একুশে পদক : রাজাকারের মুখে হাসি

ঘাতকের হাসি বড় নির্মম, হৃদয়বিদারী, ভয়ঙ্কর। এই হাসি ঘাতককে আনন্দ আর উৎসাহ দেয়, পরিতৃপ্ত করে। প্রেরণা যোগায় নতুন খুনের স্বপ্নে। ১৯৭১’র ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানী ঘতক, হানাদার বাহিনী গণহত্যার পর ঢাকার রাজপথে উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো। এই উল্লাস পরবর্তীতে খুনের উৎসবে মেতে উঠতে উজ্জীবিত করেছিলে তাদের। তাই হানাদার বাহিনী খুনের তৃষ্ণায় উন্মত্ত হয়ে হামলে পড়েছিলো নিরীহ জনতার উপর। সারা বাংলায় দীর্ঘ নয় মাস চালিয়েছিলো নির্মম হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু, ঘাতক হানাদারদের হত্যাযজ্ঞের উল্লাস বাংলার মানুষকে করেছিলো শোকাহত, অশ্র“সিক্ত। জননী হারিয়ে ছিলো সন্তান, ভাই হারিয়েছিলো বোন, পিতা হারিয়েছিলো পুত্র। হারানোর বেদনা আর ঘাতকের উল্লাসে একাত্তরে এভাবেই শোকের আকাশ ঢেকে ছিলো বাংলার মানচিত্র। কষ্টের নোনাজলে উতলে উঠেছিলো বঙ্গোপসাগরের ঢেউ।
একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদারদের সহায়তাকারী রাজাকাররা এখনও এই স্বাধীন দেশে ঘাপটি মেরে আছে। সময়ের আবর্তনে কেউবা পাল্টিয়েছে খোলস, কেউবা অবয়ব। এমনই এক রাজাকারকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক হাতে প্রাপ্তির আনন্দে হাসতে দেখলাম গত ১৯শে ফেব্র“য়ারী। আর এই রাজাকারের হাতে পদক তুলে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯শে ফেব্র“য়ারি রাজধানী ঢাকার ওসমানী মিলনায়তনে একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে আরও ১৪জন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে রাজাকার এটি এম শামসুজ্জামানকেও একুশে পদক প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রি।
এটিএম শামসুজ্জামান যে একজন সক্রিয় রাজাকার ছিলেন, এ ব্যাপারে কারও আপত্তি নেই এবং থাকারও কথা নয়। কারণ, এটিএম শামসুজ্জামানের রাজাকার হওয়ার ব্যাপারটি প্রমাণিত সত্য। ঘাদানিক (ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি)’র সভাপতি শাহরিয়ার কবির প্রমুখদের সম্পদিত একাত্তরের রাজাকারদের তালিকাসম্বলিত দালিলিক কেতাব ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’-এ  একাত্তুরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি এম শামসুজ্জামানের ভুমিকা সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি একাত্তরে রেডিওতে মামা-ভাগ্না শিরোনামের অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের পক্ষে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কথিকা পাঠ করতেন। বইটিতে দেখানো হয়েছে যে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান সমূহে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে ড. নিলীমা ইব্রাহীমকে চেয়ারম্যান করে ছয় সদস্য বিশিষ্ট যে কমিটি করা হয়, এই কমিটি ১৯৭২ সালের ১৩ মার্চ সরকারকে যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিলো, সেখানে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনকারী (রাজাকার) বেতার-কথক হিসেববে এটিএম শামসুজ্জামানকে ১০ নাম্বারে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে এবং এই কমিটি এটিএম শামসুজ্জামানসহ মোট ৩৬ জনকে বেতারে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচারণার অপরাধে পরবর্তী ৬ মাস বেতারের সকল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে সরকারকে সুপারিশ করে। আমাদের জানা মতে, সরকার তাদের এ সুপারিশ কার্যকর করে এটিএম শামসুজ্জামানসহ সুপারিশকৃত মোট ৩৬ জনকে পরবর্তী ৬ মাস বেতারের সকল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখে। এ হিসেবে আমরা বলতে পারি, এটিএম শামসুজ্জামান একজন সাজাপ্রাপ্ত রাজাকারও বটে।
একুশে পদক বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক সর্বোচ্চ পুরস্কার। ৫২’এর ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে ১৯৭৬ সনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই একুশে পদক চালু করেন। ভাষা আন্দোলন, শিল্পকলা (সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, চারুকলাসহ সকল ক্ষেত্র), মুক্তিযুদ্ধ, সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সমাজসেবা, রাজনীতি, ভাষা ও সাহিত্যসহ মোট ১৫টি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্যে প্রতি বছর এই একুশে পদক প্রদান করা হয়।
এটিএম শামসুজ্জামানকে অভিনেতা হিসেবে শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্যে একুশে পদক ২০১৫ প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র গেরিলায় এটিএম-এর নিখুঁত অভিনয় শিল্পকলায় বিশেষ অবদান হিসেবে বিবেচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। গেরিলা চলচ্চিত্রে এটিএম একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অভিনয় করেছেন। এই চলচ্চিত্রে এটিএমকে শান্তি কমিটির প্রস্তাবকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে ও এক পর্যায়ে একজন রাজাকারকে চড়-থাপ্পড় কষতে দেখা গেছে। শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকাররা তাকে জবাই করে হত্যা করে। অথচ, মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অভিনয়কারী এই শামসুজ্জামান ৭১ সালে বাস্তবে ছিলেন একজন সাচ্চা রাজাকার! এই যে অভিনয়ের জন্যে তাকে একুশে পদক দেয়া, সেই অভিনয়টাও তো আমাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটা দেশে একজন রাজাকারের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অভিনয় করা কখনও যৌক্তিক হতে পারে না। তাহলে একজন রাজাকারের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অভিনয় করাটা যেখানে অযৌক্তিক, সেখানে একজন রাজাকারকে এই অভিনয় শিল্পে অবদানের জন্যে একুশে পদক দেওয়া হয় কোন যুক্তির ভিত্তিতে! তর্কের খাতিরে না-হয় মেনে নিলাম, রাজাকারের জন্যে মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অভিনয় করা অযৌক্তিক নয়, কিন্তু খোদ একুশে পদক প্রদান নীতিমালার আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন রাজাকার কখনও একুশে পদক পেতে পারেন না। কারণ, নীতিমালার ২.০ পয়েন্টে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিবেচ্য ব্যক্তি, গোষ্ঠি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার বিশেষ অবদান থাকিতে হইবে এবং ব্যক্তির ক্ষেত্রে চরিত্র গুণ ও দেশাত্মবোধে তাঁহাকে অনবদ্য হইতে হইবে। এই ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক জীবনের/সময়ের কৃতিত্ব(Life Lime Achievement ) সর্বাধিক গুরুত্ব প
আমরা মনে করি, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ ১৯৪০ সালে জন্ম নেওয়া শামসুজ্জামানের সামগ্রিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এ অংশটি কেটেছে রাজাকারীর কুকীর্তিপনায়, তাঁর সামগ্রিক জীবনের এই সামান্য সু-কীর্তির মূল্যায়নে একুশে পদক প্রদান একুশে পদক প্রদান নীতিমালার সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক।
পরিস্থিতি দৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই সব নীতিমালা-টিতিমালা আসলে কিচ্ছুই না। বাস্তবেও তাই। সব হচ্ছে, ক্ষমতাসীন সরকারের মর্জি। আর এই সরকারের কাছে তো ঢালাওভাবে নীতি একটাই, আওয়ামী লীগ আর নন আওয়ামী লীগ। এ জন্যে সাকা চৌধুরী বলে ছিলেন, বাল (BAL) (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) এমন একটা মেশিন, যার এক দিকে রাজাকার দিলে অন্য দিকে মুক্তিযোদ্ধা বের হয়। শুধু আওয়ামী লীগ-ই বা কেনো? বিএনপিও বা কম কিসে? চার দলীয় জোট সরকার নিজেদের মর্জি মাফিক হওয়ার কারণে ২০০৩ সালে রাজাকার খান আতাউর রহমানকেও তো একুশে পদক প্রদান করেছিলো। আর এই সরকার তাদের মর্জিমাফিক হওয়ায় আরেক রাজাকারকে প্রদান করলো একুশে পদক। সুতরাং উভয়ই সমান। আর মর্জিমাফিক হওয়াটাই হচ্ছে সকলের আসল নীতি।
এটিএম শামসুজ্জামান স্পষ্টত একজন আওয়ামী ঘরাণার অভিনয়-শিল্পী। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সিনিয়র সহ-সভাপতি হওয়া ছাড়াও তাঁর চলন-বলন সবই এ স্পষ্টতা প্রমাণ করে। তিনি গত ১৪ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মেকআপ দিয়ে নায়িকা হওয়া যায়, নেত্রী হওয়া যায় না। একই অনুষ্ঠানে তিনি টকশোতে খালেদা জিয়ার পক্ষে কথা বলা বুদ্ধিজীবিদেরকে শুয়োরের বাচ্চার চেয়েও অধম হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়া কিছু দিন আগে তিনি শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে জনক শিরোনামে একখানা কবিতাও প্রসব করেছেন। রাজাকার হওয়ার পরেও একুশে পদক পাওয়ার পেছনে মূলত শামসুজ্জামানের এ-সকল মহান ‘কীর্তিই’ নেয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বোধ করি।
বিএনপি বা অন্য কারো পান থেকে চুন খসলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যায় যায় বলে যারা চিৎকার করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঠিকাদার সেই শাহরিয়ার কবির গংরা এখন কোথায়? রাজাকার এটিএম শামসুজ্জামানের পদক প্রাপ্তিতে তারা নীরব কেনো? এখন কি তাদের চেতনা যায় না? নাকি এখন তাদের চেতনায় জং ধরে গেছে?  হ্যাঁ, এখন চেতনায় জং ধরবারই কথা। কারণ, কাকের গোশ্ত কাকে খায়না বলে একটা কথা আছে না! শামছুজ্জামান শত রাজাকার হলেও তো প্রগতিশীল!
প্রথমেই বলেছি, ঘাতকের হাসি বড় নির্মম। আর সব রাজাকারের ভেতরেই লুকিয়ে আছে একাত্তরের সেই নির্মম ঘাতকসত্ত্বা। আজকে যারা নীতিনৈতিকতার তোয়াক্কা না-করে রাজাকারদের পুরস্কৃত করছেন, তারা শুধু ভাষাশহীদ আর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারিই করছেন না, উৎসাহিত করছেন দেশবিরোধীদেরকে, তাদের ক্রিয়া-কর্মে। রাজাকারদের মুখে আজ প্রাপ্তির হাসি দেখে আগামি প্রজন্ম উজ্জীবিত হবে দেশদ্রোহী চেতনায়। দেশপ্রেম আর দেশাত্মবোধ হারাবে নতুন প্রজন্ম। আরও করুণ, আরও নির্মম হবে আগামির মুক্তিযুদ্ধ। এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কী আছে?

২ thoughts on “একুশে পদক : রাজাকারের মুখে হাসি

  1. এটিএম শামসুজ্জামানের ব্যাপারে
    এটিএম শামসুজ্জামানের ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কাকে যেন সেদিন ইস্টিশনে তেল মাজতে দেখলাম !
    তার দাবী ,

    সে সরকারী লোক ছিল ,কাজেই সরকারের অনুমতি তার অগ্রাহ্য করা ঠিক হতোনা বিধায় কোবতেখান পাঠ করছে

    আবার জন্মযুদ্ধ ৭১এর পর মুক্তিযোদ্ধা অভিনয়ের প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্যটাই চরম।
    শামসুজ্জামানকে ২১শে পদক দিলে মীজানিরাও একদিন বলবে ,আমি সরকারী ভৃত্য ছিলাম বিধায় “বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বলিয়া ভুল করিয়াছি”উক্ত বক্তব্যখান ফাকিস্তানে দিয়েছিলাম ,আবার পরে বাঙলার জন্য কত কাজ করেছি অকা ?
    খান আতাউর আর শামসুজ্জামানের ২১শে পদক শ্রেফ রাজনীতির জন্যই পাওয়া ।
    আর আপনাকে দেখলাম আরেক রাজাকার “সাকা”র নীতি কথা আওড়াচ্ছেন ।এটাও উচিত্‍ নয় ,কেননা রাজাকারের কোন নীতিকথা আওড়ানো শ্রেফ রাজাকারকে তুঙ্গে তুলে দেওয়া ….

  2. সুন্দর মন্তব্যের জন্যে আপনাকে
    সুন্দর মন্তব্যের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। তবে সামান্য দ্বিমত করে নিই।
    নীতিকথা যারই হোক, উচ্চরণ করাটা উচিৎ। এর দ্বারা রাজাকারকে তুঙ্গে তুলা হবে না, বরং লোকেরা এর দ্বারা অন্তত ভালো বলতে উৎসাহী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *