জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সঙ্কট সমাধানে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা- দ্বিতীয় পর্ব

প্রথম পর্ব

আনুমানিক ৫০,০০০ থেকে ১০০,০০০ বছর আগে আগুন আবিস্কার(১১) এবং এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ছিল প্রশ্নাতীত ভাবে মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় আবিস্কার। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আমরা যত রকম কাজই করতে চাই না কেন তা কোন না কোন ভাবে তাপ উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে ঠিক যে কায়দায় তাপ উৎপাদন করা হচ্ছে তা চালু থাকলে যে সন্তানদের মুখ দেখে আমরা ভবিষ্যতের কথা ভাবি তাদের পুরো জীবদ্দশা শেষ করার মত সময় পৃথিবীর হাতে নেই। যদিও বিশ্বের মোট তেলের মজুদ আগামি ৪৩ বছরের মধ্যে(১২), আবিষ্কৃত গ্যাস আগামি ৬১ বছরের মধ্যে এবং সম্ভাব্য আবিষ্কৃত গ্যাস আগামি ১৬৭ বছরের মধ্যে(১৩) এবং আবিষ্কৃত কয়লা আগামি ১৪৮ বছরের মধ্যে এবং সম্ভাব্য আবিষ্কৃত কয়লা আগামি ৪১৭ বছরের মধ্যে(১৪) শেষ হয়ে যাবে। পাঠক হয়ত নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলছেন এই ভেবে যে প্রথম পঞ্চাশ বছর তেল দিয়ে চলব, তার পর আমাদের বাচ্চাকাচ্চারা গ্যাস জ্বালাবে, তাদের বাচ্চাকাচ্চারা থেকে শুরু করে নাতি পুতিরা কয়লা দিয়ে চলতে পারবে। তার পরের জেনারেশন কিভাবে চলবে তা ভাবতে আমার বয়েই গেছে। তাদের চিন্তা তারা করবে। তার পর হয়ত মহা নিশ্চিন্তে একটা ঘুম দিবেন এই ভেবে যে আগামি পাঁচ ছয়টা জেনারেশনের জন্য বিরাট ভাবে চিন্তা ভাবনা করে তাদের মোটামুটি উদ্ধার করে ফেললেন। আসলে ব্যপারটা এত সরল সমীকরণ নয়। সারা বিশ্বে তেল, গ্যাস, কয়লার মজুদ সব দেশে সমানভাবে তো নেইই, উপরন্তু যেখানেই যা আছে তার মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণও সব ক্ষেত্রে সবার কাছে নেই।
যেমন-
সবচেয়ে বেশী তেল সমৃদ্ধ দেশ(১৫)
দেশ শতকরা মজুদ
সৌদি আরব ২০.৫৬%
কানাডা ১৩.৮%
ইরান ১০.২%
ইরাক ৮.৯%
কুয়েত ৪.০%
সংযুক্ত আরব আমিরাত ৭.৬%
ভেনিজুয়েলা ৬.২%
রাশিয়া ৪.৬%
লিবিয়া ৩.০%
নাইজেরিয়া ২.৮%

সবচেয়ে বেশী গ্যাস সমৃদ্ধ দেশ(১৫)
দেশ শতকরা মজুদ
রাশিয়া ২৭.৮%
ইরান ১৫.৪%
কাতার ১৪.৫%
সৌদি আরব ৩.৮%
সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩.৪%
আমেরিকা ৩.২%
আলজেরিয়া ৩.১%
নাইজেরিয়া ২.৯%
ভেনিজুয়েলা ২.৪%
ইরাক ১.৯%

সবচেয়ে বেশী কয়লা সমৃদ্ধ দেশ(১৫)
দেশ শতকরা মজুদ
আমেরিকা ২৮.৬%
রাশিয়া ১৮.৫%
চীন ১৩.৫%
অস্ট্রেলিয়া ৯%
ভারত ৬.৭%
দক্ষিন আফ্রিকা ৫.৭%
ইউক্রেইন ৪%
কাজাখাস্থান ৩.৭%
সার্বিয়া ১.৬%
পোল্যান্ড ০.৯%

উপরের তিনটি তালিকা থেকে আমরা কিছু দেশের নাম আলাদা করে নেই। সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, ভারত, দক্ষিন আফ্রিকা, ইউক্রেইন, কজাখাস্থান, সার্বিয়া, পোল্যান্ড। এই দেশগুলোর পরিবর্তে আমরা যেখানে খুশী সেখানে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া বসিয়ে দিতে পারি। বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদী দেশ গুলোর তালিকায় অনায়াসে আরও চার পাঁচটি দেশের নাম বলাই যেতে পারে, কিন্তু আলোচনার সুবিধার্থে এই নাম গুলো বসালে যা পাই তা হল আমার পরবর্তী ছয় প্রজন্মের তেল, গ্যাস, কয়লা আসলে চার পাঁচটা দেশের হাতে। স্বভাবতই এই দেশগুলো তাদের ভবিষ্যৎ চার পাঁচশো বছরের মজুদ ঠিক রেখে বাকি যা থাকে তা অন্য দেশের কাছে বিক্রয় করতে চাইবে। আর যদি না থাকে তাহলে পৃথিবীর অন্য যেকোনো যায়গায় আবিষ্কৃত অথবা সম্ভাব্য আবিষ্কৃত সমস্ত তেল, গ্যাস, কয়লার মজুদ দখল করবে। একই সাথে এটাও আশা করবে যে উক্ত চার পাঁচশো বছরের মধ্যে নিশ্চয়ই এই গুলোকে বাদ দিয়ে দেয়ার মত টেকসই প্রযুক্তি চলে আসবে। তাহলে ধরে নেয়া যায় আমাদের মত ছোট এবং অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ তারা যেকোনো ভাবে হোক দখল করার চেষ্টা করবে। হয় যুদ্ধ করবে অথবা এসব দেশের লুটেরা, দালাল সরকারগুলোর মাধ্যমে এই সম্পদ হাতিয়ে নিতে চাইবে। বয়স্কদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প শুনে শৈশবে মনে হত একটা যুদ্ধ কতইনা রোমাঞ্চকর। দুর্ভাগ্য জনক হলেও সত্যি যে এই দালাল লুটেরা সরকারগুলো আমাদের সেই রোমাঞ্চ থেকেও বঞ্চিত করল। কারন কোন দেশে ঠিক এরকম দালাল লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু থাকলে সাম্রাজ্যবাদী দেশ গুলোর আসলে যুদ্ধ করে পয়সা নষ্ট করতে হয়না। এমনিতেই সব দিয়ে দেয়। বিনিময়ে তারা পায় সেইসব দেশে নিশ্চিন্তে জীবন যাপনের নিশ্চয়তা। দেশে একটা ফাঁপা অর্থনীতি বজায় থাকে, উপর থেকে দেখলে মনে হবে সব ভালই চলছে, কোন সমস্যা নাই, দেশ উন্নতির জোয়ারে ভাসছে। শাসকরা জনসভায় এটা করেছি সেটা করেছি বলে বিরাট বিরাট ডায়লগ মারবে। অনেকটা সেই গল্পটার মত “চেয়ারম্যান সাহেব আমারে লাথি মারতে মারতে বাজারের এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত নিয়া গেসে – আল্লা সারাইসে একটা থাপ্পড়ও দেয়নাই”। আসলে দেশটা শুকিয়ে যাওয়া ঝিঙে ফলের মত হয়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ক্ষেত্রে তাই ঘটতে যাচ্ছে। আর বিভিন্ন দেশের দালাল লুটেরা সরকার গুলো তাদেরকে চেয়ারম্যান সাহেবের থাপ্পড় মেরে অপমান না করার বদন্যতায় বিগলিত হয়ে বেঁচে থাকছে।

উপরের আলোচনায় ফসিল ফুয়েলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, সভ্যতার উন্নয়নে তার মহিমা কীর্তন করার উদ্দেশ্যে উল্লেখ করা হয়নি, কিংবা একারনেও উল্লেখ করা হয়নি যে যদি বাংলাদেশের সম্পদ সাম্রাজ্যবাদীদের খপ্পরে না পড়ে তাহলে এদেশের জনগন কত ভাল থাকবে এবং ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিন্ত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা নিয়ে মূলত এই আলোচনা। ধরে নেয়া যাক বাংলাদেশের দখল হয়ে যাওয়া সব জাতীয় সম্পদ জনগন সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারলো, ভবিষ্যতে এদেশের জাতীয় সম্পদের দিকে আর তাদের নেকনজর দিলনা, দেশ সমৃদ্ধি অর্জন করলো, ক্রয় ক্ষমতা বাড়ল এবং যখন জনগনের প্রয়োজন তখন তারা বাংলাদেশে তেল, গ্যাস, কয়লা রফতানিও করল। সে ক্ষেত্রেও জ্বালানি শক্তির প্রয়োজনে বাংলাদেশ কি ফসিল ফুয়েল ব্যবহার করবে? উল্লেখিত তিন প্রকারের ফসিল ফুয়েলই মূলত হাইড্রো কার্বনের বিভিন্ন ধরন। প্রথমেই আসা যাক ব্যবহৃত ফসিল ফুয়েলের মধ্যে সবচেয়ে কম ক্ষতিকর প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যপারে।

প্রাকৃতিক গ্যাস
প্রাকৃতিক গ্যাস বেশিরভাগ সময় পরিচয় পায় সবচেয়ে নিরাপদ ফসিল ফুয়েল হিসেবে। বাতাসে বিভিন্ন প্রকারের গ্যাসের যে মিশ্রণ তাতে যে গ্যাস যে অনুপাতে আছে তা প্রান বিকাশে সহায়ক বলেই পৃথিবীতে প্রানের বিকাশ ঘটেছে এবং বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। কিন্তু এই প্রাকৃতিক গ্যাস বাতাসে থাকা বিভিন্ন গ্যাসের প্রান সহায়ক অনুপাতকে এলোমেলো করে দেয়। প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালানোর (বিদ্যুৎ উৎপাদন অথবা যেকোনো কাজে) ফলে প্রচুর পরিমানে কার্বন-ডাই-অক্সাইড(CO2) তৈরি হয় এবং মিথেন(CH4) ছড়িয়ে পড়ে। IPCC এর করা চতুর্থ পর্যালোচনা রিপোর্ট থেকে জানা যায় ২০০৪ সালে প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালানোর ফলে ৫.৩ বিলিয়ন টন কার্বনডাই অক্সাইড বাতাসে মিশেছে(১৬) । যা একই সাথে বাতাসের বিভিন্ন গ্যাসের আনুপাতিক মিশ্রণ নষ্ট করার সাথে সাথে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কথা বাদ দিলেও প্রাকৃতিক গ্যাস নিজেই কার্বন-ডাই-অক্সাইডের চেয়ে অনেক বেশী ক্ষতিকর গ্রিন হাউস গ্যাস। যদিও বায়ুমণ্ডলে খুব কম পরিমানে প্রাকৃতিক গ্যাস ছড়ায় এবং বায়ুমণ্ডলে এর ক্ষতির প্রভাব ১২ বছর থাকে, যেখানে কার্বনডাই অক্সাইডের ক্ষতিকর প্রভাব ১০০ থেকে ৫০০ বছর থাকে তথাপি এর বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি করার ক্ষমতা কার্বনডাই অক্সাইডের চেয়ে ২০ গুন বেশী। Environmental Protection Agency (EPA) এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বছরে ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট অথবা বিশ্বে মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৩.২ ভাগ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে(১৭) (১৮)। যা ২০০৪ সালে মোট যে পরিমান গ্রিন হাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে তার ১৪.৩ ভাগ(১৯)।

জ্বালানী তেল
পেট্রোলিয়ামজাত তেল জ্বালানোর ফলে একই ভাবে কার্বন-ডাই-অক্সাইড(CO2) উৎপাদিত হয় কিন্তু সেই পরিমান প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়ে বহু গুন বেশি। এছাড়াও ভূগর্ভস্থ জলাধারে মিশে যাওয়ার ঘটনা প্রচুর পরিমানে ঘটে। পৃথিবীর প্রায় ৭০ ভাগ তেলের মজুদ কোন না কোন ভাবে ভূগর্ভস্থ জলাধারের সাথে সম্পৃক্ত। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে সমুদ্রের ভিতরে যে তেলক্ষেত্রগুলো থেকে তেল উত্তোলন করা হয় তা ঐ ক্ষেত্রের চারপাশের সমুদ্রের জীব-বৈচিত্র্যকে কে আংশিক অথবা পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলে(২০)। এর বাইরেও আছে বিভিন্ন সময়ে তেলবাহী জাহাজের দুর্ঘটনা অথবা সমুদ্রের ভিতর তেলক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ফলে কয়েকশ থেকে কয়েক লক্ষ টন তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা। এরকম কিছু দুর্ঘটনার ফলে আলাস্কা, মেক্সিকো উপসাগর, গালাপোগাস দ্বীপপুঞ্জের বাস্তুসংস্থান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়লে সামুদ্রিক পাখি, শামুক, ঝিনুক, মাছ, ডলফিন, তিমি ও অন্যান্য কিছু স্তন্যপায়ি সামুদ্রিক প্রানির গায়ে তেল জড়িয়ে যায় এবং তাদের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস ও খাদ্য গ্রহন বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে বংশ ধরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করার থাকেনা। এছাড়াও প্রাকৃতিক ভাবে জন্মলাভ করা কিছু উপকারি ব্যাকটেরিয়া যেমন মাইক্রোকক্কাস, আর্থোব্যাকটের, রোডোকক্কাস এর সংখ্যা ব্যাপক ভাবে হ্রাস পায়(২১)। সাম্প্রতিক কালে (৫ অক্টোবর ২০১১) নিউজিল্যান্ডের বে অফ প্লেনটিতে যে তেল ছড়িয়ে পড়েছে তা দেড় বছরের বেশী সময় ধরে ওই অঞ্চলের ক্ষতি সাধন করে যাচ্ছে। এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে মেক্সিকো উপসাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার কারনে ওই অঞ্চলের জীব-বৈচিত্র্য সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।

কয়লা
কয়লা ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত এবং পরিবেশগত প্রভাব আলোচনা করতে গেলে একে সভ্যতার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপাদান হিসেবে সারা পৃথিবীতে ব্যাপক হারে কয়লা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সেই বিদ্যুৎ মানুষের উপকারেও লাগছে কিন্তু মানবজাতি কয়লার এই উপকার গ্রহন করার জন্য বড় বেশী মূল্য দেয়। এর ক্ষতিকর দিক আলোচনা করে শেষ করার মত নয়। তবুও সংক্ষেপে কয়লা ব্যবহারের কিছু ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হল(২২) (২৩) ।
• সারা বিশ্বের কয়লা খনি গুলোতে প্রতি বছর দুর্ঘটনা এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে অক্রান্ত হয়ে ২৪,০০০ এর বেশী মানুষ মারা যায়।
• উড়ন্ত ছাই, বার্নারের নিচে জমা হওয়া ছাই, মারকারি, তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, আর্সেনিক, ভারি ধাতু সহ কোটি কোটি টন বর্জ্য উৎপাদন।
• উচ্চ মাত্রার সালফার মিশ্রিত কয়লা থেকে এসিড বৃষ্টি হওয়া।
• বিষাক্ত পদার্থ সমুহের ভূগর্ভস্থ জলাধারে এবং খনি এলাকায় মাটির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়া।
• স্থলভূমি, নদনদী, খাল–বিল বিষাক্ত উড়ন্ত ছাই এর কারনে বিষক্রিয়ায় অক্রান্ত হওয়া।
• কয়লা খনি এলাকা এবং এর আসে পাশের এলাকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে যাওয়া।
• কয়লা খনিতে বজ্রপাত অথবা আসেপাশের বনাঞ্চল থেকে লাগা আগুন কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত জ্বলতে থাকা।
• কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উড়ন্ত ছাই নিয়ন্ত্রন করার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে তা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হওয়া।
• কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিঃসরিত হওয়া বিষাক্ত মারকারি, সেলেনিয়াম, আর্সেনিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে।
• কার্বনডাইঅক্সাইডের নিঃসরণ। বায়ুমণ্ডলে কয়লার কারনে সবচেয়ে বেশী পরিমানে কার্বনডাইঅক্সাইড নিঃসরিত হয় যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী(২৪)।

আমেরিকার ৪৬ ভাগ বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদন হলেও নাসার গডার্ড ইন্সিটিউট অফ স্পেস স্টাডিজ এর ডিরেক্টর জেমস হ্যানসেন এর মতে , “Coal is the single greatest threat to civilization and all life on our planet.” (২৫)।
যে ক্ষতিকর দিকগুলো উল্লেখ করা হল সেগুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী যে জানেনা তা নয়। খুব সচেতন ভাবে বর্তমান সরকার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ৯ কিলোমিটারের মধ্যে বাঘেরহাট জেলার রামপালে ২৬৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার পরিকল্পনা করেছে। যেকোনো একটি ১০০০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্দুতকেন্দ্র থেকে ৩০০,০০০ টন ছাই, ৪৪,০০০ টন সালফার ডাই অক্সাইড, ২২,০০০ টন নাইট্রাস অক্সাইড, ৬০০০,০০০ টন কার্বন বর্জ্য হিসেবে তৈরি হয়(৪২)। এছাড়া ৭১৪,০০০ গ্যালন পানি প্রতিদিন দরকার হয় বিভিন্ন প্রক্রিয়া ঠাণ্ডা করার কাজে(৪৩)। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় কয়লা আসবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদী দিয়ে। ফলে ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত জাহাজের কারনে বনের শব্দ দূষণ, নদীর পরিবেশ দূষণ, বিদ্দুতকেন্দ্রের জন্য পশুর নদী থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবহৃত পানি, নিঃসরিত গরম পানি, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বাভাবিক দূষণ এই সব মিলে পশুর নদী একটি মৃত নদীতে পরিণত হবে এবং ব্যাপক মাত্রায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ায় কয়েক বছরের মধ্যে সুন্দরবন বলে কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবেনা। যে সুন্দরবন ধ্বংস হলে বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকবে না।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি সম্বন্ধে মোটামুটি সারা পৃথিবী সরব। ব্যাপক হারে বনভূমি ধ্বংস এবং ফসিল ফুয়েল পোড়ানোর কারনে যে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গত হয় তা ভূপৃষ্ঠ, সমুদ্র, জলবায়ু সহ সারা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা গত শতাব্দীতে প্রায় এক ডিগ্রী বৃদ্ধি করেছে এবং বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণার ফল অনুযায়ী অবস্থা এরকম চলতে থাকলে একবিংশ শতাব্দীতে এই তাপমাত্রা আরও তিন থেকে সাড়ে ছয় ডিগ্রী বৃদ্ধি পাবে(৩০)। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি সারা পৃথিবী জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা নষ্ট হওয়া, সুপেয় পানির অভাব সৃষ্টি করা, বিভিন্ন ধরনের রোগের মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া, মেরুঅঞ্চল সহ পৃথিবীর বরফাচ্ছাদিত এলাকা সমুহের বরফ গলে গিয়ে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সমতল ভুমি ক্রমান্বয়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া এবং ক্ষেত্র বিশেষে অনাবৃষ্টির কারনে মরুকরণের(৩১,৩২) ফলে সমগ্র মানব সভ্যতা হুমকির মুখে পড়ার একমাত্র কারন(২৬,২৭,২৮,২৯)। জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল উষ্ণ তাপদাহ সৃষ্টি হওয়া, অতিরিক্ত খরা, হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাত, অতি বন্যা, অসময়ে বন্যা, দীর্ঘায়িত বন্যা, সমুদ্রের পানিতে এসিডের ঘনত্ব ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে সমগ্র প্রজাতি ধ্বংস হওয়া ইত্যাদি। বিভিন্ন গবেষণা, পত্র-পত্রিকা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের করা খবর থেকে জানা যায় যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দুই তিনটি দেশের একটি বাংলাদেশ। এমনিতেই বাংলাদেশ অতীত থেকেই ঝড়, বাদল, বন্যার দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এর সাথে যদি জলবায়ু পরিবর্তনগত প্রভাব সমুহ যোগ হয় তাহলে এর ফল কি হবে সে অভিজ্ঞতা এবং ক্ষত বাংলাদেশ রীতিমত বয়ে বেড়াচ্ছে। একটি সহজ উদাহরন দেয়া যেতে পারে। হিমালয়ের বরফ গলা পানি ইন্দুর ৪৫ ভাগ, গঙ্গার ৯১ ভাগ এবং ব্রম্মপুত্রের ১৩ ভাগ পানির উৎস। তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারনে বরফ বেশী মাত্রায় গলছে। ফলে আগামী ৫০ বছর এই নদী গুলোতে পানির প্রবাহ বেশী থাকবে, ফলে অসময়ে বন্যার প্রকোপ বাড়বে। কিন্তু তার পরই শুরু হবে ভয়াবহ বিপর্যয়। কারন ততদিনে হিমালয়ের সমস্ত বরফ গলে যাবে। নদীগুলোর পানির উৎস মরে যাবার সাথে সাথে নদীগুলোও আর টিকে থাকবেনা। শুরু হবে এই সমগ্র অঞ্চল জুড়ে মরুকরণের প্রক্রিয়া(৩৩)। এমনিতেই বর্তমানে অতি বন্যা এবং গ্লাসিকাল লেকের পানির চাপ বেড়ে বিস্ফোরিত হবার কারনে পানি ছড়িয়ে পড়ায় ভারত ও নেপালের প্রচুর মানুষ স্রেফ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা, আইলা, সিডরের মত প্রলংকারি ঝড়ের পরবর্তী সময়ে লবনাক্ততা ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার কারনে বিশাল অঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধুমাত্র ৯৮ এর বন্যায় আর্থিক ক্ষতি সাধন হয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। শস্য উৎপাদনের মৌসুমে নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় এবং বৃষ্টিপাতের অভাবে এদেশে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় ৮৮ ভাগ পানি উঠাতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে। ফলে ভূগর্ভস্থ জলাধারের পানির স্তর প্রতি বছরই নিচের দিকে নামছে। এসবই হচ্ছে মূলত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে। যার প্রধানতম কারন ফসিল ফুয়েল। মজার কথা হল এই ফসিল ফুয়েল পোড়ানোর কারনে যে গ্রিন হাউস গ্যাস এবং তার ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধি তার জন্য মোটেই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো দায়ি নয়। এর জন্য মূলত দায়ী সাম্রাজ্যবাদী এবং অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র গুলো।

তৃতীয় পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *