“মানুষের ইতিহাস এখনও শুরুই হয়নি”………….

আজকের দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় একটা খবর দেখে-পড়ে আরেকবার মনটা বিষাদে ছেয়ে গেলো। না, নতুন কোন তথ্য নেই খবরটাতে, পুরনোই। তারপরও, মন খারাপ করে দেবার মতোই খবরঃ ‘৯৯ শতাংশ সমান ১ শতাংশ!!’ খবরটার সারমর্মঃ বর্তমান বিশ্বের অর্ধেক সম্পদের মালিক মাত্র ১ শতাংশ মানুষ। আর আগামী বছর ১ শতাংশ মানুষের এ সম্পদের পরিমাণ বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের মোট সম্পদকে অতিক্রম করে যাবে। গতকাল সোমবার চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান অক্সফাম বিশ্বের ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ও অসমতা নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। (লিঙ্কঃ http://www.kalerkantho.com/print-edition/…/2015/01/20/177552)


আজকের দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় একটা খবর দেখে-পড়ে আরেকবার মনটা বিষাদে ছেয়ে গেলো। না, নতুন কোন তথ্য নেই খবরটাতে, পুরনোই। তারপরও, মন খারাপ করে দেবার মতোই খবরঃ ‘৯৯ শতাংশ সমান ১ শতাংশ!!’ খবরটার সারমর্মঃ বর্তমান বিশ্বের অর্ধেক সম্পদের মালিক মাত্র ১ শতাংশ মানুষ। আর আগামী বছর ১ শতাংশ মানুষের এ সম্পদের পরিমাণ বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের মোট সম্পদকে অতিক্রম করে যাবে। গতকাল সোমবার চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান অক্সফাম বিশ্বের ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ও অসমতা নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। (লিঙ্কঃ http://www.kalerkantho.com/print-edition/…/2015/01/20/177552)

এই কথাটা তো ‘Occupy Wall Street’ আন্দোলনের সময়ও অনেকবার বলা হয়েছে, বারবার শুনেছিঃ “We, the 99%……!!!” কিংবা তারও বহু আগে, মার্কস-এঙ্গেলস’র কমিউনিস্ট ইশ্তেহারঃ “শৃঙ্খল ছাড়া প্রলেতারিয়েতের হারাবার কিছু নেই, কিন্তু জয় করবার জন্য আছে সমস্ত বিশ্ব! দুনিয়ার মজদুর – এক হও, এক হও!!” অথচ আজও, দেশে দেশে, এবং বাংলাদেশে, রাজা-রাজড়ারা তাদের অবস্থানকে একচেটিয়ারকম সংহত করার অভিপ্রায়ে সুদীর্ঘকালের ষড়যন্ত্র ও তৎপরতায় তাদের মতাদর্শগত আধিপত্যের জাল ছড়িয়ে দিয়েছে সবখানে, সবভাবে। আমাদের বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। এই দেশের রাজা-রাজড়ারাও (উহু,শুধু রাজনীতিবিদ নন; সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী নেতা, তথাকথিত সুশীল – সবগুলো মিলিয়ে এক অশুভ নেক্সাস) বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই জনগণের কাছে মুক্ত চেতনা নয়, দাসত্বের আকাঙ্খা করেছে। হু, রাজা-রাজড়ারা মানুষের, তারুণ্যের শক্তিকে তাঁর অনুকূলে কাজে লাগাতে চায় বলে আসলে মনুষ্যত্বকে, তারুণ্যকেই ধ্বংস করতে তৎপর – দেশে দেশে, এবং বাংলাদেশে। রাজা-রাজড়ারা মানুষের, তারুণ্যের অপরিসীম সৃজনশীলতাকে ভয় পায়, কারণ প্রায়শই সে দ্রোহী। রাজা-রাজড়াদের দরকার পুতুলের। সেবাদাসের। যে পুতুলেরা, সেবাদাসেরা তাদের কথায় উঠবে, বসবে, নাচবে। যার নিজের কোন সত্তা থাকবে না। থাকার মধ্যে থাকবে লোভ। আত্নকেন্দ্রিকতা। স্বার্থসর্বস্বতা। যার নেশায় যা খুশি তাই করবে। যার কোন শিকড় থাকবে না। ব্যবহার করে আগাছার মত ছুঁড়ে ফেলাও যাবে। স্বীকার করতেই হবে, শোষক শ্রেণী এক অর্থে যথেষ্ট সফলই এই ব্যাপারে। অসভ্যতা তাই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে সভ্যতাকে। আলোর ঝলকানিতেও ঢাকা যাচ্ছে না নিচের অন্ধকারকে; এতটাই অপ্রতিহত দাপট তার। আজকের তরুণেরা, মানুষেরা সেই অমানবিক সমাজব্যবস্থার শিকারমাত্র। ওইখানে প্রবল আঁধার আছে; কিন্তু আলো নেই, আনন্দ নেই, প্রাণপ্রাচুর্য নেই; অথচ কষ্ট আছে, যন্ত্রণা আছে, আর্তিও আছে। সমস্যার শিকড় সমাজের ক্রমবর্ধমান শ্রেণী বৈষম্য ও অসন্তোষ, সম্পদের বিতরণ ও বন্টনের ঘোর অসাম্যে প্রোথিত। অথচ এই মূল সত্যটাকে না জেনেই, না বুঝেই আমরা আমাদের অর্থহীন অস্তিত্ব ভুলতেই তাই অহেতুক হৈ-হল্লা করছি, অমানবিক আচরণে লিপ্ত হচ্ছি। অথবা অস্তিত্ব টিকাতেই হয়ে উঠছি নৃশংস, মরিয়া। আর এই আত্নহননের ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের সঙ্গেই নিজেদের অকথ্য সংঘর্ষের মাধ্যমে আমাদের জীবনের সবধরণের অপ্রাপ্তির একটি ফয়সালা খুঁজে নিতে চাচ্ছি! আর তখন, আমাদের মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জানানঃ এইখানে কোন ঈশ্বর নেই – যেখানে আমরা ৯৯%! “ঈশ্বর থাকেন ওইখানে, ওই ভদ্র পল্লীতে’ – যেখানে বাস করে অবশিষ্ট ১%……!!

এঙ্গেলস-র কথার সূত্র ধরে তাই বলা যায়, বিশ্বব্যাপী আমরা এখনও প্রকৃত সভ্যতায় প্রবেশ করিনি। আমরা এখনও প্রাক সভ্যতা স্তরে আছি। মানুষের ইতিহাস এখনও শুরুই হয়নি। মানুষেরা মানুষ হিসেবে আলাদা বেঁচে থাকতে পারে না; মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার শর্ত পূরণ করতে হলে প্রকৃতি, প্রাণবৈচিত্র্য, পশু-পাখি-বন-বৃক্ষ-পানি-বাতাস, পুরো ইকো-সিস্টেম জগতও অনুকূল থাকতে হবে। পুঁজি শুধু মানুষকে দখল করেনি, তা বিপর্যস্ত করেছে অসংখ্য প্রানের সমাবেশ সমস্ত প্রকৃতিকেও।

কিন্তু মানুষের সভ্যতা সম্ভব, সম্ভব মানুষের ইতিহাসে প্রবেশ। কিন্তু মৃতের আধিপত্য, পুঁজি কিংবা ঈশ্বরের ভৌতিক ক্ষমতা যখন মানুষের সকল মানবিক ক্ষমতাকে তার নিজের ক্ষমতা হিসেবে কেন্দ্রীভূত করে রাখে তখন সম্পদ, দক্ষতা, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব দরিদ্র, বঞ্চিত, নিগৃহীত, সম্পধীন, ক্লিষ্ট মানুষের দ্বারা চিহ্নিত হয়। প্রযুক্তি শৃঙ্খলিত। বিজ্ঞান বন্দী। মিডিয়া কেন্দ্রীভূত, পুঁজির নাটবল্টু উৎপাদন উপযোগী করে শিক্ষা বিন্যস্ত। পুঁজির ভৌতিক ক্ষমতা দ্বারা সম্মতি উৎপাদনের সংস্কৃতি নির্মাণের অবিরাম অপচেষ্টা জোরদার। পুঁজির শৃঙ্খলে পদদলিত, খণ্ডবিখণ্ড, পুঁজি নিয়ন্ত্রণে আদেশ নির্দেশে আত্নসমর্পিত মানুষ নিজের শক্তি আবিষ্কার ছাড়া কী করে নিজেকে চিনবে? কী করে হাঁটবে মুক্তির পথে? শক্তি তার প্রকৃতিতে, শক্তি তার সমষ্টিতে। মানুষকে তার নিজের “ঈশ্বর” পেতে হলে যেতে হবে প্রকৃতির কাছে, দাঁড়াতে হবে সমষ্টির সাথে। মানুষের ধারাবাহিকতায় অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ পরম্পরায় নিপীড়ন বৈষম্য ও আধিপত্যবিরোধী যে মুক্তির লড়াই তা ঈশ্বরের মুক্তির জন্যও অপরিহার্য। বাংলাদেশেও, নিপীড়িত মানুষ হিসেবে বিশ্বের অন্যসকল পীড়িত মানুষের সঙ্গে ঐক্য ও সংহতির দরোজা আমাদের সামনে খোলা। আমরা কেন অন্যের শৃঙ্খলের সাথে নিজেদের তৈরি শৃঙ্খলে আটকে বসে থাকবো……!?

না, আটকে থাকবো না। নিশ্চয়ই না। পাথরে পাথর ঘঁষে যারা আগুনের ফুলকি ছুটিয়েছিলো প্রাচীন অরণ্যে, তারা তো শুধু সেঁকে নেয়নি পশুদের মাংসপিন্ডগুলো; বরং তারা জীবনের স্যাঁতস্যাঁতে পাতাও মেলে ধরেছিলো উনুনের উপর। অন্ধকার গুহাগুলো একসময় হয়ে উঠলো আমাদের জীবন্ত সংস্কৃতির ঘর-বাড়ি। হু, মরা গাঙে আবার জোয়ার আসবে, খরার দেশও ছেয়ে যাবে সবুজে। নিদারুণ আঁধার কাটেনা যদিও, জঞ্জাল বাড়েই শুধু; তারপরও, সোনার কাঠি-রুপোর কাঠির যে ঘুমে ঘুমিয়ে আছে রাজ্যপাট-রাজকন্যা, সেই কাঠিটি পাল্টে দিতে পারে সাহসী রাজকুমার। তারুণ্যই পারে অমানিশা ভেঙে আলো আনতে। সিন্দাবাদের ভূতের মত চেপে বসা অন্ধ নিয়তিকে পাল্টাতে পারে স্বপ্নবান সাহসী তরুণেরাই। প্রকৃত মানুষেরাই।

একবার, মাত্র একবার, যদি পথ খুঁজে পায়! যদি পথ খুঁজে পায় !!

৪ thoughts on ““মানুষের ইতিহাস এখনও শুরুই হয়নি”………….

    1. মানুষের ইতিহাস শুরু হবে,
      মানুষের ইতিহাস শুরু হবে, নিশ্চয়ই হবে – সেদিন, যেদিন অমানবিক পুঁজির উপর মানবিক মানুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে!!

      শুভেচ্ছা। ধন্যবাদ……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *