শোক পরিণত হউক সংযমে

গঠনতান্ত্রিকভাবে বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। ভোটের রাজনীতিতেই এর বেঁচে থাকা এবং বিকাশ। ভোটের জন্য বিএনপির যা করা উচিত, তাই দলটির জন্য শোভন এবং সঠিক। স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মাঠে থেকে রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন বেগম জিয়া। তাঁর দলে বেগম জিয়ার সমকক্ষ আর কেউ নেই।

গঠনতান্ত্রিকভাবে বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। ভোটের রাজনীতিতেই এর বেঁচে থাকা এবং বিকাশ। ভোটের জন্য বিএনপির যা করা উচিত, তাই দলটির জন্য শোভন এবং সঠিক। স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মাঠে থেকে রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন বেগম জিয়া। তাঁর দলে বেগম জিয়ার সমকক্ষ আর কেউ নেই।

কাজেই বিএনপি নামক দলটি বেগম খালেদার। তিনিই এর একমাত্র ‘ক্যারিসমেটিক লীডার’। এ দলের বাকি যারা, অর্থাৎ ব্যারিস্টার মওদুদ, রফিক, নোমান, তরিকুল, মীর্জা ফখরুল, মীর্জা আব্বাস, খোকা, দুদু, আমান, খোকন, মেজর হাফিজ- দলে এদের ভূমিকা থাকলেও বেগম জিয়ার বট গাছের ছায়ায় এদের অবস্থান তৃণভোজীর মতো। বাদ বাকি জানা-অজানা উপদেষ্টাদের কথা নাইবা বললাম! বিএনপি যদি কখনো ভাসে, তা বেগম জিয়ার ক্যারিসমাতেই। আর যদি ডুবে, তাও বেগম জিয়ার দুর্বলতার কারনেই।

গত মাসে শাহবাগের গণজাগরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইল ফলক। এ ঘটনা বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতির মানসপট। এখন দৃশ্যপট বদলাবার আয়োজন চলছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবর যে সহিংসতা দেখা যায়, শাহবাগের গণজাগরণে তা ছিল না। যদিও এটা সবাই জানেন যে শাহবাগের পেছনে সরকারি দলের ইন্ধন ছিল। সরকারি দল ইন্ধন দিয়ে যে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছে, বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি সেই ফায়দা লুটতে পারেনি। অথচ শাহবাগে অবস্থান করেই সরকার পতনের আন্দোলন চূড়ান্ত করা যেতো।

সরকারের পতন ঘটানো কতোটা সহজ?

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে সরকারের পতন ঘটানো খুব সহজ কাজ নয়। স্বাধীনতার ৪২ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া কখনো সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হয়নি। তা বঙ্গবন্ধুর ’৭৫-এর সরকারই হউক, কিংবা ২০০৬-এর ইয়াজ উদ্দিনের সরকারই হউক! সেনাবাহিনী যখনই হস্তক্ষেপ করেছে তখনই সংবিধান বহির্ভূত উপায়ে সরকারের পতন ঘটানো গেছে। কিন্তু অবস্থা যদি এমন হয় যে, সেনাবাহিনী তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে আর এমন ‘রিস্ক’ নিতে রাজি না হয়, তখন কি করতে হবে? তখন একমাত্র ভরসা জনগণের ‘ভোট’। নির্বাচনের মাধ্যমেই পতন ঘটাতে হবে সরকারকে। বিএনপি’র সামনেও বর্তমানে এই একটি মাত্র পথ খোলা আছে।

বাংলাদেশের বাস্তব এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আজ সেনা শাসনের অন্তরায়। ’৭০ অথবা ’৮০-র দশকের মতো সেনাবাহিনী ইচ্ছে করলেই আজ বন্দুকের নল উঁচিয়ে ক্ষমতা কেড়ে নিতে আসবে না! এমন কি আমাদের পার্শ্ববর্তী মায়ানমার, অথবা পাকিস্তানের কথাই ভাবুন। যতই দিন যাচ্ছে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাড়ছে, অংশগ্রহণ বাড়ছে রাজনীতিতে। এবং রাজনীতিবিদরা দুর্নীতি করেন এটা জেনেও মানুষ রাজনৈতিক দলের বিকল্প কোন শক্তিকে ‘বিগত দিনের ভাবনা’ বলে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের বিকল্প কে?

আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি, এতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের মানুষ যখনই আওয়ামী লীগ অথবা শেখ হাসিনার কাজে অসন্তুষ্ট হয়েছে তখনই বেছে নিয়েছে বিএনপিকে। বিএনপির আদর্শ, উদেশ্য, সোজা কথায় দলটির ‘ইসলাম প্রীতি’ কতোটা তা নিয়েও মানুষ কেয়ার করে না। তবে বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে বেছে নেয়ার পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু এই খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গত বাইশ বছরের রাজনৈতিক ম্যানুভারিং-এ বিএনপি বেশ কিছু মারাত্মক ভুল করেছে। সে ভুলগুলোই আজকের প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত।

আজ প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তি কোনটি? শাহবাগের গণজাগরণ পরবর্তীতে বেগম জিয়ার বক্তব্য ও সিদ্ধান্তগুলো বিএনপিকে রাজনীতির তৃতীয় কাতারে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ মোল্লাদেরকে সমাজের উচ্ছিষ্ট ভোগী বলেই মনে করে। এবং মোল্লারা ধর্মের দোহাই দিয়ে যে নিজেদের মতলব হাসিল করতে চায়, বাংলাদেশের মানুষ তা তাদের জীবনের শিক্ষা থেকেই জেনেছে। মসজিদ, আর পীরের ভাওতা দিয়েই যদি শাসন করা যেত, তাহলে স্বৈর শাসক এরশাদ বাংলাদেশের আজীবন রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা ছিল। এমন কি পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ হওয়ারও কথা ছিল না!

বিএনপি কতকাল জামায়াতকে পুষবে?

যদিও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজের একটি মধ্যপন্থি ইমেজ সৃষ্টির জন্য জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি করার অনুমোদন দিয়েছিলেন, কিন্তু নিজে কখনো জামায়াত অনুসারী ছিলেন না। বরং দলকে ধর্মের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। জিয়া দুই ধারার লোকজনকেই তাঁর দলে জড়ো করেছিলেন। এদের মধ্যে যেমন ছিলেন সাবেক মুসলিম লীগার, তেমনি ছিলেন ন্যাপ থেকে আগতরাও। এই দুই ধারার কেউই জামায়াত পন্থি নয়! যদিও মুসলিম লীগ পন্থিদের অনেকে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিলেন।

বিএনপির জামায়াত প্রীতি আসলে শুরু হয়েছে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর থেকে। ’৯০ সালে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা উৎখাতের পর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের সহনশীলতা তৈরি হয়। এর সুযোগ নেয় জামায়াতে ইসলামী। ’৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি লাভ করে ১৪০, আওয়ামী লীগ ৮৮, জামায়াত ১৮, এবং জাপা ৩৫ আসন। সরকার গঠনে ১৫১টি আসন লাভের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কারনে বিএনপি জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করে এরশাদকে কারাগারে নিক্ষেপ করে।

এদিকে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩, আওয়ামী লীগ ৬২, জাতীয় পার্টি ১৪ এবং জামায়াতে ইসলামী ১৭ আসন লাভ করে। সরকার গঠনে জামায়াতের প্রয়োজন না হলেও বেগম জিয়ার মাথা মোটা উপদেষ্টারা তাকে পরামর্শ দেন সরকারে জামায়াত নেতাদের মন্ত্রি বানানোর। জানা যায়, বেগম জিয়া প্রথমে এতে ঘোর আপত্তি জানিয়েছিলেন। কারন নির্বাচনের সময় এই জামায়াত নেতারাই নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু তারেক জিয়াকে ম্যানেজ করে জামায়াতের তিন নেতা সরকারে মন্ত্রিত্ব লাভ করে।

স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকার অবমাননা বাংলাদেশের মানুষ সহজভাবে নেয়নি। বিশেষত যে রাজাকার-আলবদররা বাংলাদেশের মাটিতে ইতিহাসের নৃশংস ও বর্বরতম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, যাদের হাতে দেশের বুদ্ধিজীবীরা শহীদ হয়েছে, মানুষ তা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের যে গভীর ক্ষত বাংলাদেশের মানুষ গত প্রায় চার দশক ধরে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে, তার বিস্ফোরণ হয়েছে ২০০৮ সালের নির্বাচনে।

নির্বাচনের ফলাফলে যতই নক্ষত্রের পতন হউক, বাংলাদেশের মানুষ জামায়াত কিংবা জাতীয় পার্টি নয়, বিএনপিকেই এখনো আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য বিকল্প মনে করে। তাই বিএনপি কতোটা দায়িত্বশীলতা এবং নির্ভর যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে মানুষ তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।

বেগম খালেদা জিয়া কতোটা দায়িত্বশীল?

বেগম খালেদা জিয়া কি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এ প্রশ্নটি নিজেকে করবেন? যে নতুন প্রজন্মটি ছিল আওয়ামী লীগের উপর বীতশ্রদ্ধ, তারা আজ এ প্রশ্নটিই ছুঁড়ে দিচ্ছে বেগম জিয়ার প্রতি। সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে বেগম জিয়া দেশের অস্থির পরিস্থিতিকে যে ভাবে আরো বেসামাল করে দিয়েছিলেন তাঁর উস্কানিমূলক মন্তব্য থেকে, মানুষ তাঁর এ অকস্মাৎ পরিবর্তনে স্তম্ভিত। কার স্বার্থে, কোন প্রয়োজনে বেগম জিয়া এতোটা বেপরোয়া কথাবার্তা বলেছেন? তাঁর নিজের স্বার্থে? প্রবাসে আটকে পড়া সন্তানদের স্বার্থে? নাকি দলের স্বার্থে? আমার ধারণা এর কোনটিই নয়!

বেগম জিয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে যে আংশিক তথ্য পেয়েছিলেন তাঁর উপদেষ্টাদের কাছ থেকে, সে আলোকেই তিনি এমন বেপরোয়া মন্তব্য করেছিলেন। আর এসব মন্তব্যে বিএনপি’র তো কোন উপকার হয়ইনি। বরং গত কয়েক সপ্তায় বিএনপি’র জন বিচ্ছিন্নতা আরো বেড়েছে। জামায়াতে ইসলামী যে সর্ষের তেল তাকে সরবরাহ করেছে, তাতে নিদ্রা হবে ঠিকই। কিন্তু সুখনিদ্রা শেষে হয়তো দেখবেন, দল হিসেবে বিএনপি’র অস্তিত্ব নেই!

পরিশেষে আমার ছোট্ট অভিজ্ঞতা দিয়েই এ লেখার ইতি টানবো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াত-শিবিরের সংঘটিত তথাকথিত ‘ইসলামী বিপ্লবের’ বিরুদ্ধে আমরা যে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য গড়ে তুলেছিলাম তাতে ছাত্রদলও ছিল। কারন শিবির সেখানে পর্যায়ক্রমে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রদল, সব ক’টি ছাত্র সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য গঠন করে আমরা ১৯৯০ সালে চাকসু এবং প্রায় সব ক’টি হলে শিবিরকে পরাজিত করেছিলাম। বেগম জিয়ার যদি বিশ্বাস না হয়, তৎকালীন চবি ছাত্রলীগ সভাপতি পরিবেশ মন্ত্রী হাসান মাহমুদকে টেলিফোন করে জেনে নিতে পারেন। তাও যদি বিশ্বাস না হয়, তৎকালীন ছাত্রদল নেতা আপনার দলের সাবেক এমপি চট্টগ্রামের ওয়াদুদ ভুইয়াকে জিজ্ঞেস করুন। অতঃপর আপনি আব্দুল্লাহ আল নোমান সাহেবকেও জিজ্ঞেস করতে পারেন। ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসের দিকে চট্টগ্রামের আওয়ামী নেতা মহিউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে একই প্যান্ডেলের নীচে বসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের গণ জাগরণকে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন এই নেতা! তাতেও যদি খটকা লাগে, তৎকালীন চবি শিবির নেতা জামায়াতের হামিদুর রহমান আজাদ এমপিকে জিজ্ঞেস করুন।

আজ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উতখাতে জামায়াতে ইসলামী হয়ত জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনে আপনাকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এমন দিন আসবে, যে দিন ওরা আপনাকে কারাগারে নিক্ষেপ করতেও দ্বিধা করবে না। কারন তারা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে- ইসলামী বিপ্লবই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। আর নারী নেতৃত্ব তো তাদের জজবারই বাইরে!

আজ দেখে ভালো লাগছে- একজন রাজনীতিবিদের প্রতি সম্মান জানাতে আপনি আপনার দলের উদ্যোগে তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন। আপনার এ উদ্যোগ যেন কেবল লোক দেখানো না হয়! শোক প্রকাশ থেকে সংযম, অতঃপর সমঝোতা ও সন্ধির পথেই যেন বাংলাদেশের নিয়তি নির্ধারিত হয়! জয় বাংলা, শেখ হাসিনার মতো বেগম খালেদা জিয়াও দীর্ঘজীবী হউন!

নিউইয়র্ক, ২২শে মার্চ ২০১৩

২ thoughts on “শোক পরিণত হউক সংযমে

  1. আজ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে
    আজ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উতখাতে জামায়াতে ইসলামী হয়ত জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনে আপনাকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এমন দিন আসবে, যে দিন ওরা আপনাকে কারাগারে নিক্ষেপ করতেও দ্বিধা করবে না। কারন তারা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে- ইসলামী বিপ্লবই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। আর নারী নেতৃত্ব তো তাদের জজবারই বাইরে!

    কিন্তু বিম্পি এইটা বুঝলেতো?

  2. তাঁর দলে বেগম জিয়ার সমকক্ষ

    তাঁর দলে বেগম জিয়ার সমকক্ষ আর কেউ নেই।

    বিএনপির দৈন্যতা এতেই ফুটে ওঠে। সবচে বড় কথা এখন বিএনপি বলে আলাদা কোন দল আছে বলে মনে হয় না। জামাতের একটা শাখা দল বলা যায়।

    বিঃ দ্রঃ আপনি একজন কনফিউজড পাবলিক বলে মনে হোল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *