এদেশের শিক্ষিত তরুণদের আন্দোলনমুখি অবস্থান ও আন্দোলনবিমুখ হওয়ার শেকড়সন্ধান(১ম পর্ব)

এদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দেখা যায়, বিভিন্ন গণআন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষিত তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। তরুণদের প্রাণশক্তিতে এ অঞ্চলে যে বামপন্থী আন্দোলন বিকাশ লাভ করেছিলো, তা আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে পালন করেছিল ভ্যানগার্ডের ভূমিকা। অথচ, এই সময়কালে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এক ধরনের রাজনীতিবিমুখ তথা আন্দোলনবিমুখ অবস্থান দেখা যায়। বর্তমান সময়ে প্রগতিশীল ছাত্র-যুব আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত শিক্ষিত তরুণেরা সমাজ বদলের লড়াইকে এগিয়ে নিতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে সেভাবে আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সচেতন প্রগতিশীল তরুণদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে বিভ্রান্তি ও হতাশা, কোনো ক্ষেত্রে তা একধরনের নিস্পৃহ নৈরাশ্যবাদ, কখনো কখনো রোমান্টিক ইউটোপিয়ান বিপ্লবীপনার জন্ম দিচ্ছে। আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে, সমাজে সৃষ্ট নতুন নতুন উপাদানের সাথে মিথস্ক্রিয়া ও দ্বন্দ্বে সংস্কৃতির চেহারা বদলায়- বদলায় মনস্তত্ব। তাই, বর্তমান সময়ের তরুণদের সংস্কৃতির স্বরূপ এবং আন্দোলনবিমুখ হওয়ার শেকড় সন্ধান করতে হলে আমাদের একটু পেছন থেকে শুরু করা প্রয়োজন। সামন্তযুগের অবক্ষয়পর্ব এবং পুঁজিবাদের উন্মেষকালে এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উদ্ভব কীভাবে ঘটল, এর পরে কীভাবে শিক্ষিত তরুণেরা স্বাধীনতা সংগ্রামসহ প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠল, আর কেনবা এ সময়কালে এসে আপাতদৃষ্টিতে সেই ধারাকে ম্রিয়মাণ মনে হচ্ছে সে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা প্রয়োজন। এদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ঘটনাপ্রবাহ কীভাবে শিক্ষিত তরুণদের মনোজগত গঠন করেছে এবং তরুণদের আন্দোলনমুখি এবং আন্দোলনবিমুখ করেছে, সে বিষয়টি বুঝতে হলে ইতিহাসের নিবিড় পাঠ জরুরি।

শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উত্থানপর্ব-ব্রিটিশ আমল

১৮৩৫ সালের মেকলের শিক্ষানীতিতে খোলাখুলিভাবেই বলা হয়েছিল এমন এক ধরনের শিক্ষার কথা, যা এক মধ্যবর্তী অনুগত শ্রেণি তৈরি করবে এবং ব্রিটিশ শাসনশোষণ কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হবে। কিন্তু মেকলে যতই ‘Indian in blood and color but English in tastes’-এর স্বপ্ন দেখুক না কেন, এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীই কিন্তু পরবর্তীতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার দাবি তুলতে থাকে। হবস, লক, রুশো, ভলতেয়ার, বেকন, হিউম, টমাস পেইন এর রচনা শিক্ষিত বাঙ্গালি তরুণদের উজ্জীবিত করতে থাকে, তারা ফরাসী বিপ্লবের সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার বাণীতে উজ্জীবিত হয়। শিক্ষিত বাঙালির মনে ক্রমশ দাগ কাটতে থাকে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক ঘটনাবলী, দার্শনিক তত্ত্ব এবং তা তাদের চৈতন্যেরও রূপান্তর ঘটাতে থাকে। মার্কস যথার্থই বলেছিলেন, ‘England it is true is causing a social revolution in Hindustan, was actuated only by the interests and was stupid in her manner of enforcing them…Whatever may have been the crimes of England she was the unconscious tool of history in bringing about the revolution. (১৮৫৩ সালে নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন পত্রিকায় মার্কসের মন্তব্য)।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বাংলায় স্কুল-কলেজের সংখ্যাও বাড়তে দেখা যায়, এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিস্তার লাভ করতে থাকে, বৃদ্ধি পায় সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবী, আইনজীবী-চিকিৎসক ইত্যাদি বৃত্তিজীবী, শিক্ষক-অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা। অসংখ্য সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। সেই সাথে শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এই সময়েই, অভিজাত, ভুস্বামী জমিদার শ্রেণির বদলে রাজনৈতিক আন্দোলন, নানা সভা-সমিতির নেতৃত্ব চলে যায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে। আর তার সাথে সাথে শিক্ষিত ছাত্র-যুব সমাজও আরো আন্দোলনমুখি হয়ে উঠতে থাকে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত রাাজনীতিতে সক্রিয় হবার পর থেকেই ছাত্রদের মাঝেও ভারতজুড়ে সংগঠন গড়ে উঠতে দেখা যায়। ১৮৭৫ সালে বিলেতফেরত আনন্দমোহন বসুকে কেন্দ্র করে স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন গড়ে ওঠে, যেখানে নিয়মিত সভা করে দেশ-বিদেশের মুক্তিসংগ্রামের রোমান্টিক বিবরণ আলোচনা করা হত। ১৯০৫ সালের ৪ নভেম্বর কলকাতার কলেজ স্কয়ারে প্রায় তিন হাজারের অধিক ছাত্রের সমাবেশে এন্টি সার্কুলার সোসাইটি নামে এদেশের প্রথম গণ ছাত্র সংগঠন গঠিত হয়।

বাংলার শিক্ষিত তরুণেরা সাম্যবাদী চিন্তার সংস্পর্শে আসে মূলত বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্য বইটির মাধ্যমে যেটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৭৯ সালে। বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মানবতাবাদী চিন্তাদর্শন বামপন্থী চিন্তার জমিনকে উর্বর করে তোলে বাঙালি মধ্যবিত্তের মাঝে। বিশেষত, নজরুলের লেখায় সাম্যবাদী চিন্তার অনেক খোরাক পাওয়া যায় সেসময়। এ সময়কালেই, ১৯২০ সালে ১৭ অক্টোবর তাসখন্দে প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের উদ্যোগে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। তবে, বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ব্যাপকভাবে বামপন্থী চিন্তাধারার বিকাশ হতে থাকে ১৯২০-এর দশকের মধ্যভাগের পর থেকে। ১৯২৯ সালে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সাধারণ স্বত্তাধিকারীদের ইস্তেহার’ নাম দিয়ে কমিউনিস্ট ইস্তেহারের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন। এছাড়া, প্রগতিশীল শিক্ষিত তরুণদের উদ্যোগে সেসময় প্রতিষ্ঠা লাভ করে প্রগতি লেখক সংঘ। বিশের দশক থেকে চল্লিশের দশকের শুরু পর্যন্ত এ অঞ্চলে অসংখ্য বামপন্থী গোষ্ঠীর জন্ম হয়। ত্রিশের দশক থেকেই বাংলায় একের পর এক গণ আন্দোলনের জোয়ার বইতে থাকে, যার পুরোভাগে ছিলো বামপন্থীরা। এই বামপন্থীদের মূল চালিকাশক্তি ছিল শিক্ষিত তরুণ মধ্যবিত্তরা। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের আকর্ষণে তরুণরা বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে যুক্ত হয়। সেসময় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মীরাই মূলত সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়ে শ্রমিক কৃষক আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বাঙালি শিক্ষিত তরুণদের কাছে বিপ্লববাদী রাজনীতি গান্ধিবাদী অহিংস আন্দোলনের চেয়ে জনপ্রিয় ছিলো। ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকীরা ছিলেন তাদের হিরো। ১৯০৬-০৭ সাল থেকে বাংলায় যে বিপ্লববাদী আন্দোলনের সূচনা, তার ধারাবাহিকতা ছিল ১৯৩০ সাল পর্যন্ত। এ সময়কালে অনুশীলন, যুগান্তরের মত বিপ্লবী দল গড়ে উঠেছিল। গান্ধিজীর লবণ আইন অমান্যের আন্দোলন সারা ভারতকে কাঁপিয়ে দিল্ওে এ অঞ্চলে সূর্যসেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন বাঙালি তরুণদের আরো বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল। এ সময়কালে পুরনো বিপ্লববাদী আন্দোলনে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের প্রভাবও পড়তে শুরু করেছিল। এ কথা বলা যায় যে, বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে এ অঞ্চলের তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের হাতেখড়ি হয়েছিল সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠনগুলিতে। এই সংগঠনগুলিতে যে নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ, কষ্টসহিষ্ণুতার শিক্ষা তারা পায়, তাকেই তারা কাজে লাগায় শ্রমিক-কৃষকের মাঝে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯২১-২২ সালে চা শ্রমিকদের আন্দোলনের সাথে ছাত্রসমাজ যুক্ত হওয়ার কথা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, গোয়ালন্দে চা শ্রমিকদের ধর্মঘট সফল করতে উদ্যোগী ভ‚মিকা নেয় ছাত্ররা। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বামপন্থী চেতনাজাত নানামুখী কর্মকাণ্ডের জন্যই শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন সর্বসাধারণের মাঝে উৎসাহ সঞ্চার করে। ধর্মঘটী শ্রমিকের পক্ষে সমর্থনসূচক সভা, চাঁদা সংগ্রহ খুব সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখা যায়। এদিকে বামপন্থীদের উদ্যোগে কৃষক আন্দোলনও র্যাজডিকেল রূপ ধারণ করে। মণি সিং-এর নেতৃত্বাধীন টংক আন্দোলন, পরবর্তীতে তেভাগা আন্দোলন এদেশের প্রগতিশীল তরুণসমাজকে উদ্বুদ্ধ করে। এ সময়কালের উজ্জীবনী গণসংগীত, গণনাট্য সংঘের নাটক, বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের লেখা, বিদেশী মার্কসবাদী তত্ত্ব ও সাহিত্য শিক্ষিত তরুণদের মনোজগতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

ফকির বিদ্রোহ, সন্যাস বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ভারতজুড়ে স্বরাজের জন্য নানামাত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম, অনুশীলন, যুগান্তরের মত সশস্ত্র গ্রুপসমূহের বিপ্লবী প্রয়াস বাংলাকে পরিণত করেছিল অগ্নিগর্ভে। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম যে মুক্তিচেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল, তার মাঝেই বিকশিত হয়েছে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম ও প্রগতিশীল রাজনীতি। সেই স্রোতেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণেরা আন্দোলনমুখি হয়েছে, গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে নিজেদের আকাঙ্ক্ষাকে মিলিয়ে নিয়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্যশিক্ষা ও দেশ-বিদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের ঘটনাবলীর সংস্পর্শে এদেশের তরুণদের মধ্যে সচেতনতার বীজ বপন করে দেয়। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নজরুলদের রচনাও শিক্ষিত তরুণদের ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করে জাতীয়তাবাদী ও উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে। এর পাশাপাশি মার্কসবাদী সাহিত্য ও তত্ত্ব প্রগতিশীল তরুণদের শ্রমিক-কৃষকের রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করে তোলে। জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা ও তাদের সাথে সংগ্রামে শরীক হওয়া, বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক দ্ব›দ্বকে মোকাবেলা করার মধ্য দিয়ে প্রগতিশীল তরুণেরা শাণিত হয়, হয়ে ওঠে আন্দোলনমুখি।

আত্মপরিচয়ের সন্ধান ও মুক্তিযুদ্ধ- পাকিস্তান পর্ব

ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান তরুণদের প্রাণশক্তিতে এবং জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণে আভারতবর্ষের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম যখন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে- বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, ভগত সিং, রাজগুরু, আশফাকউল্লাহ, সূর্যসেন, প্রীতিলতাদের মত অসংখ্য তরুণের আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত যখন মানুষকে উজ্জীবিত করছে স্বাধীনতার মন্ত্রে, তখনই ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উৎসাহে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয় ভারতবর্ষজুড়ে। নানামুখী ষড়যন্ত্র এবং উত্তাল সেই সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাবলীকে ঘিরে সৃষ্ট গণবিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে সামনে নিয়ে আসা হয় দ্বি-জাতি তত্ত্বকে । ভারতবর্ষের জনগণের বিজয়কে খণ্ডিত করা এবং ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নয়া উপনিবেশিক শোষণ নিশ্চিত করার ষড়যন্ত্রকে সফল করে ১৯৪৭ সালে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্র।

এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সবসময়েই ধারণ করেছে অসাম্প্রদায়িক, উদার, মানবতাবাদী চরিত্রকে। সুফিবাদ, মরমীবাদ, বাউল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ, লালন, বিবেকানন্দ, নজরুলের মত মনিষীরা উদার মানবতাবাদী দর্শন প্রোথিত করেছেন বাঙালির মানসপটে। সেই চরিত্রকে ধারণ করে ও হাজার বছরের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-সংগ্রামকে লালন করে, পাকিস্তান নামক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামোর অংশ হওয়া বাঙালি তরুণদের মধ্যে এক নতুন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। অধিকন্তু, পাঞ্জাবি একচেটিয়া ধনিকদের নেতৃত্বে পরিচালিত পাকিস্তানী রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণের খড়গ নেমে আসে পূর্ববঙ্গের মানুষের ওপর। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিকক্ষেত্রে নিদারুণ বৈষম্য, ভাষা-সংস্কৃতির উপর আগ্রাসন, রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-নিপীড়ন এ অঞ্চলের মানুষকে, বিশেষত তরুণদের ক্রমশ মুক্তিসংগ্রামের দীক্ষায় দীক্ষিত করে তোলে।

ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই প্রগতিশীল, বামপন্থী তরুণ কমিউনিস্টরা এই আন্দোলনকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বামপন্থী, কমিউনিস্টদের সংস্পর্শে এসে ছাত্রদের মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তন-মননের ধারা বিকশিত হতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের মহান ২১শে ফেব্রুয়ারিতে শহীদদের আত্মদান এ আন্দোলনকে এনে দেয় অপ্রতিরোধ্য গতি। এ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এবং ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের মাঝে যে প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনার উন্মেষ ঘটে, তার উপর ভিত্তি করে ১৯৫২ সালের ২৬শে এপ্রিল প্রতিষ্ঠা লাভ করে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। ‘মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামের সংগঠনটির সাম্প্রদায়িক চরিত্র তখনো বহাল ছিল। ছাত্র ইউনিয়নের অসাম্প্রদায়িক প্রচারনা ও ছাত্রদেও অগ্রসরমানতার প্রভাবে সেই সংগঠনটি ১৯৫৪ সালে তার নাম থেকে মুসলিম শব্দটি উঠিয়ে নেয়। এটি নিঃসন্দেহে তৎকালীন শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তাচর্চার দিককে নির্দেশ করে। সেসময় বামপন্থী প্রগতিশীল তরুণরাই বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তারা সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীকার ইস্যুতে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে থাকে। শাসকদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে একুশে উদযাপন, রবীন্দ্রনাথ চর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রাখে ছাত্ররা।

পাকিস্তানপর্বের গৌরবময় ইতিহাসের পাঠ থেকে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সেসময় ছাত্র আন্দোলনের বিকাশ আমাদের মুক্তিসংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার পূর্ব বাংলার শিক্ষিত তরুণরা নিজের ভাষা, সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। ক্রমশই অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী হয়ে ওঠা শিক্ষিত তরুণেরা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের চাইতে বাঙালি পরিচয়কে অনেক বেশি গর্বভরে ধারণ করতে থাকে। আমরা লক্ষ্য করি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক অগ্রসর অংশ হিসেবে ছাত্রসমাজকে চিহ্নিত করা হলেও, সেসময় এর ভেতর দরিদ্র কৃষকশ্রেণীর সন্তানদের সংখ্যার আনুপাতিক বৃদ্ধি ঘটে। এছাড়া, শাসকশ্রেণী গণবিরোধী শিক্ষানীতি ও পূর্ব বাংলায় শিক্ষা সংকোচনের নীতি গ্রহণ করলেও, স্থানীয় উদ্যোগে পূর্ববাংলায় অসংখ্য স্কুল কলেজ গড়ে ওঠে। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা ছাত্ররা ছাত্র আন্দোলনকে ক্রমশ র্যাুডিকাল চরিত্র নিতে প্রভাবিত করে। এছাড়া, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম, সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার বিকাশ সেসময়ে বহু তরুণকে উদ্বুদ্ধ করে বামপন্থী আদর্শে। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সাথে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর দহরম-মহরম, এদেশের সচেতন তরুণদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। দেশের প্রগতিশীল বামপন্থী তাত্তি¡কদের লেখা, মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্টালিন-মাও এর রচনা ও কর্মের সংস্পর্শে আসে সচেতন শিক্ষিত তরুণেরা। ছাত্রসমাজ এবং গণমানুষের মধ্যে এক নিবিড়, অর্গানিক যোগাযোগ এবং আন্তঃসম্পর্ক স্থাপিত হয়। ছাত্রসমাজ ক্রমশ তাই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার উপযোগী হয়ে ওঠে। তারই প্রমাণ আমরা দেখি, ছাত্র আন্দোলনে শ্রমিকরাও মাঠে নেমে লড়াই করে, ৬২’র আন্দোলনে শ্রমিক সুন্দর আলী শহীদ হয়। ছাত্র-এমনকী ছাত্রীরাও লাল ঝান্ডা নিয়ে সংগঠিত করতে থাকে শ্রমিক কৃষকের সভা। ছাত্র আন্দোলনপর্ব শেষ করে তরুণরা শ্রমিক রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। সাহসী, ত্যাগী, কষ্টসহিষ্ণু নেতা-কর্মীরাই তখন ছাত্র-যুব আন্দোলনের প্রাণভোমরা।

বামপন্থী, প্রগতিশীল ছাত্ররা ছয় দফার অসম্পূর্ণতা দূর করতে ১১ দফার কর্মসূচি ঘোষণা করে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধীতা, একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিলোপ, কৃষক-শ্রমিকের বিভিন্ন দাবী, ছাত্রসমাজের শিক্ষা বিষয়ক দাবী ইত্যাদি যুক্ত করে ছাত্রসমাজ ১১ দফাকে পরিণত করে বাংলার গণমানুষের মুক্তির সনদে। নিঃসন্দেহে ছাত্রদের এ এক অসাধারণ কৃতিত্ব। সবকিছু মিলিয়েই ছাত্রসমাজ এ দেশের প্রেক্ষাপটে তখন সমাজ বদলের এক প্রগতিশীল চরিত্র হয়ে ওঠে । বদলে যাওয়া এ ছাত্র-যুবসমাজ ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়। র্যাগডিকেল ছাত্রসমাজের জঙ্গি মনোভাব স্বাধীনতার দাবিকে সামনে তুলে আনে, দেশের সর্বস্তরের মানুষ ভ্যানগার্ড ছাত্র-যুবদের লড়াইকে সমর্থন করতে থাকে, কারণ ছাত্র-যুবরাই তখন জাতির প্রত্যাশাকে ধারণ করতে পারছিল কৃতিত্বের সাথে। ছাত্রসমাজই প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে, সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। পাকিস্তানীদের আক্রমণের মুখেও মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বে ছাত্র-যুবরা যতটুকু সম্ভব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল দেশের প্রতিটি অঞ্চলে। দলে দলে তরুণেরা মুক্তিবাহিনীতে যুক্ত হতে থাকে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধে মেহনতী মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে, নিজেকে আত্মোৎসর্গ করতে থাকে স্বাধীন মাতৃভূমির জন্য। চীনাপন্থী বামদের বিভ্রান্তি, মুজিববাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকা স্বত্ত্বেও দেশের বেশিরভাগ শিক্ষিত ছাত্র-যুবরা প্রগতিশীল চেতনাকে ধারণ করে মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করে স্বতঃস্ফুর্তভাবে। ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশায় প্রগতিশীল ছাত্র-যুবরা অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেয়।

২ thoughts on “এদেশের শিক্ষিত তরুণদের আন্দোলনমুখি অবস্থান ও আন্দোলনবিমুখ হওয়ার শেকড়সন্ধান(১ম পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *