একটি নৈতিকতাপূর্ণ অর্থব্যবস্থার প্রয়োজন

আমরা বিশ্বব্যাপী যে অর্থব্যবস্থায় বেঁচে আছি, সেটি পুঁজিবাদি অর্থব্যবস্থা। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার অসারতা প্রমাণিত হওয়ার পর বারবার পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার দুর্বলতা ও ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছে। পুঁজিবাদের শোষণে অতিষ্ট জনতার শ্লোগান বিশ্বব্যাপী বারবার ধ্বনিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১২ সালে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনের কথা তো সবার জানা। যখন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের ৮২টি রাষ্ট্রের ৯৫১টি শহরে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছিলো জনতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বারবার পুঁজিবাদী অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশ্বের নানা দেশে দেখা দিয়েছে পুঁজিবাদের সঙ্কট। ১৯৯৫ সালে মেক্সিকোতে, ১৯৯৭-৯৮ সনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে, ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকায় এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ও রাশিয়ায়, ১৯৯৯ সনে ব্রাজিলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির মারাত্মক সঙ্কট দেখা দেয়। একই সঙ্গে সঙ্কটাপন্ন দেশগুলোতে দেখা দেয় পুঁজিবাদবিরোধী বিক্ষোভ। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের এই ঘনঘন সঙ্কট তৈরীর বহুবিধ কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পুঁজিবাদী অর্থনীতির মৌলিক নীতিগত দুর্বলতা। পুঁজিবাদী অর্থনীতি দৃশ্যত যতোটা মজবুত গাথুনিপূর্ণ মনে হয় বাস্তবে ততোটা আদৌ নয়। পুঁজিবাদ মূলত দৃশ্যত চাকচিক্যপূর্ণ অথচ অন্তঃসারশূন্য একটি অর্থব্যবস্থা। যে কারণে বিশ্লেষকরা মাকড়সার জালের সঙ্গে পুঁিজবাদী অর্থনীতিকে প্রায়শই তুলনা করে থাকেন। মাকড়সার সূক্ষè ও সুবিন্যস্ত জাল যেমন সামান্য হাওয়ায় মিলিয়ে যায় তেমনি সামান্য পরিবর্তনে মুহূর্তে ভেঙ্গে যায় বিশাল পুঁিজবাদের ভিত।
পুঁিজবাদী ও ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন, তারা পুঁিজবাদের সঙ্কট মোকাবেলায় ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। অবশ্য এ উপস্থাপনার যৌক্তিকতাও রয়েছে। আমরা যদি পুঁিজবাদী ও ইসলামী অর্থনীতির তুলনামূলক আলোচনা এবং এর প্রতিফল বিশ্লেষণ করি, তাহলে সে যৌক্তিকতা ফুটে উঠবে।
পুঁিজবাদী  অর্থনীতরি একটি অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে, ব্যক্তির সম্পদের মালিক শুধু ব্যক্তিই। এখানে একের সম্পদে অন্যের আইনগত কিম্বা নৈতিক কোনো অধিকার নেই। পুঁজিবাদের এ মূলনীতি মানুষকে চরম স্বার্থপর ও ভোগবাদী হিসেবে গড়ে তোলে। এর বিপরীতে সমাজতন্ত্র স্বার্থপরতার লাগাম এমনভাবে টেনে ধরেছে যে মানুষকে তার সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। কিন্তু ইসলাম পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যখানে যে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা দিয়েছে, তা ভোগবাদকে যেমন দমন করে, তেমনি মানুষকে তার বৈধ সম্পদের  পূর্ণ অধিকার প্রদান করে। এক কথায় বললে, ইসলামী অর্থনীতির দ্বারা মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক নৈতিকতা সৃষ্টি হয়। সমাজে সম্পদের সুষম বন্টন প্রতিষ্ঠা পায়। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আন্তরিকতা, মমত্ববোধ, সহানুভূতি ও পরার্থপরতা জাগ্রত হয়।
ইচ্ছে মতো আয়-ব্যয় পুঁজিবাদী অর্থনীতির আরেকটি মূলনীতি। এই মূলনীতির ভিত্তিতে ব্যক্তিকে যত ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা আয়-ব্যয়ের আইনগত অধিকার প্রদান করে পুঁজিবাদ। এখন কেউ যদি কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে সোনালী ব্যাঙ্কের টাকার বস্তা চুরি করে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয়, পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূলনীতি অনুযায়ী সেটা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু ইসলমে এধরনের অনৈতিক আচরণের আদৌ কোনো সুযোগ নেই। ইসলামী অর্থনীতি ব্যক্তির যত ইচ্ছা ততো আয়ের পথকে উন্মুক্ত রেখে হালালা-হারামের বিধানের ভিত্তিতে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আয়-ব্যয়ের পথকে রুদ্ধ করেছে।
পুঁজিবাদের এ সকল নীতি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। আর এ নৈরাজ্যের রাজা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদ গায়ের জোরে ও চাতুরিপনার মাধ্যমে শোষণ করছে বিশ্ব অর্থনীতি। তথাকথিত বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাকে ব্যবহার করছে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে। সাম্রাজ্যবাদের সুবিধার্থে অবাধ বাণিজ্য চুক্তির বিধান চালু করেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। ক্ষুদ্র দেশগুলোর জন্যে দেশীয় শিল্পকে বাঁচানোর বিরাট একটি উপায় ছিলো বিদেশী পণ্যে শুল্ক আরোপ করা। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা অবাধ বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে তা উঠিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া বিশ্বায়নের তত্ত্ব প্রয়োগ করে অনেক আগেই পৃথিবীকে বাণিজ্যিক সীমানাশূণ্য করেছে পুঁজিবাদ। ফলে পুঁজিবাদের মোড়লরা সর্বত্র ভোগের সাম্রাজ্য তৈরির প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। দেশীয় সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী পুঁজি ও পণ্যের অসম রপ্তানী করছে পুঁজিবাদ। যে কারণে বিশ্বব্যাপী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সর্ম্পকের ক্ষেত্রে দিনদিন ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্বি পাচ্ছে। এক পক্ষ হচ্ছে একচেটিয়া লাভবান আর অপর পক্ষ হচ্ছে মুনাফা থেকে বঞ্চিত।
এই যে আজকের পৃথিবীতে উন্নয়নের  ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্ব ও অনুন্নত বিশ্বের মধ্যে একটা বিশাল ব্যবধান, এর জন্যে  এই পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা অনেকাংশেই দায়ি। শুধু বৈশ্বিক উন্নয়ন নয়, দৈশিক উন্নয়নে অগ্রগতিহীনতার জন্যেও পুঁজিবাদ সমানভাবে দায়ি। পুঁজিবাদের নৈতিকতাহীন নীতি পুঁজিপতিদেরকে এতোটাই মুনাফামুখী করে তুলে, যে একজন পুঁজিপতি মুনাফাহীন ক্ষেত্রে এক পয়সা ব্যয়েও নিরুৎসাহবোধ করেন। যে কারণে দেশের পুঁজিপতিরা নিঃর্স্বাথ দেশোন্নয়নে অর্থব্যয় না করে সম্পদের পাহাড় গড়তে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। অনেকে আবার দেশীয় ব্যাংকে আস্থা রাখতে না পেরে বিদেশে অর্থপাচার করেন। এই বিদেশে আর্থপাচারের ক্ষেত্রে আমাদের বাংলাদেশী পুঁজিপতিরা অনেক এগিয়ে। ইউএনডিপির এক প্রতিবেদন বলছে, অর্থপাচারে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় আর আইভরিকোস্ট অদ্বিতিয়। অর্থাৎ এক নাম্বার। ইউএনডিপির এ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৮০কোটি ডলার অর্থাৎ ৬, ২৪০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। স্বাধীনতার পর থেকে ৪২ বছরে তিন লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এর অধিকাংশ টাকাই সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকে পাচার হয়েছে। অথচ, পদ্মা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় মাত্র ২৫ হাজার কোটি টাকার জন্যে দেশে দেশে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে হাত পাততে হয়েছে আমাদের। যদি পাচার হওয়া তিন লাখ কোটি টাকা দেশে বিদ্যমান থাকতো, তাহলে কি পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্যে  কখনও বিদেশে হাত পাততে হতো!
যদি মানুষের মধ্যে সত্যিকার অর্থে নৈতিকতাপূর্ণ অর্থনীতিবোধ জাগ্রত হয়, তাহলে এই নীতিহীন স্বার্থপরতা আর থাকবে না। মানুষ মানুষের জন্যে হয়ে দাঁড়াবে। ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে দারিদ্র বিমোচন। হতদরিদ্রদের শোষণ করে পুঁজিপতি সম্পদের পাহাড় গড়বে না। বিদেশে পাচার হবে না আর দেশের অর্থ। সম্রাজ্যবাদ বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য আর ধরে রাখতে পারবে না। কমে আসবে উন্নত বিশ্ব আর অনুন্নত বিশ্বের উন্নয়নের ব্যবধান। আর মানুষের মধ্যে সত্যিকার অর্থে নৈতিকতাপূর্ণ অর্থনীতিবোধ জাগ্রত করতে হলে প্রয়োজন ইসলামী অর্থব্যবস্থা। শুধুই ইসলামী অর্থব্যবস্থা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *