আলোচনা? কাদের মধ্য? দুই দলের না দুই প্রভুর?




সুশীল সমাজ যদিও তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, তারপরও এই ধরনের অবস্থায় তাঁরা ঘ্যান ঘ্যান করতে এগিয়ে আসে। সাম্প্রতিক কিছু লেখা পড়ে মনে হচ্ছে তাঁরা আবার হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে আসছেন। বক্তব্য তেমন নতুন কিছু না, সেই পুরনো আবদার। ‘আলোচনা করুন’। তাঁদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বুদ্ধি এই দলগুলোর নেই, তাই উপদেশটা দিতে হচ্ছে। ব্যাপারটা কি তাই? এদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, আলোচনা করতে চাওয়া মানে, আমার আন্দোলন করার ক্ষমতা নাই কিংবা আমার ক্ষমতা নাই, এই আন্দোলন দমাবার। আর তাই এদেশে কোন দলই সেধে আলোচনার প্রস্তাব দেয় না, বিশেষ করে অপর পক্ষ যখন দুর্বল অবস্থায় থাকে। এরপরও সুশীল সমাজের বুদ্ধিতে পূর্বে কিছু আলোচনা, চিঠি চালাচালি, আলোচনার জন্য বসাবসি, সবই হয়েছিল, এবং যথারীতি সেসবে কোন ফল আসেনি।

বাস্তবতা হচ্ছে, আন্দোলন করে দাবী আদায়ের ক্ষমতা না থাকলে, এদেশের কোন সরকারী দলই বিরোধী দলের দাবী মেনে নেয় না। আর আন্দোলন দমাবার ক্ষমতা থাকলে, সরকারী পক্ষ সেই আন্দোলনকে দমাবার কোন চেষ্টাই বাদ রাখেন না। তাই আন্দোলন করে দাবী আদায় করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে, আন্দোলন কত জোড়ালো হচ্ছে আর অন্য পক্ষ কতোটা শক্তহাতে তা দমন করতে পারছে এই দুইয়ের ভারসাম্যের ওপর। বহুকাল হল, এদেশের কোন আন্দোলনে, সাধারণ জনতা অংশ নেয় না। ফলে এই মল্লযুদ্ধ মুলতঃ চলে সরকারী বাহিনী আর পিকেটারদের ভেতরে।

গত ছয়বছর, এই পিকেটারের সাপ্লাইয়ে বেশ ঘাটতি ছিল। আর তাই, কোন আন্দোলনেই বিরোধী দল জুত করতে পারছিল না। যা তাঁরা করছিল কিংবা আন্দোলন চালাবার জন্য যা জরুরী হয়ে পড়েছিল, তা ছিল জনগণকে আন্দোলনের কর্মসূচীতে যোগ দিতে বাধ্য করার। এমন কোন কার্যক্রম, যেখানে জনগণ অংশ নিতে বাধ্য। হরতাল আর অবরোধ করতে আপনি বাধ্য। গাড়ী না চললে আপনি উঠবেন কোন বাহনে। আপনার গাড়ী ভাঙবে জানবার পরও আপনি নিশ্চয়ই গাড়ী বের করবেন না। ব্যাস হয়ে গেল, হরতাল সফল।

বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক কার অনুকুলে, এখনও বোঝা যাচ্ছে না। দেশ গোল্লায় গেলেও, এই দুই দলের কারোরই কিছু যায় আসে না। তাঁদের একটাই চাওয়া, আর তা হচ্ছে, নিজের জয় বা অপর পক্ষের পরাজয়। এই যুদ্ধ এর আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছে, এখন আমরা অভ্যস্থ হয়ে গেছি। তবে যে অংশকে নিয়ে বেশি টেনশানে থাকি, যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর যে অবস্থা, তা হচ্ছে ‘স্টেল মেট’। দাবা খেলার সেই অবস্থা, যেখান থেকে কারোরই বিজয় অর্জন সম্ভব না। টেস্ট ক্রিকেট কিংবা দাবায় যেমন ‘ড্র’ বলে একটা ব্যাপার আছে, রাজনীতিতে তেমনটা নেই। এখানে একজনের জয় কিংবা অন্যের পরাজয়, কোন একটা হতেই হবে। আর সেটা না আসা পর্যন্ত, অর্থাৎ এই ‘স্টেলমেট’ অবস্থা আমাদের সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। যারা আবদার করছেন, আলোচনার, তাঁরা ভালো করেই জানেন, কিছুই হবে না।

তারপরও এই আবদারগুলো জানানো হয়, এবং সাধারণতঃ তা জানানো হয় বেশ কিছু লাশ পড়ার পরে। আগেও বলা হয়, তবে দায়সারা ভাবে, এবং যথারীতি সেই আবদারে কেউ কর্ণপাত করেন না, মিডিয়ায় আসে না, পত্রিকায় কেউ কলাম লেখেন না। লাশ পড়া মানেই, অবস্থা গুরুতর। দুই পক্ষই বেশ শক্তিশালী। একদল সহিংস আন্দোলন করার ক্ষমতা অর্জন করেছে আর অন্যদল সেই আন্দোলন দমাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের প্রয়োজন বোধ করছে। তবে বর্তমান আন্দোলন অতিসম্প্রতি যেসব লাশ সরবরাহ করেছে, তাঁর পুরোটাই নিরুপায় জনতার লাশ। বিরোধীদলের আন্দোলনের আদেশ অমান্য করার কারণে লাশ। এই লাশ উৎপাদনের কৃতিত্ব এখনও কেউ নিচ্ছেন না, একে অন্যকে দায়ী করছেন। তবে এই লাশগুলো দেখে দুই দলের কারোরই এমন কোন বিবেক জাগছে না।

এসব আন্দোলনের জন্য খুব জরুরী হচ্ছে, আন্দোলনকারীদের লাশের যোগান। সেটাও আবার বড়সড় কোন নেতার। সেটা এখনও হয়নি, এবং ধারণা করা যায় আপাততঃ যোগান হবেও না। বড় সব নেতা আত্মগোপনে কিংবা চোদ্দ শিকের পেছনে। ওদিকে রাষ্ট্রীয় শক্তি, মাঠে নামব, নামব করছে। হুমকি, হুংকার দিচ্ছে, তবে এখনও অ্যাকশানে নামেনি। সেটা নামলে, আর তখন আরও কিছু লাশের যোগান হলে, সম্ভবতঃ খেলা জমে উঠবে। ‘স্টেল মেট’ অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।

খেলা অন্যদিকেও হচ্ছে। কূটনৈতিক পাড়ায় দৌড়ঝাপ শুরু হয়ে গেছে। নিজ নিজ প্রভুর কাছে গিয়ে আর্জি পেশ করা হয়েছে, ‘আমাকে বাঁচান’। তাঁরাও ধরি মাছ না ছুঁই পানি টাইপ বক্তব্য দিচ্ছেন। সুশীল সমাজ মুলত এই ধরনের অবস্থার জন্যই অপেক্ষা করে। কারণ এই ধরনের অবস্থায়ই তাঁদের কথা মিডিয়ায় একটু পাত্তা পায়। যে কয়জন সুশীলের গায়ে এখনও দলীয় তকমা লাগেনি, এই সময় তাঁদের কিছুটা কদর হয়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় কলাম লিখে তাঁরা জানান দেন, অবস্থা এখন গুরুতর, দেশের বেশ ক্ষতি হচ্ছে, অতএব এবার আলোচনা করা যেতে পারে। আগে বলিনি কারণ তখন আমার কথা কেউ পাত্তা দিত না।

আলোচনা আদৌ হবে কি না, আর হলে সেখান থেকে কোন ফল আসবে কি না, তা নিয়ে সব দলই নিজ নিজ বক্তব্য দিচ্ছেন। সেই বক্তব্য অবশ্য আসল বক্তব্য না। সেটা ‘মেন্টাল গেম’। হুমকি দিয়ে অপর পক্ষকে ঘায়েল করা। আগামী কিছুদিনের ভেতর সম্ভবতঃ বড় নেতারা পরিষ্কার করবেন, আলোচনার নাটক করতে তাঁরা রাজী কি না। আরও কিছু ব্যাপার এখনও পরিষ্কার হয়নি। প্রভুরা কি সিদ্ধান্ত নেবেন, কোন প্রভু এবার নিজের দাবীতে অনড় থাকবেন কিংবা দুই প্রভুর কোনজন এবার বাংলাদেশকে অন্যজনের ঝুলিতে দেবেন, তা এখনও তাঁরা পরিস্কার করছেন না। প্রভু দুইজন ২৬শে জানুয়ারী ভারতে মিলিত হবেন। সেখানে যদি দয়া করে তাঁরা কোন সিদ্ধান্ত নেন, তবে রক্ষা, আর নয়তো কপালে আরও ভোগান্তি আছে।

দুই পক্ষই হুমকি দিয়ে রেখেছেন, খেলা আরও জোরদার হবে ২০ তারিখের পরে। অর্থাৎ দুই পক্ষই কোমর বাঁধবেন। আর এটাও ঠিক, তার আগে পর্যন্ত এই ভোগান্তি চলবে। ফেব্রুয়ারিতে অসহযোগের ডাক দেয়া হয়েছে। ওদিকে সেই সময়ে রয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। আগেকার আন্দোলন গুলোতে সাধারণতঃ শুক্র শনিকে রেহাই দেয়া হত, এখন সেটাও দেয়া হচ্ছে না। বিশ্ব ইজতেমার জন্যও তেমন কোন ছাড় দেয়া হয়নি। বেশ অনেক জেলায় জ্বালানী সংকট শুরু হয়েছে। অন্যদিকে বিজিবি দিয়ে পণ্য আর যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করানোর চেষ্টা চলছে। কতদিন চালানো সম্ভব, সময়ই বলে দেবে। জনগণকে জিম্মি করা এই নেতাকর্মী বিহীন আন্দোলন কতদিন টানা যাবে, সেটাও যেমন দেখবার বিষয় তেমনি সবাই অপেক্ষা করছে, সরকারী বাহিনী গুলি ছুঁড়লে আর লাশ পড়লে, খেলার দিক পরিবর্তন হয় কি না।

আপাততঃ আন্দোলনের ‘স্টেলমেট’ অবস্থার যে পরিবর্তন হবে না, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। আলোচনাও যে সমাধান এনে দেবে না, সেটাও সবাই জানে। আমাদের প্রভুরা, এবং তাঁদের নিয়োগ দেয়া কূটনীতিকরা কি করবে কিংবা অন্য কোন সমাধান আসবে কি না, তাঁর দিকেই সবাই তাকিয়ে আছে। এই মুহূর্তের মিলিয়ন ডলার যে প্রশ্ন তা হচ্ছে, ‘সমাধান কোন পথে?’ এই দুই দলের আলোচনায় না দুই প্রভুর আলোচনায়?

৭ thoughts on “আলোচনা? কাদের মধ্য? দুই দলের না দুই প্রভুর?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *