গ্রীসের বাম রাজনীতির চালচিত্র ও একজন গ্রীক মাওবাদী নেতার সাক্ষাৎকার

কিছু দিন আগে একটা খবর বেশ চমকে দিল। খবরটা ছিল, “গ্রীসে পুঁজিবাদ বিরোধী একটি বামপন্থী রাজনৈতিক দল ক্ষমতা দখল করেছে”। এটা চমকে যাওয়ার মতই একটি বিষয়। কেননা ইউরোপের মত একটা জায়গায় যেখানে পুঁজিবাদী সিস্টেম অত্যন্ত শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী সেখানে একটি পুঁজিবাদ বিরোধী বিপ্লবী দলের ক্ষমতায় আরোহন করা, আর কিছু না হোক কৌতুহল উদ্রেককারী তো বটেই। সেই কৌতুহল থেকেই গ্রীসের বর্তমান রাজনীতি ও সদ্য আগত ক্ষমতাসীনদের ব্যাপারে ঘাটাঘাঁটি করতে গিয়ে পেয়ে গেলাম এই দীর্ঘ ও দারুণ সাক্ষাৎকারটি। এখানে গ্রীসের বর্তমান রাজনীতি, ক্ষমতাসীন দল সিরিজার বর্তমান কর্মকান্ড সম্পর্কে অনেক গভীরে ও অনেকটা নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যারা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে ঐক্যবদ্ধ বাম আন্দোলনের ব্যাপারে আগ্রহী তাদের কাছে হয়তো এই সাক্ষাৎকারটা আকর্ষণীয় ও দিকনির্দেশনামূলক হতে পারে। তাই আমি আমার মত করে যেভাবে পেরেছি সাক্ষাৎকারটি ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। মূল লিঙ্কটি সাথে দিয়ে দিলাম। কেউ যদি কোন ভুল ত্রুটি সনাক্ত করতে পারেন এবং ধরিয়ে দিতে পারেন তাহলে কৃতজ্ঞ থাকব। পাঠকদের সুবিধার্থে সাক্ষাৎকারটির পূর্বে আমি উইকিপিডিয়া থেকে সংগ্রহ করে আরো কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় যুক্ত করে দিলাম। কারো কোন মন্তব্য থাকলে নির্দ্বিধায় জানাবেন।
https://www.jacobinmag.com/2015/01/phase-one/

Syriza: মূল নাম Coalition of the Radical Left সংক্ষেপে Syriza। এটি গ্রীসের একটি বামপন্থী রাজনৈতিক দল যা মূলত ২০০৪ সালে বিভিন্ন ধরণের বামপন্থী দলগুলোর নির্বাচনী জোট হিসেবে গঠিত হয়েছিল। এটি গ্রীসের সংসদের বৃহত্তম দল। দলটির চেয়ারম্যান হলেন আলক্সিস সিপ্রাস, তিনি দেশের বর্তমান প্রধাণ মন্ত্রীও।
জোটটি তেরোটি আলাদা আলাদা গ্রুপ এবং ব্যক্তি বিশেষকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল যেখানে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট, বামপন্থী দেশপ্রেমিক, নারীবাদী, পরিবেশবাদী, মাওবাদী, ট্রটস্কিবাদী, লেনিনবাদী, ইউরোকমিউনিস্ট, ইউরোবিরোধী ইত্যাদি বিভিন্ন ধারার সমাহার ছিল। এর সেকুলার আদর্শ থাকার পরেও সেখানে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা খৃস্টান ধর্মে বিশ্বাস করতেন কিন্তু রাস্ট্র কর্তৃক গ্রীসের অর্থোডক্স চার্চগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতার বিরোধীতা করতেন। ২০১৩ সালে এটি একটি একক পার্টিতে পরিণত হয় যদিও তার “United Social Front” নামটাও থেকে যায়।
সিরিজা একটি প্রথাবিরোধী চরিত্রের রাজনৈতিক দল (anti-establishment party)যার রাজনৈতিক সফলতা পুরো ইউরোপ জুড়ে একটা বিশাল আলোড়ন সৃষ্ঠি করেছে। যদিও দলটি তার আগের অবস্থান পরিবর্তন করেছে এবং সম্প্রতি বলছে যে, তারা ইউরো অঞ্চল ছেড়ে যাবে না। এই হচ্ছে, সিরিজার সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

যে সমস্ত দলগুলোকে নিয়ে সিরিজা একক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়-

  • Active Citizens (Ενεργοί Πολίτες): democratic socialism, patriotism
  • Anticapitalist Political Group (ΑΠΟ): communism, Trotskyism, anti-capitalism
  • Citizens’ Association of Riga (Velestinli): patriotism, internationalism, democracy, ecology, social justice[69]
  • Coalition of Left, of Movements and Ecology (Synaspismós or SYN): democratic
    socialism,[70] eco-socialism,[5] eurocommunism,[71] environmentalism,[70] feminism[70]
  • Communist Organization of Greece (KOE): maoism, communism
  • Communist Platform of Syriza: Greek section of the International Marxist Tendency, communism, Trotskyism[72]
  • Democratic Social Movement (DIKKI): left-wing nationalism, socialism,[73] Euroscepticism[74]
  • Ecosocialists of Greece: eco-socialism, green politics
  • Internationalist Workers’ Left (DEA): revolutionary socialism, communism, Trotskyism
  • Movement for the United in Action Left (KEDA): communism, Marxism–Leninism
  • New Fighter: democratic socialism, social democracy
  • Radical Left Group Roza: Luxemburgism, feminism
  • Radicals (Ριζοσπάστες): democratic socialism, patriotism
  • Red (Κόκκινο): communism, Trotskyism
  • Renewing Communist Ecological Left (AKOA): democratic socialism, Eurocommunism, green politics
  • Union of the Democratic Centre (EDIK): radicalism, social liberalism
  • Unitary Movement: democratic socialism, social democracy
  • And a number of independent leftist activists

    PASOK: Panhellenic Socialist Movement

    ১৯৭৪ সালের সামরিক জান্তার পতনের পর আন্দ্রেয়াস পাপেন্দ্রিউর হাতে গঠিত হয়েছিল এই দল। এটি মূলত একটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল। আন্দ্রেয়াসের বাবা জর্জিয়াস পাপেন্দ্রিউ সিনিয়র ছিলেন গ্রীসের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী। জর্জিয়াস ছিলেন একজন লিব্যারেল ঘরানার রাজনীতিক কিন্তু আন্দ্রেউস নিজেকে সেই অবস্থান থেকে সরিয়ে সমাজতান্ত্রিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরেই এই দল প্রায় ১৩.৫% ভোট পেয়ে নির্বাচনে ১৫টি আসন পেয়ে যায় এবং ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠার ৭ বছরের মাথায় প্রথম বারের মত ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ২০১৫ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে পার্টিটি ১৫টি আসনও নিতে পারে নি। সামরিক শাসনের পতনের পর রাজনৈতিক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল এই দলটি। ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় বারের মত নির্বাচিত হয়ে পাসক সরকার তাদের সংবিধানে বেশকিছু জনকল্যাণকর সংশোধনী নিয়ে আসে যা জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়। সংশোধনীগুলো ছিলঃ

    ১। তারা প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ক্ষমতাকে খর্ব করে প্রধাণ মন্ত্রী এবং মন্ত্রীপরিষদকে শক্তিশালী করে।
    ২। ধর্মীয় বিধি বহির্ভূত সিভিল বিয়েগুলোকে ধর্মীয় রীতির বিয়ের সম মর্যাদা প্রদান করা।
    ৩। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বামপন্থীদের নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধকে স্বীকৃতি দান করা এবং বামপন্থী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সরকারী ভাতা প্রদান করা।
    ৪। গ্রীক সিভিল ওয়ারের সময় রাজনৈতিক নির্বাসিতদের গ্রীসে ফিরে আসার অনুমতি দেয়া হয়।
    ৫। জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রীহিত হয় এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট বিরোধী কালো আইন বাতিল করা হয়।
    ৬। বেতন ভাতা কয়েকগুণ বাড়ানো হয় এবং স্বাধীন ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হয়।
    ৭। মহিলাদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য পারিবারিক আইনে সংস্কার সাধন করা হয়।
    ১৯৮১ থেকে ১৯৯০ আবার ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ এবং ২০০৯ থেকে ২০০১৪ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর PASOK ক্ষমতায় আসীন ছিল। কিন্তু, সর্বশেষ নির্বাচনে PASOK মাত্র ৪.৬৮% ভোট পায় এবং পার্লামেন্টে ১৩টি আসন লাভ করে।
    ২০১৫ সালের ২ জানুয়ারিতে পাপেন্দ্রেউ পাসক ত্যাগ করেন এবং Movement of Democratic Socialists (KIDISO) নামে নতুন একটি দল গঠন করেন ও নির্বাচনে অংশ নেন।

    New Democracy: এই পার্টিটিও ১৯৭৪ সালে সামরিক জান্তার পতনের পর গঠিত হয় এবং নির্বাচনে ২২০টি আসন ও ৫৪.৩৭% ভোট পেয়ে জয় লাভ করে। এর প্রতিষ্ঠাতার নাম কন্সতান্তিনস কারামানলিস। নির্বাচনে জয় লাভের পর রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করা হয় এবং এই পার্টির নেতৃত্বেই রাষ্ট্রের সংবিধান রচনা হয় যেখানে গ্রীসকে একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৭৯ সালে এই দল তার প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত করে যেখানে গ্রীসের রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে প্রথম বারের মত সম্মেলনের প্রতিনিধিরা সরাসরি সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই দলের নেতৃত্বেই গ্রীস NATO এবং ইউরোপীয়ান কমিউনিটিতে যুক্ত হয়। তার রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে, “র‍্যাডিকেল লিবারেলিজম”। এই দল সরকারের নজরদারীর মধ্যে মুক্তবাজার অর্থনীতিকে সমর্থন করে। এটি মুলত মধ্য ডান পন্থি দল।

    Communist Party of Greece(KKE): গ্রীসের রাজনৈতিক পটভূমিতে KKE সবচেয়ে পুরোন এবং প্রভাব বিস্তারকারী দল যা ১৯১৮ সালে Socialist Labour Party of Greece নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৬০ বছর ধরে শিল্পাঞ্চলগুলিতে গড়ে উঠা বিভিন্ন ধরণের সমাজতান্ত্রিক বা নৈরাজ্যবাদী বা কমিউনিষ্ট গ্রুপ গুলোর ধারাবাহিক কার্যক্রমের ফলে ১৯১৮ সালে এসে এই পার্টিটি গড়ে উঠে। ১৯২৪ সালে এটি কমিউনিষ্ট পার্টি অফ গ্রীস(KKE) নাম ধারণ করে মার্ক্সবাদ ও লেনিনবাদকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহু চড়াই উৎরাই পার হয়ে তাকে চলতে হয়েছে। বহুবার বহু সরকারের রোষানলে পড়েছে। কখনো জনগন কর্তৃক আদৃত হয়েছে কখনো ধিকৃত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কিংবা তার আগে ও পরে বহু বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের ইতিহাস এই পার্টির রয়েছে। অনেক অনেক পার্টি কর্মীকে খুন হতে হয়েছে, জেলে যেতে হয়েছে কিংবা নির্বাসিত হতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে গ্রীসের গৃহ যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে তৎপরবর্তী সামরিক জান্তার শাসন পর্যন্ত যা ১৯৪৪ সাল থেকে শুরু হয়ে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ৩০ বছরে KKE কে একদিকে শাসক দলগুলির নিপীড়ন নির্যাতনকে মোকাবেলা করতে হয়েছে অপরদিকে আভ্যন্তরীন মতবিরোধ ও ভাঙ্গনকেও মোকাবেলা করতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশ কিছু ছোট ছোট গ্রুপ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদা দল গঠন করে কিন্তু KKE’র ঐক্যে সবচেয়ে বড়ো ফাটল ধরে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন চেকোশ্লাভাকিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ঐ ঘটনার কারণে দলের অভ্যন্তরে প্রচন্ড মতবিরোধ তৈরি হয় এবং এক সময় দলটির একটি বড় অংশের সদস্য দল ত্যাগ করে চলে যায় ও আরেকটি পার্টি গঠন করে। যার নাম ছিল KKE-es (Interior)। এদের এক পক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিষ্ট পার্টির সকল পদক্ষেপকে সঠিক মনে করত, আরেক পক্ষ সোভিয়ত আধিপত্য বিরোধী স্বতন্ত্র ইউরোপভিত্তিক কমিউনিজম(Eurocommunism) এর তত্বকে লালন করত। ভুল-ভ্রান্তি-হঠকারীতা, তুমুল গণ আন্দোলন, সামরিক শাখা গঠন করে রীতিমত যুদ্ধ পরিচালনা করা ইত্যাদি নানাবিধ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ KKE’র ইতিহাস। ১৯৭৪ সালে সামরিক জান্তার পতনের পরে KKE আবার আইনসঙ্গত হয় এবং নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। কিন্তু ততদিনে জনগণের মধ্যে পার্টির অবস্থান অনেক নাজুক হয়ে যায়। সেই নির্বাচনে KKE ৩০০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৮ টি আসনে জয় লাভ করে। যদিও ইদানীং কিছুটা ভালো অবস্থান তৈরি হয়েছে তাদের। যেমন, ২০১২’র নির্বাচনে ৮.৫% ভোট পেয়ে ২৬টি আসনে জয় লাভ করে এবং ২০১৫’র নির্বাচনে ৫.৫% ভোট পেয়ে ১৫টি আসন লাভ করে।

    *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** ***

    স্টাথিস কুভেলাকিস সিরিজার কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য এবং এর বামপন্থী অংশের নেতৃত্ব পর্যায়ের সদস্য। তিনি মূলত সেখানকার মাওবাদী একটি গ্রুপের নেতা। তিনি লন্ডনের কিংস কলেজে রাজনৈতিক দর্শনের উপর অধ্যাপনা করেন এবং “Philosophy and Revolution from Kant to Marx” বইয়ের লেখক। তিনি আরো কিছু বইয়ের সহযোগি সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন।“Jacobin” এর পক্ষ থেকে সেবাস্টিয়ান বাজেন তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন যা নিচে দেওয়া হল।

    আমাদের সিরিজা সম্পর্কে কিছু বলুন বিশেষ করে কখন এবং কিভাবে এটি গড়ে উঠল।

    সিরিজা বেশ কিছু সংগঠন নিয়ে একটি নির্বাচনী ঐক্যজোট হিসেবে ২০০৪ সালে গঠিত হয়। এর বৃহত্তম অংশীদার হচ্ছে “আলেক্সিস সিপ্রাস” এর “সিনাস্পিসমস” পার্টি যা প্রথমদিকে বাম ও প্রগতিশীলদের ঐক্যজোট হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং এক পর্যায়ে এটি নিজেকে বামপন্থীদের ও আন্দোলনকারীদের জোট হিসেবে নামকরণ করে।এই দলটি ১৯৯১ সাল থেকেই একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। বামপন্থী আন্দোলনের বেশ কিছু ভাঙ্গনের ধারাবাহিকতায় এটির উত্থান ঘটে।

    অন্যদিকে, সিরিজা অনেকগুলো ছোট ছোট সংগঠনকেও নিজের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটা সংগঠন পুরোন বামপন্থী দলগুলো থেকে বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে Communist Organization of Greece (KOE) গ্রীসের একটি প্রথম সারির মাওবাদী গ্রুপ। এই সংগঠনের তিনজন প্রার্থী ২০১২ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় লাভ করে। ট্রটস্কিপন্থী হিসেবে পরিচিত বাম ঘরানার আরেকটি সংগঠন Internationalist Workers’ Left (DEA) তেমনই একটি সংগঠন। Renewing Communist Ecological Left (AKOA) এর কথাও বলা যেতে পারে, যারা Communist Party (Interior) থেকে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে।

    সিরিজা ২০০৪ সালে গঠিত হয়েছিল এবং প্রথম দিকে এটা খুব একটা সাফল্য লাভ করতে পারে নি। তবুও এটি ৩% এর বেশি ভোট পেয়ে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করতে পেরেছিল। একটা লম্বা পথ পরিক্রমাকে স্বল্প কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, সিরিজা হচ্ছে বিপ্লবী বামপন্থীদের নতুন করে শুরু করার একটি জটিল প্রক্রিয়ার ফলাফল।

    ১৯৬৮ সাল থেকে প্রথাগত বামপন্থীরা দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে যান। প্রথমটা ছিল Greek Communist Party (KKE), যাকে দুই দুই বার ভাঙ্গনের মুখে পড়তে হয়েছিল। প্রথম বার ছিল ১৯৬৮ সালে সামরিক শাসকদের স্বৈরশাসনের সময় যখন KKE ভেঙ্গে KKE(Interior) গঠিত হয়েছিল। এটি ছিল Eurocommunist ধরণের একটি দল। আর দ্বিতীয় বার ঘটেছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর। Eurocommunist দলটি ১৯৮৭ সালে ভেঙ্গে যায়। এর ডানপন্থী অংশ Greek Left (EAR) গঠন করে এবং সিনাস্পিসমসের সাথে শুরু থেকেই যুক্ত হয়ে যায় আর বামপন্থী অংশ AKOA নামে নিজেদেরকে পুনর্গঠিত করে।

    এরকম দুই দুইবার ভাঙ্গনের পরে KKE তে যারা থাকে তারা অদ্ভুতভাবে সনাতন ধারায় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং স্তালিনপন্থী গঠন কাঠামো(Stalinist framework) গ্রহন করে আরো বেশি কট্টর হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষ করে ১৯৯১ সালের পরে। দলটি পরবর্তীতে সংগ্রামী এবং উপদলীয় রাজনীতিকে ভিত্তি করে নিজেকে পুনর্গঠিত করে। এটি শ্রমিক শ্রেণীর সাথে সক্রিয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মীদেরকে যুক্ত করতে সমর্থ হয় এবং ইউনিভার্সিটি সহ অন্যান্য জায়গার তরুণ-যুবকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

    অন্য মেরুটি, সিনাস্পিসমস কর্তৃক সিরিজা গঠন করার মাধ্যমে শুরু হয়, যে সিনাস্পিসমস KKE থেকে বেরিয়ে যাওয়া কর্মী-সদস্যদের একত্রিকরণের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। সময়ের সাথে সাথে সিনাস্পিসমসের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯০ এর শুরুর দিকে এটি এমন এক ধরণের দল ছিল যা Maastricht Treaty(ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন সংক্রান্ত চুক্তি) কেও সমর্থন করেছিল। এটি ছিল মূলত উদার বামপন্থীদের একটি সংগঠন।

    কিন্তু, এটি বহু দল ও মতের সমন্বয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবেও ছিল। দলের অভ্যন্তরে ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের অত্যন্ত কঠিন লড়াই সংগ্রাম করে আগাতে হয়েছে আর এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে ডানপন্থীরা তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায়। একটা সময়ে সিরিজার গঠন প্রক্রিয়া, সিনাস্পিসমসকে বামপন্থী রাজনীতি স্থায়ীভাবে গ্রহণ করতে প্রণোদিত করে।

    সিনাস্পিসমসের উপর বামপন্থী রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রভাব কেমন?

    কমিউনিস্ট ভাবধারা পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মধ্যেই দৃশ্যমান হবে। এর একটি অংশ ইউরোকমিউনিস্ট প্রভাবিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে যারা ৭০ এর দশকের পর থেকে নতুন ধরণের সামাজিক আন্দোলনকে পরিচিত করেছিল। পরবর্তীতে এটি সাঙ্গঠনিকভাবে ও তাত্বিকভাবে সমন্বয়সাধনে নিজের নতুন করে গড়ে উঠার সক্ষমতাকে প্রমাণ করে এবং দলের কমিউনিস্ট গঠনকাঠামোর অভ্যন্তরে বিপ্লবী আন্দোলনের নতুন ধারাকে আত্মস্থ করতে পারে। এটি এমন একটি পার্টি যা নারী আন্দোলন, যুব আন্দোলন, বিশ্বায়ন বিরোধী আন্দোলন, বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং সমকামীদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনকে সাবলীলভাবে পরিচালিত করতে পারে এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকেও দারুণভাবে প্রভাবিত করতে পারে। দলের আরেকটি অংশ এসেছে KKE এর ক্যাডার ও সক্রিয় সদস্যদের স্তর থেকে যারা ১৯৯১ সালে KKE ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাদের একটি বড় অংশ এখন পার্টির বামপন্থী অংশের ধারক। যদিও বেশির ভাগ গ্রুপের অধিকাংশ সদস্য এবং নেতারা ঐ মানেরই ছিলেন।

    আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে, পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী এবং সক্রিয় সদস্যরা শিক্ষিত ডিগ্রিধারী শ্রমজীবি মানুষের মধ্যে থেকে উঠে এসেছে। এই দলটির বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে খুবই মজবুত শেকড় রয়েছে এবং শহরাঞ্চলেই এর কাজ বেশি হয়। খুব সাম্প্রতিক সময়েও সিনাস্পিসমসের উচ্চ শিক্ষার্থীদের ইউনিয়নে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কিন্তু KKE ১৯৮৯ – ৯১ এর পর থেকে বুদ্ধিজীবি মহলের কাছে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি।

    পার্টির নেতৃত্ব নিজেদের কমিউনিস্ট পরিচয়ও বহন করেন। সিপ্রাসের অল্প বয়স দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। সে ৯০ এর দশকের শুরুর দিকে KKE এর একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করে। দলের পুরনো নেতা এবং কর্মীদের মধ্যে অনেকেই সেই স্বৈরাচারী সময়ে পাশাপাশি লড়েছিলেন এবং জেলখানায় ও নির্বাসন ক্যাম্পে একসাথে নির্যাতন ভোগ করেছিলেন।

    গ্রীসের বামপন্থীদের মধ্যে একটি বৈরি পরিবেশ বিরাজ করছে যদিও ইদানীং একমাত্র KKE ই এই সংস্কৃতিকে লালন করছে। তারা সিনাস্পিসমস এবং সিরিজাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে প্রতিপন্ন করছে এবং এইভাবে তারা(KKE) এটিকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখছে।

    সিরিজার লাইনকে আপনি কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন? আপনি কি আরো বলবেন যে, এই জোট একটি পুঁজিবাদবিরোধী লাইনকে অনুসরণ করছে নাকি এটি ক্রমাগত আরো বেশি পুনর্গঠনবাদীদের ধারাকে অনুসরণ করছে?

    তত্বগত অবস্থান এবং কর্মসূচিগুলোকে বিবেচনা করলে সিরিজা একটি শক্ত পুঁজিবাদবিরোধী লাইনে অবস্থান করছে এবং এটি খুব পরিষ্কারভাবেই সোশ্যাল ডেমোক্রেসি থেকে নিজেকে আলাদা করে রেখেছে। আমাদের সিনাস্পিসমসের অভ্যন্তরের সেইসব মতবাদিক সংগ্রামগুলিকে বিবেচনায় নিতে হবে, যেখানে সোশ্যাল ডেমক্রেটদের সাথে জোট করার পক্ষাবলম্বনকারীদের পরাস্ত করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয় যারা এমনকি স্থানীয় পর্যায়েও কিংবা ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যেও যেকোন ধরণের জোট করার বিরোধী ছিলেন।

    যখন ২০০৬ সালের নির্বাচনে এলেক্স আলভানোস যখন পার্টির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন তখন থেকে সোশ্যাল ডেমোক্রেট অংশটি নিশ্চিতভাবেই পার্টির অভ্যন্তরে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায়। এই ডানপন্থী অংশটি যার নেতৃত্বে ছিলেন ফতিস কুভেলিস, যারা ইউরোকমিউনিস্ট গ্রুপ ইএআর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, তারা ইতিমধ্যে পার্টি ছেড়ে দেয় এবং একটি নতুন পার্টি গঠন করে যার নাম Left (Dimar)। তাদের ভাষায় এই দল PASOK এবং বামপন্থী বিপ্লবীদের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে।

    তাই সিরিজা একটি পুঁজিবাদ বিরোধী জোট যা একটি নির্বাচনী জোটের অভ্যন্তরের দ্বন্দাত্মক পদ্ধতির উপর জোর প্রদান করে এবং নিচের স্তর থেকে লড়াই সংগ্রাম করে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করাকে সঠিক মনে করে। এইভাবে সিরিজা এবং সিনাস্পিসমস, তাদের নিজেদেরকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী শ্রেণী সংগ্রামী দল হিসেবে মনে করে।
    তারা যা করতে চায় তা হচ্ছে বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি মৌলিক বিরোধ তৈরি করা। এই কারণে এর নাম রেখেছে SYRIZA: যার মানে হচ্ছে, “বিপ্লবী বামপন্থীদের জোট”। এবং এই বিপ্লবীয়ানার দাবী পার্টির পরিচয়ের(Identity) খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।

    সিরিজার সক্রিয় কর্মীদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক কেমন এবং প্রত্যেকটা সংগঠনসমূহে কি পরিমাণ মানুষ রয়েছে যারা এই জোট গঠন করেছিল?

    ২০১২ সালে সিনাস্পিসমসের প্রায় ১৬০০০ সদস্য ছিল। মাওবাদী দল KOE এর ছিল ১০০০ থেকে ১৫০০ কর্মী এবং AKOA এর বেলাতেও ঐ রকমই বলা যায়। সিনাস্পিসমসের কর্মকান্ড ও তার সাংগঠনিক কাঠামো, তার আদর্শিক অবস্থান গ্রহণের সাথে সাথে বিকাশমান হয়েছে। সাধারণভাবে প্রথম দিকে এই দলটি একটি বিশাল লম্বা নাম ও নির্বাচনমুখী ঐক্যজোট ছাড়া খুব একটা লড়াকু কর্মীদের দল ছিল না। কিন্তু দলটির সাংগঠনিক প্রক্রিয়া এবং কর্মকান্ড তাকে দুইটা ভিন্ন স্তরে দারুনভাবে পরিবর্তিত করে ফেলেছে।

    প্রথমত, বিশ্বায়ন বিরোধি আন্দোলন এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে পার্টির একটি দারুণ সক্রিয় (Dynamic) যুব সংগঠন গড়ে উঠে। এই ব্যাপারটা পার্টিকে তরুন-যুবকদের সংগঠিত করতে সহায়তা করেছিল বিশেষ করে ছাত্রদের মধ্যে, যেখানে এর আগে পার্টি সাংগঠনিকভাবে দূর্বল ছিল। পার্টির যুব সংগঠনের এখন বেশ কয়েক হাজার সদস্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, যে সমস্ত পার্টি ক্যাডাররা এই যুব সংগঠন থেকে উঠে এসেছেন তারাই সিপ্রাসের খুঁটিকে মজবুত করে ধরে রেখেছেন। তারা প্রকৃত বিপ্লবী আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত এবং তারা মার্ক্সবাদকে, বিশেষ করে আলথাসারীয় ঢঙে(Althusserian hue) মেনে চলে।

    দ্বিতীয়ত, ট্রেড ইউনিয়ন পন্থীরা পার্টির বামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে থেকে ২০০০ সালের দিকে সিনাস্পিসমসের অভ্যন্তরে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষ করে যে বড় অংশটা KKE থেকে বেরিয়ে এসেছিল তাদের মধ্যে শ্রমজীবি মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তাদেরকে শ্রেণী সংগ্রামী অবস্থান নিতে বেশি আগ্রহী হতে দেখা যায়। এই অংশটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিও অনেক সমালোচনামুখর।

    তবে এটা বলা যাবে না যে, পার্টিতে আজ আর কোন মধ্যপন্থী মানুষ নাই। বিশেষ করে আমরা আমাদের প্রধান অর্থনীতি বিষয়ক মুখপাত্র ইয়ান্নিস দ্রাগাসাকির কথা বলতে পারি। আরো কিছু পার্টি ক্যডারের কথাও বলা যায় যারা এক সময় ফতিস কুভেলিস এর সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, কিন্তু তিনি আলাদা দল গঠন করার পর তারা তাকে আর অনুসরণ করলেন না।

    আপনি বললেন যে, এখন পর্যন্ত সিরিজার মূলত গ্রীসের শহরাঞ্চলগুলোতে সক্রিয় কর্মী এবং নির্বাচনী ভিত্তি রয়েছে। ২০১২ সালের মে মাসে সিরিজা যে বিরাট নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করেছিল যেখানে দলটি ১৬.৭% ভোট পেয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হতে পেরেছিল, আপনার কি মনে হয় PASOK কে পরাজিত করার পেছনে এই পরিবর্তনটাই কাজ করেছিল?

    অবশ্যই তাই। ২০১২’র নির্বাচনের সমাজতাত্বিক বিষয়টাকে বুঝতে হলে এই ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুণগত রুপান্তরটা পরিমাণগত পরিবর্তনের একটা প্রচন্ড উল্লম্ফনের ফল। আরেকটু সহজভাবে বুঝতে গেলে ২০১২ সালের মে এবং জুন মাসের নির্বাচনটা ছিল নিখাঁদ শ্রেণী দ্বন্দের নির্বাচন। শহরাঞ্চলের শ্রমিক শ্রেণির ভোটাররা যারা প্রধাণত PASOK কে ভোট দিত তারা হঠাৎ করে সিরিজার অনুকূলে চলে গেল।

    সিরিজার প্রথম উত্থান হয়েছিল বৃহত্তর এথেন্স অঞ্চলের পাশাপাশি প্রধাণ শহরগুলোতে যেখানে গ্রীসের এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা বাস করত। এখন দলটি মে মাসের পর থেকে আঞ্চলিক কাউন্সিলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। দলটি শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে এবং জনবহুল জেলাগুলোতে ভালো ফলাফল করেছিল যেখানে আগে PASOK এবং KKE’র শক্ত অবস্থান ছিল।KKE’র পতন এই নির্বাচনগুলোতেই শুরু হয় এবং তার অবস্থা আরো খারাপ হতে যাচ্ছে। আমরা দেখছি যে, KKE’র ভোটারা সিরিজার দিকে চলে আসছে। এটা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির ভোট, আবার এটা শিক্ষিত শ্রমিকের ভোটও, যে ভোটাররা শ্রমবাজারে সক্রিয়। সিরিজার প্রতি ১৮-৩০ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে সমর্থন, তার জাতীয় গড় সমর্থনের কাছাকাছিই ছিল কিন্তু মূলত যারা শ্রমজীবি মানুষ (৩০ বা তারচেয়ে বেশি বয়সী) তাদের মধ্যে সমর্থনটা একটু বেশিই ছিল।

    এর দূর্বলতম ফলাফল এসেছে অর্থনৈতিকভাবে কম সক্রিয় অঞ্চল যেমন গ্রামাঞ্চল, পেনশনভোগী, গৃহবধু, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং স্বনির্ভর পেশাজীবি এদের থেকে। তাই সিরিজার সমর্থনের ভিত্তি গ্রীসের প্রধান প্রধান শহরাঞ্চলের বেকার জনসাধারণ ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যেই বেশি।

    সরকারী খাতের(public-sector) শ্রমিকদের মধ্যে সিরিজার সমর্থন কতটুকু পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে?

    নির্বাচনী বিশ্লেষণ দেখায় যে, সিরিজা ২০১২ সালের জুনে সরকারী খাতের শ্রমিকদের মধ্যে ৩৩% ভোট পেয়েছিল এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত থেকে ৩৪%। দুই খাতেই কমবেশ একই পরিমাণ সমর্থন রয়েছে, তবে সরকারী খাতে শ্রমিকদের মধ্যে একটু বেশি, যদি আমরা ২০১২ সালের নির্বাচন থেকে সর্বশেষ ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের নির্বাচনের ব্যাপারটা বিবেচনা করি। কিন্তু এটি সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছিল “পাইরেয়াস” নামের একটি শিল্প প্রধাণ ও শ্রমিক প্রধাণ সংসদীয় আসনে।পাশাপাশি উত্তর গ্রীসের “জানতি” প্রদেশেও ভালো ফল করেছিল যেখানকার অধিকাংশ অধিবাসীরাই তুর্কী ভাষী ও মুসলিম। প্রকৃতপক্ষে সিরিজার দুইজন এমপি এই তুর্কীভাষী মুসলিম সংখ্যালঘুদের এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।

    ২০১২ সালের নির্বাচনে সিরিজার আকস্মিক সাফল্যকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

    এখানে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমটা হচ্ছে, ২০১০ সালের পর থেকে গ্রীসের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের তীব্রতার বিষয়টি যা গ্রীক সরকার কর্তৃক কৃচ্ছতাসাধন সম্পর্কিত চুক্তি করার পরে আরো ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করেছিল। (এই চুক্তিটি গ্রীক সরকার দেশটির ঋণ পরিশোধ করার সামর্থ্য ধরে রাখার জন্য ত্রয়কার সাথে সম্পাদন করেছিল।)
    দ্বিতীয়টি নিহিত আছে গ্রীসের এবং এখন স্পেনেরও এক বিশেষ বাস্তবতার মধ্যে, যেখানে দেখা যায় এই দেশ দুটির অর্থনৈতিক সঙ্কটগুলো রাজনৈতিক সঙ্কটে রুপান্তরিত হয়ে গেছে। পুরোন রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি যা দ্বিদলীয় বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ ছিল তা ভেঙ্গে পড়েছে।

    তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে জনপ্রিয় আন্দোলনসমুহ। এটা কোন কাকতালীয় বিষয় নয় যে, গ্রীস এবং স্পেনের মত দুইটা ইউরোপীয়ান দেশে যেখানে বামপন্থীরা দায়িত্ব নিয়েছে, সেখানেই বিগত বছরগুলোতে অনেকগুলো জনপ্রিয় আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে। স্পেনে হয়েছিল কৃচ্ছতা বিরোধি আন্দোলন কিন্তু গ্রীসের আন্দোলন ছিল অনেক গভীরে এবং বৈচিত্রময়।
    বেশিরভাগ আন্দোলনকারী শক্তিগুলো যারা প্রথাগত রাজনৈতিক বন্ধন থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছিল তারা বিপ্লবী বামপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু সমাজের অন্যান্য অংশ যারা এই স্রোতের বাইরে থেকেছিল তারা এক ধরণের প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছিল এবং তারা সঙ্কটের শুরু থেকেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। যেমন, এর একটা অংশ “Golden Dawn” নামে একটি ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল নব্য নাজী পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়ল।

    কিন্তু সিরিজার নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সাফল্যকে আরো যথাযথভাবে সেই ঘটনা দ্বারা বুঝানো যায় যেখানে দলটি প্রথম থেকেই কৃচ্ছতা সাধন সংক্রান্ত সমঝোতা চুক্তির বিরোধীতা করেছিল। এটি হয়েছিল একটা দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পর, বিশেষ করে সিনাস্পিসমসের ভিতরে, সিরিজা PASOK এর সাথে জোট করার চিন্তাকে বাতিল করে দিল। যদিও দলটি বরাবরই একটি জোট হিসেবেই ছিল।

    দলটির আন্দোলনমুখী বৈশিষ্টের কারণে এটি প্রমাণ করেছে যে, বাস্তবে ও ব্যবহারিক দিক দিয়ে এটি সামাজিক আন্দোলন ও যৌথ কর্মসূচিতে নিজেদেরকে ভালোভাবে জড়িত রাখতে পারবে যা খুব সাম্প্রতিক সময়ে গ্রীসে হয়ে আসছিল। একই সাথে এটি আন্দোলনসমুহের অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফুর্ত ধরনকে এবং আন্দোলনসমুহের স্বতন্ত্র বৈশিষ্টকে সমীহ করত। যেমন এটি সিটি স্কয়ার দখল করার (Occupy City Square Movement)আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল যেখানে KKE এই আন্দোলনকে একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন বলে সমালোচনা করেছিল এবং এটাকে পেটি বুর্জোয়া ও কমিউনিস্ট বিরোধী উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল।

    এই পার্টিটি সমাজের যন্ত্রণাদায়ক সঙ্কট, যা জনগণের নিত্যদিনের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল তা মোকাবেলা করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে একটি সংহতিপূর্ণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল।এটি এমন একটি সংগঠন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যা জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়ে দিতে পারে তার প্রত্যেকটাতেই দৃশ্যমান হচ্ছিল।
    এ ছাড়াও সিরিজা ২০১২ সালের নির্বাচনের পূর্বে কয়েক সপ্তাহের প্রচারেই জনগণের মতামতকে নিজের দিকে টেনে নিয়েছিল। সত্যিকার সাফল্য এসেছিল যখন সিপ্রাস “বামপন্থীদের নেতৃত্বে কৃছতাবিরোধী সরকার” এই থিমের উপর নিজের বক্তব্যগুলোতে জোর দিয়েছিলেন। তিনি যখন KKE, মধ্য বাম দল, সংসদীয় বাম দল এবং PASOK এর অভ্যন্তরের ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিয়ে জোট করতে গিয়েছিলেন তখনও এই থিমকে জোট গঠনের প্রস্তাব হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলেন।

    এইটাই আক্ষরিক অর্থে নির্বাচনী প্রচারণার গতিপথকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল। এরপর আমরা যখন আলোড়নটা টের পেতে থাকলাম ততদিনে ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে এবং সিরিজার প্রতি সমর্থনের পরিমাণ আকাশের দিকে উড়তে শুরু করেছে। তখন থেকে কিংবা তার পর থেকে অন্যান্য দলগুলোর সিরিজার প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে উপয় ছিল না, যেটি বাস্তবে একটি দৃঢ় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে উদিত হয়েছিল যা গ্রীসের কাঁধে চেপে বসা ত্রয়কা এবং তার চুক্তিসমুহের জোয়ালকে ঝেটিয়ে দূর করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।

    ওটা একটা সার্বজনীন প্রস্তাব ছিল, বিশেষ করে বামপন্থীদের জন্য…

    আসলেই তাই।বিভিন্ন ধরণের সামাজিক আন্দোলেনে অংশগ্রহণের কারণে সিরিজাই এই ধরণের প্রস্তাব দেয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য সংগঠন ছিল। শুধু তাই নয় তার আভ্যন্তরীন প্রস্তুতিও এর জন্য উপযুক্ত ছিল। যা বললাম, এটা হচ্ছে রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটা হাতিয়ার, এবং সিরিজার অভ্যন্তরেও ভিন্ন ধরণের রাজনৈতিক কাঠামোর সহাবস্থানের একটা ব্যবহারিক চর্চা ছিল। আমাকে বলতে হবে যে, সিরিজা একটা হাইব্রীড রাজনৈতিক দল, একটা সমন্বিত রাজনৈতিক দল, যার এক পা গ্রীসের বামপন্থী লড়াকু ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে এবং অপর পা রয়েছে এই যুগে উত্থিত বিপ্লবী রাজনীতির নতুন ধাঁচের মধ্যে।

    আপনি কি মনে করেন, গ্রীসে সিটি স্কয়ার দখল করার যে সামাজিক আন্দোলন আমরা দেখেছিলাম, তার সাথে সিরিজার নির্বাচনী সফলতার কোন সম্পর্ক রয়েছে?

    অবশ্যই। কিছু মানুষ মনে করতেন যে, এই আন্দোলনগুলো শুধু স্বতস্ফূর্তই না অরাজনৈতিকও। তাই তারা প্রচলিত রাজনীতির বাইরে অবস্থান নিলেন। কিন্তু তারা তাদের সামনে থাকা রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি ব্যতিক্রমধর্মী কিছু একটার জন্য অনুসন্ধানও চালাচ্ছিল। স্পেনের পডেমস এবং গ্রীসের সিরিজা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এটা দেখায় যে, যদি বিপ্লবী বামপন্থীরা উপযুক্ত কর্মসূচি হাতে নিতে পারে তবে তারা এই আন্দোলনগুলির সাথে একটা সমঝোতায় যেতে পারে এবং তাদের দাবীগুলোকে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক রুপ প্রদান করতে পারে।

    ২০১২ সাল থেকে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সরকারী কার্য পরিচালনার সিরিজার অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপটা কি?

    ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিপ্লবী বামপন্থীরা PASOK এর সাথে যে কোন ধরণের ঐক্য করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই কারণে সিরিজা কিংবা KKE খুব সাম্প্রতিক সময়ের আগে অল্প কিছু জায়গা ছাড়া আঞ্চলিক সরকারে অংশ গ্রহণ করেনি। এখন, সিরিজা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে যে বিরাট সফলতা অর্জন করেছে তার সাথে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃতির মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য তৈরি হয়ে গেছে।

    দলটি স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত খারাপ ফল করেছিল যেটা ২০১৪ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তীতে জাতীয় ও ইউরোপিয়ান পর্যায়ের নির্বাচনে ২৭% এর জায়গায় ১৮% এ নেমে এসেছে। কিন্তু তারপরও Attica সহ আরও দুইটা অঞ্চলে এটি বিরাট অগ্রগতি অর্জন করেছিল যেখানে প্রায় ৪০% গ্রীক লোকজন বসবাস করে।

    আলেক্সিস সিপ্রাস কিভাবে গ্রীসে পরিচিত হলেন?

    সর্বাগ্রে যে বিষয়টি বিবেচনায় এসেছিল তা হল তার বয়সঃ সব কিছুর পরেও তিনি কিন্তু একজন তরুণ মানুষ। কিন্তু গ্রীসের বিপ্লবী বামপন্থীদের ক্যাডাররা এবং নেতৃস্থানীয় গ্রুপগুলো ষাটের দশকের কিংবা তারও আগের প্রজন্মের নেতাদের দ্বারা প্রভাবিত, যারা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িত থাকার জন্য এখনও যথেষ্ট মর্যাদা পেয়ে থাকেন।

    আলেকস আলভানেস যিনি সিনাস্পিসমসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনি কম বয়সের হঠকারীতা জাতীয় বিষয়কে রোধ করার জন্য সিপ্রাসের উপরে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা দেখাশোনা করেন। এটা রাজনৈতিক সদিচ্ছার একটা মহান উদাহরণ। সিপ্রাস পার্টির প্রধান নেতা হওয়ার আগেও জনপ্রিয় ছিলেন, তিনি এথেন্সের পৌর নির্বাচনে পার্টির তালিকার একেবারে প্রথম দিকে ছিলেন।

    তিনি ঐ অর্থে একজন ক্যারিশম্যাটিক জননেতা নন। তিনি জনগণের সামনে বাজে বক্তৃতা করেন এমন না, কিন্তু George Galloway কিংবা Jean-Luc Mélenchon এর মত অসাধারণ বাগ্মীতার মেধাও রাখেন না। তিনি কিছু ভুলও করেছিলেন, বিশেষ করে তার মত একজন ব্যক্তি গ্রীসের অনেক বামপন্থীদের মত, সঙ্কটের গভীরতাকে প্রথম দিকে বুঝতে পারেন নি এবং কৃচ্ছতা সাধন কর্মসূচিকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করার জন্য জাতীয় ঋণের প্রশ্নটিকে কতদূর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে তাও ধরতে পারেন নি।

    ২০১০ সালে এবং ২০১১ সালের প্রথম দিকে মনে হত তিনি বিভিন্ন ঘটনার ডামাডোলে আড়াল হয়ে গেছেন। তারপর তিনি PASOK সরকারের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে প্রধাণমন্ত্রী জর্জ পাপেন্দ্রিউর বিরুদ্ধে, জাতীয় সংসদে বিতর্কের সময় একটা লড়াকু মেজাজ নিয়ে আসলেন। এইভাবে ধীরে ধীরে তিনি একজন জনপ্রিয় জননেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে নিলেন। এরপর ২০১২ সালের মে মাসের নির্বাচনে বামপন্থীদের নিয়ে এবং কৃচ্ছতাসাধনের বিরোধীতাকারীদের নিয়ে সরকার গঠনে তার প্রস্তাবনা, তার সাফল্যকে নিশ্চিত করে।

    তিনি গ্রীসের বামপন্থীদের ভাবমূর্তিকে পরিবর্তন করেছেন। বামপন্থীদের অগ্রসরতাকে এই কিছু দিন আগেও গুরুত্বপূর্ণ, গণ্যমান্য এবং সামাজিক আন্দোলনের জন্য উপকারি হিসেবে বিবেচনা করা হত। কিন্তু উদ্ভূত সংকটকে সমাধান করতে এক ঐতিহাসিক দ্বায়িত্ব পালন করতে পারার মত কোন শক্তি হিসেবে ভাবা হত না। এটা ছিল বিপ্লবী বামপন্থীদের জন্য একটা সত্যিকারের ঘুরে দাঁড়ানো, যা বহুদিন ধরে বিংশ শতাব্দীর সাম্যবাদের পরাজয়ের আঘাতে ধুঁকছিল। এবং আজ এটা তার এতদিনের সংখ্যালঘুর ভূমিকাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে, যেখানে তাকে সবসময় শুধুমাত্র একটা বিদ্রোহী শক্তি হিসেবেই দেখা হত।

    সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে কিংবা সামজিকভাবে গ্রহণ যোগ্যতার ভিত্তিতে সিরিজার বর্তমান অবস্থাটা কি আমাদের বলবেন? তারপর সিরিজার আভ্যন্তরীন কাজের ধরণ সম্পর্কেও কিছু বলুন। বামপন্থী অংশ, তার নিজের মধ্যে বিভিন্ন সাংগঠনিক শক্তি, বাম বিরোধী শক্তি, মধ্যপন্থী কিংবা ডানপন্থী সবার সম্পর্কেই বলুন।

    ২০১২’র নির্বাচনের ঠিক পর পরই, সিরিজার একক পার্টিতে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়- যা তখন পর্যন্ত অনেকগুলো রাজনৈতিক দলের জোট হিসেবে অবস্থান করছিল। প্রথমে একটা জাতীয় সম্মেলন হল যা প্রথমবারের মত একটা নেতৃস্থানীয় কাঠামো নির্বাচন করল এরপর ২০১৩ সালের জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠাকালীন কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হল। আমি মনে করি, পার্টির গঠন কাঠামো সংক্রান্ত এবং একটা পার্টি গঠন করতে হলে আমাদের কি কি যোগ্যতা অর্জন করতে হবে ইত্যাদি নিয়ে ওই স্তরেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্দান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু একটা দ্রূত ব্যবস্থা গ্রহণের উপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল, যা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ঠ গভীরে আলোচনা করার মত সময় ছিল না।

    ঠিক ঐ সময়েই, যা শুরু করার একটা প্রক্রিয়া ছিল কিন্তু এই শুরু করার প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হয়েছিল বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সামাজিক আন্দোলনে জড়িত, বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষকে বাদ দিয়েই। তাই এটা কমবেশি পার্টি কর্মীদের নিয়ে নয়, পার্টি সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটা রাজনৈতিক দল হওয়ার দিকে এগিয়েছিল। অর্থাৎ, “অনুগামীদের নিয়ে পার্টি” না হয়ে “মিলিট্যান্টদের নিয়ে পার্টি” হিসেবে গঠিত হয়েছিল। এতে আরো বুঝা যায় যে, এটি সিরিজাকে কিছু বিশেষ ধরণের চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে গঠিত করে, যেখানে পারস্পরিক আদান প্রদান না থাকুক, অন্তত স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাকেন্দ্রিক চিরাচরিত চর্চাগুলি করতে হবে, যা গ্রীক সমাজে খুবই শক্তিশালী।

    জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠিত পার্টিগুলো ভেঙ্গে গেল। তারা কেউই আর আলাদা কেন্দ্রীভূত পার্টি হিসেবে রইল না। PASOK পুরোপুরি ভেঙ্গে গেল এবং এটা গ্রীসের সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টি যন্ত্র দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছিল। ডানপন্থীদের পার্টি হিসেবে পরিচিত “নিউ ডেমোক্রেসি”ও ভেঙ্গে গেল। কিন্তু আঞ্চলিক পর্যায়ে এই পার্টিগুলোর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ এখনও অনেক শক্তিশালী।

    এই নতুন গঠন-কাঠামোর একটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে, সিরিজা পরিষ্কারভাবে একটি নেতাকেন্দ্রিক দল হয়ে গেছে। এটা হয়েছিল কারণ, দলটির ভিতরে অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ ছিল। তারা কাজ করছিল কম এবং প্রকৃত অর্থে কৌশল গ্রহণ করা বা সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতাও ছিল কম। কর্ম-কৌশল নির্ধারণ কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটা কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। যে নেতাটি দলের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তিনি এবং তার সাথে বিভিন্ন ধরণের অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বমহল মিলে সিদ্ধান্তগুলো নিজেদের মত করে নিচ্ছেন। এখানে কোন যৌথ নেতৃত্ব কিংবা নেতৃত্ব পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ চর্চা হচ্ছে না।

    আমার মনে হয়, বামপন্থীদের সিরিজার অভ্যন্তরে বিলীন করে দেয়াটা নেতাদের অন্যতম একটা উদ্দেশ্য ছিল। তারা খুব গুরুত্ব দিয়েই ভাবছিলেন যে, “আমরা পুরনো সিরিজার(২০১২ সালের আগে) ভিতরে তুলনামূলক শক্তিশালী ছিলাম, যা বিভিন্ন দলের একটি জোট হিসেবে সংগঠিত হত। কিন্তু নতুন সদস্যদের সমাগমের কারণে দলের ভিতরে আমাদের গ্রহনযোগ্যতা(relative weight) কমে যতে পারে।” আপনাকে যদি একটা উদাহরণ দেই, যেটা নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে সিনাস্পিসমসের সবচেয়ে বড় ঘটনাঃ পার্টির সর্বশেষ কংগ্রেস, যে কংগ্রেসে ডিমার গ্রুপ দল ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে সময় আলভানোস এর নেতৃত্বে পার্টির বামপন্থী অংশ প্রায় ২৫% ভোট পেয়েছিল। তাই পার্টি কংগ্রেসে, যেখানে বামপন্থী অংশ ২৫% ভোট পেয়েছিল, সেখানে নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সিরিজার প্রথম কংগ্রেসে প্রাপ্ত মতামত নেতাদের জন্য এক দারুণ চমক নিয়ে আসে। নেতাদের জন্য চমক ছিল এই কারণে যে, বামপন্থীরা সিরিজার উদ্বোধনী কংগ্রেসে ৩০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে নিজেদের ক্ষমতা অনেক বেশি বাড়িয়ে নেয়।

    ইতিমধ্যে সিরিজার সদস্য সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। সংখ্যাটা ১৭-১৮ হাজার থেকে বেড়ে গিয়ে ৩৫-৩৬ হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। ভৌগলিক বিচারে এটি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায় কিন্তু সমর্থক এবং সংগঠিত শক্তিসমুহের মধ্যে পার্থক্যটা এখনও অনেক বিশাল। শহুরে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে পার্টি এবং তার ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যে যোগাযোগ এখনও অনেক দূর্বল।
    সিরিজা এখনও বুদ্ধিজীবি, সরকারী খাতের শ্রমিক এবং উচ্চ শিক্ষিত কিংবা অতি দক্ষ মানুষদের দ্বারা প্রভাবিত। বয়সের বিচারেও এটি বেশ সমস্যাসঙ্কুল, তরুণ যুবকদের অংশগ্রহণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে এখনও অনেক কম।

    আপনাদের সাথে কি কোন যুব শাখা আছে?

    হ্যা, একেবারে নির্দিষ্ট করে একটি যুব সংগঠন আছে, যা সিরিজার বিভিন্ন সদস্য সংগঠনগুলোর একত্রীকরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে কিন্তু এর সংখ্যা পার্টির বিভিন্ন স্তরের সমর্থকদের তুলনায় অনেকটা কম। তবে সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে সিরিজার ভাবমূর্তি তুলনামূলকভাবে বাড়ছে। এখন এটি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে কিন্তু এই ব্যাপারটা খুব নিচের স্তর থেকে শুরু হয়েছিল। যার মানে হচ্ছে সিরিজার শক্তি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনগুলির মধ্যে থেকে গড়ে উঠে, আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে প্রাইভেট সেক্টরের শ্রমিকদের মধ্যে থেকে, যেখানে KKE’র শক্তি বেশি ছিল।

    গুণগতভাবে, ব্যাপারগুলো কিছুটা ভিন্ন এবং কৌতুহলোদ্দীপকও কারণ, কমিউনিস্ট পার্টি যদিও এখন অনেক সংগঠিত এবং সুসংহত কিন্তু তার প্রধান ঘাঁটিগুলো ট্রেডইউনিয়ন আন্দোলনের কম গতিশীল জায়গাগুলোতে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। এমন সব জায়গায় যেখানে খুব সম্প্রতি আন্দোলন সংগ্রাম বিভিন্ন কারণে হয়ে উঠে নি।
    অনেক ক্রিয়াশীল ইউনিয়নগুলিতে, যেখানে আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, শুধুমাত্র সিরিজাকেই শক্তিশালী করেনি, এটা সেই ক্ষেত্রগুলোকেও বিকশিত করেছিল যেখানে এটি গড়ে উঠেছিল। উদাহরণস্বরুপ, আন্দোলন-সংগ্রাম এখন মাধ্যমিক শিক্ষদের জাতীয় ইউনিয়নের প্রধাণতম বিষয়, যা গ্রীক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মধ্যে অগ্রগামী। আরো উল্লেখযোগ্য যে, এই সেক্টরগুলোতে মধ্য বামপন্থীদের ভাবমূর্তিও তুলনামূলকভাবে উজ্জ্বল হয়েছে যারা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনগুলির মত করে লড়াই করেছিল সেখানে আপনি দেখবেন লোকজন হয় Syriza থেকে এসেছে আর নাহলে Antarsya থেকে এসেছে।

    ইউনিভার্সিটিগুলোর ক্ষেত্রেও একটি বিপ্লবী পরিবেশ আছে, যা বিগত সময়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনগুলির সাথে গড়ে উঠেছিল। সেখানে বিপ্লবী বামপন্থীরা তাদের অবস্থান সংহত করেছিল, বিশেষ করে মধ্যবামরা আরো বেশি সংগঠিত হয়েছিল।(এমনকি KKEও তাদের অবস্থান কিছুটা উন্নত করেছিল।) যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সিরিজা স্থবির হয়েছিল, মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্ররা যেখানে Antarsya(পুঁজিবাদ বিরোধীদের ঐক্যজোট) কর্মীদের সমর্থন করে সেখানে জাতীয় নির্বাচনে সিরিজাকে তার চেয়েও বেশি করে সমর্থন দান করে।

    এই দ্বৈত সমর্থনের ব্যাপারটি আমরা অন্যান্য নির্বাচনগুলিতেও দেখি। বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচনে অথবা আঞ্চলিক নির্বাচন ও ইউরোপীয় নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়টুকুতে। আঞ্চলিক নির্বাচনে, মধ্য বামপন্থীদের জোট যেখানে ২% ভোট পেয়েছিল সেখানে এক সপ্তাহ পরেই ইউরোপীয়ান নির্বাচনে মাত্র ০.৭২% ভোট পেয়েছিল। কাজেই এটা একেবারে পরিষ্কার যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে অথবা ট্রেড ইউনিয়নে আন্দোলন করার কারণে মধ্য-বামপন্থীরা সমর্থন পেত। কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন সামনে এসে গেল তখন সিরিজাই ঐসব আন্দোলনকারী শক্তিদের মধ্যে প্রধাণতম প্রতিনিধি হয়ে উঠল।

    ফলটা হল এই, ঐ সময়ের একটা উল্লেখযোগ্য পরিণতি যা বাস্তবে রুপ পেল তা হচ্ছে, গ্রীসের বিপ্লবী বামপন্থীদের বিভাজন আরো বেশি অনমনীয়, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক এবং পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। (একদিকে KKE এবং অপরদিকে অন্যরা)

    বামপন্থী অংশের বিকাশের ব্যাপারে আরো কিছু বলবেন? ২০১২ সাল থেকে তার ভিতরের উপদলগুলি, তার বেড়ে উঠা, তার আভ্যন্তরিন সংহতির মাত্রা ইত্যাদি সম্পর্কে?
    (চলবে)

৬ thoughts on “গ্রীসের বাম রাজনীতির চালচিত্র ও একজন গ্রীক মাওবাদী নেতার সাক্ষাৎকার

  1. অসাধারণ একটি পোস্ট। খুবই
    অসাধারণ একটি পোস্ট। খুবই পরিশ্রমী ও কষ্টকর পোস্টও বটে। প্রচুর তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে।
    লেখককে স্যালুট।

  2. অসাধারণ কাজ। এই ধরনের মৌলিক
    অসাধারণ কাজ। এই ধরনের মৌলিক লেখা বাংলাব্লগে ইদানিং তেমন একটা চোখে পড়ে না। :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *