দুটি পেট্রোল বোমা

মাহিন বসে গল্পের বই পড়ছে।মাহিনের চাকুরি হয়ে গেছে। পুলিশের চাকরি।ট্রেনিং এর ডাক এখনো পড়ে নি। অনেক কষ্টে বি সি এস পাশ করে চাকুরি।মা- বাবার একমাত্র ছেলে মাহিন।ছোট যে বোনটি আছে সে সবে কলেজে উঠেছে।

মাহিন বসে গল্পের বই পড়ছে।মাহিনের চাকুরি হয়ে গেছে। পুলিশের চাকরি।ট্রেনিং এর ডাক এখনো পড়ে নি। অনেক কষ্টে বি সি এস পাশ করে চাকুরি।মা- বাবার একমাত্র ছেলে মাহিন।ছোট যে বোনটি আছে সে সবে কলেজে উঠেছে।

মাহিনের বাবা সরকারী চাকুরীজিবী।মাহিনের দাদা মাহিনের দাদাকে বলে গিয়েছিলেন যেন জীবণে ঘুষ না খান।মাহিনের বাবা তার পিতার কথা ভুলেন নি।তার আর চাকুরী আছে বছর তিনেক। অনেক কষ্টে লোন ধার করে একটা বাড়ি করেছেন।যে পরিমাণ লোন বাকি আছে পেনশনের টাকা ঘরে আনতে পারবেন বলে মনে হয় না।কিন্তু, সড়ক ও জনপদের যে পদে তিনি চাকুরি করেন – একবার যদি বিবেককে বিকিয়ে দিতেন তাহলে হয়ত তিনি টাকার পাহাড়ের উপর বসে থাকতেন। মাহিনকেও তিনি সেভাবেই গড়ে তুলেছেন।

মাহিন একাই বসে আছে।মা-বাবা ছোট বোনের কলেজে গিয়েছে।দেশে হরতাল অবরোধ চলছে।মানুষ পুড়ছে মরছে।আগে হত বোমা,ককটেল এর প্রাদুর্ভাব ছিল।এখন পেট্রোল বোমার প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। পুড়িয়ে হত্যা খুবই বিভৎস। মাহিনের এগুলো নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই।রাজনীতির আগে পিছে তার পরিবার নেই।বাবার নির্দেশ রাজনীতি থেকে দূরে থাক।

অবরোধে কলেজ বন্ধ নেই।দেশে যে অবস্থা চলছে তাতে মেয়েকে একা পাঠানোর সাহস পান না মাহিনের মা। মেয়েকে কলেজে তিনিই নিয়ে যান। আজ মাহিনের বাবাও সাথে গেছেন।আজ কলেজে সব গার্জিয়ানদের নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান হচ্ছে।

এসব ভাবতে ভাবতে মাহিন ঘুমিয়ে পড়েছিল। ফোনের ভাইব্রেশনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। তার ছোট বোনের ফোন। মাহিন ফোন ধরল।কিন্তু এটা তো তার বোনের গলা নয়।অনেক চিৎকার চেচামেচি শোনা যাচ্ছে।ভয়াবহ আর্তনাদ।কথাটা অনেক কষ্টে বুঝতে পারল মাহিন”আমি বার্ন ইউনিট থেকে বলছি,আপনি কি সাদিয়ার ভাই????”

কথাটা শুনেই মাহিনের ভিতর যেন কেমন যেন ধাক্কা লাগল।
মাহিন যেন কথা বলতে পারছে না।অনেক কষ্টে সে বলল, হ্যা, সাদিয়া কোথায়??
ওপাশ থেকে ভেসে এল, “আপনি দ্রুত বার্ন ইউনিটে চলে আসুন”
লাইন টা কেটে গেল।

মাহিন পাগলের মত ছুটে গেল বার্ন ইউনিটে।হাসপাতালের গ্যাসীয় গন্ধটা ভাল লাগে না মাহিনের। এজন্য মেডিকেলে চান্স পেয়েও ভর্তি হয় নি সে।
আজ মাহিনের কাছে কিছুই কিছু নয়। ইন্টার্নিরত এক ডাক্তার মাহিনকে দেখে এগিয়ে এলো।সে মাহিনের বন্ধু নাইম।নাইম মাহিনকে সাদিয়ার বেডের দিকে টেনে নিয়ে গেল। মাহিন তখন হতবিহ্বল।একটা বেডে পড়ে আছে তার বোন।নাঈম বলল,শরীরের ৩০% পুরে গেছে। একমাত্র উপর ওয়ালাই বাচাতে পারেন। পাশের বেডে এক বৃদ্ধ শুয়ে আছেন।তার অবস্থা একটু ভাল মনে হল।কিন্তু, নাঈম বলল এর অবস্থা আরও ভয়াবহ।শুধু শ্বাসনালী পুড়ে নি।লোকটি মাহিনকে ইশারা করে বলল,”আমি দেখেছি-তোমার মা-বাবা,বলে লোকটি একটু নিস্বাদ নিল।
মাহিন যেন হুশে ফিরল,তার মা-বাবা, কোথায় তার মা-বাবা???তার মা বাবা তো তার বোনের সাথেই ছিল!”””!!!!

লোকটি বড় নিষ্বাস নিয়ে বলল,তোমার মা-বাবা এক সাথে বসেছিল,আর তোমার বোন বিপরীত পাশে আমার সাথে।ওরা সামনে থেকে ও পাশ থেকে পেট্রোল বোমা মেরেছিল।বোমা এসে সরাসরি তোমার মায়ের উপর পড়েছিল।

বৃদ্ধ আবারও বড় নিশ্বাস নিল নিয়ে বলতে শুরু করল,তোমার মা বাবা সাথে সাথেই মারা গেছেন।তোমার মায়ের মাথায় পেট্রোল বোমা পড়েছিল। তার মাথার মজগ গরম পানি ফোটার মত ফুটছিল।আমি তোমার বোনতে জানালা দিয়ে বের করে দিতে পেরেছিলাম।কিন্তু নিজে বের হতে পারি নি।

দুবার বড় নিশ্বাস ফেলে লোকটি মারা গেল। মাহিনের গণবিদারী চিৎকারে বার্ন ইউনিটের আকাশ প্রকম্পিত হল।
মাহিনদের সাজানো সংসার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে গেল।

মাহিন বোনের পাশেই থাকল।মাহিন নির্বাক নিষ্পলক।গভীর রাতে মাহিন বের হয়ে গেল।

মাহিন ফার্মগেট এর এক পাতি নেতার কাছ থেকে দুটি পেট্রোল বোমা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।

সকালের ব্রেকিং নিউজ:ফার্মেগেটে এক নেতার মৃত্যু। গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুণ ধরিয়ে দিয়ে হত্যা করেছে খুনী।

খুনটা আসলে মাহিন করেছে।কিন্তু মাহিনের কাছে সে নিজে প্রতিবাদী।
সে জানে প্রতিবাদী কারও কাছে বিপ্লবী আবার কারও কাছে দেশদ্রোহী।

মাহিন শুনেছে অরাজকতার হোতারা নাকি আজ এক রাষ্ট্রোদূত(ফপরদালাল) এর সাথে দেখা করতে যাবে গুলশান দিয়ে।রাষ্ট্রোদূত তাদের নিয়ে সমঝোতার আলোচনা করবে।

মাহিন বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।
তার ব্যাগে সেই দুটি পেট্রোল বোমা…………..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *