গণতন্ত্র স্মৃতি টুর্নামেন্ট

প্রতি ৫ বছর পর পর আমাদের শহরে গণতন্ত্র স্মৃতি টুর্নামেন্ট নামে একটা ঐতিহ্য বাহী টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয় । দুটি দল এই টুর্নামেন্ট জেতার জন্য মরণপণ লড়াই করে থাকে । রিয়াল-বার্সার ধ্রুপদী লড়াইয়ের চেয়ে কোন অংশেই কম নয় যেন এ লড়াই। তাই ভালবেসে আমরাও এই লড়াইকে এল ক্লাসিকো বলে ডাকি। মাঠের টুর্নামেন্ট গড়ানোর আগে মাঠের বাইরে যে লড়াইটা হয় সেটাও কম আকর্ষণীয় নয়। প্রতিবারের মত এবারো সেই লড়াইয়ের উৎস নির্দলীয় টুর্নামেন্ট কমিটি। এই কমিটির গঠনের উদ্দেশ্যে দুই দলের মধ্যে ঐতিহ্য বাহী গোলটেবিল বৈঠক চলছে।


প্রতি ৫ বছর পর পর আমাদের শহরে গণতন্ত্র স্মৃতি টুর্নামেন্ট নামে একটা ঐতিহ্য বাহী টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয় । দুটি দল এই টুর্নামেন্ট জেতার জন্য মরণপণ লড়াই করে থাকে । রিয়াল-বার্সার ধ্রুপদী লড়াইয়ের চেয়ে কোন অংশেই কম নয় যেন এ লড়াই। তাই ভালবেসে আমরাও এই লড়াইকে এল ক্লাসিকো বলে ডাকি। মাঠের টুর্নামেন্ট গড়ানোর আগে মাঠের বাইরে যে লড়াইটা হয় সেটাও কম আকর্ষণীয় নয়। প্রতিবারের মত এবারো সেই লড়াইয়ের উৎস নির্দলীয় টুর্নামেন্ট কমিটি। এই কমিটির গঠনের উদ্দেশ্যে দুই দলের মধ্যে ঐতিহ্য বাহী গোলটেবিল বৈঠক চলছে।

“এ” দলঃ আমরা তো বি দলের প্রধানরে টেলিফোন করছিলাম । কইছিলাম আপনারা আসেন। কিছু লোকের নাম দেন। একটা সর্ব দলীয় টুর্নামেন্ট কমিটি গঠন করি । সেই কমিটিই টুর্নামেন্ট চালাক । কিন্ত আপনারা তো আসলেন না।

“বি” দলঃ সর্বদলীয় টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান যদি হয় “এ” দলের প্রেসিডেন্ট তাহলে উনার অধীনে অন্য সাবকমিটি গুলান যেমন আম্পায়ারস কমিটি, গ্রাউন্ডস কমিটি কেমনে নিরপেক্ষ হয়ে কাজ করবে বলেন তো ?

– কেন আমাদের কমিটি বঙ্গ শ্বাশুড়ি গোল্ড কাপ টুর্নামেন্ট সফল ভাবে আয়োজন করে নাই ? তাহলে গণতন্ত্র স্মৃতি টুর্নামেন্ট আয়োজিত হতে সমস্যা কি ?

-বঙ্গ শ্বাশুড়ি গোল্ড কাপ টুর্নামেন্ট আর গণতন্ত্র স্মৃতি টুর্নামেন্ট কি এক হইল নাকি ?

– দুইটা টুর্নামেন্টই বোলারের বল স্ট্যাম্পে লাগলে ওইটারে বোল্ড আউট কয় তারপরও দুইটা টুর্নামেন্টরে কেন এক বলা যাইব না কন তো আমারে ?

-আপনাগো লগে বাহাস কইরা ফায়দা নাই , আপনারা এক দলীয় বাকশালী টুর্নামেন্ট আয়োজনের ষড়যন্ত্র করতাছেন ।

-এক দলীয় টুর্নামেন্ট আয়োজনের নজির প্রথম আপনারাই চালু করছেন এইটা কি আমরা ভুইলা্ গেছি নাকি।

-যাই কন না কেন তত্বাবধায়ক টুর্নামেন্ট কমিটি না হইলে আমরা খেলুম না ।

-তত্বাবধায়ক মনে হইতাছে শ্বশুর বাড়ির আবদার । আসলে আপনারা খ্যাপ খেইলা ধরা খাওয়া পাকি গুলানরে খেলাইতে পারতাছেন না বলে পরাজয়ের ডরে খেলবার চাইতাছেন না। আমরা কি এইসব বুঝি না নাকি?

– তত্বাবধায়ক না হইলে আমরা খেলুম না ,খেলুম না ,খেলুম না । এই আমাগো ফাইনাল কথা।

-না খেললে নাই। খেলার জন্য বহুত টিম আছে। টিমের কি অভাব পড়ছে নাকি?

-ঠিক আছে আমরাও দেইখ্যা লমু আপনারা কেমনে খেলেন ।

অতঃপর অনেক সাধের গোল টেবিল বৈঠকটি অকালেই ভেস্তে যায়। অগ্যতা টুর্নামেন্টে আয়োজনের বৃহত্তর স্বার্থে “এ” দলের প্রধান যান ছিঃ দলের প্রধান হ মু এরেসাতের কাছে বিশিষ্ট সুবিধাবাদী হিসেবে যার কিঞ্চিত সুখ্যাতি রয়েছে । হ মু বলেন -কি সৌভাগ্য আমার স্যার । আপনার মত মহান ব্যাক্তির পা আজ এই অভাগার বাড়িতে ।আপনার আগমনে আমার বাগানের সকল গোলাপ আজ যেন প্রস্ফুটিত হয়েছে। সেই গোলাপের সুমিষ্ট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এই ঘরখানি যেন মৌ মৌ করছে। স্যার আপনি কি ঐ কবিতাটি শুনেছেন?

-কোন কবিতাটি?

-ঐ যে স্যার অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়।

-না তো।

-আমি হইলাম স্যার এক অভাগা,বড়ই অভাগা । তবে স্যার আপনার মত মহান ব্যাক্তির আগমনে আজ এই অভাগার জীবন সাগরে যেন সুখের প্লাবন বইছে। স্যার আপনার পা টা একটু আগায় দেন । একটা চুমা খাই।

“এ” দলের প্রধান তার জুতা জোড়া খুলে পা জোড়া এগিয়ে দেন।

হ মু এরেসাত “এ” দলের প্রধানের পা জোড়ায় মুখ ঘষতে ঘষতে বলেন – ইয়ে মানে স্যার। চ্যাম্পিয়নশীপটা আপনারা নিতে চান… অবশ্যই নিবেন। কিন্ত স্যার রানার্স আপের প্রাইজটা যেন আমরা পাই সেদিকে একটু খেয়াল রাইখেন?

-খেয়াল রাখা হবে। আপনারা খেলতে আসেন।

-জ্বি স্যার অবশ্যই আসব। বেয়াদবি না নিলে একটা কথা বলি স্যার।

-বলুন।

– ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্টের প্রাইজটা যদি স্যার আমরা পেতাম…

– না না ওটা দেওয়া যাবে না । ওটা আগে থেকেই আমাদের একজনের জন্য ফিক্সড হয়ে আছে।

-ভাল করেছেন স্যার। সবকিছু আগে থেকে ঠিক করে রাখা ভাল। কিন্ত দু একটা ম্যান অফ দ্যা ম্যচের পুরষ্কার কি স্যার আমাদের দেওয়া যায় না …

-আহা কি যন্ত্রনা … আচ্ছা যান দু একটা ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরষ্কার আপনাদের দেওয়া হবে।

-আপনার বড়ই মেহেরবানি স্যার। আর একটা ছোট রিকোয়েস্ট ছিল স্যার ।

-আবার কি ?

-টুর্নামেন্ট উপলক্ষ্যে তো স্যার বিদেশ থেকে চিয়ার লিডার আনা হবে তাই না?

-হ্যা।

-যদি অভয় দেন স্যার একটা কথা বলি?

-বলুন

-দু একটা চিয়ার লিডার কি স্যার পাওয়া যাবে ? বহুদিন সাদা চামড়ার মাল চেখে দেখা হয় না । দেশি মালে এখন আর টেস্ট পাই না ।

– বয়স হলেও আপনার স্বভাব তো দেখি আর পাল্টায় না। আচ্ছা ঠিক আছে দেখি…

-থ্যাংকু স্যার,থ্যাংকু।

এদিকে বি দলের সমর্থক আর খ্যাপ খেলে ধরা খাওয়া পাকিদের দোসরেরা তাণ্ডব চালাতে থাকে আমাদের অনেক সাধের স্টেডিয়ামটিতে । পুড়তে থাকে স্টেডিয়ামের নির্জীব সিট। পুড়তে থাকে মাঠের সবুজ ঘাস।ঝলসানো শরীর নিয়ে হাসপাতালে কাতরাতে থাকে বল বয় ,কিউরেটর আর খেলা দেখতে আসা অল্প কিছু দর্শক। পোড়ে মানবতা, পোড়ে এক ঝাক কাঁচা স্বপ্ন। বাতাসে জমা হতে থাকে দুর্গতদের ভারী দীর্ঘশ্বাস। এদিকে এ নিয়ে সমালোচনার জবাবে “বি” দলের প্রধান বলেন – ষড়যন্ত্র,সব ষড়যন্ত্র । মাঠের খেলায় পারবে না জেনে উইকেটকে প্রভাবিত করতে তিনারা কিউরেটরের উপর হামলা চালিয়েছে। দর্শকের উপর হামলাও তাদের নীলনকশার অংশ বিশেষ । আমরা এ জাতীয় সন্ত্রাসী কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা জানাই।

অপরদিকে বি দলের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে “এ” দলের প্রধান বলেন – আপনারা জানেন পাকিস্তানী কিছু খেলোয়াড় ছদ্মবেশ ধারন করে এদেশে খ্যাপ খেইল্যা বেড়াইত। আমরা তাদের ধইরা দিছি । আশা করি শীঘ্রই তাদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর ব্যাবস্থা করবে সরকার। তাই “বি” দলের এই আন্দোলন খ্যাপ খেলা গুলানরে জেল থেকে ছাড়ানোর আন্দোলন।

উপস্থিত সাংবাদিকেরা বলেন – জ্বি স্যার আপনারা ঠিকই কাজ করেছেন। এই কাজের জন্য সাধুবাদ আপনাদের অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্ত স্যার এই টুর্নামেন্টটা চালানোও তো খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক সময় এই টুর্নামেন্টের জন্য আপনারা একসাথে মিলে মিশে আন্দোলন করেছেন। বহু মানুষ এর জন্য প্রাণ দিয়েছে। এখন যদি এই টুর্নামেন্টটি ঠিক মত আয়োজন করা না হয় তাহলে …

-আরে রাখেন মিয়া এই সব । “বি” দল যে আগুন দিয়ে স্টেডিয়াম পোড়াইতাছে, দর্শক মারতাছে এগুলান কি আপনাগো চোখে পড়ে না।

-জ্বি স্যার চোখে পড়ে । আমরা তো এগুলার বিরুদ্ধে নিয়মিতই লিখছি। কিন্ত স্যার আপনারা যেহেতু বর্তমান কমিটির দায়িত্বে আছেন একটা সফল টুর্নামেন্ট আয়োজন করাটা তো স্যার আপনাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাছাড়া…

-রাখেন মিয়া। আপনি হইলেন গিয়া খ্যাপ খেলে ধরা খাওয়া পাকিদের দোসর।

এরপর সাংবাদিকেরা আর বেশি কিছু বলার সাহস পায় না। ওদিকে “বি” দলের সমর্থক আর খেপ খেলে ধরা খাওয়া পাকিদের দোসরেরা নিয়মিতই চোরা গুপ্তা হামলা চালাতে থাকে আমাদের সাধের ষ্টেডিয়ামটিতে। ক্ষয়িত হতে থাকে আমাদের শত বছরের ঐতিহ্যটি। ষ্টেডিয়ামের ধ্বংস লীলা প্রত্যক্ষ করতে বিদেশ থেকে আসে আইসিসির সাদা চামড়ার প্রতিনিধি দল। আগুনে পোড়া গ্যালারি, নষ্ট হইয়ে যাওয়া প্রতিটি উইকেট খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে তারা আর মাথা নাড়তে নাড়তে বলে “ভেরি ব্যাড,ভেরি ব্যাড” । এদিকে দুষ্কৃতিকারীদের দমাতে মাঠে নামে “এ” দলের সমর্থক আর স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা রক্ষীরা। মাঠের খেলা বাদ দিয়ে মাঠের বাইরে চলতে থাকে একশন পাল্টা একশন। মাঠের বাইরের এই নোংরা খেলায় দুই টিমই চায় যে কোন মূল্যে জিততে। দর্শকের জন্যই টুর্নামেন্ট , টুর্নামেন্টের জন্য দর্শক নয় । এই সত্যটি আজ আর কেউ বোঝে না ।ফলশ্রুতিতে আমাদের মত সাধারন মানুষের খেলা দেখে বিনোদনের পথ বন্ধ। খেলা আর দেখব কি মাঠে যাইতেই তো এখন ভয় লাগে। অগ্যতা শেষ ভরসা ষ্টার জলসার বাংলা সিরিয়াল।এখন থেকে প্রতি রাতে বউয়ের সঙ্গে মিলে মিশে ষ্টার জলসায় “বোঝে না সে বোঝে না” দেখি। সিরিয়াল দেখতে দেখতে বউয়ের মাথা গরম হয়ে গেলে তাল পাখা দিয়ে বাতাস করি। (ফ্যানের বাতাসে কুলায় না । আমি আবার বিশিষ্ট ভদ্রলোক তো বউয়ের আদেশ অমান্য করতে পারি না) মুড়ি চিবাতে চিবাতে বউয়ের সঙ্গে সিরিয়াল দেখায় তাল মেলাই আর খানিক ক্ষন পরপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মনে মনে বলি “আহারে কতদিন মাঠে বসে খেলা দেখি না”।

১১ thoughts on “গণতন্ত্র স্মৃতি টুর্নামেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *