নিষ্ঠুরতার আগুনে দেশবাসী

বোমা, ভাঙচুর, আগুনের মধ্য দিয়ে সারা দেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের টানা অবরোধের ২০তম দিনে দেশজুড়ে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতায় পেট্রলবোমায় ঢাকায় ২৯ জনসহ বিভিন্ন স্থানে দগ্ধ হয়েছেন অন্তত ৪৭ জন।


বোমা, ভাঙচুর, আগুনের মধ্য দিয়ে সারা দেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের টানা অবরোধের ২০তম দিনে দেশজুড়ে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতায় পেট্রলবোমায় ঢাকায় ২৯ জনসহ বিভিন্ন স্থানে দগ্ধ হয়েছেন অন্তত ৪৭ জন।

রাতে যাত্রাবাড়ীতে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গ্লোরি পরিবহন নামে ওই বাসটির প্রায় সব যাত্রীই দগ্ধ হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা একসঙ্গে এত রোগীর সেবা দিতে হিমশিম খান। ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্তলাল সেন জানান, দগ্ধ ২৯ জন বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন নারী রয়েছেন। আহতদের অনেকের শ্বাসনালিসহ মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে গেছে। আহতদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এদিকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় অকালেই ঝরে যেতে হলো দগ্ধ শিশু জাকির হোসেনকেও (১১)। সারা শরীরে সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো পরিচয়হীন জাকিরের নিথর দেহ গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পড়েছিল ঢামেক মর্গে। তিনদিনের মধ্যে তাকে স্বজনরা না নিয়ে গেলে শিশুটির লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে চলে যাবে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামে। গত ১৩ জানুয়ারি সাভারের গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ শিশু জাকির হোসেনকে রেখে যান স্থানীয়রা। জাকিরের শরীরের ৭০ ভাগ পুড়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেদিন রাত ১টার দিকে জাকিরের মৃত্যু হয় এছাড়া শুক্রবার সকালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বাইরে গিয়ে দেখা হয় অটোরিকশা চালক আবদুর রশিদের স্ত্রী রশিদা বেগমের সঙ্গে। অবরোধের আগুনে পুড়ে তার স্বামীর মুখমণ্ডলসহ পুরো দেহ পুড়ে গেছে। তার স্বামীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। স্বামীর চিকিৎসার খরচ দিতে গিয়ে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। আগামী দিনের কথা ভেবে শঙ্কিত রশিদা কেঁদে ফেলেন।

দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ আবদুর রহিম গতকাল ঢামেকের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছেন। আর এর মধ্য দিয়ে অনিশ্চয়তার দোলাচলে পড়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ স্বপ্নও। আবদুর রহিমের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা সদরের শ্রীরামপুর গ্রামে। স্ত্রী মর্জিনা খাতুন, ছেলে সম্রাট (১৪) ও মেয়ে সুমাইয়াকে (৮) নিয়ে তার সাজানো সংসার। সম্রাট পঞ্চম ও সুমাইয়া তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তিনি আট বছর মালয়েশিয়ায় ছিলেন। দেশে ফিরেছেন এক বছর আগে। বিদেশে যাওয়ার সময় নেওয়া ঋণের টাকা শোধ করে যা ছিল তা দিয়েই কৃষি পণ্যের পাইকারি ব্যবসা শুরু করেছিলেন।

কুমিল্লায় গতকাল ভোর ৪টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে তিনজনের একটি দল দুটি বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। এছাড়া চৌদ্দগ্রামে মুজিব সেনা ক্লাবে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। মহানগরীর জাঙ্গালিয়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বিএনপি নেতা জলিল আবদুর রবের মালিকানাধীন এশিয়া ট্রান্সপোর্টের দুটি বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বৃহস্পতিবার রাতে শহরের বাইপাস এলাকায় বিরাসার মোড়, ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি বাসসহ সাত-আটটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর করা হয় এছাড়া রাস্তায় টায়ার ও পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে অবরোধকারীরা বিক্ষোভ করেন তাছাড়া বৃহস্পতিবার রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৫টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটান।নোয়াখালীর চাটখিলে গতকাল রাত ৯টার দিকে একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে ট্রাকের চালক নূর নবী (২৫) ও তার সহকারী মো. রাশেদ দগ্ধ হন। রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের চারমাথা এলাকায় গতকাল রাত ৮টার দিকে পেট্রলবোমা হামলায় ট্রাকচালক মাসুদ রানা (৪০) ও তার সহকারী জাহাঙ্গীর আলম (৩৫) দগ্ধ হয়েছেন এছাড়া বরিশালে গতকাল রাত সাড়ে ১০টায় দপদপিয়া সেতুর পশ্চিম প্রান্তে মালবাহী ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় চালক শফিউদ্দিন ও হেলপার রুবেল দগ্ধ হন। রাত সোয়া ১১টার দিকে গৌরনদী উপজেলার কটকস্থল ইমা পাগলার মাজার এলাকায় বাঁশবোঝাই একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এতে চালক দগ্ধ হন। তানোরে বাসে পেট্রলবোমার আগুনে দগ্ধ হয়েছেন দুই শিশুসহ আটজন। গত রাতে উপজেলা সদরের ব্র্যাক অফিসের সামনে চলন্ত বাসে পেট্রলবোমা হামলা চালান অবরোধকারীরা তাছাড়া সলঙ্গা থানা ছাত্রলীগ কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার রাতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়লে অফিসের সাত-আটটি চেয়ার পুড়ে যায়। এ ঘটনার জন্য জামায়াত-বিএনপিকে দায়ী করেছে ছাত্রলীগ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবরোধকারীরা বিচ্ছিন্নভাবে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেন। মাঝে-মধ্যে গাড়ি ভাঙচুরসহ ট্রাকে আগুন দেওয়া হচ্ছে। সলঙ্গা থানা ছাত্রলীগ কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার রাতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়লে অফিসের সাত-আটটি চেয়ার পুড়ে যায়। এ ঘটনার জন্য জামায়াত-বিএনপিকে দায়ী করেছে ছাত্রলীগ। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভৈরববাজার এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ট্রাকে অবরোধকারীরা পেট্রলবোমা ছুড়ে মারলে হেলপার গুরুতর আহত হন। রূপগঞ্জে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রূপগঞ্জে আটটি গাড়ি ভাঙচুর ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন অবরোধকারীরা। পুলিশ ও বিজিবির প্রহরার মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সদরের নুনগোলায় অবরোধ সমর্থকদের পেট্রলবোমা হামলায় অগ্নিদগ্ধ ট্রাকচালক আবদুর রহিম গতকাল মারা যান। এদিকে সারিয়াকান্দি উপজেলার ধারাবর্ষাচরের নদীর ঘাটে গতকাল আওয়ামী লীগ কর্মীর একটি স্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা।

এ ছাড়াও রাজশাহীতে শিশুসহ আটজন, বরিশালে তিনজন, বগুড়ায় দুজন, নোয়াখালীতে দুজন, সিলেটে দুজন ও মৌলভীবাজারে একজন দগ্ধ হয়েছেন। বার্ন ইউনিটে আগে ভর্তি হওয়া দুজন মারা গেছেন।

see more www.shadhinbangla24.com

১ thought on “নিষ্ঠুরতার আগুনে দেশবাসী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *