হয়তো আমিও মাতাল হয়েছিলাম!!!!

আমাদের মাঝে শুধু আমিই চুপচাপ ছিলাম। এর মানে কখনই এটা নয় যে আমি এরকমই। সেদিন মনটা খানিক খারাপ ছিল। ভাবনাগুলোও জড়িয়ে যাচ্ছিল। নানান কাব্যিক আলোচনা, শব্দ নিয়ে বাক্যালাপ, শুনেই যাচ্ছিলাম। সেদিন একা একা হাঁটতে হাঁটতে একবার ড্রেনেও পড়ে গেছিলাম। পা ভাঙ্গেনি কপাল ভালো। বিকেল সরিয়ে আঁধার নামতেই আমাদের বাক্যগুলো আলাদা হতে লাগল। আমৃত আসল, শুধা আসল। না জানি আরও কত বিশেষণ চলে আসল। কাজলায় দাঁড়িয়ে নানা আবেশে ঢুকে নানা সৃষ্টির পথ বিশ্লেষণ হল। হল, অনেক কিছুই হল। আমি বাদে বাকী সব কনক্রিটই লাগছিল। ফলত প্রশ্নটা আমার কাছেই আসল। আমি যেতে চাই কিনা? কারণ জোর করার মত বা স্বাভাবিক কোন বিষয় ছিল না এটা। অবশ্য অস্বাভাবিকতাই নাকি স্বাভাবিকতা! সেই দিক থেকে আমি প্রশ্নটা নিয়ে ভাবার বেশি একটা সময় পেলাম না। যেহেতু কেরু পান করেছি বেশ কয়বার, অন্তত বমি করে ঘটনা বেগতিক করে ফেলার সম্ভাবনা ছিল না। রাজি হয়ে গেলাম।

রিক্সা ধরার চেষ্টা হল খানিকক্ষণ। কিন্তু কেউ ত্রিশ টাকার কম যাবে না। ফলত অটোতে করেই শুরু করলাম পঞ্চবটির উদ্দেশ্যে।

গন্তব্যে নেমে নিজেও খানিক রসিক হয়ে গেলাম। রাস্তার পাশের ময়লা নর্দমার পানিতে ফালি হয়ে থাকা চাঁদের টুকরোর প্রতিচ্ছবি নিজেকে নদীর সাথে মিলিয়ে দিচ্ছে। একজনকে ডেকে দেখালাম। কারণ যা দেখছি, যা ভাবছি তা নিজের মাঝে রেখে দিলে কি আর প্রকাশ করা যায় আমি কি ভাবতে পারি আর কি পারি না!

বাঁধ পেরিয়ে গলির ভেতর দিয়ে যেতে লাগলাম। এঁকে বেঁকে। আমার রাস্তা মনে রাখার ক্ষমতা নেই খুব একটা। তাই চেষ্টা করাও বাদ দিলাম।

যেতে যেতে আমাকে একটা শ্মশান দেখানো হল। জানলাম, শ্মশানের পাশেই অমৃত বহে। যদিও অমৃতের চারিত্রিকতা নিয়ে আমার প্রশ্ন শেষ হয় নাই।

রাস্তা থেকে নিচু একটা ঘর। বেশ নিচু। দরজা নেই। একটা কাপড়ের পর্দা সাঁটা। একে একে করে ভেতরে প্রবেশ করলাম। আমি ছিলাম সবার পেছনে। এটাই ছিল আমার প্রথম আসা। ফলত আমার জানা ছিলনা ঠিক কোথায় চোখ রাখতে হবে। ফলত আমি ভুল জায়গায় দৃষ্টি স্থাপন করে ফেললাম।

সেই কয়মিনিট যতক্ষণ সেখানে ছিলাম, আমার মাথায় একটা দৃশ্য কেবল গেঁথে গেল।

ঢুকতেই মাটির বারান্দায় একটা বাচ্চা ছেলে বসে ছিল। কতই আর বয়স হবে? আট কিংবা দশ। ষ্টীলের প্লেটে শিম ভাঁজি দিয়ে মেখে ভাত খাচ্ছিল। পাশেই দুটো বই রাখা ছিল।

তাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে আমরা একটা গ্লাশে করে বেশ কয় ঢোক বাঙলা মদ পান করে ফেললাম। আমার বিষয় জানি না। বাকীরা মাতাল হল। হয়তো আমিও হয়েছিলাম। আমি আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। আমরা বেরিয়ে আসলাম।

হয়তো আমিও মাতাল হয়েছিলাম। আমার মাথায় বারবার ঐ ছেলেটা চলে আসছিল। আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছিল। এক হাতে একটা মদের গ্লাস আমাকে বাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা হাত আমার দিয়ে এগিয়ে দিচ্ছিল, “ভাই ত্রিশ টাকা দেন।”

আমিও মাতাল হয়েছিলাম। আমাকে মাতাল করেছিল বাচ্চাটার বাঁকা হয়ে বসার ভঙ্গি। আমাকে মাতাল করেছিল তার ক্ষুদা।

ঘুমাতে পারার আগ পর্যন্ত সে বারবার আমার কাছে টাকা চাচ্ছিল। বারবার আমার দিকে মদের গ্লাসটা এগিয়ে দিচ্ছিল।

প্রায় দু বছর আগের একটা দৃশ্যও আমার চোখে ফিরে এসেছিল। যেটা আমি আগে খেয়াল করিনি কখনও।

একবার এক বর ভাইএর সাথে কাজলার ভেতরে একজনের বাসায় গিয়েছিলাম। পঞ্চাশ টাকা একটা মহিলার হাতে দেয়ার পর একটা বাচ্চা মেয়ে দুটো পুরিয়া এনে দিয়েছিল আমাদের হাতে। সেখানেও মাটির বারান্দায় একথালি অসমাপ্ত মাখা ভাত পরেছিল।

আমি আর কখনও হয়তো মাতাল হতে পারব না। ভয় করে, মাতাল হলেই হয়তো ওরা দুজন চলে আসবে, এক হাতে মদ আর এক হাতে গাঁজা নিয়ে। আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আমার কাছে টাকা চাইবে। ওদের হাসির কোণে আঁটকে থাকবে ভীষণ ক্ষুদা।

২ thoughts on “হয়তো আমিও মাতাল হয়েছিলাম!!!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *