনে ত্রুটি আছে বলেই সমাজ গঠন হয়নি। ’৭১ সালের পর রাষ্ট্রটিকে যেভাবে গঠন করার কথা, সেভাবে গঠন করা যায়নি। মূলত এখানেই সমাজের অধঃপতন।’ বলছিলেন, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। বর্ষবরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনাকে উপলক্ষ করে রাষ্ট্র, সমাজ ও নানা বিষয় নিয়ে সম্প্রতি তার মুখোমুখি হই। নাতিদীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারটি অনলাইন কমিউনিটির জন্য তুলে ধরলাম।

সায়েম সাবু : জনসম্মুখে নারী হয়রানির ঘটনা পুরনো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে বর্ষবরণের দিনকার ঘটনাটি আলাদাভাবে দেখা যায় কি না?
হাসান আজিজুল হক : আলাদা কি না, জানি না। আমি শুধু বলব, একটি জাতি তার আত্মসম্মানবোধের জায়গা থেকে কত নিচে নামতে পারে বর্ষবরণের দিন টিএসসি চত্বরের ঘটনাটি তারই সূচক। এটি ব্যাখ্যা করার মতো নয়। ওরা নারীকে ভয়ানক নির্যাতন করেছে, ব্যাপারটি এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেখে-শুনে বলা যায়, ওদের কাছে নারী কোনো মানুষই নয়। এমন আচরণ একটি পশুর সঙ্গেও করা যায় না। নারীদের যেভাবে অসম্মান, বিবস্ত্র করা হয়েছে, তা জঘন্যতম অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি অনেক ভয়ঙ্কর হওয়া দরকার। ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই কাজটি করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। তাই যদি হয়, তাহলে কোনোভাবেই ক্ষমার প্রশ্ন উঠতে পারে না।

সায়েম সাবু : এবার পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তো অপরাধীদের চিহ্নিতই করতে পারেনি। পূর্বের ঘটনাগুলোও মানুষ মনে রাখে না।
হাসান আজিজুল হক : বাঙালি জাতির সর্বনাশ এখানেই। ভয়ঙ্কর ঘটনাও আমরা দু’দিন পরে ভুলে যাই। কিছুই মনে রাখতে চাই না। কিন্তু যারা এসব ঘটায়, তারা সবই মনে রাখে। অপরাধীরা ভোলে না। কীভাবে শক্তির প্রদর্শন করা যাবে, তা ওরা ভালোভাবেই জানে। রাষ্ট্র আমাদের ভুলিয়ে রাখে। আমি বলছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় আজকের দিনে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মানা যায় না। যখন শুনতে পাই, সরকারের মদদপুষ্ট ছাত্রলীগের কেউ কেউ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তখন মনে হয় আত্মহত্যা করি।
এমন দেশে থাকতে হচ্ছে! আমার ভাষা ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনাটিই প্রথম নয়। এর আগে বহুবার হয়েছে। ঘটনা ঘটিয়ে উল্টো ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে। নারী লোভনীয় বেশে বের হচ্ছে কেন? এমন প্রশ্নও তোলা হয়। তাহলে নারীকে ভোগ্য পণ্য ছাড়া মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা বাঙালির পক্ষে সম্ভব হবে না। নারীকে ইভটিজিং করা হয়, স্কুলের ছোট ছোট মেয়েদেরও ইভটিজিং করা হচ্ছে। কী লজ্জার কথা?

সায়েম সাবু : তাহলে কি এর কোনো প্রতিকার নেই?
হাসান আজিজুল হক : প্রতিকারের চেয়ে এখন প্রতিরোধ নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে। আমি এখন পরামর্শ দেব, নারী তুমি সশস্ত্র হও। যেখানে তোমারে লাঞ্ছনা করা হবে, গায়ে হাত দেয়া হবে, সেখানেই অস্ত্রের ব্যবহার করে প্রতিরোধ কর। হাত বা পায়ের স্যান্ডেল আর যথেষ্ট নয়। এ দিয়ে নারী তাকে রক্ষা করতে পারছে না।
চ্যানেলগুলোতে দেখলাম, এবারের বর্ষবরণের শুরুটা কত সুন্দর ছিল। যদিও এ নিয়ে আমার ভিন্নমত আছে। ভোর থেকে মানুষ সেজে, নতুন কাপড় পরে সারাদিন আনন্দে কাটিয়েছে। আনন্দের সঙ্গে অমন বর্বরতা যায়? তুমিই বলো। রাতে বাড়িতে গিয়ে নারীরা যখন দেখল, তাদেরই অন্য বোনদের এভাবে সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে, তখন তাদের কী মনে হলো? এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ নিয়ে আমি আর কথা বলতে পারছি না। নিজেকে স্থির রাখতে পারছি না। শুধু বলব, কঠোরতর শাস্তি হওয়া দরকার। অপরাধী কে, কী তার রাজনৈতিক পরিচয়, তা বিবেচনায় না নিয়ে দ্রুত এর শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।

সায়েম সাবু : মানুষ তো সভ্য হচ্ছে। এমন সময় নারীকে অস্ত্র নিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে কেন?
হাসান আজিজুল হক : রাষ্ট্র, প্রশাসন নারীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নারীকে তো বাঁচতে হবে। এভাবে মার খেয়ে তো বাঁচা যায় না। এ কারণেই আমি বলেছি, নারী তুমি নিজেকে অত দুর্বল ভাবছো কেন? অস্ত্র হাতে নিয়ে নিজেকে রক্ষা করার মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দাও তুমিও মানুষ, তোমারও বাঁচার অধিকার আছে। নারী-পুরুষ সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে শক্তির দরকার হতেই পারে। বাঁচতে হলে নারীকে অস্ত্র হাতে নিতে হবে। তা না হলে সারাজীবন নারীকে মার খেতেই হবে। শুধু নারীই নয়, বৃহৎ পরিসরে বললে রাষ্ট্র কারোই নিরাপত্তা দিতে পারছে না। নিরাপত্তা বিষয়টি বাংলাদেশ থেকে উড়ে গেছে। পহেলা বৈশাখে আবারও তার প্রমাণ হলো। সবাই বলছে, খুঁজে বের করো। এটি একটি বাজে কথা হয়ে গেছে। খোঁজাও হয় না আর বেরও হয় না। তাই তো রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে।’ একটি ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে আটজন মানুষকে মারা হলো। এমন হচ্ছে কেন, এই প্রশ্ন তো সবার মনেই। এর জন্য কি রাষ্ট্রকে দায়ী করা যায় না? অবশ্যই রাষ্ট্র দায়ী। অপরাধী ধরা না পড়া, বিচার না হওয়ার কারণেই এমন নৃশংসতা বারবার ঘটছে। অভিজিৎকে, ওয়াশিকুরকে দিনের বেলায় কুপিয়ে হত্যা করা হলো। কোনো প্রতিরোধ নেই, প্রতিকার নেই। এ কারণেই বলছি, রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন।

সায়েম সাবু : রাষ্ট্র, সমাজে এমন অধঃপতন ঘটল কেন?
হাসান আজিজুল হক : রাষ্ট্রের গঠনের মধ্যেই ভুল আছে। রাষ্ট্র গঠনে ত্রুটি আছে বলেই সমাজ গঠন হয়নি। ’৭১ সালের পর রাষ্ট্রটিকে যেভাবে গঠন করার কথা, সেভাবে গঠন করা যায়নি। এখানেই অধঃপতন।

সায়েম সাবু : এর দায়?
হাসান আজিজুল হক : মুক্তিযুদ্ধের পর রাষ্ট্রে কেউ না কেউ দায়িত্ব নিয়েছে। দায়টা তারই। রাষ্ট্রীয় একটি কাঠামো দাঁড়িয়েছে, তা তো অস্বীকার করার জো নেই। সেই কাঠামোতেই ভুল থাকতে পারে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাটিকে যারা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধও করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর যারা ক্ষমতায় এসেছেন, যারা রাষ্ট্র তৈরি করেছেন, সংবিধান রচনা করেছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আবার তাদের হাতেই সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে, তারাই আবার এই লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। সংবিধান কী, তা কী কারণে লঙ্ঘন হতে পারে, তা তারাই ভালো বলতে পারেন। সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে জানেন না, তারা সংবিধান লঙ্ঘনও করেন না। কারণ নাগরিকদের এ ব্যাপারে জানার অধিকারই দেয়া হয়নি। কথায় কথায় বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ ওঠে। আচ্ছা বলুন তো, কয়জন মানুষ তার বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে অবগত, নাগরিকদের কয়জন এই স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন?
শুরু থেকেই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করা হয়েছে। কয় দিন আগেও হিন্দুদের বাড়িতে, মন্দিরে হামলা করা হলো। রামুর বৌদ্ধমন্দিরে সম্মিলিতভাবে হামলা চালানো হলো। কোনো বিচার নেই, তদন্ত নেই। কেউ কিছু বলছিও না। পহেলা বৈশাখ হিন্দুয়ানি অনুষ্ঠান, এ কথাও শুনতে হয়। আমাদের মূর্খতা হিমালয়ের চেয়ে কয়েক হাজারগুণ উঁচুতে দাঁড়িয়েছে। না জানার ভুল। বাংলা সাল কে, কখন, কীভাবে প্রচলন করলো, তার কোনো হিসাব রাখেনি বাঙালি। হিজরি সাল ব্যবহার করা যেতেই পারে। ব্যবহার করা হয়েও বটে। কিন্তু সৌরজগতের সঙ্গে মিল রেখে এ অঞ্চলে পঞ্জিকা তৈরি করা হয়েছে, তা আপনি বাদ দিতে পারেন না। যুগে যুগে এই পঞ্জিকা পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তনে সম্রাট আকবরও ভূমিকা রেখেছেন। আমরাও পরিবর্তন করে আসছি। আমরা ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করলাম। পশ্চিমবঙ্গে উদযাপন করল ১৫ এপ্রিল। এই বিভাজন তো ১৯৪৭ সাল থেকেই হয়ে আসছে।

সায়েম সাবু : আজকের যে বিভাজন, তা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে কি না?
হাসান আজিজুল হক : একেবারে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর জন্যই এই বিভাজন। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্মে মানুষ হত্যার কথা বলা নেই। কেউ বলতে পারবে না, ধর্ম আক্রমণের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তর কোনো ব্যাখ্যাও নেই হত্যাকারীদের কাছে। তবুও ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করছে। অভিজিতের হত্যাকারীরা তাদের পক্ষে কী বলতে পারে ধর্মকে আশ্রয় করে। কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধুই মিথ্যার ওপর এই রক্তারক্তি। আর রাষ্ট্র তাতে সায় দিচ্ছে।

সায়েম সাবু : গোটা দুনিয়াই তো এমন বিভাজনে বিভক্ত?
হাসান আজিজুল হক : ইসলামিক স্টেটের সদস্যরা যা করছে, তা ধর্মের কাজ নয়। এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদেরই ক্ষতি করা হচ্ছে। আইএস কী ধ্বংসযজ্ঞই না চালাচ্ছে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায়। গোটা মধ্যপ্রাচ্য এখন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। সবই পালের গোদা আমেরিকার দোষ। তারাই সারা দুনিয়াতে বিষ ছড়াচ্ছে। আমেরিকাই সন্ত্রাসীদের লালন পালন করছে। সবই আমেরিকার পুঁজির স্বার্থে।
মানুষ বুঝতেও পারছে না তার মগজের, চিন্তার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে কে? প্রতিনিয়ত সে অন্যের স্বার্থে চিন্তা বিকিয়ে দিচ্ছে। কী পরবে, কী খাবে, এমনকি কী বলবে, সবই নিয়ন্ত্রণ করে দেয় আমেরিকা। সবাই ফেক মানুষের রূপ নিচ্ছে।

সায়েম সাবু : বলতে চাইছেন, সবই ডামাডোল?
হাসান আজিজুল হক : শুরু থেকেই বাঙালি ডামাডোলের মধ্য দিয়ে চলছে। বাঙালি বাস্তবের চেয়ে আবেগে বিশ্বাসী। আর এ কারণেই বারবার ঠেকতে হচ্ছে। ’৭১-পরবর্তী শাসন ব্যবস্থার ছাড় দিয়েও যদি বলি, তবুও বলতে হয় একটি বড় ঘটনা তো সমাজ পরিবর্তনে উপলক্ষ হিসেবে কাজ করে। ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশের জন্য বড় ঘটনা। শেখ সাহেব চেষ্টা করেছেন। কিন্তু থামাতে তো পারছিলেন না। এটি তো সত্য। অপশাসনের পথ চলা আজও শেষ হয়নি।
অমর্ত্য সেন বলেছেন, পৃথিবীর কোথাও দুর্ভিক্ষ হওয়ার সুযোগ নেই। কোত্থাও না। এরপরেও হচ্ছে। কেন? মানুষ নিজে নিজের দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করছে। বিশ্ব মোড়লরা খাবার সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছে। আর মানুষ না খেয়ে মরছে। ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ এভাবেই সৃষ্টি।
এরপর ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে যায়, তা বলা যেতেই পারে। জিয়াউর রহমান যতই গণতন্ত্রের কথা বলেন না কেন, তার ক্ষমতা গ্রহণের ইতিহাস তো ভোলা যায় না। স্বৈরপথেই তার উত্থান। জিয়াউর রহমানই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। বাঙালি-বাংলাদেশি প্রশ্ন তুলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের মূল জায়গায় আঘাত করেছেন। কী কী কারণে আমি বাঙালি, তা স্পষ্ট করে বলতে পারি। কিন্তু কী কারণে আমি বাংলাদেশি, তা আজও বুঝতে পারি না। কেউ বলতেই পারেন আমি বাঙালি নই। অবাঙালি তার পরিচয় বহন করতেই পারেন। বাংলায় কথা বলেন আর নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে প্রকাশ করেন, এর মানে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে আঘাত করা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঘাতকারীরা কখনও মনে করে না এই বাংলাদেশ তাদের। যুদ্ধাপরাধীরা কখনও স্বীকার করে না তারা অন্যায় করেছে। বিচার হচ্ছে, ফাঁসি হচ্ছে, তবুও তাদের মধ্যে কোনো অনুতাপ কাজ করছে না। এমনকি তাদের সহযোগীরাও এ বিষয়ে নীরব।
দুই নেত্রীর মধ্যে যা চলছে, তা দেখে মনে হচ্ছে ‘দুই সতীনের বিবাদ, মাঝখান থেকে সংসার উধাও।’ যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিচ্ছেন, তাদের কেউই বুক ফুলিয়ে বলেন না যে আমি বাঙালি। পুকুরে বেনোজল অর্থাৎ বন্যার জল ঢুকলে বড় মাছগুলো বেরিয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেনোজল ঢুকে সর্বনাশ করা হয়েছে। এখন আর নিয়ন্ত্রণ নেই।

সায়েম সাবু : বেনোজল ঠেকাতে পারলাম না কেন?
হাসান আজিজুল হক : ঠেকাবে কে? যাদের ঠেকানোর কথা তারাই পুকুর কেটে দিয়েছে। গোলাম আযমকে এ দেশে কে ফিরে এনেছেন। জিয়াউর রহমানের সেনা শাসনকে টপকে এরশাদও একই ধারা সৃষ্টি করেন। এরশাদও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন। স্বৈরশাসক এরশাদ যে নবধারায় রাজনীতি করেছেন, ’৯০-এর পর দুই নেত্রী একই ধারা সৃষ্টি করেছেন। এই রাজনীতি মানুষের কল্যাণ আনে না। মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টি করার জন্যই এমন রাজনীতি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। নইলে রাজনীতি ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করে কেমন করে? দেশ, রাজনীতি, পুুঁজি সবই তো ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন। সাধারণের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। দেশের ৯০ ভাগ পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র ১০ ভাগ মানুষ। আর ৯০ ভাগ মানুষ এই বৈষম্যমূলক রাজনীতির কারণে দিশেহারা।

সায়েম সাবু : এর মধ্য দিয়েও মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে। সমাজ এগুচ্ছে?
হাসান আজিজুল হক : এগুচ্ছে বটে। তবে মানুষের অধিকার হরণ করে সমাজের পরিবর্তন করা হচ্ছে। সবাই বলছে, চলেই তো যাচ্ছে। যারা চালাচ্ছেন, তারাও একই কথা বলছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, বেঁচে থাকা আর ভালো থাকা এক বিষয় কি না? রাজনীতির নামে এখন যা হচ্ছে, তা বানরের পিঠা ভাগাভাগি। যারা ক্ষমতায় আসেন তারা সব সময় ভাগের পাল্লাটা নিজের জন্য বেশি রাখেন। এভাবে করতে গিয়ে সাধারণের জন্য আর অবশিষ্ট কিছু থাকছে না।

সায়েম সাবু : এভাবে কোথায় গিয়ে ঠেকব আমরা। এই রাজনীতির শেষ কোথায়?
হাসান আজিজুল হক : শেষ আছে। চূড়ান্ত ঠেকে গিয়েও মানুষ দাঁড়িয়ে যায়। মানুষের শক্তির কোনো বিনাশ নেই। মানুষের শক্তিকে পরাজয় করা যায় মাত্র, কিন্তু ধ্বংস করা যায় না।

সায়েম সাবু : একই কথা বিপরীত শক্তির জন্যও প্রযোজ্য হওয়ার কথা?
হাসান আজিজুল হক : শক্তির বিপরীতে অপশক্তি। অপশক্তি দাঁড়িয়ে থাকে মিথ্যার ওপর ভর করে। মিথ্যা বিনাশী। এর ধ্বংস হবেই। সুতরাং আজকে যে জায়গায় গিয়ে মানুষ ঠেকেছে তা আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। কিন্তু তা শুভশক্তি দিয়েই মানুষ অতিক্রম করবে। যুগে যুগে শুভ শক্তিকে ধ্বংস করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। ধ্বংস হয়নি। হবেও না।

[প্রথম প্রকাশ, সাপ্তাহিক]

৫ thoughts on “টিএসসির নারী নিপীড়ন : হাসান আজিজুল হক স্যারের বিশেষ সাক্ষাৎকার

  1. বাঙালি জাতির সর্বনাশ এখানেই।

    বাঙালি জাতির সর্বনাশ এখানেই। ভয়ঙ্কর ঘটনাও আমরা দু’দিন পরে ভুলে যাই। কিছুই মনে রাখতে চাই না। কিন্তু যারা এসব ঘটায়, তারা সবই মনে রাখে। অপরাধীরা ভোলে না। কীভাবে শক্তির প্রদর্শন করা যাবে, তা ওরা ভালোভাবেই জানে। রাষ্ট্র আমাদের ভুলিয়ে রাখে। আমি বলছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় আজকের দিনে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মানা যায় না। যখন শুনতে পাই, সরকারের মদদপুষ্ট ছাত্রলীগের কেউ কেউ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তখন মনে হয় আত্মহত্যা করি।

    শেষ পর্যন্ত হাসান আজিজুল হকের মত সাহিত্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে অবস্থান নিলেন? :চিন্তায়আছি:

  2. শক্তির বিপরীতে অপশক্তি।

    শক্তির বিপরীতে অপশক্তি। অপশক্তি দাঁড়িয়ে থাকে মিথ্যার ওপর ভর করে। মিথ্যা বিনাশী। এর ধ্বংস হবেই।

  3. ইসলামিক স্টেটের সদস্যরা যা

    ইসলামিক স্টেটের সদস্যরা যা করছে, তা ধর্মের কাজ নয়। এর মধ্য দিয়ে মুসলমানদেরই ক্ষতি করা হচ্ছে। আইএস কী ধ্বংসযজ্ঞই না চালাচ্ছে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায়। গোটা মধ্যপ্রাচ্য এখন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। সবই পালের গোদা আমেরিকার দোষ। তারাই সারা দুনিয়াতে বিষ ছড়াচ্ছে। আমেরিকাই সন্ত্রাসীদের লালন পালন করছে। সবই আমেরিকার পুঁজির স্বার্থে।
    মানুষ বুঝতেও পারছে না তার মগজের, চিন্তার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে কে? প্রতিনিয়ত সে অন্যের স্বার্থে চিন্তা বিকিয়ে দিচ্ছে। কী পরবে, কী খাবে, এমনকি কী বলবে, সবই নিয়ন্ত্রণ করে দেয় আমেরিকা। সবাই ফেক মানুষের রূপ নিচ্ছে।

    বাঙালী প্রবাসী অনলাইন নাস্তিক কমিউনিটি এবার হাসান আজিজুল হক স্যারকেও ‘বুইড়া…’ বইলা গাইল শুরু করতে পারে।

  4. ব্যাপারটা নারীদের পুরুষ হয়ে
    ব্যাপারটা নারীদের পুরুষ হয়ে ওঠার মত হল !!!আর প্রতিরোধের দায়ভার নারীরা নিলেও ঠেকানোর চেয়ে প্রতিযোগিতা বাড়বে ….ভীতি পাইয়ে শ্রদ্ধা আদায় এটা কোন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারেনা ।

  5. রাজনীতির নামে এখন যা হচ্ছে,

    রাজনীতির নামে এখন যা হচ্ছে, তা বানরের পিঠা ভাগাভাগি। যারা ক্ষমতায় আসেন তারা সব সময় ভাগের পাল্লাটা নিজের জন্য বেশি রাখেন। এভাবে করতে গিয়ে সাধারণের জন্য আর অবশিষ্ট কিছু থাকছে না।

    একমত। স্যারকে ধন্যবাদ এত সুন্দর একটি সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *