তারা দেশপ্রেমিক (১৯৭১)

রাততো অনেক হল বাড়ি যাবেন না?

রাততো অনেক হল বাড়ি যাবেন না?
হ্যা যেতে তো হবেই। নাড়িরটান অনেক বড় টান। অস্পষ্ট স্বরে জবাব দিল লোকটি। বিড়বিড় করে বলতে বলতে মানুষটি চলে গেল। স্টেশন মাস্টার সুধীর বাবুর মনে অনেক কৌতূহল এই মাঝ বয়সী লোকটিকে নিয়ে। সুধীর মন্ডল এই জনমানব শুন্য স্টেশনে বদলি হয়ে এসেছেন প্রায় দুই বছর হল। প্রথম দিকে খেয়াল না করলেও প্রায় দুই বছর হল লোকটিকে দেখছেন প্রতিদিন কার জন্য যেন তিনি অপেক্ষা করেন। এই ত্রিমহনী স্টেশনে রাত আটটা বাজলেই ফাকা হয়ে যায় মেইল ট্রেন ও আসে দুইদিন পরপর। কিন্তু লোকটি প্রতিদিন ই আসেন। কার জন্য এত অপেক্ষা তার? কেন এই অপেক্ষা জানতে চাইলেই এড়িয়ে যান নানা কৌশলে। এতদিনে তিনি শুধু তার নামটিই জানতে পেরেছেন শুধু আর কিছুই জানা হয়নি তার।
এখন এপ্রিল মাস চলছে। ১৪ই এপ্রিল। রাত ১১ টা বেজে ১০ মিনিট। হঠাৎই প্রচণ্ড ঝড় শুরু হল। কাল বৈশাখী। আজকাল আবহাওয়াও সঠিক টাইম মেনে চলছে একদম বৈশাখের প্রথম দিনেই ঝড়। ভাবাই যায় না। তবে মন্দ লাগছে না সুধীর বাবুর। রুমথেকে বেড়িয়ে দেখলেন অনিমেষ মজুমদার আজ ও বসে আছেন। হাতে জলন্ত সিগারেট নিয়ে। সুধীর বাবু তার কাছে গিয়ে বললেন কফি খাবেন? আমার কাছে ডেনমার্কের এক্সপ্রেসো কফি আছে। হ্যা দিতে পারেন এককাপ। তবে আমার রুমে গিয়ে খাবেন চলেন। আপনার রুম কোথায়? আমি এই স্টেশন এর মাস্টার। ও আচ্ছা। তবে চলুন আজ নাহয় আপনার সাথেই কিছুক্ষন সময় পার করেই গেলাম, আজও মনে হয় ওরা আসবে না।
তারা এসে রুমে বসলেন। কফিও রেডি। কাপে চুমুক দিতে দিতে সুধীর বাবু জানতে চাইলেন তার কথা। কার জন্য এই অপেক্ষা?
অনিমেষ বাবু কিছুক্ষন চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলেন এইটা কত সাল?
২০০৪।
তখন ছিল ৭১। আর আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মার্চ মাসের ২৫ তারিখ। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল। শেখ সাহেব যুদ্ধ ঘোষনা করে ফেলেছেন পাক আর্মির বিরুদ্ধে। আমি বাড়ি আসলাম। নিজ এলাকায় যুদ্ধ করব বলে। আমার বাবা তখন স্বর্ণের ব্যবসা করতেন। পাকসেনারা হিন্দুদের সবার আগে মারা শুরু করল। আত্বিয় স্বজনরা তখন ভারত চলে গেছে কিন্তু বাবাকে পাঠাতে পারলাম না। আমি যুদ্ধ করতে চলে গেলাম। আমার বিয়ের বয়স তখন সবে মাত্র ছয় মাস। অনুরিমা, আমরা একসাথে ই পারতাম। তবে ও সাংবাদিকতা বিভাগে। প্রেমের বিয়ে আমাদের। আমি যখন চলে আসলাম সেদিন ওকে আমার সাথে আনতে পারিনি। কারন সে তখন লিখবে দেশকে নিয়ে। বিশ্বের কাছে পৌছে দিবে পাক বর্ররতার কথা। তার কাছে আমার চেয়েও দেশ বড় ছিল। আমার কাছেও ঠিক তাই। আপনি তখন হয়ত অনেক ছোট ছিলেন। আপনারও ঠিক ঐ ব্যাপারটাই কাজ করত যা আমার আর অনুরিমার মধ্যে কাজ করেছিল।
ও আমাকে কথা দিয়েছে দেশ স্বাধীন হলে আমরা আবার একসাথে রেসকোর্স এলাকায় ঘুরব।

আমি যুদ্ধে চলে গেলাম। বাবা আর অসুস্থ মা কে রেখে। শুনেছি আমি চলে যাবার দিন পনেরো পরেই বাবা মা কে মেরে ফেলেছে ওরা। বাবা নাকি ওদের পাচ কেজি স্বর্ণ দিয়েছিল। তাও প্রাণটুকু ভিক্ষা দেয়নি ওরা। ৭ই ডিসেম্বর ছিল আমাদের শেষ অপারেশন। আমরা পাকসেনাদের উড়িয়ে দেই এই অঞ্চল থেকে। ১৬ তারিখে ফিরে আসলাম নিজ বাড়িতে। কিন্তু এসে দেখি শুধু বাড়ি আছে মানুষ গুলো নেই। চলে গেলাম ঢাকা অনুরিমার কাছে। গিয়ে শুনি সপ্তাহ খানিক আগে ও নাকি ট্রেনে রওনা হয়েছে এখানে আসবে বলে। তাই আবার ফিরে এলাম এখানে। দিন গেল মাস গেল এমনকি বছর কি বছর পার হয়ে গেল আমার বউটি আর এলনা। কাল হয়ত আসবে আমার পাখিটি কতদিন দেখিনা তার চাঁদ বদনখানি। বলতে বলতে অনিমেষ বাবু বেরিয়ে গেলেন।
সুধীর বাবুর চোখ দুটি কখন পানিতে ভিজে গেছে তা নিজেও টের পাননি তিনি। তবে তার বুক গর্বে ভরে যাচ্ছে এই ভেবে যে অনিমেষ আর অনুরিমার মত দেশপ্রেমিকরা ছিল বলেই আজ আমরা স্বাধীন দেশে মুক্ত হাওয়া নিতে পারছি। তোমাদের অজস্র সালাম আমাদের জন্য নিজের সব কিছু ত্যাগ করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *