একটির সাথে একটি মৃত্যু

লেখক: নীল

হঠাৎ করেই কুকুরটি ভয়ানক ভাবে ডাকতে শুরু করলো।

এইভাবে তো কুকুরটি আগে কখনো ডাকেনি। তাহলে আজ কেন এইভাবে ডাকছে?

কুকুরটি ডেকেই যাচ্ছে।

কুকুরের এই শব্দে রমিজ মিয়াঁর কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেল।

রমিজ মিয়াঁ উঠে বসতেই কুকুরটি থেমে গেলো এবং সব কিছু নিরব হয়ে গেল।

বাড়িতে চোর আসেনি তো?

চোর আসলেই কি, রমিজ মিয়াঁর আছে কি আর নিবে কি!

আছে তো বলতে শুধু একটা ভাঙ্গা টিনের ঘর!

চোর নিশ্চয় ই পথ ভুল করে এই বাড়িতে এসেছে।

না হলে এই বাড়িতে চোর আসবে কেন?

এই গ্রাম টি অজপাড়াগাঁ এর থেকে একটু কম।

ইদানিং গ্রাম এ সাপের উপদ্রপ কমে গিয়ে চোর এর উপদ্রপ বেড়ে গেছে।


লেখক: নীল

হঠাৎ করেই কুকুরটি ভয়ানক ভাবে ডাকতে শুরু করলো।

এইভাবে তো কুকুরটি আগে কখনো ডাকেনি। তাহলে আজ কেন এইভাবে ডাকছে?

কুকুরটি ডেকেই যাচ্ছে।

কুকুরের এই শব্দে রমিজ মিয়াঁর কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেল।

রমিজ মিয়াঁ উঠে বসতেই কুকুরটি থেমে গেলো এবং সব কিছু নিরব হয়ে গেল।

বাড়িতে চোর আসেনি তো?

চোর আসলেই কি, রমিজ মিয়াঁর আছে কি আর নিবে কি!

আছে তো বলতে শুধু একটা ভাঙ্গা টিনের ঘর!

চোর নিশ্চয় ই পথ ভুল করে এই বাড়িতে এসেছে।

না হলে এই বাড়িতে চোর আসবে কেন?

এই গ্রাম টি অজপাড়াগাঁ এর থেকে একটু কম।

ইদানিং গ্রাম এ সাপের উপদ্রপ কমে গিয়ে চোর এর উপদ্রপ বেড়ে গেছে।

একটা সময় ছিল যখন সাপ এর ভয়ে সন্ধের পর কেউ ঘর থেকে বাইরে যেত না।

মানুষ চিন্তা থেকে একেবারে মুক্তি পায় না।

আগে মানুষ চিন্তিত থাকতো সাপ এর ভয়ে। আর এখন চোর এর ভয়ে।

রমিজ মিঁয়া একবার ভাবলেন বাইরে গিয়ে দেখবেন কিনা।

বাইরে যাওয়ার আগেই ঘর এর দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ হল!

এখন প্রায় নয়টা বাজে।

নয়টা মানেই অনেক রাত গ্রামে।

রমিজ মিয়াঁ দরজা খুলেই দেখলেন কান্না চোখে লিটন দাড়িয়ে আছে।

এই গ্রামে একজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি রয়েছেন।

খুব নাম ডাক্।

সবাই তাকে বড় সাহেব বলে ডাকেন।

লিটন হচ্ছে বড় সাহেব এর কেয়ার টেকার।

‘কি বেপার এত রাতে?’

‘বড় সাহেব এর ছোট ছেলে নদীতে পরে মারা গেছেন।’

‘ইন্নালিল্লাহি:’

‘চাচা আপনি কবর খুঁড়েন।’

‘আচ্ছা।’

এই গ্রামে শুধু রমিজ মিঁয়া ই আছেন যিনি লাশের কবর খুঁড়েন।

এই কাজ টি খুব সাহসী লোক ছারা পারেন না।

রমিজ মিয়াঁ এই কাজ করে যা পান তাতে তার সংসার খুব ভালো ভাবেই চলে যায়।

সংসার আর কি? তিনি তো একাই।

প্রায় ৫২ বছর হয়ে গেছে রমিজ মিয়াঁর, কিন্তু বিয়ের কথা কখনো মুখে আনেন নি।

যদিও গ্রামের লোকেরা তাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু কেউ পারেনি।

রমিজ মিয়াঁর মুখ কিছুটা লম্বাটে।

তার মধ্যে বড় বড় ২ টা চোখ।

প্রতিদিন তার ২ প্যাকেট বিড়ি লাগে।

বাইরে কনকনে শীত।

এই শীত এর মধ্যে কার ইচ্ছা করবে কবরস্থান এ গিয়ে কবর খুঁড়তে।

তারপরেও রমিজ মিয়াঁ কবর খুঁড়ার সরঞ্জাম নিয়ে কবরস্থান এ যাচ্ছেন কবর খুঁড়ার জন্য।

এই গ্রামে একটি মাত্রই কবরস্থান আছে।

কবরস্থান টি “হাউলি” কবরস্থান নামে পরিচিত।

রমিজ মিয়াঁ কবরস্থান এ পা দিতেই খুব জোরে বাতাস বইতে লাগলো।

মনে হচ্ছে কোনো দৈত্য তার বিশাল মুখ দিয়ে ফুঁ দিচ্ছে।

কুয়াশা কে মনে হচ্ছে ঠান্ডা আগুন এর ধুঁয়া।

খুব কষ্টে একটা কবর খুঁড়লেন।

কালো অন্ধকার এর মধ্যে রমিজ মিয়াঁ কবর এর দিকে তাকিয়ে আছেন। আর অনেক কিছু ভাবছেন।

বাচ্চা ছেলেটা এইভাবে চলে গেলো।

মাত্রই তো তার জীবন শুরু হল। কত কিছু করতো বড় হয়ে।

রমিজ মিঁয়া ছেলেটাকে মাঝে মাঝে দেখতেন কাধে স্কুল এর ব্যাগ নিয়ে স্কুল এ জেতে!

মাঝে মাঝে কথা হত। এই তো সেদিন রমিজ মিয়াঁ চা এর দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন।

এমন সময় তাদের কেয়ার টেকার লিটন এর সাথে দোকানে এসে কিছু কেনার সময় রমিজ মিয়াঁ কে দেখে বলল, ‘আঙ্কেল আপনি লাশ এর কবর খুঁড়েন তাই না?’

‘হুঁ’।

‘আপনার অনেক সাহস তাই না’?

‘হু কিন্তু তুমি কিভাবে জানলে?’

‘বাবা বলেছেন যারা কবর এ কাজ করেন তাদের অনেক সাহস, আরো বলেছে ভূতেরা ও নাকি তাদের ভয় পায়।’

‘তাই?’

‘আঙ্কেল আপনাকে ভূতেরা ভয় পায়?’

‘হুঁ’

‘কি দেখে ভয় পায়? আপনার তো অনেক বড় দাঁত নেই, হি হি।’

এই বলে চলে গেল বাচ্চাটি!

চেহারার মধ্যে খুব মায়া। বেশি হলে ৯ বছর হবে।

পৃথিবীতে তো অনেক অদ্ভুদ ঘটনা ঘটছে।

যদি কখনো এমন হত কোনো একটি ফল খেলে চির অমর হওয়া যাবে।

কেউ যদি মাথা কেটে ফেলে সাথে সাথে মাথা গজাবে, কেউ যদি হাত কেটে ফেলে সাথে সাথে হাত গজাবে।

খারাপ হত না।

দুপুরে জানাজা দিয়ে বাচ্চাটি কে কবর দেওয়া হল।

রমিজ মিয়াঁ সেখানে উপস্থিত ছিলো।

সবাই কবর ছেরে চলে গেলো কিন্তু রমিজ মিয়াঁ গেলো না।

তিনি কবর টির পাশে দাড়িয়ে আছেন।

মাগরীব এর আযান এর পর রমিজ মিয়াঁ কবর ছেড়ে তার ঘরের মধ্যে আসলেন।

রমিজ মিয়াঁ এখন চৌকির উপরে শুয়ে বিড়ি টানছেন আর বাচ্চা টি কে নিয়ে ভাবছেন।

কি যেনো নাম বাচ্চাটার? ও হ্যাঁ মনে পরেছে সেদিন লিটন তাকে বিল্লু বলে ডাকছিল।

তাহলে বিল্লু তার নাম?

নাকি অন্য কিছু?

এইসব ভাবতে ভাবতে দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ হল।

রমিজ মিয়াঁ দরজা খুললেন কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না।

বেপার কি?

তাহলে কি রমিজ মিয়াঁ কে কেউ ভয় দেখাচ্ছে?

না তা হতে পারে না কারণ গ্রামের সবাই জানে রমিজ মিয়াঁ কিছুতেই ভয় পান না।

এখন প্রায় ৯ টা বাজে। বাইরে হিম শীতল ঠান্ডা। তার মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার বিকট শব্দ।

দরজায় আবারো ঠক্ ঠক্ শব্দ হল এবার বেশ জোরে।

রমিজ মিয়াঁ চোখ খুলে বিরক্তি মুখে দরজা খুললেন, আর সাথে সাথে একটা গরম বাতাস তার দেহ ভেদ করে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।

এবারো কাউকে দেখতে না পেয়ে রমিজ মিয়াঁ খুব বিরক্ত হলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন এবার কেউ আসলেও আর দরজা খুলবে না।

রমিজ মিয়ে চৌকি তে শুঁয়া মাত্র দেখতে পেলেন পাশে দাড়িয়ে আছে একটি শিশু।

সাদা পাঞ্জাবি পরে।

খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।

রমিজ মিয়াঁ ভুল দেখছেন না তো?

না ছেলেটি কে তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন।

‘আঙ্কেল ভালো আছেন?’

‘হুঁ’।

‘আমাকে চিনতে পেরেছেন?’

‘হুঁ তুমি বিল্লু না?’

‘হ্যাঁ আমি বিল্লু।’

‘কিন্তু তোমার তো কবর এ থাকার কথা, এখানে আসলে কিভাবে?’

‘ওখানে ভালো লাগছিল না তাই আপনার সাথে খেলতে আসলাম।’

‘তাই?’

‘হ্যাঁ, ওখানে অনেক বাচ্চারা আছে ওরা সবাই খেলে কিন্তু আমাকে খেলতে নেয়না।’

‘ও আচ্ছা’

‘জানেন মৃত্যুর পরেও মানুষ বেচে থাকে কিন্তু সবাই দেখতে পায় না! যেমন আমাকে শুধু আপনি দেখছেন।’

‘ও আচ্ছা।’

‘আঙ্কেল আমি চলে যাচ্ছি।’

‘কেন খেলবে না?’

‘না খেলতে ভালো লাগছে না’

এই বলে ছেলেটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

বিল্লু কে তিনি খুজলেন কিন্তু আর তাকে দেখতে পেল না।

খুব জোরে বৃষ্টি নেমেছে।

রমিজ মিয়াঁ ঘুমিয়ে পরলেন।

রমিজ মিয়াঁর বাড়িতে বেশ পুরোনো একটি কুয়ো আছে। ব্যবহার হয় না। কিন্তু রাত এ বৃষ্টির পানি তে কুয়ো প্রায় ভরে গেছে!

রমিজ মিয়াঁ ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসে দেখে বিল্লু কুয়োর উপরে বসে আছে।

‘আঙ্কেল ভালো আছেন?’

‘হুঁ তুমি?’

‘আমি ভালো আছি’

‘বিল্লু তুমি কিভাবে মারা গেলে?’

‘আপনি তো জানেন নদীতে পরে মরেছি!’

‘নদীতে কিভাবে পরে গেলে?’

‘আমি নদীর পারে খেলছিলাম, হঠাৎ কেউ একজন চিৎকার করে বলল বাচাউ বাচাউ, আমি কিছু না ভেবেই পানিতে নেমে গেলাম।’

‘তারপর?’

‘আমি কিছু জানি না, আঙ্কেল আমি চলে যাচ্ছি।’

এই বলে বিল্লু অদৃশ্য হয়ে গেল।

রমিজ মিয়াঁ যেগুলো দেখছেন সেগুলো কি আদো সত্যি? নাকি তাঁর কল্পনামাত্র!

এখন গভীর রাত। রমিজ মিয়াঁর ঘুম আসছে না। একের পর এক বিড়ি টেনে যাচ্ছেন।

মাঝে মাঝে কয়েকটা পেঁচা ডেকে উঠছে।

রমিজ মিয়াঁ অনেক কষ্টে ঘুমালেন।

আজ ৩দিন হয়ে গেল কিন্তু রমিজ মিয়াঁ বিল্লুর দেখা পেল না।

রমিজ মিয়াঁর কেন জানি বিল্লুর সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছা করে।

একজন মৃত শিশুর সাথে তিনি কেন কথা বলতে চাইবেন?

তাহলে তিনি কি পাগল হয়ে গেলেন?

আজো বাইরে খুব বৃস্টি হচ্ছে।

বৃষ্টির ফোটা টিনের চাল এ পরলে এক অদ্ভুদ আওয়াজ হয়।

সেই আওয়াজ এ ঘুম ভালো হয়। রমিজ মিয়াঁ খুব আরাম করে ঘুমাচ্ছেন।

রমিজ মিয়াঁ আজ তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে বাইরে আসলেন।

বাইরে এসে দেখেন সেই কুয়োর উপড়ে বিল্লু বসে আছে।

রমিজ মিয়াঁ কথা বলতে যাবেন ঠিক এমন সময় খুব জোরে বাতাস এসে বিল্লু কে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিলো।

রমিজ মিয়াঁ তাড়াতাড়ি করে কুয়োর কাছে এসে কুয়োর ভেতরে তাকালেন।

তিনি দেখতে পেলেন বিল্লু তাকে বলছে, ‘আঙ্কেল আমাকে বাঁচান – আঙ্কেল আমাকে বাঁচান – আমি মরে যাচ্ছি – আমাকে বাঁচান।’

রমিজ মিয়াঁ আর কিচ্ছুটি না ভেবে কুয়োতে ঝাঁপ দিলেন বিল্লু কে বাঁচানোর জন্য।

ঝাঁপ দেওয়ার সাথে সাথে রমিজ মিয়াঁ বুঝতে পারলেন কুয়োর মধ্যে কেউ নেই। তাহলে বিল্লু কোথায় গেল?

রমিজ মিয়াঁ কুয়োর মধ্যে ডুবে যাচ্ছেন।

এইভাবে কিছুক্ষণ যাওয়ার পর রমিজ মিয়াঁ ও মরে গেলেন।

তাঁর মৃত দেহ কুয়োর মধ্যে ভাসছে।

২ thoughts on “একটির সাথে একটি মৃত্যু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *