এদেশের শিক্ষিত তরুণদের আন্দোলনমুখি অবস্থান ও আন্দোলনবিমুখ হওয়ার শেকড়সন্ধান(২য় পর্ব)

আশাবাদের চাষাবাদ ও আশাভঙ্গের কাল- বাংলাদেশ পর্ব


আশাবাদের চাষাবাদ ও আশাভঙ্গের কাল- বাংলাদেশ পর্ব

অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আসে। শুরুতে স্বপ্ন-আশা ও উৎসাহের কমতি ছিল না। ৭২-এই আমরা পেলাম সংবিধান, মুক্তিকামী মানুষ ও প্রগতিশীল ছাত্র-যুবদের আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটল যখন সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে জায়গা পেল ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে তখন বামপন্থার জোয়ার। বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে ডাকসুসহ দেশের ছাত্রসংসদগুলোতে বিজয় লাভ করছিল। সেসময় ছাত্রদের দাবির সাথে সংগতি রেখে কুদরত-ই-খুদা কমিশনের একটি প্রগতিশীল শিক্ষানীতিও গৃহীত হল। তবে কিছুদিনের মধ্যেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ একের পর এক কঠিন বাস্তবতার শিকার হয়। শাসকশ্রেণীতে তখন পেটিবুর্জোয়াদের প্রাধান্য। এই পেটিবুর্জোয়া শ্রেণি তাদের শে্রণিগত বৈশিষ্টের কারণেই ক্ষমতার জোরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রাতারাতি শ্রেণিউত্তরণের স্বপ্নে বিভোর হয়। দেশজুড়ে চলে লুটপাট, চোরাকারবারীর মহোৎসব। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া লুটেরা শক্তি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সম্পত্তি, জনগণের সম্পত্তিকে লুট করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে থাকে। তার পাশাপাশি সদ্যোজাত এই দেশকে নিয়ে চলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নানা খেলা। এর মধ্যে, ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের প্রতি সংহতি জানাতে গিয়ে আমেরিকান ইনফরমেশন সেন্টার ঘেরাও করার সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে গুলি চালানো হয়। মতিউল ,কাদের শহীদ হন। ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির অমিল দেখে ছাত্রসমাজের মত সাধারণ মানুষও হতাশ হতে থাকে। শিক্ষিত তরুণদের অনেকে তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কেউ কেউ সশস্ত্র সংগ্রামের পথে পা বাড়ায়। ছাত্র-যুব সমাজের একটি অংশ জাসদের গণবাহিনীতে যোগ দিয়ে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম চালাতে থাকে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয় স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধু একদলীয় বাকশালের ঘোষণা দিলেন। বাকশাল ছাড়া সব দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে সহায়তায় সপরিবারে হত্যা করা হল বঙ্গবন্ধুকে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেনাবাহিনীতে একের পর এক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ছাত্র-তরুণ সমাজ নয়, বাংলাদেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে সেনানায়কেরা। সেনাশাসকদের দখলে ১৫ বছরের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যায়। ক্ষমতার কেন্দ্রে যেই থাকুক, মোশতাক, জিয়া অথবা এরশাদ, নীতি একই থাকে। সংবিধান বারবার কাটাছেঁড়া করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রকে সংবিধান থেকে উঠিয়ে দেওয়া হয়। ইসলামকে করা হয় রাষ্ট্রধর্ম। প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় রাজনৈতিক দল, মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তিরা আবার শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতগুলোকে ধীরে ধীরে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়। লুটেরা পুঁজির দৌরাত্ম বজায় থাকে। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ কাঠামোকে পাকাপোক্ত করা হয়। অর্থনীতি হয়ে পড়ে পরনির্ভরশীল-সাহায্যনির্ভর। বহুজাতিক কোম্পানির আস্ফালন বৃদ্ধি পায়। মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে পেছনে হাঁটতে শুরু করে বাংলাদেশ। ক্রমবর্ধমান হতাশা ও সেনানির্ভর রাজনীতি বপন করে ছাত্রসমাজের মধ্যে আন্দোলনবিমুখতার বীজ।

ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রগতিশীল ছাত্র-যুব সমাজকে দুর্বল এবং অকেজো করার প্রেেয়াজন হয়ে পড়ে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হয়, বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক শিক্ষার বদলে ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসকে করা হয় বিকৃত। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষার অধিকারকে সংকুচিত করে তোলার প্রয়াস চলে। দরিদ্র মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় প্রতিক্রিয়াশীলতার বীজ। প্রগতিশীল চিন্তাচর্চা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত আসে। প্রগতিশীলদের উপর দমন-পীড়ন-নির্যাতন তো ছিলই, তার পাশাপাশি ছাত্রদের মধ্যে পেশিশক্তি, অস্ত্রবাজি, দখলদারিত্বের বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় দখলদারিত্ব ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি।

এর মাঝেও প্রগতিশীলরা ছাত্র-যুবরা নিজেদের সংগঠিত করতে চেষ্টা করে। মজিদ খানের শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ৮৩’র মধ্য ফেব্রুয়ারিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন এবং তাতে কাঞ্চন-দীপালী-জয়নাল-জাফরদের জীবনদান তারই প্রমাণ। প্রগতিশীল ছাত্র-যুবরা যে তখনো সমতার সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নকে ধারণ করে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল, তার আরেকটি প্রমাণ তাজুল। ছাত্র ইউনিয়ন নেতা তাজুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়েও নিশ্চিত-নিরাপদ জীবনের প্রলোভনকে পাশ কাটিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হন এবং এরশাদের ভাড়াটে গুন্ডার হাতে শহীদ হন। ৮৩’র মধ্য ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। কিন্তু বুর্জোয়া দলগুলোর লেজুড়বৃত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে পেশিশক্তি, অস্ত্রবাজি, কালো টাকার প্রভাব বাড়তে থাকে, যা সুস্থ ধারার ছাত্র আন্দোলনের বিকাশকে ব্যহত করে। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রমাগত ভাঙ্গনের প্রভাব বামপন্থী প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শত প্রতিকূলতা, দমন-নির্যাতন স্বত্তে¡ও ছাত্র-যুবদের ধারাবাহিক সংগ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের গতিবেগ বৃদ্ধি পায়। প্রগতিশীল তরুণেরা নানাভাবে আন্দোলনে সম্পৃক্ত থেকে, দমনপীড়নের মুখে বীরোচিত সাহস দেখিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। স্বৈরাচারবিরোধী গান, কবিতা রচিত হতে থাকে। শিক্ষিত তরুণেরা চালাতে থাকে নানা ধরণের প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। ছাত্র-সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে ঐতিহাসিক দশ দফা দাবি নিয়ে সর্বাত্মক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই দশ দফা প্রণয়নে প্রগতিশীল বামপন্থী ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সকল রাজনৈতিক জোটের নেতৃবৃন্দ দশ দফার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং ক্ষমতায় আসলে তা বাস্তবায়নের অঙ্গিকার করে। ছাত্রসমাজ তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব আরো একবার পালন করে, গণতন্ত্রের সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয় ৯০ এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে।

এরশাদের পতনের পর দেশবাসী আবার আশায় বুক বাঁধে। এই তো গণতন্ত্র এলো, দুর্দিন গেল বলে! সাধারণ শিক্ষিত তরুণরাও বিজয়ের আনন্দে উদ্বেল, আশায় বুক বাঁধে, দশ দফা বাস্তবায়ন হবে-দেশ প্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে। অথচ সে আশায় গুড়েবালি। সরকার বদলাল, কিন্তু নীতির বদল ঘটল না। দশদফাকে কাঁচকলা দেখাল গণতান্ত্রিক(!) সরকারগুলো। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পরনির্ভরশীল অর্থনীতি বজায় থাকলো, লুটেরা পুঁজিবাদ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মূল্যস্ফীতি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলল। রাজনীতিতে লুটেরা ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ রাজনীতিকেই ব্যবসায় পরিণত করল। নির্বাচনে কালোটাকার ছড়াছড়ি, পেশীশক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পেল-বৃদ্ধি পেল রাজনৈতিক অস্থিরতা-জিম্মি হল দেশের জনগণ। এই সময়কালে হলদখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-অস্ত্রবাজির অপরাজনীতি গ্রাস করছে ছাত্র-আন্দোলনকে, কলুষিত করছে শিক্ষাঙ্গনকে। ছাত্ররা- তরুণেরা হয়ে পড়েছে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারমাত্র। সর্বগ্রাসী হতাশার এই ব্যাক্তিবাদ, ভোগবাদ ও খোলাবাজারের যুগে বামপন্থী পার্টিগুলোও তরুণদের আর নতুন কোন স্বপ্ন দেখাতে পারছে না। ৯০-পরবর্তী তরুণদের অনেকেই তাই রাজনীতি ও আন্দোলন থেকে দূরে সরে গেছে, একধরণের হতাশা এবং অপ্রাপ্তির বেদনা থেকেই।

এই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রগতিশীল তরুণেরা যে লড়াই করছে না তা নয়। প্রতিকূল কালস্রোতে দাঁড়িয়েও প্রগতিশীল তরুণেরা স্বপ্ন দেখছে, প্রয়োজনে মাঠেও নামছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করছে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ১৯৯২ সালের ১৩ই মার্চ শহীদ হয়েছেন ছাত্র ইউনিয়ন ও তৎকালীন গণতান্ত্রিক ছাত্রঐক্যের নেতা রাজু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে পুলিশী নির্যাতনের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলন, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র বিদ্রোহে সচেতন প্রগতিশীল তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বামপন্থী প্রগতিশীল ছাত্ররা সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে সফল আন্দোলন গড়ে তুলেছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭/৪ ধারা বাতিলের আন্দোলন। সাম্রাজ্যবাদীদের কালো থাবা ও বহুজাতিক কোম্পানীর হাত থেকে দেশের সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের চালিকাশক্তিও সেই সকল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ছাত্র-তরুণেরা। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সেই সকল স্বপ্নবান, উদ্যমী তরুণেরা- নানা প্রতিকূলতা সত্তে¡ও। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে আমরা দেখলাম এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণরা কিভাবে মাঠে নামলো, আন্দোলনকে সংগঠিত করলো। তবু সেই বিচ্ছিন্নতা তাদের আন্দোলনকে শেষপর্যন্ত শহুরে মধ্যবিত্তদের আন্দোলনের চোরাগলিতে আটকে ফেলল, গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে এই দূরত্বের সুযোগ নিল মৌলবাদী শক্তি।
সাধারণভাবে শিক্ষিত তরুণেরা প্রচলিত দ্বিদলীয় রাজনীতি ও সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের প্রতি বীতশ্রদ্ধ থাকলেও, প্রগতিশীল আন্দোলনের এই ধারায় এখনো তারা ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে না। ফলে দেশের বড় ধরনের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন এনে দিতে এই প্রগতিশীল ধারা এখনো খুব বেশি সফল হতে পারছে না। ৯০-পরবর্তী প্রগতিশীল ছাত্র-যুব আন্দোলন কী কারণে সেভাবে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারছে না, প্রবন্ধের শেষাংশে এই কারণগুলো খোঁজার প্রচেষ্টা থাকবে।

শিক্ষিত তরুণদের বিচ্ছিন্নতার শেকড়সন্ধান

স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে, বিশেষত, সেনাবাহিনীর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকেই শিক্ষাখাতে চরম বৈষম্য তৈরি হয়। একদিকে ইংরেজি মিডিয়াম, অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্রমবর্ধমান কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে। উচ্চশিক্ষায় বাজারমুখী শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হয়- উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ঘটে। বাণিজ্যিকীকরণের ধারাবাহিকতায়, গত দুই দশকে একের পর এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী হয়, যেখানে মানবিক মানুষ তৈরি করার পরিবর্তে কর্পোরেট চাকুরে তৈরি করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে। জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার বদলে ইনফরমেশনভিত্তিক খণ্ডিত শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রবণতা দেখা যায়। মানবিক সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত না করে, বাজার ব্যবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ আত্মকেন্দ্রিক ক্যারিয়ারমুখি শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হয়। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব, কিছু শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা ও অন্ধ লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির শিকার হয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোও সুনাম হারাতে থাকে। মাদকের অবাধ বিস্তার অনেক হতাশাগ্রস্ত তরুণকে গ্রাস করে। শহর অঞ্চলে এক ধরণের ক্যারিয়ারমুখী, স্বার্থপর, বিচ্ছিন্ন শিক্ষিত তরুণ তৈরি হয়।

৯০’পরবর্তী গণতন্ত্রের(!) এই সময়ে, ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়, ডাকসুসহ ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে নানা কৌশলে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ‘ছাত্ররাজনীতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে, ছাত্র রাজনীতি মানেই এখন সন্ত্রাস-হানাহানি, হল দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি’ – এ ধরনের বাগাড়াম্বর বক্তৃতার মাধ্যমে ছাত্রদের আন্দোলন করার অধিকার কেড়ে নিয়ে আত্মসুখবাদী, ভোগবাদী, ক্যারিয়ারসর্বস্ব প্রবণতার প্রতি উৎসাহিত করার চক্রান্তও চলতে থাকে। পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে টক শো- এমনকী ক্লাস লেকচারেও ছাত্র আন্দোলনকে হারাম বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। এই সুযোগেই সুযোগসন্ধানীরা বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির ফায়দা লুটছে, ছাত্ররাজনীতির নামে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্রসংগঠন দিয়ে লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডামি-মাস্তানির প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এই অপরিষ্কার- ক্লেদাক্ত ছাত্ররাজনীতির পান্ডারা পরবর্তীতে জাতীয় নেতৃত্বে এসে সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে চালাচ্ছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও অবাধ লুটপাট। অপরদিকে অনেক তরুণই এই ছাত্ররাজনীতির প্রতি ঘৃণা পোষণ করে চিরকালের জন্য রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছে-এবং ছাত্র-যুব আন্দোলনের প্রতি আস্থা হারিয়ে; ক্যারিয়ারসর্বস্ব, বিচ্ছিন্ন মানুষ হয়ে পরবর্তীতে নিজের অজান্তেই ব্যক্তিমালিকানার এই বর্বর সমাজকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা পালন করছে।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় আলোচনার দাবী রাখে। ৯০-পরবর্তীতে গোটা বিশ্বেই এক বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পতন হয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের। একমেরু বিশ্বেও অধিপতি হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র। এদেশে অনেকেই সমাজতন্ত্রের শেষ দেখে ফেলেন। এমনকী সোভিয়েত আমলে সুবিধাভোগী অনেক বামপন্থী নেতাও ভোল পালটে সমাজতন্ত্রের ইতি দেখে ফেলেন। অনেক প্রগতিশীল তরুণ হতাশ হয়ে পড়ে- বাম আন্দোলনে তা বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই দুর্বলতার সুযোগে খুব সহজেই আধিপত্য বিস্তার করতে পারে এদেশের লুটেরা শাসকগোষ্ঠীর ওপর। সিভিল সোসাইটিতে তৈরি হয় সাম্রাজ্যবাদীদের আধিপত্য। ‘সুশীল সমাজ’ নামের অভিজাত বুদ্ধিজীবীদের উৎসাহিত করা হয়, যারা একদিকে সমাজতন্ত্রের বদনাম ও মুক্তবাজারের গুণগান গাইতে থাকে। কর্পোরেট-বহুজাতিক কোম্পানীগুলো এদেশে বিস্তার লাভ করে, সামান্য ঋণের বিনিময়ে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ এর নির্দেশ মেনে চলে নতজানু শাসকগোষ্ঠী। এনজিও প্রতিষ্ঠিত হয়। এনজিওগুলো মানবাধিকার, দারিদ্র্য বিমোচনের গালভরা বুলি আর মোটা অংকের বেতন দিয়ে শিক্ষিত তরুণদের প্রলোভন দেখাতে থাকে। বিশেষত প্রগতিশীল শিক্ষিত তরুণরা হয় এদের টার্গেট।

এ সময়কালে, স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে ঘটে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়- এদেশের লোকসংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলে। যোগাযোগপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ও ব্যবসার কারণে তরুণদের কাছে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হয়ে যায়, শহুরে তরুণদের ঘরে আসে কম্পিউটার, হাতে আসে এমপিথ্রি, আইপড। যোগাযোগের এই প্রযুক্তি যেন আরো আলোকবর্ষ দূরে নিয়ে যায় তরুণদের। কানে হেডফোন লাগিয়ে, তারা হয়ে পড়ে বধির; টিভি ও কম্পিউটারের ভার্চুয়াল জগতে নিবদ্ধ দৃষ্টি অন্ধ করে দেয় তাদের। নিত্য-নতুন চাহিদা তৈরি হয় বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে। ক্যারিয়ারমুখী-ভোগবাদী ‘ডিজুস’ সংস্কৃতি গ্রাস করে তরুণ সমাজকে। গানে-নাটকে-সিনেমায়-সাহিত্যে সামাজিক বাস্তবতাকে ফুটে উঠতে খুব কমই দেখা যায়। মার্কসবাদী সাহিত্য, তত্তে¡র প্রতি তরুণদের আর আগ্রহ সেভাবে দেখা যায় না, সস্তা সুখপাঠ্য সাহিত্য দখল করে রাখে তাদের মনোজগত। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষায়, প্রচলিত মূল্যবোধ কিংবা সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো ধরনের জিজ্ঞাসার সম্মুখীন করতে সাম্প্রতিক কথাসাহিত্য ব্যর্থ, কবিতা জীবনের স্পন্দন ও প্রেরণা থেকে বঞ্চিত। প্রিন্ট ও ইলেকট্রণিক মিডিয়া খোলাবাজার ও পুঁজিবাদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত।এসবকিছুর প্রভাব এসে পড়ে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের উপর। তারা গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়- নিজেদের থেকেও বিচ্ছিন্ন্ হয়ে পড়ে, হতাশ ও হতোদ্যম হয়ে পড়ে।

সচেতন তরুণদের মধ্যেও বর্তমান সময়ে নানা ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। সচেতন তরুনদের এক অংশের মধ্যে আমরা উত্তরাধুনিকতার প্রভাব দেখতে পাই। উত্তরাধুনিকতার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতকে আত্মস্থ না করে, বিচ্ছিন্নভাবে উত্তরাধুনিকতার চর্চা তাদের আরো পরস্পর থেকে দূরে ঠেলে দেয়। বর্তমান সমাজবাস্তবতা, সিভিল সোসাইটিতে বুর্জোয়া আধিপত্য ও বিচ্ছিন্নতার চর্চার কারণে বুর্জোয়া সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ায় এইসব তরুণ বিচ্ছিন্নতা, হতাশা ও আত্মমুখিনতার দর্শনের সহজ শিকার। সমাজে বিদ্যমান নানা অসংগতি নিয়ে তারা সচেতন, কিন্তু প্রত্যেকটি অসংগতিকে তারা একেকটি বিচ্ছিন্ন ডিসকোর্স হিসেবে মনে করে এবং তাদের মধ্যেকার সংযোগসূত্রকে তারা খুঁজে পায় না। বুর্জোয়ারা তাদের শত্রু, অথচ বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বামপন্থীদেরও তারা মিত্র মনে করে না। কাঠামোবিরোধীতার কাঠামোতে তারা ঘুরপাক খেতে থাকে। সমাজবিকাশের মূলধারাকে তারা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, সবকিছুকে খারিজ করার নৈরাজ্যবাদী চিন্তার জগতে তারা পতিত হয়। উপরিকাঠামোর নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা সংগ্রাম করতে চায়, কিন্তু অন্যায়-অবিচারের মূল দুর্গকে তারা আক্রমণ করে না। ব্যাপক জনগণ থেকে তারা হয়ে থাকে বিচ্ছিন্ন, নিজেদের ভাবনার খণ্ডিত জগতে তাদের বিচরণ। কোনো কোনো বামপন্থী তরুণদের মাঝেও এ ধরনের অনৈতিহাসিক, হতাশা ও নৈরাজ্যপন্থী চিন্তাধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়।

সমাজ বিকাশ অধ্যয়নের বই-পুস্তিকাগুলো এখন তরুণদের কাছে খুব একটা সহজলভ্য নয়, বিশেষত বাংলায়। তাই একধরনের রোমান্টিকতার জায়গা থেকে অনেক তরুণ বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনীতিতে আসলেও, তত্ত্বচর্চার ঘাটতির কারণে খুব সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে বা প্রলোভনের শিকার হয়। শহুরে শিক্ষিত তরুণদের এখন আবার ফেসবুক, বøগের মত সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো ব্যবহার করতে দেখা যায়। শোনা যায়, সাম্প্রতিক আরব বসন্তের অনেকখানি কৃতিত্বও নাকি এসব সাইটের! অনেক বিচ্ছিন্ন তরুণ এসব সামাজিক সাইটে খোলাখুলিভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করছে, নিজেদের মাঝে যোগাযোগ তৈরির মাধ্যমে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই শিক্ষিত তরুণ গোষ্ঠীও কিন্তু জনমানুষ হতে বিচ্ছিন্ন একটি জগতে বাস করছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য এখন আগের চাইতে অনেক সহজলভ্য। কিন্তু সত্যিকারের জীবনদর্শন গড়ে না উঠলে, সমাজ বিকাশের ধারাকে বুঝতে ব্যর্থ হলে সেসব তথ্য থেকে গড়ে ওঠা সচেতনতা সমাজ পরিবর্তনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এসব তরুণদের বিপ্লবাকাঙ্ক্ষা ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, যদি তারা গণমানুষের সাথে মিশে যেতে না পারে।

এদেশের শিক্ষিত তরুণদের আন্দোলনমুখি অবস্থান ও আন্দোলনবিমুখ হওয়ার শেকড়সন্ধান(১ম পর্ব)

৩ thoughts on “এদেশের শিক্ষিত তরুণদের আন্দোলনমুখি অবস্থান ও আন্দোলনবিমুখ হওয়ার শেকড়সন্ধান(২য় পর্ব)

  1. গুরুত্বপূর্ণ একটি পোষ্ট।
    গুরুত্বপূর্ণ একটি পোষ্ট। কিছু কিছু বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ অসাধারন। এই বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করা কিছু বুদ্ধিজীবী আর তাদের দোসর কিছু মিডিয়া এই সময়ের অনেক মেধাবী তরুণদের মাঝে ‘আই হেইট পলিটিক্স’ জাতীয় মনোভাব ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে । এই মনোভাবের অনেক তরুণ উচ্চ শিক্ষার নামে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে । তারপর কিছু টাকা পাঠিয়ে ,বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে সাপোর্ট করে আর পত্রিকায় দেশের খবরের নিচে কমেন্ট করে দেশের প্রতি দায়িত্ব সারছে। আর আমরা ব্লগে যতই বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মত প্রকাশ করি না কেন বাস্তবিক ভাবে আমরাও দিন কে দিন হতাশ , জনবিচ্ছিন্ন ,স্বার্থ পর হচ্ছি । আপনার ভাষায় বলতে হয় ভার্চুয়াল জগত আমাদের আলোক বর্ষ দূরে সরে নিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *