আরশোলা এবং হস্তি সম্বন্ধীয় কয়েকটি কল্পগল্প

হ্যাঁ, বরং সেটাই ভাল। জীব জন্তু পশু পক্ষী লইয়া গল্প লিখিতেও মজা আবার রিস্ক কম। ইহাতে গল্পটাও রসালো হইয়া ওঠে আবার কিছুটা শিশুতোষ আনন্দ’ও লাভ করা যায়। ভাবিয়া দেখুন, উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী কিম্বা সুকুমার রায়েরা যে সব উপাদেয় সাহিত্য রাখিয়া গিয়াচেন তাহাদের সর্বাঙ্গ জুড়িয়া কেবল বানর শৃগাল শজারু তেলাপোকা আর হস্তি। আমাদের সোনামনিরা সে সকল গল্প পড়িয়া ফোকলা দাঁতে যখন খিলখিল করিয়া হাসিয়া ওঠে, সে হাসি দেখিয়া আমরা যারা বয়োজ্যৈষ্ঠ তাহারাও অপার আনন্দ অনুভব করিয়া থাকি। তাহাদের সার্থকতা এই যে, তাহারা একই সাথে একই গল্পে শিশু কিশোর যুবা বৃদ্ধদের জন্য ভুরি ভুরি আনন্দের রসদ পাঁজা করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন আর অদ্যাবধি’ও আমরা সে রস প্রাণ ভরিয়া আস্বাদন করিয়া চলিতেছি।

তাই পশু পক্ষী লইয়া গল্প লিখিতেও মজা আর গল্প বানানো’ও সহজ। ইহার আরেকটি ভাল দিক রহিয়াছে, গাল দিয়া ব্যাঙ্গ করিয়া পশু পক্ষীকে লইয়া গল্প লিখিলে পশুকুল প্রতিবাদ করিতেও আসেনা, প্রতিরোধ করিতেও আসেনা। মনুষ্যকুলের মধ্য হইতে দু’চারি জন যাহারা পশুবৎ মানসিকতা পোষণ করে তাহারা গল্প পড়িয়া গল্পের নির্যাশটুকু অনুধাবন করিতে পারিলে রাগে দাঁতে দাঁত কামড়াইয়া চুপ করিয়া থাকেন কিন্তু নিজের পাশবিক চেহারা উন্মুক্ত হইয়া পড়ে এই ভয়ে খুব একটা সরব হইয়া ওঠেন না। আমিও সেই পন্থায় অবলম্বন করিতেছি, দেখিয়াছি শিশুতোষ গল্পকারের কোন কালেই কোন শত্রু ছিলনা। অযথা মনুষ্য লইয়া গল্প লিখিয়া শত্রুতা বাড়াইয়া লাভ কি?

আমার গল্পে কয়েক জন আরশোলা আর এক খানা হস্তি আমন্ত্রিত হইয়া আসিয়াছেন। ইহারা যেনতেন কেহ নন, ইনারা প্রত্যেককেই পশুদরদী, প্রাণীহিতৈষী, সমাজকর্মী এবং সেই সাথে নারীবাদী।

একটা আরশোলার গল্প বলি।

একজন নারীবাদী আরশোলা জীবনের শেষ বেলায় এসে বিবাহ করিবেন বলিয়া ঠিক করিলেন। প্রত্যেকটি আরশোলা বিবাহ করিয়া সংসার পাতিয়া ফি বছর শ’য়ে শ’য়ে বাচ্চার মা হইতেছেন। সুচারু ঘরকন্না করিয়া স্বামী সন্তান লইয়া সুখে শান্তিতে বাস করিতেছেন দেখিয়া কাহার না সংসার করিবার ইচ্ছা হইবে না? তো, ঠিক করিলেন তিনি বিবাহ করিবেন। তো হইলো বিবাহ, সারা দেশে ছিঃ ছিঃ পড়িয়া গেল। এতদিন নারীবাদী হইয়া কি না শেষ বয়সে এসে বিবাহ! ছিঃ! নারীবাদী আরশোলা বিপাকে পড়িয়া গেল। তাই তো, সারাজীবন নারীবাদী সাজিয়া পুরুষ বিদ্বেষ দেখাইয়া শেষ কালে আসিয়া সেই পুরুষের সাথেই গিয়া ঘর বাধিলাম? স্বামীকে গিয়া কহিলেন “ শোন, আজ হইতে তুমি নীচে আর আমি উপরে। আমিও দেখাতে চাই, একজন নারীবাদী হিসেবে একজন পুরুষকে আমরা সব সময় নীচেই বিবেচনা করি”। যা হোক, পরের বছরেও তাহার কয়েকশো বাচ্চা ডিম ফুটিয়া বাহির হইলো!

আরেকটি আরশোলার গল্প।

একজন নারীবাদী আরশোলা হটাত করিয়া বিপাকে পড়িয়া বিবাহ করিয়াছেন। নারীবাদী আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে তাহার এই কর্ম গর্হিত অপরাধ বলিয়া গণ্য হইলো। তাহার সহযাত্রীরা তাহাকে যারপরনাই গালমন্দ করিতে লাগিল। ইহা কি করিলে তুমি? একজন নারীবাদী হইয়া পুরুষের হাতে নিজেকে সমর্পণ করিলে? ধিক্কার, ধিক্কার!

নারী বাদী আরশোলাটি নিকটস্থ দোকানে গিয়া জিজ্ঞেস করলেন “ আরশোলা মারার ঔষধ পাওয়া যাবে?” দোকানি হতভম্ব হইয়া জিজ্ঞেস করলেন “ আপনি কি আত্মহত্যা করতে চান নাকি ম্যাডাম?” “ মর জ্বালা! বলি, এই ঔষধ খাইয়ে আমি আমার স্বামীকে হত্যা করতে চাই, আপনি শুধু বলুন এতে আমার পাপ হবে কি না?” দোকানি এক গাল হেসে জবাব দিলেন, “ না, কোন পাপ হবে না”। আরশোলাটি প্লাগ করা ভ্রু একটু খানি বাঁকা করিয়া সন্দেহের চোখে জিজ্ঞেস করলেন “কেন, পাপ হবে না কেন”। হো হো করে হেসে দোকানি জবাব দিলেন “ আরশোলা মারার ঔষধ খেয়ে কোন আরশোলাকে মরতে দেখেছেন কখনও?”

এটি একটি মস্তকহীন নারীবাদী আরশোলার গল্প।

সভা সেমিনার মাঠে ময়দানে তার তুমুল জয় জয়কার। যে আরশোলাটি আজ হইতে সাত দিন আগেও ঘরের কোন বসিয়া শেলাই ফোঁড়াই এর কাজ করিত, রাধিতো বাড়িতো স্বামী বাচ্চাদের দেখভাল করিত সেই আরশোলাটিই কি না এখন এতো বড় বক্তা, সেই আরশোলাটিই কি না এখন এতো দরাজ গলায় রাজপথ দাপাইয়া নারীবাদের পক্ষে তুমুল আন্দোলন গড়িয়া তুলিয়াচে! তো, একদিন এক সাংবাদিক তাহার ইন্টারভিউ লইতে আসিয়াছেন।

ঃ ম্যাডাম, এতদিন কেন আপনি এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হইয়া আন্দোলনকে বেগবান করিবার চেষ্টা করেন নাই? হটাত করিয়া এই সময়ে এতো সোচ্চার হইবার পিছে রহস্য কি?

ঃ আপনার জানা উচিত, আরশোলা মাথা ছাড়াও সাত দিন পর্যন্ত জীবিত থাকিতে পারে। আজ হইতে সাতদিন আগে এক পারিবারিক ঝগড়ার প্রাক্কালে আমার স্বামী আমার চুল সমেত মাথা ছিঁড়িয়া লইয়াছিল। মাথা থাকিতে এ কর্মটি কে করিতে আসে?

ওহ, আমি তো ভুলিয়াই গিয়াছি! আমার গল্পে একজন নারীবাদী হস্তী আসিয়াছেন। এইবার তাহার গল্প বলিব।

নারীবাদী হস্তীর ইয়া চওড়া বপু, ইয়া বিরাট দেহ। যেদিকে যান, সাড়া পড়িয়া যায়। দেখিতেও যেমন তাহার হুঙ্কার’ও তেমন ভয়াল । তারপরেও প্রাণী জগতে এই একমাত্র প্রাণীটিই সবসময় হাসি খুশি থাকে। জিজ্ঞেস করুন, কেন? আপনি তো মশায় আচ্ছা লোক! খেয়াল করিয়াছেন কি, হস্তীর সব সময় দন্ত বাহির হইয়া থাকে! না হাসিলে কাহারো দাঁত বাহির হইয়া থাকিতে দেখিয়াছেন কখনও? তাজ্জব!

এই হাসি খুশি নারীবাদী হস্তিটি হটাত করিয়া গোঁ গোঁ করিয়া কাঁদিতে লাগিল। বাবা জিজ্ঞেস করে, মা জিজ্ঞেস করে কিন্তু কাউকেই কোন কারন না বলিয়া হস্তিটি কেবল কাঁদিয়াই যাইতেছে আর কেবল কাঁদিয়াই যাইতেছে। মা অনেক করিয়া ধরিলেন,

ঃকি হইয়াছে আমাকে খুলিয়া বল, আমি সব সমাধান করিয়া দিতেছি।
ঃ না মা, এ যে সমাধানের যোগ্য নয়। আমি ভুল করিয়া একটা পিঁপড়ার প্রেমে পড়িয়াছি।
ঃ তো কি হইয়াছে, ভুলিয়া গেলেই তো ল্যাঠা চুকিয়া যায়। এতে এতো কাঁদিবার কি আছে?
ঃ না মা, সম্ভব না। পিপড়াকে আমি কিছুতেই ছাড়িতে পারিবনা।
ঃ কেন, কেন ছাড়িতে পারবি না শুনি।
ঃ আমি যে পিঁপড়ার বাচ্চার মা হতে চলেছি!

এক চামচিকার সাথে এক হস্তীর বিবাহ হইলো। বাসর রাতে হস্তীর সাথে রাত কাটাইয়া সকালে চামচিকা ভেউ ভেউ করিয়া কাঁদিতে লাগিল। কি হইয়াছে শুধাইয়া পাড়ার লোক হুমড়ি খাইয়া পড়িল। শেষে চামচিকার কথা শুনিয়া সকলের চক্ষু চড়কগাছ। সে অন্ধকারে ভুল করিয়া সমুখের শুঁড়কে লেজ ভাবিয়া তাহার তলা অনুশন্ধান করিয়া কাঙ্খিত অঙ্গের সন্ধান তো পাই’ই নাই উপরন্তু সেখানে দুটো দাঁত দেখিয়া নিরাশ হইয়াছে। সে ভাবিয়া লইয়াছে যে তাহাকে ঠকানো হইয়াছে এবং বেশি বয়সি হস্তীর সাথে তাহাকে বিবাহ দেওয়া হইয়াছে। তা না হইলে ওইখানে দাঁত গজাইবে কেন!

এবার একটা হস্তী বিক্রির বিজ্ঞাপন।

নারীবাদী হস্তীর যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া ত্যাক্ত-বিরক্ত হইয়া গেছেন আনিস সাহেব। সংসারে নানা রকমের যন্ত্রণা গঞ্জনার অবশেষে শেষমেষ তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন হস্তিটি বিক্রি করিয়া দেবেন তিনি। ততাক্ষনাত ফোন করলেন পত্রিকা অফিসে।
আনিস সাহেব : হ্যালো, আমি একটা বিজ্ঞাপন দিতে চাহিতেছি।
বিজ্ঞাপন ম্যানেজার : আপনি শেষ মুহূর্তে ফোন করিয়াছেন, আমার হাতে মাত্র এক স্কয়ার ইঞ্চি জায়গা খালী আছে। চলবে?
আনিস সাহেব : না না, এত কম জায়গায় হবে না। আমার একটা পোষা হস্তি আছে, সেটা বিক্রির বিজ্ঞাপন দিতে চাই। এতো অল্প জায়গায় চলবে না। একটু বড় সাইজ তো, একটু বেশি জায়গা লাগবে।

৭ thoughts on “আরশোলা এবং হস্তি সম্বন্ধীয় কয়েকটি কল্পগল্প

  1. দারুণ সুখপাঠ্য। খুব মজা
    দারুণ সুখপাঠ্য। খুব মজা পাইছি। এখানে লাইক দেবার সিস্টেম আছে কি না আমার জানা নাই, থাকলে বা জানলে দিতাম।
    কয়েকটি ভুল বানান চোখে পড়ায় সেগুলির শুদ্ধরূপ এবং ব্যাখ্যাসহ উল্লেখ করলাম। এ বিষয়ে আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। আশাকরি সহজভাবে নেবেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে পাশে রাখবেন।
    চমৎকার লেখার জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

    গিয়াচেন>গিয়াছেন
    সোনামনিরা>সোনামণিরা
    বয়োজ্যৈষ্ঠ>বয়োজ্যেষ্ঠ
    এক খানা >একখানা
    তুমি নীচে >তুমি নিচে (নিচ=তল, যেমন-নিচতলা। নীচ=হীন, যেমন-নীচু জাত।
    নারী বাদী >নারীবাদী
    শেলাই>সেলাই
    রাধিতো>রাঁধিত
    বাড়িতো>বাড়িত
    রাধিতো বাড়িতো> রাঁধিত-বাড়িত (দ্বিত্ব শব্দের মাঝে হাইফেন ব্যবহার করলে খারাপ হয় না, যদিও অন্যভাবে লিখলে ভুল নাই।)
    তুলিয়াচে>তুলিয়াছে
    কারন>কারণ (ব্যতিক্রম ছাড়া ঋ, র, ষ, ক্ষ, গ, ষ এর পরে ণ বসে)
    পারিবনা>পারিব না (‘না’ শব্দটি ক্রিয়ারসাথে বসে না, ‘নি’ শব্দটি বসে। যেমন- করি না, করিনি। যদিও বিষয়টি বহুল প্রচলিত, অনেক বড় বড় লেখকও লিখে থাকেন তবে এটি ব্যকরণসিদ্ধ নয়।)
    অনুশন্ধান>অনুসন্ধান
    কাঙ্খিত>কাঙ্ক্ষিত (ঙ+ক্ষ)
    বয়সি>বয়সী
    ত্যাক্ত>ত্যক্ত
    শেষমেষ>শেষমেশ
    ততাক্ষনাত>তৎক্ষণাৎ

    1. আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
      হ্যাঁ,

      আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

      হ্যাঁ, অনেক ভুল ধরিয়া দেওয়ার জন্য সত্যিই আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।
      এই ভুলগুলোর কিয়দংশ অজ্ঞতাপ্রসুত আবার কিছুটা কী-বোর্ডের কারনে ঘটিয়াছে।
      পরবর্তীতে এই সকল মাথায় রাখিয়া লিখিবার প্রত্যয় রইল।

      1. আমি কৃতজ্ঞ। অনেকে রিএ্যাক্ট
        আমি কৃতজ্ঞ। অনেকে রিএ্যাক্ট করে বসে। যদিও আমি ইতিবাচকভাবেই এ সহযোগিতাটি করতে ও পেতে চাই।

        1. এখানে শিখিতে আসিয়াছি।
          এখানে শিখিতে আসিয়াছি। মাঝেমধ্যে একটু আধটু ত্রুটি ধরাইয়া দেওয়ার আহব্বান রহিল।
          আর নিশ্চিন্তেই এটা করিতে পারিবেন বলিয়া বিশ্বাস রাখিবেন।
          সমালোচক অনেকেই হইতে পারে, সুহৃদ অনেকেই হইতে পারে না।

          1. সহ-ব্লগার হিসেবে আপনার
            সহ-ব্লগার হিসেবে আপনার মন্তব্য সত্যিই অনুপ্রেরণা যোগায়। দ্বিপাক্ষিক বিষয়টি আছে বলেই ব্লগের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এখানে লেখককে পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।

            সাধ্যমত সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *