ছাত্র ও ছাত্র রাজনীতি

ব্রিটিশ ভারত থেকে বাংলায় ছাত্র সংগঠন এবং ছাত্ররাজনীতির প্রভাব ধীরে ধীরে শুরু হতে থাকে;কিন্তু পাকিস্তান শাসনামলে বাংলাদেশে(পূর্ব পাকিস্তান)বিভিন্ন অবস্থায় ছাত্র সংগঠন তথা ছাত্র রাজনীতি বিশেষ প্রভাব সৃষ্টি করতে থাকেন। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। এই আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলোই মূলত মূল চালিকাশক্তিরূপে কাজ করেন। পাকিস্তান আমলে ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষাঙ্গনের সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করতেন। এদেশে ষাটের ও আশির দশকে যে দু’টি ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে,দু’টিই ছিল শিক্ষাকেন্দ্রিক,সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে,সরকারের অন্যায় শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে ছাত্ররা রাজপথে নেমে এসেছিলেন এবং জীবন দিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ। অবদান ছিল এবং তাঁরা একটি মহান আদর্শ নিয়ে কাজ করেছিলেন। তৎকালীন ছাত্র সংগঠনগুলোর ছাত্র রাজনীতির উদ্দেশ্যে ও আদর্শ ছিল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আন্দোলন। অর্থ তথা টাকা জিনিসটার সাথে তাঁদের কোনো সম্পর্কই ছিল না। কোনো ছাত্র সংগঠনের নেতারা টাকার লোভে ছাত্ররাজনীতি করেননি। করেছিলেন একটা মহান আদর্শকে বুকে ধারণ করে। শিক্ষা,শান্তি,ন্যায়নীতি প্রগতি,অন্যায়ের প্রতিবাদ এগুলো ছিল তাঁদের রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। ছাত্র সংগঠনগুলোকে তাঁরা কখনো লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবেননি।
কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকের প্রত্যেকটি ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের চরিত্র সার্বিকভাবে বিচার করলে আদর্শ ও নৈতিকতার ভস্মীভূত ছাইটুকুও পাওয়া যাবে না। স্কুল,কলেজ থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ও ছাত্ররাজনীতি এখন একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে র্পরিণত হয়েছে। ছাত্র সংগঠনগুলোকে মনে হয় এক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সদস্যরা যেন এক একজন ব্যবসায়ী। টেন্ডারবাজী,ভর্তিবাণিজ্য,চাঁদাবাজি-সহ বিভিন্ন অনিয়ম ও অনৈতিক কাজের মাধ্যমে টাকা উপার্জন যেন ছাত্র রাজনীতির একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদর্শের ঝান্ডাধারী,কমিউনিজমের স্বপ্নবাদী বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোও এর থেকে মুক্ত নয়। প্রত্যেক ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা কমিটিতে পদ পেতে মরিয়া ’ আর ক্ষমতাসীন দলের হলে তো কথায় নেই। বিরোধীদলের হলেও অনেকে এটাকে ভবিষ্যতের লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে মনে করে। পদ যেন এক সোনার হরিণ। সংগঠনের কমিটি ঘোষণার আগে ও পরে পদের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মারামারি হওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা। শুধু মারামারি নয় একজন আরেকজনকে একপক্ষ আরেকপক্ষকে খুন করতেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না। এমনকি তারা বিভিন্ন মিটিংয়ে এমপি,মন্ত্রীদের সামনেও হাতাহাতি,মারামারি শুরু করে দেন। যেকোনো মূল্যে একটা পদ পাওয়া মানে হচ্ছে অবৈধ টাকা উপার্জনের একটা বৈধ ও আনুষ্ঠানিক লাইসেন্স পাওয়া। আরো দুঃখের বিষয় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল উভয় সংগঠন এখন পরিচালিত হচ্ছে প্রধানত অছাত্রদের দিয়ে। কমিটির মেয়াদ তিন থেকে চার বছর পার হলেও নতুন নেতৃত্ব গঠনের উদ্যোগ নেই। ছাত্রত্ব নেই,তবু তারা ছাত্রনেতা। অবাক বিষয় হচ্ছে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার যাদের স্বৈরাচারী সামরিক শাসক হিসেবে বলতে পছন্দ করেন,সেই সামরিক জিয়া ও এরশাদের শাসনামলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলেও বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে তার আর হচ্ছে না। ডাকসু,চাকসু,রাকসু প্রভৃতি ছাত্র সংসদের নির্বাচন হচ্ছে না। বিগত অনেক বছর ধরে। এক সময় এসব ছাত্র সংসদের যাঁরা নির্বাচিত হতেন তাঁরাই পরবর্তীকালে ছাত্র সংগঠনের শীর্ষে নেতৃত্বে আসতেন। এসব ছাত্রনেতা কেবল নিজের সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কাছে আস্থাভাজন ছিল না;আস্থাভাজন ছিলেন দলমত নির্বিশেষে সব ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের।
কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে,বর্তমান কোনো রাজনৈতিক দলেই সম্ভবত চান না যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব আসুক। তারা চান অনুগত ছাত্র নেতৃত্বে। এই অনুগত ও লেজুরভিত্তিক নেতৃত্ব দিয়ে কখনো ছাত্ররাজনীতির প্রগতি সম্ভব নয়। এতে বরং তাদেরই পকেট পুজো হবে। গোষ্ঠী ও ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষা হবে।
সম্প্রতি কয়েকমাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দলের নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছাত্রদল নেতাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখেছেন, ‘তোমাদের অনেক বয়স হলো,চাকরি কারো না,ব্যবসা করো না,তোমারা চলো কীভাবে?তোমাদের পরিবার থেকে কী তোমাদের এখনো টাকা দেয়?”
শুধু ছাত্রদলের নয় অন্যান্য সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন করা যায়। এতে অবাক বা বিস্ময়ের কিছু নেই। বেগম জিয়ার অজানা নয় যে,যারা চাকরি করেন না,ব্যবসাও করেন না এবং যাদের ছাত্রত্বও নেই তারা চলে কীভাবে। নেতাদের কাছে এই প্রশ্ন করার আগে তাঁর উচিত ছিল নিজের কাছে প্রশ্ন করা। কীভাবে এসব অছাত্রদের ছাত্ররাজনীতিতে জায়গা করে দিয়ে অবৈধ আয়ের এবং অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছেন।
এ যাবৎ ক্ষমতার রাজনীতি ছিল লাভজনক ব্যবসা। কিন্তু এখন শুধু জাতীয় রাজনীতি নয়,ছাত্ররাজনীতিও লাভজনক ব্যবসা হিসেবে পরিণত হয়েছে।

২ thoughts on “ছাত্র ও ছাত্র রাজনীতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *