রা’সুল মাল, রাব্বুল মাল, আবুল মাল

আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছাড়াও রাবিশ, ভোগাস ইত্যাদি বকাবকিসহ নানা বক্তব্যের কারণে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তিত্ব। সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকিংকে ফ্রড (প্রতারণা) এবং প্রচলিত সুদ ও রিবা এক নয় বলে বক্তব্য প্রদান করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। তিনি ফেব্র“য়ারির শুরুর দিকে জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে সংসদসদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ইসলামি ব্যাংকিং একান্তই একটি ফ্রড (প্রতারণামূলক) ধারণা। ভুলের ওপর নির্ভর করে ইসলামি ব্যাংকিং হচ্ছে।….. ইসলামে রিবা নিষিদ্ধ। কিন্তু রিবা ও সুদ এক নয়। রিবা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। এখানে কোনো মানবিকতা  নেই। সুদ হচ্ছে কস্ট অব ফান্ড (তহবিলের ব্যয়) বা কস্ট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (প্রশাসনিক খরচ)। ধর্ম নিয়ে যারা বেশি কথা বলেন, তারা সুদ আর রিবাকে এক করে ফেলেন।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী এখানে মূলত কস্ট অব ফান্ড যুক্তির মাধ্যমে রিবাকে সুদ থেকে পৃথক করে দেখছেন। এটা হয়তো কোরআনে বর্ণিত রিবার সংজ্ঞা ও  ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর অসচেতনতারই বহিঃপ্রকাশ। এই বক্তব্য প্রদানের আগে অর্থমন্ত্রীর বুঝা উচিৎ ছিলো যে, ইসলামের অর্থনীতি অনুযায়ী কস্ট অব ফান্ড কোন কোন ক্ষেত্রে গ্রহণ করা যায়, আর কোন কোন ক্ষেত্রে গ্রহণ করা যায় না। কেননা, ইসলামী অর্থনীতি অনুযায়ী যে সকল জিনিস সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়, তা থেকে কস্ট অব ফান্ড গ্রহণ করা বৈধ না। এই বিধি অনুযায়ী টাকা-পয়সা ঋণ প্রদান করে কস্ট অব ফান্ড বলে এর বিপরীতে অতিরিক্তি গ্রহণ করাও বৈধ হবে না। কেননা, টাকা-পয়সা সরাসরি ব্যবহারযোগ্য কোনো বস্তু কিম্বা বিক্রয়যোগ্য কোনো পণ্য নয়। এগুলো হচ্ছে বিনিমিয়ের মাধ্যম মাত্র। যারা সুদের পক্ষে কথা বলেন, তারা টাকা-পয়সা বা মুদ্রাকে পণ্য হিসেবে গণ্য করে  কস্ট অব ফান্ড, সার্ভিস চার্জ ইত্যাদি বলে সুদকে বৈধ করার চেষ্টা করেন।
এ ছাড়া  কোরআনের সকল ব্যাখ্যাকারকগণ হাদিসের ভিত্তিতে রিবার যে সংজ্ঞা দিয়েছেন এর দ্বারা প্রচলিত সুদকেই রিবা হিসেবে নির্দেশ করে। ইমাম আবু বকর আল জাস্সাস তার বিখ্যাত তাফসির আহকামুল কোরআনে রিবার সংজ্ঞায় বলেন, জাহিলিয়াতের সময় সুদ ছিল, কোনো নির্ধারিত সময়ের জন্যে প্রদত্ত ঋণের আসলের ওপর ঋণগ্রহীতা কর্তৃক দেয়া নির্ধারিত অতিরিক্ত। ইমাম ফখরউদ্দিন রাজি জাহিলিয়াতের যুগে রিবার প্রচলন পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন, জাহিলিয়াতের যুগে লোকেরা অর্থঋণ দিত আসল ঠিক রেখে মাসিক হারে অতিরিক্ত পরিমাণ আদায়ের ভিত্তিতে। এ ছাড়া ফিকহ-এর কিতাব সমূহে  কুল্লু কারজিন জাররা নাফ’আন ফাহুয়া রিবা (মুনাফা অর্জনকারী প্রত্যেক ঋণই রিবা বা সুদ) বলে সুদের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। সুতরাং এখানে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে এক্সট্রা ইন্টারেস্ট গ্রহণ করে কস্ট অব ফান্ড ব্যাখ্যা দিয়ে সুদের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বা রিবাকে চক্রবৃদ্ধি সুদ বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আর যৌক্তিকতা ও মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচলিত সুদ এবং চক্রবৃদ্ধি সুদ কোনোটিই মানবিক নয়। চক্রবৃদ্ধি সুদ যেমন মানুষকে অমানবিক করে তোলে অচক্রবৃদ্ধি সুদও তেমনি মানুষকে মানবিকতা থেকে দূরে ঠেলে দেয়। তবে প্রচলিত সুদের চেয়ে চক্রবৃদ্ধি সুদ অধিকতর অমানবিক। সুতরাং মানবিকতা আর অমানবিকতার বুলি আওড়িয়েও সুদকে হালাল কিম্বা রিবা থেকে পৃথক করার কোনো সুযোগ নেই।
লাভ-ক্ষতির অংশিদারীর ভিত্তিতে সুদবিহীন কারবারের জন্যে ইসলাম মুদারাবা পদ্ধতির প্রচলন করেছে। মুদারাবার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীকে রাব্বুল মাল আর বিনিয়োগকৃত পুঁজিকে রা’সুল মাল বলে। রাসুল সা. বিবাহের পূর্বে খাদিজা রা.-এর কাছ থেকে লাভ-ক্ষতির অংশিদারির (মুদারাবা) ভিত্তিতে পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করতেন। রাসুল সা. যেহেতু মদীনায় আল-আমীন বা বিশ্বাসী হিসেবে খ্যাত ছিলেন, তাই মদিনার লোকেরা তাদের অর্থকড়ি রাসুল সা.-এর কাছে জমা রাখতো। পরবর্তিতে সাহাবাদের মধ্যে এর চর্চা শুরু হয়। সাহাবাদের মধ্যে হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও ইবনে আব্বাস রা. উল্লেখযোগ্য। যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা.-এর কাছেও লোকেরা অর্থকড়ি জমা রাখতো। তিনি লোকদের কাছ থেকে তা আমানত হিসেবে জমা না রেখে ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতেন, যাতে করে তা প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায় এবং তিনি তা বিনিয়োগও করতেন আবার লোকেরা তাদের প্রয়োজনে উঠিয়ে নিতেও পারতো। ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম সাধারণত রাসুল সা.-প্রবর্তিত ও সাহাবাদের চর্চিত বর্ণিত পদ্ধতিতেই করে থাকে। ব্যাংক রাব্বুল মাল (বিনিয়োগকারী)-এর কাছ থেকে রা’সুল মাল (পুঁিজ) সংগ্রহ করে অন্যের কাছে বিনিয়োগ করে এবং তা থেকে মুনাফা অর্জন করে। তবে ইসলামী ব্যাংকগুলো মুদারাবার ভিত্তিতে  পুঁজি সংগ্রহ করলেও নিরাপত্তার প্রশ্নে সাধারণত মুদারাবার ভিত্তিতে পুঁিজ বিনিয়োগ করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যংকগুলো সাধারণত বাইয়ে মুরাবাহার আশ্রয় নিয়ে থাকে। অর্থাৎ ব্যাংক নগদ মূল্যে পণ্য ক্রয় করে বাকিতে পরিশোধের শর্তে গ্রাহকের কাছে ক্রয়কৃত মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্যে বিক্রি করে।
রাসুল সা.-এর সময় থেকে ইসলামী অর্থব্যবস্থার শুরু হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে প্রচলিত ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৯৬৩ সনে মিশরে মিট গামার লোকাল সেভিংস ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর পরে ১৯৭৫ সনে জেদ্দায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), দুবাইয়ে দুবাই ইসলামী ব্যাংক এবং ১৯৮৪ সালে জেনেভায় দারুল মাল ইসলামিক ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সনে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল) প্রতিষ্ঠিত হয়।  উল্লেখ্য, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ নিবন্ধিত হয়। ১৯৯৬ সালে ইসলামি ব্যাংকিং নীতিমালার ভিত্তিতে কাজ করার লক্ষ্যে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড এবং সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড নামে আরও দুটি ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পায়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন সাতটি ইসলামি ব্যাংক  রয়েছে এবং তাদের শাখার সংখ্যা  গ্রাম ও শহর মিলে ৫৩২টি।
এটা সবারই জানা যে, ইসলামী ব্যাংকই একমাত্র বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা নয়। ইসলামী ব্যাংকিং-এর বিপরীতে পৃথিবীতে আরেকটি ব্যাংকিংব্যবস্থা রয়েছে। যাকে আমরা সাধারণত  সুদী ব্যাংক বলে জানি। যার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভব ইসলামী ব্যাংক সৃষ্টির অনেক আগে। ১৪০১ সনে ব্যাংক অব বার্সেলোনা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই সুদী ব্যাংকব্যবস্থার আধুনিক যুগের সূচনা। এর পর ১৬৯৪ সালে বিশ্বের প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক দি ব্যাংক অব ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। সতেরো শতকে এসে বিশ্বের নানা দেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংক অব হিন্দুস্থান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান। ৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্টেট ব্যাংক আব পাকিস্তানের বাংলাদেশ শাখাটি বাংলাদেশ ব্যাংকে রূপান্তর হয়।
এই ব্যাংকিং ব্যবস্থা এক সময় আজকের মতো এতো উন্নত ছিলো না। সময়ের পরির্বতনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকব্যবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। এক কথায়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এই সময়ে এসে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির সুবাদে ব্যাংকিং সেবা মানুষের   দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। সকল ব্যাংকিং সেবার জন্যে এখন আর  লোকদেরকে পেরেশান হয়ে গ্রাম থেকে শহরে আসতে হচ্ছে না। ছোটখাটো লেনদেন ঘরে বসেই অনলাইনে সারা যাচ্ছে। ফলে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ব্যাংকিং-এর দিকে বহুগুণে ধাবিত হচ্ছে। মানুষ তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকিং-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে। অর্থ সঞ্চয়, স্থানান্তর ও বিনিয়োগ ইত্যাদি অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ব্যাংকমুখী হচ্ছে জনগণ। ফলে ব্যাংকে লেনদেন বাড়ছে। কিন্তু, তারপরেও পুঁজিবাদী সুদীব্যবস্থানির্ভর প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সঙ্কট কাটছে না। থেকেই যাচ্ছে তাদের সেই পুরোনো সঙ্কট। কখনও দেউলিয়া হচ্ছে ব্যাংক, কখনও গ্রাহক। এর বিপরীতে ইসলামী অর্থব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত সুদবিহীন ইসলামী ব্যাংকগুলো ক্রমাগত তাদের সফলতার মুখ দেখেই যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়োচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা। দিন দিন বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকের সংখ্যা, গ্রাহক ও লেনদেন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি ইউরোপের অমুসলিম দেশগুলোতেও ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বেরে ৭৫টি দেশে প্রায় হাজারের অধিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী অর্থব্যবস্থার উপর পরিচালিত হচ্ছে।
ইসলাম মানবতার ধর্ম। মানুষের কল্যাণের জন্যেই ইসলামের সকল বিধি-বিধান। ইসলাম সুদবিহীন অর্থব্যবস্থার প্রচলন করেছে প্রতারণা কিম্বা মানুষ ঠকানোর জন্যে নয়, মানুষের কল্যাণ ও মানবিকতার জন্যে। ইসলামী ব্যাংক যেহেতু ইসলামী অর্থব্যবস্থার ভিত্তিতে তাদের র্কাযক্রম পরিচালনা করে থাকে, সুতরাং ইসলামী ব্যাংকিংকে ফ্রড কিম্বা প্রতারণা বলা আদৌ ঠিক হবে না।

৯ thoughts on “রা’সুল মাল, রাব্বুল মাল, আবুল মাল

    1. ইসলামী পরিভাষায় হয়ত ‘মুৎ আর
      ইসলামী পরিভাষায় হয়ত ‘মুৎ আর জল’ একই জিনিস। কিন্তু বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘মুৎ আর জল’ ভিন্ন জিনিস। দু’টি জিনিসের রাসায়নিক ভিন্নতা অনেক। বিজ্ঞান আর ধর্মের পার্থক্য হচ্ছে এখানেই। ধার্মিকরা মুৎ আর জল’কে একই জিনিস মনে করে। আর বিজ্ঞান দুটোকে ভিন্ন মনে করে।

  1. খামাখা প্যাঁচাল করতাছেন
    খামাখা প্যাঁচাল করতাছেন ক্যান?

    ইসলাম জল আর মুতের রাসায়নিক পার্থক্য শুধু স্বীকার করেনি বরং এরই ভিত্তিতে ইসলাম জলপানককে বৈধ আর মুৎপানকে অবৈধ করেছে।এজন্যে একজন ধার্মিকের কাছে জল আর মুতের তারতম্য অনেক।

    বিজ্ঞান আর ধর্মে মূলত কোনো ভিন্নতা নেই। যারা ধর্ম, বিজ্ঞান কোনোটাই বুঝে না তারাই শুধু শুধু ধর্ম আর বিজ্ঞানের মাঝে পার্থক্য তৈরি করছে। ওরা এখন বলছে, জল আর মুতের মধ্যে রাসয়নিক পার্থক্য আছে। কিছুদিন পর আবার বলবে, না, জল আর মুতের মাঝে রাসায়নিক কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং মুতও জলের মতো সু-পানীয়। বাস্তবেও ওরা এভাবে যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানেরর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি করছে।

    1. দারুণ জবাব দিয়েছেন ভ্রাতা,তবে
      দারুণ জবাব দিয়েছেন ভ্রাতা,তবে এই বলদাটা এর পরেও ত্যানা পেচাইতে থাকবে।

      বলদ কি আর মানুষ হয়?

Leave a Reply to শাহরীয়ার সুজন Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *