প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

** অনেকদিন থেকেই এই লেখাটা পোষ্ট করবো করবো করে করা হচ্ছিলো না। হুমাযুন আজাদের অসাধারণ একটি লেখা। আমার কাছে এই লেখাটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। আপনাদের কাছে কেমন লাগবে আপনারাই বিচার করুন।

:: প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে ::::


** অনেকদিন থেকেই এই লেখাটা পোষ্ট করবো করবো করে করা হচ্ছিলো না। হুমাযুন আজাদের অসাধারণ একটি লেখা। আমার কাছে এই লেখাটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। আপনাদের কাছে কেমন লাগবে আপনারাই বিচার করুন।

:: প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে ::::

বাঙালি মুসলমান প্রগতির দিকে কিছু পথ হাঁটার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, আবার ফিরে যাচ্ছে পেছন ও প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে; আমার ভয় হচ্ছে বিশশতকের শেষ দশকটি হয়ে উঠবে আরো প্রতিক্রিয়াশীল; মহামারীরূপে দেখা দেবে প্রতিক্রিয়াশীতার আরো নানা রকমের রোগ। সমাজ রাষ্ট্র যারা চালাচ্ছে ও চালাবে তারা নিজেদের প্রয়োজনেরই সৃষ্টি করবে সে সব, কারণ তা হবে তাদের জন্যে সুবিধাজনক। ‘যুগান্তের বা শতকান্তের ক্লান্তি’ বলে একটি কথা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো ইউরোপে; আমাদের এখানে তেমন কোনো ক্লান্তির বদলে হয়তো দেখা দেবে শতকান্তের অন্ধকার বা ব্যাধি, যার লক্ষণ এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্। এগানোর কথা ছিলো বাঙালি মুসলমানের, এগোনোর চেষ্টা করেছি; তবে এখন হয়ে উঠছি পেছনমুখো, পেছনই হয়ে উঠেছে আবার গন্তব্য। বিভিন্ন বিষয়ে নানা প্রশ্ন তোলা যেতো দু-দশক আগেও, তাতে কোনো সাহসের দরকার পড়তো না, এখন সে-সব প্রশ্ন তোলা বড়ো রকম সাহসের ব্যাপার ও বিপজ্জনক; অনেক কিছুই দু-এক দশক আগে বাতিল বলে গণ্য হয়ে গিয়েছিলো, এখন সে-সব হয়ে উঠেছে ভীতিকরভাবে জীবন্ত। জীবন ও রাজনীতি, সাহিত্য ও শিল্পকলা সবই এখন পরিত্যক্ত সমস্ত ব্যাপারের কাছে পরাজিত হচ্ছে; বাঙালি মুসলমান কিছুকাল বাঙালি থাকার পর আবার হয়ে উঠেছে মুসলমান ও মধ্যযুগীয়; প্রতিক্রিয়াশীরতা হয়ে উঠছে তার জীবনধারণের পদ্ধতি।

এবার যে নির্বাচন হয়ে গেলো, তাতে যে ভাষায় উত্তেজিত করা হয়েছে জনসাধারণকে, তা প্রগতির বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভাষা ছিলো না, সে ভাষা ছিলো প্রতিক্রিয়াশীলতার। একটি জাতি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর উচ্চকন্ঠে কথা বলেছে পাকিস্তান আন্দোলনের ভাষায়। তাদের কথা শুনে মনে হয়েছে যেনো তারা নতুন করে নেমেছে কোনো অদ্ভুত পাকিস্তান আন্দোলনে। চল্লিশের দশকে ধর্মের যে উন্মত্ততা জাগিয়েছিলো জিন্নাটুপি পরা রাজনীতিকেরা, নব্বইয়ের দশকে সে আবহাওয়াই সৃষ্টি করেছিলো গণঅভ্যুত্থান উত্তর বাঙলাদেশের নর ও নারী নেতারা। যেনো ধর্মযুদ্ধে নেমেছিলো তারা, বিপন্ন ইসলামকে রক্ষা করার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো বিধর্মীদের বিরুদ্ধে। এতো বিসমিল্লাহ এর আগে কেউ শোনে নি। এবার চল্লিশ দশকের নারায়ে তকবির বা আল্লাহো আকবর ছিলো না, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই যে ওই ধ্বনি শোনা যাবে না, এমন নয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি একটি অসাধারণ ধর্মীয় নির্বাচনের উদাহরণ হয়ে থাকবে। ইসলাম বিপন্ন ছিলো না এবার, ইসলামকে উদ্ধারেরও কোনো দরকার ছিলো না, ইসলাম এসব রাজনীতিকদের নির্ভর করেও টিকে থাকবে না। এদের নির্ভর করে যদি ইসলামের টিকে থাকতে হয়, তবে স্বীকার করতে হবে যে ইসলাম সত্যিই খুবই বিপন্ন; এবং তখন ইসলামকে উদ্ধার করতে হবে এদেরই হাত থেকে।
এবার যে রাজনীতিক ইসলাম চর্চা হয়ে গেলো, তাতে কোনো আধ্যাত্মিকতা ছিলো না, তা ছিলো পুরোপুরি কপটতা। যে রাজনীতিকেরা ধর্মের কথা বলেছে, তাদের জীবনে ধর্মের স্থান নেই; তারা যে জীবন যাপন করে, তাতে ধর্ম থাকতে পারে না; তারা ধর্মকে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে। একটি জাতি যখন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়, যখন ওই জাতি নষ্ট করার মতো আর কিছু পায় না, তখন সে জাতি নষ্ট করে তার শ্রেষ্ঠ জিনিশগুলোকেই। জনসন বলেছিলেন, দেশপ্রেম হচ্ছে বদমাশের শেষ আশ্রয়। বদমাশ যখন পায়ের নিচে মাটি পায় না, তখন সে আঁকড়ে ধরে দেশপ্রেমকে। কিন্তু এবার বাঙলাদেশে দেখা গেছে তাদের শেষ আশ্রয় ধর্ম। এমন ঘটে নি যে বাঙালি মুসলমান ধর্ম থেকে সরে গেছে, তাদের আবার ফিরিয়ে আনতে হবে ধর্মের পথে; এমন ঘটে নি যে বাঙালি মুসলমান একটি একনায়ককে উচ্ছেদ করেছে প্রাণ ঢেলে ধর্মসাধনার জন্যে, তাই দিকে দিকে পুন:বাসিত করতে হবে ধর্মকে। যদি এমন হতো যে ওই একনায়ক এসে ন-বছরে দেশছাড়া করেছে ধর্মকে, তাই জনসাধারণ তাকে সরিয়েছে ধর্মের জন্যে, তাহলে চমতকার মানানসই হতো্ এবারের নির্বাচনের ভাষা। কিন্তু ওই একনায়কের বড়ো পুঁজিই ছিলো ধর্ম। তার মতো মসজিদে আর কে গেছে? তার মতো টুপি আর কজন পরেছে? তার মতো এতো হজ আর কে করেছে? সে ছাড়া দেশে আর কে প্রতিষ্ঠা করেছে রাষ্ট্রধর্ম? তার মতো মসজিদে মসজিদে গিয়ে আল্লার নামে এতো আর কে কেঁদেছে? পীরের বাড়ীর দিকে হেলিকপ্টারে চেপে তার মতো আর কে গেছে? ধর্মের কোনো অভাব সে রাখে নি বাঙলাদেশে। তার মতো ধার্মিক আর কোথায় পাওয়া যাবে? যদি ধর্মই বাঙালি মুসলমানের এতো দরকার ছিলো, তাহলে ওই ধার্মিকটিকে হটানোর কোনো দরকার ছিলো না।
এটা এখন বেশ ষ্পষ্ট যে যারা হটেছে এবং যারা এসেছে তাদের মধ্যে কোনো চরিত্রগত পার্থক্য নেই; একই শ্রেণীর তারা, একই ধরণের বিশ্বাস ও কপটতা তাদের পুঁজি, একই প্রতিক্রিয়াশীলতায় তারা মজ্জমান। তাই এবারের রাজনীতিকেরা চলেছে গত ন-বছরের বাঁধানো পথে, ওই পথ থেকে একটুও সরে আসেনি। ন-বছর ধরে ওই লোকটি একা যা করেছিলো, এবার সবাই মিলে করেছে তাই; যে প্রতিক্রিয়াশীলতার ভার সে একা বহন করেছিলো, এবার তা বহন করেছে সবাই মিলে। তাই নির্বাচনে হয়েছে আসলে তারই জয়; এবারের নির্বাচনে প্রতগিশীল অভ্যূত্থানের জয় হয় নি, হয়েছে পরাজয়। এক ভন্ডের মুখ থেকে ধর্ম উঠে এসেছে অসংখ্য ভন্ডের মুখে। এবারের নির্বাচনে প্রধান ছিলো দুজন নারী, তারা দুজন ধর্মের দুই বড়ো প্রবক্তা হয়ে উঠেছিলো, কিন্তু এটা নির্মম সত্য য ইসলাম অনুসারে তাদের রাজনীতি করারই কোনো অধিকার নেই। হাদিসে আছে, যে নারীর কথামতো চলে সে ধ্বংস হয়। এসব কথা কেউ তোলে নি; কিন্তু একদিন যে তোলা হবে না, এমন নয়। প্রতিক্রিয়াশীলতা যখন আরো শক্তিশালী হবে, সেদিন নিশ্চয়্ই কেউ একথা বলবে, শুধু বলবে না জোর করে তাদের রাজনীতিক মঞ্চ থেকে তুলে ঢুকিয়ে দেয়া হবে পর্দার ভেতরে।
আধুনিক জীবনের সাথে কোনো ধর্মই খাপ খায় না, কোনো ধর্মেরই অনুশাসন সম্পূর্ণ মেনে চলতে পারে না আধুনিক জীবন। যদি আধুনিক জীবন চাই, তাহলে বাদ দিতে হবে ধর্মের অনেক বিধিবিধানকে; বা ধর্মকে করে তুলতে হবে ব্যক্তিগত। ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক করে আধুনিক জীবন চলতে পারে না। কেউ যদি ইসলাম মানে, এবং মনে করে রাষ্ট্রের সব কিছু চলবে ইসলামের বিধান অনুসারে, তবে নিষিদ্ধ করে দিতে হবে অভিনয়, চলচ্চিত্র, সাহিত্য নৃত্যকলা, বিজ্ঞানের বিভিন্ন এলাকা। একই সাথে অভিনয় ও ইসলাম চলতে পারে না। কোনো অভিনেত্রী দেখা দিতে পারে না, যাকে বলতে পারি ইসলামসম্মত অভিনেত্রী। ইসলাম থাকলে সিনেমা থাকতে পারে না, নাচ থাকতে পারে না; ইসলাম থাকলে চারটি বিয়ে করার অধিকার থাকতেই হবে, তাতে স্ত্রীদের অনুমতি নেয়ার দরকার পড়তেই পারে না, ইসলাম থাকলে সহশিক্ষা থাকতে পারে না; ইসলাম থাকলে একটি যুবক ও যুবতী পাশাপাশি বসতে পারে না, আর তারা পাশাপাশি বসলে ইসলাম থাকতে পারে না। এরপর রয়েছে বড়ো প্রশ্ন; গণতন্ত্রকি ইসলামসম্মত? গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা আর ধর্ম হচ্ছে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ। এসব প্রশ্ন এবার তোলা হয়নি. কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে তোলা হবে মর্মান্তিকভাবে। ইসলাম শুধু বিসমিল্লা নয়, আরো অনেক কিছু।
তবে এবারের রাজনীতিকেরা জনগণকে প্রতারণা করার জন্যেই এতো বিসমিল্লা বলেছে; কলাভবনেও এখন জিনসপরা ছাত্রনেতারা বিসমিল্লা বলে নেত্রীদের স্তবস্তুতি শুরু করে। কিন্তু এর ফল খারাপ হতে বাধ্য। এর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব পরবে সমাজে, শিক্ষায়, জীবনযাপনে, সাহিত্যে, শিল্পকলায় এবং সমস্ত এলাকায়। ধর্ম এমন ব্যবস্থা, যা খুবই নিয়ন্ত্রণবাদী, ধর্ম ব্যাক্তির স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, কোনো প্রশ্ন করতে দেয় না, সামনের দিকে এগোতে দেয় না। ধর্মের নামে যে কোনো সামাজিক বিঘ্ন সৃষ্টি করা যায়, বিস্তর বাজে কথাকে পবিত্র কথা বলে প্রচার করা যায়। ধর্মের নামে প্রতিবেশীর বাড়িকে চারদিক থেকে ঘিরে দু-গন্ডা মাইক যদি আমি সারাদিন বাজাই, তবুও সে আপত্তি করতে পারবে না, কেননা আমি ধর্মচর্চা করছি; ওই মাইকে যদি আমি অজস্র আপত্তিকর কথা বলি, তবুও কেউ আপত্তি করতে পারবে না, কেননা আমি ধর্মচর্চা করছি। যদি আমি রাস্তা বন্ধ করে ধর্মীয় জলসা বসাতেই পারি, তবুও কেউ আপত্তি করতে পারবে না, কেননা আমি ধর্মের কাজ করছি। ধর্মে গ্রহণযোগ্য নয়, এমন সত্য বলা যায় না, কিন্তু সম্পূর্ণ অসত্য কথা বলা যায় ধর্মের নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যা পড়ানো হয়, তার অধিকাংশই ধর্মবিরোধী, শুধু বিজ্ঞানের সত্যগুলোই নয়, মানবিক সত্যগুলোর ধর্মের সাথে সামঞ্জস্যবিহীন। যদি ধর্ম রাখতে চাই, তবে মানুষের সমস্ত অগ্রগতিকে বর্জন করতে হবে, কিন্তু তা কি সম্ভব?

যা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষকে স্বাভাবিকভাবে বিকশতি হতে দেয় না তাই প্রতিক্রিয়াশীলতা, এবং এর ফল কখনো শুভ হতে পারে না।
প্রতিক্রিয়াশীলতা স্বৈরাচারের সঙ্গী, তা গণতন্ত্রের সঙ্গী হতে পারে না। যখনই কোনো জাতি বা সমগ্র মানবসমাজ প্রতিক্রিয়াশীলতায় আক্রান্ত হয়েছে, তখন তার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে গেছে; এবং সে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে লেগেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। মুসলমানের বিকাশই রুদ্ধ হয়ে গেছে প্রতিক্রিয়াশীলতার জন্যে। বাঙালি মুসলমান বিকশিত হতে যাচ্ছিলো, কিন্তু তাকে বন্দী করা হচ্ছে; তার ফলে নষ্ট হচ্ছে তার সমস্ত সৃষ্টিশীললতা। আমার ভয় হচ্ছে ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার জন্যে রাজনীতিকেরা দেশকে করে তুলবে আরো প্রতিক্রিয়াশীল, গণতন্ত্র হয়ে উঠবে হাস্যকর; শিল্পসাহিত্য এখনই ম্রিয়মাণ, কয়েক বছরে তা পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়বে। প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ায় দিনদিন ঢেকে যাচ্ছে বাঙলাদেশ।

** হুমায়ুন আজাদ

৩ thoughts on “প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

  1. প্রতিক্রিয়াশীলতা স্বৈরাচারের

    প্রতিক্রিয়াশীলতা স্বৈরাচারের সঙ্গী, তা গণতন্ত্রের সঙ্গী হতে পারে না। যখনই কোনো জাতি বা সমগ্র মানবসমাজ প্রতিক্রিয়াশীলতায় আক্রান্ত হয়েছে, তখন তার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে গেছে; এবং সে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে লেগেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

    প্রতিক্রিয়াশীলতা সব সময়ই ক্ষতিকর ! আর প্রতিক্রিয়াশীলতা সবসময় যে মৌলবাদীদের মধ্যেই থাকে তা নয়, এটা তথাকথিত প্রগতিশীলদের মধ্যেও বিপুল পরিমাণে দেখা যায় !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *