গণতন্ত্র, রাজনৈতিক আন্দোলন ও বর্তমান বাংলাদেশ

গণতন্ত্রের উদ্ভব ও চর্চা শুরু হয়েছিল প্রাচীন গ্রীসে । খ্রিষ্টপূর্ব ৫’ম শতকে গ্রীসের এথেন্সে গণতন্ত্র বিষয়ক ধারণার উৎপত্তি হয় এবং জনপ্রিয় রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে দ্রুত তৎকালীন বিভিন্ন নগররাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে । গণতন্ত্র বিষয়ক প্রাথমিক ধারণার সাথে কালের বিবর্তনে কিছু সংযোজন-বিয়োজন হয়ে অধুনা বিশ্বে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনপ্রিয়তা লাভ করে স্থায়ী হয়েছে । যদিও গণতন্ত্রের ওপর বিভিন্ন সময় নানাভাবে আঘাত এসেছে । পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্রসহ কয়েকটি মতবাদ গণতন্ত্রকে নড়বড়ে করার চেষ্টা করেছে । তবে সময়ের পথপরিক্রমায় এগুলো বিদায় নিয়ে গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় অবস্থান দিয়েছে । গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ চর্চার বিষয় । পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলেও সকল দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো একরকম নয় । কোথাও পূর্ণ গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে আবার কোথাও গণতন্ত্রের লেবাসধারী শাসকগোষ্ঠী দ্বারা গণতন্ত্র বাঁধা প্রাপ্ত হচ্ছে । আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও গণতন্ত্রের জনক আব্রাহাম লিঙ্কন ঐতিহাসিক ‘গেটিসবার্গের ভাষনে’ গণতেন্ত্রর রুপরেখা বর্ণনা করেছেন । তিনি বলেছিলেন, ‘Democracy is a government of the people, by the people and for the people.’ লিঙ্কন প্রদত্ত সংজ্ঞায় গণতন্ত্রের তিনটি দিক স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে । তা হল-জনগণের শাসন, জনগণের জন্য সরকার ও জনগণ দ্বারা পরিচালিত শাসন । সহজভাবে বললে, ‘গণতন্ত্র হলো কোন জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোন সংগঠনের) এমন একটি শাসন ব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান অধিকার রয়েছে । গণতন্ত্রের আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরীর ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহনের সমান সুযোগ রয়েছে, যা সরাসারি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে । যদিও (গণতন্ত্র) শব্দটি সাধারণভাবে একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয় তবে অন্যান্য সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য’ [সূত্র-উইকিপিডিয়া] । বিজ্ঞ-মনীষীদের যে যেভাবেই গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করুক না কেন তাদের সকলের সংজ্ঞার সারমর্ম হচ্ছে, গণতন্ত্র এমন একটি পদ্ধতি যার শাসনব্যবস্থায় শাসনক্ষমতা এক বা মুষ্টিমেয় লোকের হাতে ন্যস্ত না থেকে সমগ্র জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে । গণতান্ত্রিক সরকার তার কাজের জন্য জনগণের নিকটা দায়ী থাকে । গণতন্ত্র যে পূর্ণভাবে সমালোচনার উর্ধ্বের শাসনব্যবস্থা তা নয় । তবুও গণতন্ত্রের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তিতর্ক থাকার পরেও বর্তমান বিশ্বে যতগুলো শাসনব্যবস্থা প্রচলিত আছে তার মধ্যে গণতন্ত্র-ই অধিক সংখ্যক রাষ্ট্রে জনপ্রিয়তা পেয়েছে কারণ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জনমতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় । যদিও কিছু রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে গণতান্ত্রিক হলেও গণতন্ত্রের চর্চা করছে না কিংবা যেটুকু করছে তাতে গণতন্ত্রের ত্রুটিপূর্ণ দিকটাই ফুটে উঠছে । একথা অনস্বীকারর‌্য্য যে, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি জনমত । সংখ্যাধিক্যের মতামতের উপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়ণ ও প্রচলণ হলেই তাকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলা যাবে । যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক ও দার্শনিক এরিস্টটল গণতন্ত্রকে ঘৃণিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন । তার যুক্তির মধ্যে অন্যতম ছিল, গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে শাসনক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ প্রবল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গণতন্ত্র ব্যর্থ হবে । তবে বিশ্বের বহু দেশ তার জনসংখ্যার পরমত সহিষ্ণুতার গুণে গণতন্ত্র চর্চা করে বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় অবস্থানে পৌঁছেছে । আবার কোথাও গনতন্ত্রের নামে এমন ভয়াল রূপ পরিস্ফূটিত করা হয়েছে যা মানুষকে আঁৎকে দেয়ার সকল রসদ বহন করে ।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একাধিক রাজনৈতি দল থাকা অপরিহার‌্য । জনমত নিয়ে যে দল রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাবে তারা সব সময় জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে এমনটা ভাবার যৌক্তিকতা নাই । কখনো কখনো নির্বাচিত সরকার এমন কতগুলো সিদ্ধান্ত নেয় যা মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ক্ষতির কারণ হয় । শাসকদলকে সকল অন্যায় চিন্তা ও কর্ম থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য দক্ষ বিরোধীদল থাকা অপরিহার‌্য । বিরোধীদলের প্রধান কাজ হল সরকারী দলের গঠনমূলক সমালোচনা করে একদিকে যেমন জনমতকে তাদের অনুকূলে আনা এবং শাসক দলকে অন্যায় ও ক্ষতিকর সিন্ধান্ত ও কার্মকান্ড থেকে বিরত রাখা । বিরোধীদল যখন শাসক দলের কোন ত্রুটি পায় তখন একদিকে যেমন বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে তার সমালোচনা করে তেমনি রাজপথে অবস্থান নিয়ে তার প্রতিবাদ জানায় । শাসকদল যখন বিরোধীদলের স্বার্থ কিংবা জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে তখন বিরোধীদল মানবন্ধন, হরতাল, অবরোধসহ নানা ধরণের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালনের গণতান্ত্রিক অধিকার রাখে । তবে শাসকদল যদি বিরোধীদলকে কোনঠাসা করে রাখার অপচেষ্টা করে তবে বিরোধীদলে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীর বিপরীতে সহিংস আন্দোলনও চোখে পড়ে । তবে যখন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংস আন্দোলনে রূপ নেয় তখন সেটাকে আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা চলে না । গণতন্ত্রের মুলমন্ত্র যেখানে মানুষের জীবন-মালের নিরাপত্তা দেয়া সেখানে জীবন কেড়ে নেয়া কিংবা অার্থিক ক্ষতিসাধণকে স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবেই বিবেচনা করা হবে । এক্ষেত্রে শাসক দলের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চিন্তায় গণতন্ত্রের চর্চা থেকে পদস্খলন হওয়া কিংবা সরকারী দলের ভূলের কারণে বিরোধীদল তাদের অনুকূলে সৃষ্ট জনমতকে কাজে লাগিয়ে শাসন ক্ষমতায় আরোহনের জন্য সরকারের সাংবিধান নির্ধারিত মেয়াদপূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তাদরকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামার স্পৃহাও হতে পারে । রাজনৈতিক দল যেহেতু জনগণের সেবক কাজেই জনগণের স্বার্থ রক্ষার বিপরীতে যদি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা মনোযোগী হয় তবে সেটাকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলার কারণ থাকে না ।

’৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও মূলত ’৯০ এর দশকে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা ব্যাপৃত হয় । দেশের দু’টো প্রধান রাজনৈতিক দল পালা করে দেশের শাসনক্ষমতায় আসে । ক্ষমতার লোভে তাদেরও যে গণতন্ত্রের ধারা থেকে পদস্খলন হয়নি তা নয় । ’৯৬, ’০৭ এবং ’১৪ সালে দেশের গণতন্ত্রের উপর মারাত্মক আঘাত এসেছে । ’৯৬ সালে বিএনপির ২১ দিনের শাসন, ’০৭ সালে রাজনৈতিক দলের বিরোধে ২ বছরের সেনাশাসন এবং ’১৪ সালের ৫ জানুয়ারীতে বিতর্কিত নির্বাচনের পর চলমান দিনগুলোতে গণতন্ত্রের ধারা ব্যাহত হয়েছে । প্রাণহানী, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদের ক্ষতি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি, কৃষকের ক্ষতি ও শিক্ষার্থীদের ক্ষতিসহ নিয়মিত নানামূখী ক্ষতি হচ্ছে । রাজনৈতিক সহিংস আন্দোলনে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো প্রায় ভেঙ্গে গেছে । মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নাই বললেই চলে । ’১৫ এর ৫ জানুয়ারী থেকে রাজনৈতিক সহিংস আন্দোলনে নিহত হয়েছে ৩০ জন । যাদের মধ্যে ২২ জন সাধারণ মানুষ । যারা রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবেও জড়িত নয় । পেট্রোল বোমায় পুড়ে হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর ক্ষণ গুনছে অসংখ্য । খেঁটে খাওয়া মানুষগুলো এবং তাদের পরিবার ক্ষুধার যন্ত্রনায় মরতে বসেছে । শত শত যানবাহন আগুন দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে । রাজনৈতিক মতবিরোধের সুযোগ নিয়ে মামলার ফাঁদে ফেলে হাজার হাজার মানুষকে হয়রানিতে রাখা হয়েছে । প্রশাসনকে দলীয় করণের মাধ্যমে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সুচনা হয়েছে । এর জন্য দায়ী কে ? অবরোধ যেহেতু বিএনপির ডাকা তবে অবশ্যই বিএনপি । কিন্তু বিএনপিকে অবরোধ ডাকতে হল কেন ? শুধু গণতন্ত্রের চর্চা বিদ্যমান থাকলে কোন সমস্যাই দেখা যেত বলে ভাববার কি কোন সুযোগ ছিল ? পত্রিকার পাতায় রাজনীতি কিংবা দেশের হালহকিকত সম্পর্কীয় খবরগুলো পাঠের সময় শরীর শিউরে ওঠে । কি ভয়াবহ সে সকল খবর ! মানুষ পুড়িয়ে মারাকেও কি রাজনীতি বলব ? যখন সম্বলহীন ট্রাকওয়ালা কাকুতি-মিনতি করে বলে, ভাই সবাই এগিয়ে আসুন ! আমার ট্রাকের আগুন নিভান । কিস্তির টাকায় কেনা ট্রাক । এটা পুড়ে গেলে আমি পথে বসব । ট্রাক ড্রাইভারের একথা কি দেশের রাজনৈতিক দলদুটোর শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের কান পর‌্যন্ত পৌঁছে না ? এটাই কি গণতন্ত্র ? পেট্রোল বোমার আঘাতে যারা মারা গেছে তারা হয়ত কয়েক মিনিটের যন্ত্রনা সহ্য করেই মুক্তি পেয়েছে কিন্তু শরীরের সিংহভাগ পুড়ে যাওয়ার পরেও যারা প্রাণে বেঁছে আছে তাদের আর্তচিৎকার কি আমাদের রক্ষকদের কাছে পৌঁছে না ? রাজনীতির ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না দুধের শিশুও । দোষ কি তার ? কোন দলের সাপোর্ট করে এ শিশুরা ? এ কেমন অশুভ তৎরতা ? একদল ক্ষমতায় থাকার জন্য, আরেকদল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পুরো দেশেটাকে দহনের কুন্ডলীতে নিক্ষেপ করেছে । এদের কর্মকান্ড দেখে হতাশায় ছেয়ে গেছে আগামীর বাংলাদেশের রাহবারদের চিন্তা-চেতনা । মঙ্গলবার বিবিসি কিছু স্কুল শিক্ষার্থীর কাছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল । একজনও দেশের পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট নয় । কোমল কণ্ঠগুলোতে কেবল ক্ষোভ আর ক্ষোভ ছিল । গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ভোটাধিকার নাগরিকের বড় অধিকার অথচ গত ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৩ টি আসনের প্রার্থীদের সাংসদ হতে ভোট লাগে নি । কেউ কেউ বিনা ভোটে সাংসদ হয়ে মন্ত্রীও হয়েছেন ! দেশের মানুষের কাছে কি তারা এতই জনপ্রিয় ! সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠিত হোক । সেটা যে সরকারই হোক তাদেরকে সাধুবাদ জানানো জন্য জনতা প্রস্তুত কিন্তু ওভাবে কেন ? গণতন্ত্র ফিরে আসুক এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক । দেশের মানুষ শান্তিতে বাস করতে এবং নিশ্চিন্তে পথে বের হতে চায় । ফিরে আসুক গণতন্ত্র শুধু এই প্রত্যাশায় । আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশ্যা বেশি । অথচ সেই তারাই মানুষের প্রত্যাশাকে ত্যাগ করে গণতনন্ত্রের উল্টো পথে হাঁটছে । দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক দল দু’টির ভূলের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোন পক্ষ যদি তাদের স্বপক্ষে জনমত গঠন করে ক্ষমতার দৌড়ে এগিয়ে যায় তখন অবাক হওয়ার কিছু থাকবে কি ?

রাজু আহমেদ । কলাম লেখক ।
raju69mathbaria@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *