এই অন্ধকার দুঃসময়ে দিল্লীর আম আদমি পার্টি কি হতে পারে আমাদের আলোকবর্তিকা?


কঠিন এক সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই দেশ। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার লোভে রক্তের হোলি খেলায় মত্ত। বহুরুপী যন্ত্রণায় সদাই কাতর সাধারণ মানুষ। ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে দেশে। সর্বশেষ যা ঘটল তা অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি লজ্জাষ্কর, অনেক বেশি পীড়াদায়ক। পহেলা বৈশাখের দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটু স্বস্তির নিঃশাস নিতে এসেছিলেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মানুষরূপী কতগুলো জানোয়ারের হাতে সর্ব সম্মুখে নিপীড়িত হলেন একাধিক নারী, লাঞ্ছিত হল সমগ্র বাংলাদেশ, ধর্ষিত হল বাঙ্গালী সংস্কৃতি।

আরেকদিকে সিটি কর্পোরেশনগুলোতে প্রবলভাবে বইছে নির্বাচনের হাওয়া। সেখানেও রাজনীতিবিদদের পেছনে ফেলে শিল্পপতিদের দৌরাত্ম্য। যে কয়জন রাজনীতিবিদ আছেন, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী আছেন, মূল ধারার মিডিয়ার প্রচারণায় তারা হলেন ব্রাত্য। ফলে এটা পরিষ্কারভাবেই বুঝা যাচ্ছে, হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্য থেকে নির্বাচনে জিতে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা কেউই নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত-সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি হবেন না। তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষের স্বার্থ থাকবে সবচেয়ে উপেক্ষিত। অথচ এই সাধারণ আম জনতাই এদের নির্বাচিত করবে। আবার এই আম জনতাই বার বার বছরের পর বছর তাদের হাতেই নির্যাতিত হবেন, নিপীড়িত হবেন। এর কি কোন শেষ নেই? এ থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই?

এমনই এক দুঃসহ অন্ধকার সময়ে আলোকবর্তিকা হয়ে উঠছে দিল্লীর আম আদমি পার্টি। এই দলটি সমগ্র পৃথিবীর গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে এবং সবচেয়ে ব্যতিক্রমী পার্টি হিসেবে নিজেদের বিশিষ্টতা তুলে ধরেছে। আমার আজকের লেখা এই দলটিকে নিয়ে। লেখাটা কিঞ্চিত বড় কিন্তু পাঠক যদি কষ্ট করে পুরোটা পড়েন এবং প্রাসংগিক মন্তব্য প্রদান করেন তবে কৃতার্থ বোধ করব।

পেছনের কথা
সাধারণত মিছিল, মিটিং, আন্দোলন, বন্ধ ইত্যাদির জন্য ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত(কারো কারো কাছে) ছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, বিশেষ করে কোলকাতা শহর। কিন্তু ২০১১ এর পরে শুধু ভারতের নয় সমগ্র বিশ্বের নজর ঘুরে গেল দিল্লির দিকে। কেননা এই বছর ৫ এপ্রিল তারিখে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক আন্দোলন, ভারতের দূর্নীতি বিরোধী আন্দোলন। যার মধ্যমনি ছিলেন গান্ধীবাদী প্রবীন ব্যক্তিত্ব আন্না হাজারে। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ অনেক পুরোন। একটা পর্যায়ে এটা একটা ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। রাজনীতি মানেই হচ্ছে লুটপাট, সরকারী কাজ মানেই হচ্ছে ঘুষ-বকশিশের খেলা, এতো জানা কথাই। সাধারণ মানুষও এটা মেনে নিয়েছিল, যদিও মনে নিতে পারে নি। মানুষ যে মনে নিতে পারে নি অর্থাৎ দেশের এই অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম ভিতর থেকে মেনে নিতে পারে নি, ভিতরে ভিতরে ঠিকই রাগে ক্ষোভে ফুঁসছিল, তা টের পাওয়া গেল আন্না হাজারের অনশন কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর। কেননা ২০১০ এর নভেম্বর থেকে ২০১১ এর মার্চ পর্যন্ত একটার পর একটা দূর্নীতি’র স্ক্যান্ডাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছিল কিন্তু সরকার বা প্রশাসনের কোন তরফ থেকেই কোন কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাছিল না।চারদিকে সরকার এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।

এমনই এক সময়ে দৃশ্যপটে হাজির হলেন আন্না হাজারে। তার দাবি ছিল, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সকল স্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের(এমনকি মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি সবাই এর আওতায় পড়বেন) বিরুদ্ধে আনীত দূর্নীতির অভিযোগের স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা দিয়ে একটি বিল পাশ করা যার নাম হচ্ছে জনলোকপাল বিল এবং এই বিল তৈরি করার জন্য সরকার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি নিয়ে একটা যৌথ কমিটি গঠন করা। বলাই বাহুল্য প্রথম দিকে সরকার তার দাবীর প্রতি কর্ণপাত করার প্রয়োজন মনে করে নি। সরকারের টনক নড়ল তখন, যখন দেখা গেল প্রাথমিক পর্যায়ে ১৫০ জন সাথীকে নিয়ে শুরু করা আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ এসে যুক্ত হয়ে গেছে এবং এই আন্দোলন শুধু দিল্লীতেই নয় সমস্ত ভারতের অনেকগুলো শহরের মানুষ সংহতি জানাচ্ছে। এই আন্দোলনের ঢেউ দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং আরো কিছু দেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। তারপর অনেক কিছু হল। আন্না হাজারে বারবার অনশন করলেন, দিল্লীর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিলেন, মিছিল হল, মিটিং হল এবং আরো অনেক কিছু হওয়ার পরে জনলোকপাল বিল শেষ পর্যন্ত তৈরি হল।

এই আন্দোলন শুধু আন্না হাজারেই করেন নি, ভারতের আরেক সাধক, যোগব্যায়ামের উপর বিশেষভাবে দক্ষ-যোগগুরু খ্যাত রামদেবও তার হাজার হাজার সমর্থকদের নিয়ে আলাদা করে দূর্নীতি বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু এই বিল আর কিছুতেই সংসদে পাশ করানো গেল না। দূর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত ভারতের রাজনীতবিদরা যে কখনোই এই বিল সংসদে পাশ করাবেন না তা এতদিনে এই আন্দোলনে জড়িত হওয়া অনেকের মনেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। আর এই উপলব্ধি থেকেই আন্না হাজারের সাথে থাকা কিছু মানুষ রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে এই ব্যাপারটাকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই কিছু মানুষদের মধ্যে কয়েকজন হলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মনীষ সিসোদিয়া, প্রশান্ত ভূষণ প্রমুখ। যদিও আন্না হাজারে এই ধরণের চিন্তা ভাবনার চরম প্রতিবাদ করলেন এবং কেজরিওয়ালদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। আর এরই সাথে সাথে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন ভারতের চলমান ইতিহাস থেকেও । কারন এর পরের ইতিহাস নির্মাণ করলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তার সাথে থাকা দিল্লীর সংগ্রামী জনতা।

কে এই কেজরিওয়াল?
ভারতের হরিয়ানা প্রদেশে ১৯৬৮ সালে জন্ম নেয়া অরবিন্দ কেজরিওয়াল হলেন তার ইঞ্জিনিয়ার বাবা গোবিন্দ রাম কেজরিওয়াল এবং মা গীতা দেবি’র প্রথম সন্তান। ছোট বেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র কেজরিওয়াল খৃষ্টান মিশনারী স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিখ্যাত প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইআইটি-খড়গপুর থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং এ গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেন। এরপর কিছুদিন টাটা কোম্পানীতে চাকরিও করেন। কিন্তু পরে টাটার চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভারত সরকারের আয়কর বিভাগে এসিস্ট্যান্ট জয়েন্ট কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। আর সেখানেই তিনি দূর্নীতির ভয়াবহ চিত্রটি দেখতে পেলেন। এই পর্যায়ে এসে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান রামকৃষ্ণ মিশন এবং মাদার তেরেসার সাথে কাজ করা মানবতাবাদী কেজরিওয়ালের মনে একটু একটু করে গড়ে উঠে দ্রোহ। তিনি অস্বীকার করেন প্রচলিত দূর্নীতির সাথে যুক্ত হতে। যে কারণে তাকে ডিপার্টমেন্টের ভিতরে কোথাও কোন কাজ দেয়া হয় না। তিনি প্রায় দেড় বছর কোন কাজ না করেই বেতন নিতে থাকেন। কিন্তু চাকরিটা ছাড়তেও পারছিলেন না, কারন চাকরিতে প্রবেশের পর উচ্চ শিক্ষার্থে তিনি যে দুই বছরের সবেতন ছুটি নিয়ে ছিলেন সেখানে উল্লেখ ছিল যে, কোর্স শেষে চাকরিতে যোগদান করে অন্তত তিন বছরের মধ্যে তিনি চাকরি ছাড়তে পারবেন না। তাই কষ্টে-সৃষ্টে দেড় বছর চাকরি করার পরে পরবর্তী দেড় বছর তিনি বিনা বেতনে ছুটি নিয়ে এর পরে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। তবুও শেষ রক্ষা হয় না। ভারত সরকার তার কাছ থেকে জরিমানা বাবদ ৯,২৭,৭৮৭ টাকা আদায় করে নেয়, যা তাকে তার বন্ধুদের কাছ থেকে হাত পেতে সংগ্রহ করতে হয়েছে।

যাই হোক, চাকরিতে থাকতে থাকতেই কেজরিওয়ালের নজরে আসে “পরিবর্তন” নামের একটি সংগঠনের কিছু কর্মকান্ড। যারা মূলত নাগরিকদের বিভিন্ন রকমের সমস্যা সঙ্কট যেমন, পাব্লিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম, সরকারী প্রজেক্ট, সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি, আয়কর, বিদ্যুৎ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোকে চিনহিত করত এবং তা নিরসন করতে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করত। তাদের আন্দোলনগুলো ছিল অদ্ভুত, ঠিক প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মত নয়। এমনকি এনজিওগুলোর মতও নয়। তারা কোন বড় প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা থেকে অনুদান নিত না কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করত। তাদের কর্মসূচিও ছিল ব্যতিক্রমী। যেমন তারা সরকারের যে সমস্ত অফিসে দূর্নীতি হয় সে সমস্ত অফিসগুলোর সামনে গিয়ে বসে পড়ত, সেখানে সত্যাগ্রহ আন্দোলন চালাত এবং যে সমস্ত ভিজিটররা অফিসে আসত তাদেরকে ঘুষ লেনদেন না করার জন্য অনুরোধ করত। পাশাপাশি, আন্দোলনকারীরা ভিজিটরদের কাজ নিজ উদ্যোগে বিনামূল্যে করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করত। তারা সরকারের বিভিন্ন আইন সংশোধনের জন্য কিংবা নতুন আইন প্রণয়নের জন্য জনস্বার্থে মামলা দায়ের করত।

মূলত এইসব আন্দোলনের চাপেই দিল্লী সরকার রাজ্য পর্যায়ে ২০০১ সালে Right To Information (RTI) আইন পাশ করে। যে আইনের মাধ্যমে একজন নাগরিক সরকারের রেকর্ড থেকে তথ্য জানতে আবেদন করতে পারে এবং যেকোন ধরণের তথ্য সরকার তাকে জানাতে বাধ্য থাকবে। “পরিবর্তন” এই আইনকে ব্যবহার করে লোকজনকে বিনামূল্যে কাজ করে দিয়ে সাহায্য করত। ২০০২ সালে “পরিবর্তন” দিল্লীর একটা এলাকায় সংগঠিত ৬৮টি সরকারী প্রজেক্টের তথ্য বের করে নিয়ে আসে, জনগণের কমিটি গঠন করে প্রজেক্টের আর্থিক হিসাবগুলোকে নিরীক্ষা করে এবং এই প্রক্রিয়ার ৬৮ট প্রজেক্টের মধ্যে ৬৪টিতেই প্রায় ৭০ লাখ টাকার দূর্নীতি উদ্ঘাটন করে। এরপর তারা এলাকার সাধারন মানুষকে নিয়ে এক গণ শুনানী আয়োজন করে এবং যে সমস্ত সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা তাদের এলাকার উন্নয়নকে ব্যাহত করছে তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে। এভাবে তারা ২০০৩ সালে রেশন কেলেঙ্কারি, ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারি ইত্যাদি ঘটনাগুলোকে জনসম্মুখে নিয়ে আসে।

এই সমস্ত কর্মসূচির সবকটাতেই কেজরিওয়াল সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। আর এই আন্দোলনগুলোর মাধ্যমেই আন্না হাজারে, অরুণা রয়, শেখর সিং প্রমুখ আন্দোলনকারীদের সাথে কেজরিওয়ালও জনগণের কাছে পরিচিত হন। ২০০৫ সালে তাদের উদ্যোগে Right To Information (RTI) আইনটি ভারতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাশ হয়। তিনি ২০০৬ সালে তার চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন এবং ঐ বছরই উদীয়মান নেতৃত্ব ক্যাটাগরিতে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরষ্কার লাভ করেন। এই পুরষ্কারের টাকা দিয়ে তিনি “Public Cause Research Foundation” প্রতিষ্ঠা করেন। তার সাথে বর্তমান দিল্লী সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী মনীষ সিসোদিয়া, কিরণ বেদী, প্রশান্ত ভূষণ প্রমুখ ব্যক্তিত্বরাও যুক্ত ছিলেন। তাই বলা যায়, কেজরিওয়ালের দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দুই দুই বার শপথ নেয়াটা একেবারে যাদু-মন্ত্রের মাধ্যমে হয়নি। তিনি রাজনীতির ময়দানে উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। বহু আন্দোলন সংগ্রাম ও ত্যগ-তিতিক্ষার পথ বেয়েই তাকে এখানে আসতে হয়েছে।

আম আদমি পার্টি কেন ব্যতিক্রম?
ব্যতিক্রম অনেক দিক থেকেই। আম আদমি পার্টি কোন নেতার ড্রয়িং রুমে জন্ম নেয় নি। কোন ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমুহের ক্ষমতার ভিত্তি আরও মজবুত করতে এই পার্টির জন্ম হয় নি। এই পার্টি জন্ম নিয়েছে উত্তাল গণ আন্দোলনের গর্ভে। দূর্নীতির বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়াই সংগ্রাম করতে করতে সম্মিলিত জনতার এক বাস্তব উপলব্ধির ফল হচ্ছে আম আদমি পার্টি। এই পার্টির জন্ম দিয়েছেন দিল্লীর হাজার হাজার সংগ্রামী জনগণ। যখন দূর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকারীরা অনুভব করলেন, যতই আন্দোলন হোন না কেন, সব কিছুর ক্ষমতা রাজনীতিবিদদের হাতে এবং প্রচলিত এই রাজনীতিবিদরা কিছুতেই তাদের দাবী মানবেন না। শেষ পর্যন্ত তারা বুঝলেন আন্দোলনকারীদেরকেই রাজনীতিতে নামতে হবে। তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মতামতের ভিত্তিতে কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীরা নতুন দল গড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। দলের নাম রাখা হল “আম আদমি পার্টি” অর্থাৎ, সাধারণ জনতার পার্টি।

নামেই এই দলের পরিচয় সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। বাকিটা তাদের কর্মকান্ডেও প্রতিফলিত হয়। রাজনীতি ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা বেশ কিছু নতুন বিষয় নিয়ে এসেছে যা এর আগে কেউ চিন্তাও করতে পারে নি। যেমন,

নির্বাচনী তহবিলে কিংবা দলের সাধারন তহবিলে তারা যে অর্থ সংগ্রহ করে এবং দলের কাজে যে পরিমাণ অর্থ তারা ব্যয় করে তার হিসাব কড়ায়-গন্ডায় দলের ওয়েব সাইটে দিয়ে দেয়। যেখান থেকে একজন ব্যক্তি পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে বসে তাদের দলের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা করতে পারে।

কিংবা বলা যায় তাদের দলের সাংগঠনিক পদ্ধতির কথা, যেখানে চিরস্থায়ী হাই কমান্ড বলতে কিছু নেই। দলের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সকল স্তরের প্রতিনিধিরাই পার্টির সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। দলের আভ্যন্তরীন সংবিধানও অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও কার্যকর।

অথবা বলতে পারি শিক্ষামন্ত্রী মনীষ সিসোদিয়ার কথা। যিনি মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পরে স্বশরীরে বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে আচমকা পরিদর্শন করছেন। স্কুলের কর্মকান্ড দেখছেন, কোন ভুল-ত্রুটি-অপরাধ নজরে পড়লে সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

এরকম অনেক বৈশিষ্ট্যই আছে যা আম আদমি পার্টিকে আর সবগুলো রাজনৈতিক দল থেকে আলাদা করে রেখেছে। নীতি আদর্শের ক্ষেত্রেও তারা ব্যতিক্রম। কোন বিশেষ আদর্শের প্রতি তাদের কোন কট্টরতা নেই। কোন একটা বিশেষ নীতি কিংবা দৃষ্টিভংগিকে তারা অমোঘ, অপরিবর্তনীয় মনে করে বসে নেই। তাদের সাফ কথা হচ্ছে, তারা জনগণের কল্যাণে যেখানে যা পাবেন তাই গ্রহণ করবেন আর যখন যেভাবে প্রয়োজন বর্জন করবেন। এক্ষেত্রে কেজরিওয়ালের একটা উক্তি তুলে দেয়া যায়-

Kejriwal said “We are aam aadmis. If we find our solution in the left we are happy to borrow it from there. If we find our solution in the right, we are happy to borrow it from there.
(কেজরিওয়াল বলেছেন, আমরা হলাম আম জনতা। আমরা যদি বামপন্থার মধ্যে আমাদের সমস্যার সমাধান খুঁজে পাই তবে সেখান থেকে তা খুশি মনে গ্রহণ করব। আমরা যদি ডানপন্থার মধ্যে আমাদের সমাধান খুঁজে পাই তবে আমরা সেটাও আনন্দের সাথে গ্রহণ করব।)

প্রসংগক্রমে পার্টির ওয়েবসাইট থেকে ছোট্ট একটি প্রশ্নের ছোট্ট একটি উত্তর এখানে দিয়ে দিচ্ছি। পাঠকরা একটু মনোযোগ দিয়ে পড়বেন। কারণ পরবর্তীতে এই বিষয়টার বিস্তারিত আলোচনা হবেঃ

প্রশ্নঃ আম আদমি পার্টি কি বামপন্থী?
উত্তরঃ আমরা আদর্শ দ্বারা চালিত হওয়ার পরিবর্তে অনেক বেশি সমাধানকেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক দল। একটা সময়ের পুরনো প্রবণতা হচ্ছে, যেকোন রাজনৈতিক দলকে হয় বামপন্থী নাহয় ডানপন্থী কিংবা মধ্যপন্থী হিসেবে চিনহিত করা হত। এই প্রক্রিয়ায় সবাই আসল ইস্যুটা কি এবং তার সমাধানই বা কি হবে তা ভুলে যেত। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমরা সমাধানকেন্দ্রিক থাকব। যদি কোন সমস্যার সমাধান বামপন্থার মধ্যে নিহিত থাকে তবে আমরা তা খুশিমনে বিবেচনা করব। একইভাবে এটা যদি ডানপন্থা কিংবা মধ্যপন্থায় খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে সেটাও আমরা বিবেচনায় নিব। আদর্শ হছে পন্ডিত ব্যক্তি এবং মিডিয়ার জন্য, যারা সবকিছুকে একটা ছকে ফেলে বিচার করতে চায়।

তবে আম আদমি পার্টির যে বক্তব্যগুলো সবচেয়ে বেশি মানুষের নজর কেড়েছে এবং দলটিকে ব্যতিক্রমী হিসেবে চিনহিত করেছে সেগুলোর উপর একবার চোখ না বুলালে পুরো বিষয়টা বুঝা যাবে না। তাই নিচে দলটির নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো থেকে কিছু কিছু অংশ উল্লেখ করে দিলাম-

মূল্য বৃদ্ধির হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করা হবে
আজকের দিনে জীবন যাপনের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেকারত্ব সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, দিল্লী এবং তার অধিবাসীদের সামগ্রিক উপার্জন বেড়েছে কিন্তু বাস্তবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও সেবার মূল্য আরও বেড়ে যাওয়ার কারনে (যেমন, বিদ্যুৎ, পানি, শাক-সব্জী, খাদ্য শস্য, পেট্রল, ডিজেল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি) জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে খারাপ। এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করতে হলে কেন্দ্রিয় রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তবে রাজ্য সরকার পরিস্থিতির উন্নয়নে স্বাধীনভাবে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। আম আদমি পার্টি নিম্ন লিখিত কর্মসূচি গ্রহণ করবে-

১। আমরা প্রত্যেক পরিবারের বিদ্যুৎ বিল ৫০% কমিয়ে দেব এবং প্রতি দিন ৭০০ লিটার পানি বিনা মূল্যে সর্বরাহ করব।
২। খুচরো পাইকারী ব্যবসার ক্ষেত্রে মজুতদারি ও মুনাফাবাজি রুখতে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হবে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কখনও কালো বাজারি টিকতে পারে না। আমাদের সরকার আইনের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে। কালোবাজারিরা গ্রেপ্তার হবে, তাদের গুদামগুলোতে রেইড করা হবে তাদের মজুত করা পণ্যগুলোকে বাজারে ছেড়ে দেয়া হবে যেন খাদ্য-শস্য, শাক-সব্জী এবং ফলমূল বাজারে স্বল্পমূল্যে সহজলভ্য হয়।
৩। শিক্ষা বাবদ ব্যয় প্রতিটি পরিবারের মোট ব্যয়ের একটি অপরিহার্য অংশ। আমরা প্রাইভেট স্কুলগুলোর লাগামহীন বেতন-ফি নিয়ন্ত্রণ করতে আইন প্রণয়ন করব এবং তারা যেন “ডোনেশন” সংগ্রহ করতে না পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিব। আমরা সরকারী স্কুলের মান উন্নত করব যেন সাধারণ মানুষ তাদের বাচ্চাদের সরকারী স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত হয়।
৪। আমরা সরকারি হাস্পাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি করব এবং হাসপাতালের সেবার মান ধারাবাহিকভাবে উন্নত করব যেন সাধারণ মানুষ হাসপাতালের সকল সেবা সহজেই পেতে পারে। এতে সাধারন মানুষের ডাক্তার এবং চিকিৎসা বাবদ ব্যয় অনেক কমে যাবে।
৫। জীবনের যাপনের ব্যয় বৃদ্ধির জন্য দূর্নীতি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। ক্ষমতায় আসার ১৫ দিনের মধ্যে আমাদের সরকার দূর্নীতিকে কঠরভাবে দমন করতে জন লোকপাল বিল কার্যকর করবে।
৬। মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ হচ্ছে কালো বাজারি অর্থনীতি। কালো অর্থনীতির উৎস মুখ হচ্ছে নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থ প্রদানের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া। আমাদের দল এমন একটা উদাহরণ তৈরি করেছে যা প্রমাণ করে জনগণের কাছ বৈধ অর্থ আদায় করেই নির্বাচনে লড়া যায়। কালো টাকার প্রবাহ বন্ধ করে আমরা সাধারন মানুষকে মূল্য বৃদ্ধি ও মুদ্রা স্ফীতি থেকে মুক্ত করব।
৭। রেশনের দোকান এবং “পাব্লিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম” সাধারণ মানুষকে মূল্য বৃদ্ধি থেকে রক্ষা করে। কিন্তু দিল্লীতে রেশন ব্যবস্থা দূর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। আমাদের সরকার মহল্লা সভার মাধ্যমে “পাব্লিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম” এর দূর্নীতিকে প্রতিরোধ করবে। নগদ টাকার বিনিময় বন্ধ করে পরিবারগুলোতে সরাসরি রেশনকৃত দ্রব্যগুলো সুষ্ঠুভাবে বিলি বন্টন হয় আমরা তা নিশ্চিত করব। আমরা ডাল এবং তেলকে “পাব্লিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম” এ অন্তর্ভুক্ত করব।
এই উদ্যোগগুলো মূল্যস্ফীতির বোঝা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করবে এবং তাদের পরিশ্রমের টাকার সদ্ব্যবহার করতে পারবে।

স্বরাজ বাস্তবায়ন : জনতার শাসন
সরকার গঠনের পরে প্রাথমিকভাবে সম্পাদিত কাজগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে, স্বরাজ আইনকে পাশ করানো যা জনগণের ক্ষমতাকে বিকশিত করবে এবং মহল্লা সভা গঠন করতে আইনী সহায়তা দান করবে। এর মাধ্যমে তৃণমল পর্যায় থেকে দূর্নীতি দমন করার ব্যাপারে অনেক দূর আগানো যাবে। উদ্যোগগুলো নিম্ন লিখিত উপায়ে বাস্তবায়িত হবে।

১। দিল্লীর ২৭২ টি মিউনিসিপল ওয়ার্ড রয়েছে। প্রত্যেকটি ওয়ার্ড ১০ থেকে ১৫ টি মহল্লায় বিভক্ত হবে যেখানে প্রত্যেকটি মহল্লায় ৫০০ থেকে ১০০০টি পরিবার থাকবে।
২ একটা মহল্লার ভোটারদের নিয়ে গঠিত সাধারণ সভাকে মহল্লা সভা বলে অভিহিত করা হবে।
৩। প্রত্যেক মহল্লায় ন্যুনতম একটা করে সভা আহবান করার জন্য নিয়ম থাকবে। অনেক অনেক সরকারী জটিলতা দূর্নীতিকে উৎসাহিত করে। সমস্ত ধরণের সরকারি প্রক্রিয়াকে সযথা সম্ভব সরল করা হবে।
৪। সরকারী কর্মকান্ডে স্বচ্ছতা আনতে এবং দূর্নীতি কমাতে আমরা তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করব।
৫। মহল্লা সভার নোটিশ প্রত্যেক পরিবারের কাছে পাঠানো হবে। জনগণকে বেশি বেশি করে অংশ গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা হবে। মহল্লা সভায় সাধারন মানুষ তাদের মহল্লা সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে রাজ্য সরকার ঐ সমস্ত ইস্যুতে তাদের প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। মহল্লা সভার একটি ছোট কর্মী পরিষদ থাকবে যারা সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করবে।
৬। “Citizen Local Area Development” ফান্ড প্রত্যেক মহল্লা সভায় এবং নাগরিক কল্যান এসোসিয়েশনে প্রদান করা হবে। প্রত্যেক মহল্লায় একটি সম্মিলিত ফান্ড বরাদ্দ করা হবে এবং এগুলো মহল্লা সভা কর্তৃক স্বাধীনভাবে কাজে লাগানো হবে। মহল্লার অবস্থিত পার্ক, রাস্তাঘাট, রাস্তার বাতি, ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৭। মহল্লার প্রত্যেক সরকারী কাজের বিল মহল্লা সভাকে সন্তুষ্ট করেই পরিশোধ করা হবে।
৮। মহল্লা সভাগুলো তাদের এলাকায় অবস্থিত রেশন দোকানের লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে এবং নতুন একজনকে লাইসেন্স প্রদান করতে পারবে যদি তারা প্রয়োজন মনে করে।
৯। জন্ম সনদ, মৃত্যু সনদ, আয় বিবরণী সনদ ইত্যাদি মহল্লা সভার অফিস থেকেই পাওয়া যাবে। SDM অফিসে আর যেতে হবে না এই কাজগুলো সম্পাদনের জন্য ঘুষ দিতে হবে না।
১০। সরকারী ভাতা গ্রহণকারীর তালিকা যেমন, বয়ষ্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ইত্যাদি মহল্লা সভা দ্বারা প্রণীত হবে।
১১। এলাকায় কোন মদের দোকান খুলতে হলে মহল্লা সভা এবং মহল্লায় অবস্থিত মহিলাদের অনুমতি নিয়েই খুলতে হবে। মহল্লা সভা এলাকায় অবস্থিত সরকারী স্কুল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের তদারকি করতে পারবে।
১২। কয়েক বছরের মধ্যে আমরা যখন দেখব মহল্লা সভার কাজকর্ম সঠিকভাবে চলছে এবং এটা ফলপ্রসু হচ্ছে তখন আমরা কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে আইন প্রণয়নে মহল্লা সভাকে জড়িত করব। ঐ নির্দিষ্ট আইনের বিলের প্রতিলিপি প্রত্যেক মহল্লা সভায় পাঠানো হবে এবং আইনটি প্রণয়নের সময় মহল্লা সভার মতামত বিবেচনায় নেয়া হবে। আবার উল্টো দিক থেকে মহল্লা সভাগুলোও কোন বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে আইন সভার কাছে প্রস্তাব রাখতে পারবে।

স্বচ্ছ রাজনীতি
রাজনীতিতে স্বচ্ছতা যে শুধু কাঙ্খিত নয়, এটা যে খুবই সম্ভব তা প্রমাণ করার জন্যই আম আদমি পার্টি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে ভারতের রাজনীতি যতটা না রাজনীতিগত ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিষয় তার চেয়েও অর্থ বিনিয়োগ করে এবং পেশী শক্তি ও স্বজনপ্রীতির ব্যবহারের মাধ্যমে সুবিধা আদায়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় অকল্পনীয় পরিমাণ টাকা ব্যয় করে। এটাকে ভবিষ্যতে মুনাফা করা এবং জনগণের সম্পদ লুটপাট করার আশায় একটা বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। আম আদমি পার্টি রাজনীতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত উদ্যোগগুলো গ্রহণ করেছেঃ

  • আমরা আমাদের দলকে দেয়া অনুদান এবং দলের পক্ষ থেকে ব্যয় করা প্রতিটি পয়সার হিসেব নিকেশ আমাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করি। আম আদমি পার্টির কোন প্রার্থীই ইলেকশন কমিশন বেঁধে দেয়া লিমিটের বাইরে একটা টাকাও অতিরিক্ত ব্যয় করে না।
  • একটি পরিবার থেকে কেবল মাত্র একজন ব্যক্তিই অফিস সম্পাদক বা দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হতে পারে।
  • যদি কোন প্রার্থীর দূর্নীতি কিংবা অপরাধের সাথে জড়িত থাকার প্রমান পাওয়া যায় তাহলে তড়িৎ গতিতে তার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে আমাদের দল রাজৌরি গার্ডেন এলাকা থেকে তার প্রার্থীকে প্রত্যাহার করে যদিও তুমুল প্রতিদ্বন্দিতামূলক নির্বাচনটিতে ঐ আসনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
  • আমাদের সরকার দিল্লী জনলোকপাল আইন পাশ করবে। এই আইনের আওতায় মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমএলএ ও সকল সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিচার করা যাবে।

দিল্লী জনলোকপাল বিল
আম আদমি পার্টি দিল্লী জনলোকপাল বিল পাশ করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পার্টি রাজনীতি থেকে দূর্নীতির শেকড় উপড়াতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এই বিলের ধারাগুলো হচ্ছে নিম্নরুপঃ

১। দিল্লী সরকারের সকল সরকারী কর্মকর্তারা(মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং এমএলএ সহ) লোকপালের তদন্তের আওতায় পড়বে। দিল্লীর সরকারী কর্মকর্তাদের তাদের সম্পত্তির বাৎসরিক বিবরণী প্রদান করতে হবে। যেকোন অঘোষিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।
২। যদি কোন সরকারী কর্মকর্তা দূর্নীতির অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হন তাহলে তাকে তার কর্ম থেকে অপসারন করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে।
৩। দূর্নীতি মামলার ক্ষেত্রে গঠিত তদন্তগুলোর সময় বাঁধা থাকবে। মন্ত্রী, এমপি কিংবা সচিবদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর ছয় মাস থেকে এক বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুরাহা করতে হবে। দিল্লীর লোকপালের প্রশাসনগত, অর্থনৈতিক এবং তদন্ত করার স্বায়ত্বশাসিত ক্ষমতা থাকবে।
৪। দিল্লীর প্রত্যেক সরকারী অফিসে একটি করে সিটিজেন চার্টার প্রয়োগ করা হবে। এই চার্টার প্রত্যেক সরকারী ডিপার্টমেন্টের সেবা প্রদানের কাজকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে সম্পাদন করতে বাধ্য করবে। সাধারন মানুষের দূর্গতি কম হয় এমন প্রক্রিয়া সূচিত হবে এবং যারা এই সিটিজেন চার্টারের অনিয়ম করবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
৫। যারা নিজে থেকে দূর্নীতিবাজদের ধরিয়ে দেবে তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে এবং পুরষ্কার প্রদান করা হবে। সৎ কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা হবে এবং তাদেরকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেয়া হবে।

বামপন্থী ভাবনায় আম আদমি
যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস সম্পর্কে জানেন, যাদের পাঁচসালা পরিকল্পনাগুলো গৃহিত হওয়ার প্রক্রিয়াগুলো সম্পর্কে ধারণা আছে, তাদের কাছে স্বরাজের বিষয়গুলো নিশ্চয়ই পরিচিত মনে হচ্ছে। স্বরাজের পয়েন্টগুলো পড়তে পড়তে সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবিধান রচনার প্রক্রিয়াটা কি মনের মধ্যে ভেসে উঠল? উঠতেই পারে, কেননা যে স্বরাজের ধারণা আজকে আম আদমি পার্টি আলোচনায় নিয়ে আসছে তার চর্চা বহু দিন আগেই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে হয়ে গেছে। আম আদমি পার্টি জনগণের জন্য যে সমস্ত কর্মসূচি বা পরিকল্পনা নিয়ে আসছে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি জনমুখী কর্মকান্ড পরিচালিত হয়েছে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে। তাহলে আজকের দিনে বামপন্থীরা আর পারছে না কেন? যে সমস্ত কাজ একটি মধ্যবিত্ত এবং বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর মানুষের নেতৃত্বে করে ফেলা যাচ্ছে সেই সমস্ত কাজ বামপন্থীদের নেতৃত্বে হচ্ছে না কেন? বামপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে আম আদমি কে কিভাবে মূল্যায়ন করা যায়?

আমার মতে বামপন্থী রাজনীতির ব্যর্থতার বাই প্রোডাক্টই হচ্ছে “আম আদমি পার্টি”র মত রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান। এই সমস্ত দলের সফলতার কারণ অনুসন্ধান করলেই বামপন্থীদের নিজেদের ব্যর্থতার কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। যে কাজটা বামপন্থীদের করার কথা ছিল, অর্থাৎ, ব্যাপক গণ আন্দোলন গড়ে তোলা, রাজনীতিতে গণ মানুষকে ওতোপ্রতোভাবে সম্পৃক্ত করা, স্তরে স্তরে নেতৃত্ব গড়ে তোলা ইত্যাদি কাজগুলো বামপন্থীরা করতে পারেনি বলেই সাধারন মানুষ নিজে থেকেই তার রাজনৈতিক দল তৈরি করে নিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের বাম আন্দোলনের দিকে যদি একটু নজর দেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে, যে সমস্ত দেশে বামপন্থী দলগুলো জনগণের এই স্বতস্ফুর্ত আন্দোলনের সাথে নিজেদেরকে মেলাতে পারছে এবং কট্টরতা ও হামবড়া ভাব বাদ দিয়ে অনেক ধরণের মানুষকে এবং একাধিক রাজনৈতিক দলকে সমন্বয় করে রাজনীতি করতে পারছে, তারাই রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। বুর্জোয়া শ্রেণীকে পরাস্ত করে ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে টক্কর দেয়ার মত শক্তি অর্জন করতে পারছে। আমরা যদি ভেনেজুয়েলা, চিলি, বলিভিয়া কিংবা অতি সম্প্রতি গ্রীসের রাজনীতির দিকে তাকাই তাহলে এই বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হব।

আম আদমি পার্টির মাধ্যমে জনগণের সকল সমস্যার সমাধান যে হবে না এবং দূর্নীতি কিংবা শোষণের শিকড় যে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় প্রোথিত তা কোনদিনও উচ্ছেদ হবে না এটা তো নিশ্চিত। কিন্তু এর মাধ্যমে যে উপকারটা হবে তা হচ্ছে, ব্যাপক মাত্রায় জনগণের মনে উন্নত সমাজ গঠনের স্বপ্ন তৈরি হবে। “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” তা শুধু কাগজে কলমে না থেকে প্রতিটা মানুষের মননেও গেঁথে যাবে। মানুষ তার নিজের ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে যাবে এবং যখন একটা পর্যায়ে গিয়ে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতার কারণেই আম আদমি পার্টি আর জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না তখন এই দলকে হয় পুঁজিবাদ বিরোধী লড়াই শুরু করতে হবে আর নাহলে অন্য কোন সত্যিকারের পুঁজিবাদ বিরোধী বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে চলে আসার পরিস্থিতি তৈরি হবে। মাঝখান থেকে এক দল সচেতন, সক্রিয় ও সঙ্ঘবদ্ধ জনগণ তৈরি হয়ে যাবে যারা সমাজ বিপ্লবের জন্য অপরিহার্য উপাদান। যাদের অনুপস্থিতিতে আর যাই হোক সমাজ বিপ্লব কোনদিনও সম্ভব হবে না কিংবা কিছু দিনের জন্য ক্ষমতায় গেলেও সেই বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়া যাবে না।

তাই বাম দলগুলির উচিৎ যেখানেই এই সমস্ত আন্দোলন স্বতঃস্ফুর্তভাবে গড়ে উঠেছে সেখানেই আন্দোলনে সর্বশক্তি নিয়ে যুক্ত হয়ে যাওয়া। আর যেখানে তা এখনও গড়ে উঠেনি সেখানে তা নিজেদের উদ্যোগে গড়ে তোলা। আজকে যে সকল বামপন্থী দল নির্বাচনে অংশ নেন কিংবা বর্তমানের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তাদের উচিৎ আম আদমি পার্টির নির্বাচনী ইস্তেহার এবং তাদের কর্মকান্ড ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় থেকেও কি করে বুর্জোয়া নির্বাচন পদ্ধতিকে বামপন্থীরা বিপ্লবের অনুকূলে ব্যবহার করতে পারে তার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখান থেকে তারা নিতে পারেন। বামপন্থী নেতা কর্মীদের অতি স্বত্তর নিজেদের রাজনীতির মূল্যায়ন করা উচিৎ। তাদের কাজের ধরণ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা উচিৎ। নাহলে ইতিহাসের গতিপথ থেকে ছিটকে পড়াটাই হবে অবধারিত।

সাধারণ মানুষের ভাবনায় আম আদমি
এখন আপনি যদি আসলেই একজন আম আদমি হন, আপনি যদি বামও বুঝেন না, ডানও বুঝেন না, পরিবার পরিজন নিয়ে একটু ভালোভাবে নিরাপদে বাঁচতে চান তাহলে আপনার পক্ষ থেকে আম আদমিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? আপনি রাজনীতির ধারে কাছেও যান না কোন দিন। শুধুমাত্র নির্বাচন আসলে মহামূল্যবান ভোট প্রদান করে নিজের নাগরিক কর্তব্য সম্পাদন করেন। আপনি কিভাবে দেখতে পারেন আম আদমি পার্টিকে?

এটা দেখার আগে আপনাকে একবার এ দেশের রাজনীতির চালচিত্র দেখে নিতে হবে। এই যে গত ২৫ বছর ধরে অর্থাৎ, এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পরে দুইটা দল কিংবা দুই দলের নেতৃত্বে দুই জোটের হাতে দেশটাকে তুলে দিলেন প্রতি পাঁচ বছর পর পর, তার ফলটা কি পেলেন? অবাধ দূর্নীতি, স্বজন প্রীতি, লুটপাট, কিছু কিছু মানুষের আংগুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যাওয়া, নীতি-আদর্শ-মূল্যবোধের অভূতপূর্ব অধঃপতন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মানকে তলানিতে নিয়ে আসা, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদের উত্থান ইত্যাদি ইত্যাদি আর কত বলব? এই সব নিয়ে কি খুব সুখে আছেন? এই দেশটাকেই কি চেয়েছিলেন আপনি? যখন আপনার কাছের মানুষ ঘর থেকে বের হন তখন কি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন দিন শেষে সে অক্ষত হয়ে ঘরে ফিরতে পারবে কি না? যখন নিজে বাসে চড়ে কোথাও যান তখন কি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন যেকোন সময় চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোয় রোড এক্সিডেন্টে মারা যাবেন না কিংবা পেট্রল বোমায় ঝলসে যাবেন না?

যখন এক দল যেকোন উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য শত শত মানুষকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিতে কুন্ঠা বোধ করে না, যখন আরেকদলের যেকোন উপায়ে ক্ষমতায় থাকার জন্য পাখির মত মানুষ মেরে ফেলতে হাত কাঁপে না, উপর থেকে নিচ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করে ফেলে তখন আপনার কি ভূমিকা থাকে? আপনি বড়োজোর “দুচ্ছাই, এই দেশটা রসাতলে গেল, কিচ্ছু হবে না এই দেশে” ইত্যাদি বলে টলে প্রতিদিনকার জীবন যেমন করে কাটান সেভাবেই কাটাতে থাকেন। অফিসে কলিগদের সাথে কিংবা সন্ধ্যায় বন্ধুদের আড্ডায় ইচ্ছেমত রাজনৈতিক দলগুলোকে গালাগালি করে, নেতাদের গুষ্ঠি উদ্ধার করে বাসায় ফিরে খেয়ে দেয়ে স্টার জলসা কিংবা টক-শো দেখে হাই তুলতে তুলতে ঘুমিয়ে পড়েন। এই তো বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের জীবন? তো কি মনে করেন কোন কাজ হচ্ছে এতে? কোন কাজ হবে কোনদিন?

আজ দিল্লীর রাজনীতিতে যে আকাল চলছে সেই আকাল বাংলাদেশের রাজনীতিতেও চলছে। কিন্তু দিল্লীর জনগণের সাথে আপনার তফাৎ হচ্ছে দিল্লীর জনগণ তাদের নীতি নির্ধারণীর দায়িত্ব নিজের হাতেই নিয়ে নিয়েছে। আর আপনি বসে বসে স্বপ্ন দেখছেন কোন একদিন একটা মহামানবের নেতৃত্বে রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন হবে। কোন একটা ভালো রাজনৈতিক দল দেশে উদয় হবে আর আপনার সকল সমস্যার সমাধান করে দেবে। আপনি নিশ্চিন্তে আপনার পরিবার পরিজন নিয়ে পুনরায় রাজনীতিবিদদের দোষ খুঁজতে খুঁজতে সুখে শান্তিতে জীবন কাটিয়ে দেবেন। এই যদি হয় আপনার ভাবনা তাহলে বলতেই হয় আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এই দিন আর কখোনই আসবে না। কেউ এসে আপনাকে উদ্ধার করে দিয়ে যাবে না। এখন সময় হয়েছে নিজের দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেয়ার। পারিবারিক, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত কাজের পাশাপাশি একটু রাজনীতিতেও হাত লাগান। এলাকার সমস্যা সঙ্কট নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন, যার যার চোখে যে যে সমস্যা পড়বে সাধ্য অনুযায়ী সমাধান করার চেষ্টা করেন। একা না পারলে আরও কয়েকজনকে উৎসাহিত করেন। চোখের সামনে যখন অভিজিত রায় কিংবা বন্যা আহমেদরা খুন হবে কিংবা পহেলা বৈশাখের উৎসবে ভরা প্রকাশ্য দিবালোকে নারীরা নরপশুদের আক্রমণে উলঙ্গ হবেন তখন ক্যাবলা কান্তের মত দাঁড়িয়ে থাকবেন না, প্রতিবাদ করেন, পারলে প্রতিরোধ করেন। এক কথায় চিরাচরিত অরাজনৈতিক জীবন যাপনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। আর নাহলে এর পরের টার্ম কিন্তু আপনার। নিস্ক্রিয়, নির্জীব থাকতে থাকতে কখন যে আপনার শরীর থেকেও সম্ভ্রমের শেষ চিণহটুকু লোপাট হয়ে যাবে টেরও পাবেন না। এই ক্ষেত্রে আম আদমি পার্টি হতে পারে আপনার পর্যবেক্ষণের বিষয়। দেখেন এদের কাছে থেকে কিছু নিতে পারেন কিনা। এই অংশটা একজন বিশিষ্ট দার্শনিকের বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করছি(নাম মনে নাই সম্ভবত প্লেটো কিংবা এরিস্টেটল),

আপনি রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করলেন না মানে হচ্ছে আপনার চেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ দ্বারা আপনি শাসিত হলেন

শেষ কোথায়?
শেষ কোথায় জানার আগে নিশ্চয়ই একটা প্রশ্ন মনে উঁকি মারছে, এতো যে প্রতিশ্রুতির বন্যা তারা বইয়ে দিল, ক্ষমতায় গিয়ে কি আর তা রাখবে? যে যায় লঙ্কায় সেই তো হয় রাবণ। হয়ে গেল তো বেশ কিছু দিন। তা কি করেছে এই সময়ে তারা? কিছু শুরু করতে পেরেছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাদের ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজে ঢুঁ মেরেছিলাম। যা পেয়েছি তা বাংলায় আপনাদের জন্য দিয়ে দিলাম। এগুলো হচ্ছে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পর পঞ্চাশ দিনের মধ্যে সম্পাদিত কাজের তালিকা-

বিদ্যুৎ খাতঃ

  • ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিল ৫০% হ্রাস করা হয়েছে।
  • সাবেক DERC প্রধাণের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ বিভাগের উপর শ্বেতপত্র প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পানিঃ

  • প্রতি মাসে ২০ হাজার লিটার পানি প্রতি ঘরে ঘরে সরবরাহ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

নারীর নিরাপত্তাঃ

  • দিল্লী সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লী পুলিশের কাছে দিল্লীর রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর তালিকা চাওয়া হয়েছে।
  • নারী উত্যক্তকারীদের প্রতিহত করার জন্য দিল্লী শহরের লোকাল বাসে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত মার্শাল নিয়োগ করা হয়েছে এবং দিনের যেকোন সময় বাসগুলোতে আচমকা রেইড করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।

শিক্ষাঃ

  • দুইশ’র বেশি প্রাইভেট স্কুলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বেতন ফি আদায়ের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে।
  • কুলগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু হয়ে গেছে।

বাণিজ্যঃ

  • শহরের ব্যবসায়ীদের ট্যাক্স/ভ্যাট প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং R9 ফরম পূরণের তারিখ বর্ধিত করা হয়েছে।
  • স্ট্যাম্প ভেন্ডর লাইসেন্স এখন থেকে অনলাইনে পাওয়া যাবে।

প্রশাসনিকঃ

  • জন্ম/মৃত্যু এবং অন্যান্য সার্টিফিকেটগুলো এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে অনলাইনে পাওয়া যাবে।
  • রেশনে কার্ডও অনলাইনে পাওয়া যাবে।

পরিবেশঃ

  • পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র দ্বারা ৬৬টি আচমকা পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং ১৮ টি জায়গায় সমস্যা খুঁজে পাওয়া গেছে।
  • আবর্জনা পোড়ানো হয় এমন ১৮টি প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে যারা খোলা জায়গায় আবর্জনা পোড়ায়। তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে।
  • অতিরিক্ত ভারবাহী পণ্য বোঝাই গাড়ির ১৭০ টি চালানকে সনাক্ত করা হয়েছে যারা পরিবেশ দূষণের জন্য অন্যতম দায়ী।

অন্যান্য সিদ্ধান্তসমুহঃ

  • ২০৮০০ ই-রিক্সাকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এর আগে যেখানে মাসে ৬০০টি করে দেয়া হত।
  • প্রায় এক লক্ষ বয়ষ্ক ভাতার আবেদন আগে থেকে ঝুলে ছিল। যার ৩০ হাজার দিল্লী সরকার কর্তৃক অনুমোদন দেয়া হয়েছে এবং এ মাসে আরও বিশ হাজার দেয়া হবে।
  • অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা আগে প্রতি মাসে ৭৫০ টাকা বেতন পেত যা এখন ৪-৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
  • ফরেনসিক ল্যাব্রেটরিগুলোর দিকে মনযোগ দেয়া হয়েছে।
  • অক্টোবরের মধ্যে মন্ডলী জেল তৈরি হয়ে যাবে।
  • হাসপাতালগুলোকে পুনঃরায় ডিজাইন করা হচ্ছে, যেন আরও বেশি করে বেড ধারণ করতে পারে এবং গরীব মানুষরা আরও বেশি স্বাস্থ্যসেবা পায়।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনেকগুলো প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ঝটিকা সফর করেছে এবং সুয়াইন ফ্লু’র টেস্টের চার্জ যেন ৪৫০০ রুপির অতিরিক্ত কেউ নিতে না পারে তার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
  • সকল সরকারী হাসপাতালে বিনামূল্যে সুয়াইন ফ্লু পরীক্ষা করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
  • ৩৬০০০ হাজার চুক্তিভিত্তিক সরকারী নিয়োগকে স্থায়ীকরণ করা হয়েছে যার মাধ্যমে প্রায় ১৮০,০০০ মানুষ উপকৃত হবে।
  • মাফিয়া’র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে পুলিশ কনস্টেবল মারা গিয়েছিলেন তার পরিবারকে এক কোটি রুপি ক্ষতি পূরণ দেয়া হয়েছে।
  • প্রাইভেট গ্যাস তেল ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর উপর অডিট পরিচালনার আদেশ দেয়া হয়েছে।
  • গৃহহীনদের জন্য তিনশ’র বেশি রাত্রি যাপন কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
  • লাল বাতিওয়ালা সাইরেন অপসারণ করা হয়েছে এবং ভিআইপি সংস্কৃতি’র অবসান করা হয়েছে।
  • শিশুদেরকে নার্সারিতে ভর্তির জন্য হেল্প লাইন চালু করা হয়েছে।
  • দূর্নীতি বিরোধী হেল্প লাইন ১০৩১ চালু করা হয়েছে। যেখানে প্রতিদিন ১০০০০ জন মানুষের অভিযোগ গ্রহন করা সম্ভব।

এই হচ্ছে, প্রথম পঞ্চাশ দিনে সম্পাদিত তাদের কাজের খতিয়ান। ছোটখাটো সাফল্য আরও আছে। সবগুলো আর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। এভাবেই যদি চলত, কোন ঝামেলা নাই, শুধু সাফল্য আর সাফল্য, তাহলে কি দারুনইনা হত। কিন্তু এমন হয় শুধুমাত্র রুপকথায় আর সিনেমায়। বাস্তব জীবনে এমন হয় না কখনোই। এদের ক্ষেত্রেও সবকিছু ভালোভাবে চলছে না। ক্ষমতায় যাওয়ার এক মাসের মধ্যে দলের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্ত ভূষন, শান্তি ভূষণ প্রমুখদের সাথে দলের বাকি নেতৃত্বের দ্বন্দ লেগে যায় এবং দুই মাসের মধ্যে তারা দল থেকে বেরিয়ে আলাদা দল গঠন করেন। এখন দেখা যাক তারা কি করেন আর কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে আম আদমি পার্টি এই বিদ্রোহকে কিভাবে মোকাবেলা করে।

তাই বলা যায়, শেষ কথা বলতে কিছু বলার সময় এখনও আসে নি। এ প্রসঙ্গে আমি শুধু দিল্লীর প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ও বর্তমানে আম আদমি পার্টি’র একজন সদস্য আশুতোষ বাবুর একটি আর্টিকেলের কিছু অংশ উল্লেখ করতে চাই। বাকিটা সময়ই বলে দেবে।
পার্টিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সমস্যাকে তিনি যেভাবে দেখছেন,

…আমি এটাকে বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা হিসেবেই দেখছি। এটাকে একজন কিশোরের সাথে তুলনা করা চলে যে তার কৈশোরকে অতিক্রম করে একজন পরিণত মানুষ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা প্রতিটা মানুষের জন্যই একটি ঝুঁকিপূর্ণ সময়। তাকে অনেক কিছুই শিখতে হবে তার শৈশব-কৈশোরকে পিছনে ফেলে যেতে হবে এবং এই প্রক্রিয়াটা এখনও সম্পন্ন হয় নি।
আমরা সবাই জানি AAP একটি আন্দোলনের মধ্য থেকে জন্ম নিয়েছে। ভারত বনাম দূর্নীতি-যা আন্না হাজারের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। একটা বিশাল অংশের জনগণ তাকে সমর্থন করেছিল।এই আন্দোলন জাতীয় রাজনীতির গতিপথকে বদলে দিয়েছিল। দূর্নীতি রাজনীতির একটি প্রধাণ ইস্যু হয়ে উঠল। জনগণ জেগে উঠলেন এবং দূর্নীতিকে নির্মূল করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। এই আন্দোলনের অন্যতম পরিণতি হল কেজরিওয়ালের নেতৃত্বের একটা অংশ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, একটা রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে এবং নির্বাচনে লড়তে হবে কেননা এটা নিশ্চিতভাবেই বুঝা যাচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত না রাজনীতিকে ভিতর থেকে পরিষ্কার করা যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত গণতন্ত্রও স্বচ্ছ এবং নাগরিক-বান্ধব হবে না।
এই মানুষদের চোখ ভরা স্বপ্ন ছিল, ছিল সুন্দর, আদর্শভিত্তিক, সম্পূর্ণ নতুন এক বিশ্বের স্বপ্ন। এখানে নৈতিকতা মূল্যবোধ জড়িয়ে ছিল। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল বাস্তব জীবনে রাজনীতি এত সুন্দর নয়, এখানে আদর্শ কোন ব্যাপার নয়, নৈতিকতা কোন ব্যাপার নয়। এটা কোন স্বপ্ন নয়। এটা বাস্তব পৃথিবী। এখানে ক্ষমতাই শেষ কথা, শুধুই ক্ষমতা।
AAP হচ্ছে একটি অভূতপূর্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র যা নৈতিকতাকে ক্ষমতার সাথে মিলিয়ে দেবে, নীতি –আদর্শকে বাস্তবের সাথে মিশিয়ে দেবে, ভারতীয় রাজনীতির দোদুল্যমান পেন্ডুলামকে ভারসাম্যে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে, সমাজব্যবস্থার মধ্যে সুস্থধারার পুনঃর্জাগরণ ঘটাবে। কিন্তু এটি রাতারাতি হয়ে যাবে না। তাকে সময় দিতে হবে। এর বয়স মাত্র দুই বছর। এটি বিকশিত হচ্ছে। তার বেড়ে উঠাটা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হচ্ছে কিন্তু তার শরীর তার বেড়ে উঠার সাথে মানিয়ে নিতে সময় নেবে। এটি একটি শিশুর মত যাকে হঠাৎ করে অনেক অনেক বড় বড় মানুষের আড্ডায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
…এটা সহজ নয়। চলুন ফুলটিকে ফুটতে দেই। শিশুটিকে বড় হয়ে উঠতে দেই। তার সম্পূর্ণ হয়ে উঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। একটা আন্দোলনকে সম্পূর্ণ পার্টিতে রুপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। এটি প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঘটে, আম আদমি পার্টির ক্ষেত্রেও এটা ঘটবে। এ নদীতে আগুন আছে, এ আগুনে ডুবতে হবে। আক্ষরিক অর্থেই আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হতে হবে। এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নাই।

তথ্যসূত্র
১। http://en.wikipedia.org/wiki/Aam_Aadmi_Party
২। http://en.wikipedia.org/wiki/Arvind_Kejriwal
৩। www.aamaadmiparty.org/
৪। http://www.ndtv.com/opinion/its-a-crisis-of-adolescence-writes-ashutosh-on-aaps-troubles-746327

৬ thoughts on “এই অন্ধকার দুঃসময়ে দিল্লীর আম আদমি পার্টি কি হতে পারে আমাদের আলোকবর্তিকা?

  1. ভারতীয় জনগণকে বৈশ্বিক ও দেশীয়
    ভারতীয় জনগণকে বৈশ্বিক ও দেশীয় মুনাফাখোরদের হাত থেকে রক্ষা করতে আম আদমির কর্মসূচী কি? এই প্রশ্নটার উত্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটাই ঠিক করে দেবে এরকম দল আমাদের আদৌ দরকার আছে কিনা!

    1. ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।
      ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য। এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান হচ্ছে, সাধারণ মানুষের স্বার্থে, জনজীবনের সমস্যা সমাধানে তারা লড়াই চালিয়ে যাবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে লড়াই করতে করতে যখন যে ধরণের উদ্যোগ নিতে হয় তারা তা নেবে। লড়াই সংগ্রামের এক পর্যায়ে যদি ব্যাপকভাবে অনুভূত হয় যে, এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা না ভাংলে আর চলছে না। এটা ভেঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মাণ করতেই হবে। তাহলে তারা সে পথেই আগাবে। এ ব্যাপারে তাদের কোন পূর্ব সিদ্ধান্ত নাই। তবে এ ধরণের পার্টি আমাদের দেশে অবশ্যই দরকার। কারণ, এই ধরণের পার্টি আর কিছু করতে পারুক কিংবা না পারুক, অন্তত ব্যাপক অংশের সাধারণ মানুষকে সচেতন, সক্রিয় এবং সংঘবদ্ধ করে ফেলতে পারবে। যা এই মুহূর্তে খুবই প্রয়োজন।

      1. আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভারতীয়
        আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভারতীয় জনগণকে বৈশ্বিক ও দেশীয় মুনাফাখোরদের হাত থেকে রক্ষা করতে আম আদমির কর্মসূচী কি? আপনি উত্তর দিলেন,

        এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান হচ্ছে, সাধারণ মানুষের স্বার্থে, জনজীবনের সমস্যা সমাধানে তারা লড়াই চালিয়ে যাবে। সাধারণ মানুষের পক্ষে লড়াই করতে করতে যখন যে ধরণের উদ্যোগ নিতে হয় তারা তা নেবে।…

        এটা তো গড়পড়তা কথা হলো। রাজনৈতিক পার্টির কর্মসূচী সুনির্দিষ্ট হয়। আম আদমি কিভাবে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে থেকে গণস্বার্থ রক্ষা করব? সেক্ষেত্রে তাদের কর্মসূচীগুলো কি, তা স্পষ্ট করে জানতে আপনার সহযোগিতা চাই।।

        1. রাজনৈতিক দল সম্পর্কে আমাদের
          রাজনৈতিক দল সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত যে ধারণা তা দিয়ে আম আদমি পার্টি কে বুঝা যাবে না। এটা একটা ভিন্ন ধরণের রাজনৈতিক দল। এদের সৃষ্ঠি হয়েছে মূলত মূলধারার রাজনীতির দীর্ঘদিনের লুটপাটের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ঘাতকতা, সুবিধাবাদ, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-দূর্নীতি সর্বোপরি ব্যর্থ ও হতাশাজনক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে। দীর্ঘ দিন ধরেই এই উপমহাদেশের মানুষ দেখে আসছে রাজনৈতিক দলগুলো বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের কথা বলে, সাধারণ মানুষের ভোট নিয়ে, সাধারণ মানুষের শক্তি সমর্থন ব্যবহার করে রাজনীতি করছে কিন্তু বার বার সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই পলিসি গ্রহণ করছে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। আবার উলু খাগড়ার পক্ষের দল, শ্রমিক শ্রেণীর লড়াকু দল, সর্বহারার মেহনতি দল ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে বাম দলগুলো একদিকে সুবিধাবাদী ও আপোষের রাজনীতির চর্চা করেছে, কেউ কেউ নিজেরাই বুর্জোয়াদের চেয়ে বড় বুর্জোয়া হয়ে গেছে(যেমন সিপিআই, সিপিএম ইত্যাদি) আর কেউ কেউ খন্ড বিখন্ড হতে হতে ছোট ছোট গ্রুপে পরিণত হয়ে গেছে। যেমনঃ সিপিআই(এমএল)। তাই এবার উলুখাগড়ারা নিজেরাই নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠন করে ফেলেছে। এরা হচ্ছে মূলত মধ্যবিত্ত উলুখাগড়া। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষরা এর নেতৃত্বে কিন্তু ব্যাপক অংশের শ্রমজীবি ও মেহনতি মানুষের সমর্থন এর পেছনে রয়েছে। এটা এখনও গড়ে উঠার পর্যায়ে রয়েছে। এর বিকাশ এখনও সম্পন্ন হয় নি। তাই চূড়ান্ত দিক নির্দেশনা ও কর্মসূচি এখনই তাদের কাছ থেকে আশা করা ভুল। সাধারণ মানুষের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে, সাধারন মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে তারা যদি বিদ্যমান সমাজ কাঠামো ভাঙ্গার প্রয়োজন মনে করে তবে তারা তাই করবে। সেটা নির্ভর করবে তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সম্মিলিত উপলব্ধির উপর এবং ঐ ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্ঠি হওয়ার উপর। তবে তাদের দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের যে চর্চা, জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও স্বরাজ সম্পর্কিত তাদের যে ধারণা এবং এটা বাস্তবায়নের জন্য তাদের যে প্রচেষ্টা, সাধারণ মানুষের স্বার্থে এখন পর্যন্ত নেয়া তাদের যে সরকারী ও দলীয় পলিসি তা এখনও ইতিবাচক ও কৌতুহল উদ্দীপক। তাই এ ধরণের রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে।

  2. বাঙালীর রক্ত থেকে রাজনৈতিক
    বাঙালীর রক্ত থেকে রাজনৈতিক সততা বিলীন হয়ে গেছে। এখানে সহসা এমন রাজনৈতিক পরিবর্তন আশা করিনা। তবে এই অঞ্চলের সাম্পপ্রতিক সময়ে গণমুখী রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত হয় থাকবে আম আদমী পার্টি।

    1. ধন্যবাদ। তবে দ্বিমত পোষন করছি
      ধন্যবাদ। তবে দ্বিমত পোষন করছি আপনার সাথে। আপামর বাঙ্গালী জনসাধারণের ভেতর থেকে রাজনৈতিক সততা বিলীন হয় নাই। সততা বিলীন হয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের রক্ত থেকে(কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া)। খেয়াল করবেন যখন কোন গরীব মানুষ নির্বাচনের সময় কোন প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা পয়সা কিংবা অন্য সাহায্য নেয় সে কিন্তু ভোটটা দেয়ার সময় ঐ প্রার্থীকেই দেয়। খুব কম মানুষই আছে যারা টাকা খেয়ে বেইমানী করে। উদাহরণটা খুব যুৎসই হল না বটে, তবে চিন্তা করে দেখেন সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সততার অনেক উদাহরণই চোখের সামনে পাবেন। শাহবাগের গণজাগরন আন্দোলনে কিংবা রানা প্লাজার উদ্ধার অভিযানে কিংবা ওয়াসার কূপে পতিত শিশু জিহাদের উদ্ধার অভিযানে, সমস্ত জায়গাতেই সাধারণ মানুষ তার সবটুকু ঢেলে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *