চাঁদের কলঙ্কের মতো হাতির ঝিলের বিষফোঁড়া


আমার প্রিয় বন্ধু ডাক্তার রোকাইয়া সুলতানা রুমা ফেইস বুকে ঐতিহ্যবাহী ঢাকার বেশ কিছু অপূর্ব এবং আকর্ষণীয় ছবি দিয়েছিলেন বেশকিছু দিন আগে। তার মধ্যে হাতিঝিলের চোখ ধাঁধানো সেঁতু দেখে আমার চোখে আনন্দে ভিজে গিয়েছিলো। রাতে হাতিরঝিল দেখে বিদেশের কোনো স্থাপনা মনে হয়। আমার ঢাকা শহরে এতো সুন্দর মুগ্ধ করা একটি সেঁতু তৈরি হলো। বাহ! নববর্ষের উপহার হিসেবে প্রধান মন্ত্রি শেখ হাসিনা নগরবাসীকে এই নান্দনিক সেঁতু উপহার দেন।

আমি বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেছি, দেখছি- নানা রঙের, নানান ব্রিজ। কিন্তু পৃথিবীর কোনো শহরের সাথে আমাদের ঢাকা শহরের তুলনা চলে না। ইতিবাচক ভাবেও, নেতিবাচক ভাবেও। বিশ্বের বড় বড় শহরের মাঝখানে প্রবাহিত নদীকে কেন্দ্র করে কি অপূর্ব সৌন্দর্যে সাজানো মনোরম শহর। লন্ডনের টেমস, নিউইর্য়ক হার্টসন, সিডনি্র প্যারাম্যাটা, বাগবাদে তুরাগ, অটোয়ায় অটোয়া নদীর মুগ্ধতা এখনো চোখে লেগে আছে। এমন কী গঙ্গা-যমুনাও কলকাতা-দিল্লীকে সমৃদ্ধ করেছে। কারণ, এ সব নান্দনিক নদীগুলো প্রতিটি শহরের প্রাণ। স্বচ্ছ টলমলে নীল জলের সুরেলা স্রোতের মায়াবী খেলায় মেতে থাকে দু’কূল। আর আমাদের বুড়িয়ে যাওয়া ‘ঐতিহ্যবাহী’ বুড়িগঙ্গা আজ যেনো মৃত্যুর পথযাত্রী। পরিবেশের ভয়াল চিত্র! নোংরা-নষ্ট, দুর্গগন্ধযুক্ত, বিষাক্ত, ময়লা কালোজলের মরণখেলায় হেরে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা। শহরের ভেতরের প্রাণোচ্ছ্বল খাল-বিল-ঝিল হারিয়ে গেছে। এই সব খাল ছাড়াও শহরের প্রায় সব নালা ভরাট করে ভয়াবহ ভাবে ভূমিখেকোরা গ্রাস করেছে। প্রায় মৃত নগরে পরিণত হয়েছে ঢাকা শহর। শহরের ৪৩টি খাল দখল করে নিয়েছে ১০ হাজার ৫১৫ জন ব্যক্তি। এরশাদ-খালেদা ব্যক্তি স্বার্থে ঢাকা শহরের জায়গা-জমি দু’হাতে নিজেদের লোকের মধ্যে দান-খয়রাত করে বিলিয়েছেন। যেমন- রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকা ধ্বংস করে রাগব-বোয়াল, রুই-কাতলাদেরকে প্লট বরাদ্দ দিয়েছে। এমন কি রাস্তাকে প্লট বানিয়ে ভাগাভাগি নিয়েছে। সড়ক প্রকল্প রাতারাতি হয়ে গেল শিল্পপ্লট?

তারপরও অন্তত্য একটি ঝিলে জ্বলে উঠলো ঝলমলে রঙিন আলো। কিন্তু মাঝখানে রয়েছে একটি ‘টিউমার’ অর্থাৎ বিজিএমইএ ভবন নামক বিষফোঁড়া। যা চাঁদের কলঙ্কের তুল্য। যাকে আদালত কর্তৃক আখ্যা করা হয়েছে- ক্যান্সার। ডাক্তার রোকাইয়া সুলতানা রুমা ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি জানেন মরণব্যাধি ডাক্তার ক্যান্সারের ক্ষতিকর দিকগুলো।

তাই নব্বই দিনের মধ্যে হাইকোর্ট এই ‘ক্যান্সার-ভবন’ ভাঙ্গার নির্দ্দেশ দিয়ে বলেছেন- ‘বিজিএমইএ ভবনটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হাতিরঝিল প্রকল্পে একটি ক্যান্সারের মতো। এ ধ্বংসাত্মক ভবন অচিরেই বিনষ্ট না করা হলে এটি শুধু হাতিরঝিল প্রকল্পই নয়, সমস্ত ঢাকা শহরকে সংক্রামিত করবে’। আদালত রায়ে আরো বলেন, বস্তুত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে বিজিএমইএকে আইনের প্রতি আরও অধিক শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। অথচ তারা তা না করে আইনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ব্যবহার করেছেন।

প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা আগেই বলেছেন যে, ‘ঢাকার হাতিঝিল প্রকল্পের সোন্দর্য বিনষ্ট করছে বিজিএমইএ ভবন, এটি একটি টিউমার’।
তাই এ টিউমার নষ্ঠ করছে পরিবেশ, নষ্ট করছে সৌর্ন্দয্য, নষ্ট করছে সরকারের ভাবমুর্তি, নষ্ট করছে আইন এর প্রতি শ্রদ্ধা।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ২৮ নভেম্বর তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে কারওয়ানবাজারের পাশে সোনার গাঁ হোটেলের পেছেনে হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি খালের ওপর এই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ভবন নির্মাণ শেষ হলে ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন উদ্বোধন করেন সে সময়কার প্রধানমন্ত্রি বেগম খালেদা জিয়া।

জানা গেছে, নিয়মনীতি ভংগ করে তারা বরাদ্দকৃত জায়গাজমি বাদ দিয়ে ঝিলের ঠিক মাঝখানে এই বিষফোঁড়ার বীজ বপণ করা হয়! পৃথিবীর আর কোথাও এ ধরনের ‘অভ্যতা’র দৃষ্টান্ত নেই। এক অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করে কৃষি মন্ত্রি মতিয়া চৌধুরী বিজিএমসির কর্মকর্তাদেরকে আঙ্গুল দেখিয়ে রুঢ় কন্ঠে বলেছিলেন- উনাদের হাত আমাদের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই কিন্তু সরকার তা কোনো ভাবেই রোধ করতে পারেনি। কারণ, সরকারের চেয়ে তারা অনেক অনেক বেশি ক্ষমতাধর! জানি না, আদালত রায়ের চেয়েও ক্ষমতাধর কিনা। সরকার যদিও র্যা ঙ্কস ভবন ভেঙ্গে চমৎকার ব্রিজ করেছেন। সেনা নিবাসের ভেতরে খালেদা জিয়ার ‘অবৈধ’ দখল উচ্ছেদ করেছে। শেখ রেহানা ফিরিয়ে দিয়েছে তাঁর ধানমন্ডিস্থ বাড়ি। ইচ্ছে করলে সরকার অনেক কিছুই পারেন। কিন্তু করেন নি। এবার আমার আদালতের রায়ের কার্যকরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে এরা যেনো আবার বৈধতা না পায়। দেশের স্বার্থে পরিবেশ রক্ষায় এই ‘অবৈধ ভবন’ ভেঙ্গে ঢাকা শহরের ‘ক্যান্সার’ উপশম হবে, এটাই নগরবাসীর প্রত্যাশা।

১ thought on “চাঁদের কলঙ্কের মতো হাতির ঝিলের বিষফোঁড়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *