পহেলা অঘ্রাণঃ নববর্ষ থেকে নবান্ন অতঃপর অধুনা কৃষি দিবস

পহেলা অঘ্রাণ (অগ্রহায়ণ) বাঙালির সুপ্রাচীন ইতিহাস। ইতিহাসের কানাগলি পেরিয়ে উলটো পথে গেলেই দেখা যাবে যে বাঙালি গেরস্থ বাড়িতে পহেলা অঘ্রাণ মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। নতুন ধানের গন্ধে ম ম উঠান বাড়ি। রাজবাড়িতেও খাজনা আদায়ের বাজনার সুর বেজে উঠত অঘ্রাণের ছোঁয়ায়। (এখনো ঘুমপাড়ানি গানে এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়, “…বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দিব কিসে?…”) মানে সব মিলিয়ে আনন্দ আপামর বাঙালির মনে। (এর অস্তিত্ব এখনো ধরা পড়ে, জাতীয় সঙ্গীত গাবার সময় “…অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে কি দেখেছি…”, কিন্তু আমরা গাইবার সময় চিন্তাও করে দেখি না।) হেমন্ত-শীতের সন্ধিক্ষনে নববর্ষের আনন্দ। নববর্ষ? নববর্ষ কোত্থেকে এলো রে বাবা… বলে যারা ভাবছে তাদেরকেই বলছি চোখ কচলে লাভ নেই, ঠিকই পড়েছেন “নববর্ষ”। অগ্রহায়ণ শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এ সত্য। অগ্রহায়ণ কে ব্যবচ্ছেদ করলে পাওয়া যাবে দুটি শব্দ, অগ্র(প্রথম) + হায়ণ(বছর)। বছরের (বাংলা বছরের) প্রথম মাস (প্রাচীন ধারা অনুযায়ী) অগ্রহায়ণ। ১০/১১ মার্চ , ১৫৮৪ এর আগে তাই ছিল বাংলার বুকে। মহামতি আকবর দ্যা গ্রেট, কার্ড শাফল (তাস পুনঃ বিন্যাস) করে বৈশাখ কে বানালেন ইশকাপনের টেক্কা। উদ্দেশ্য খাজনা আদায়। হালখাতা খুলে বাকি আদায়ের থেকে পহেলা বোশেখ (বাঙাল ঢঙ্গে বৈশাখ উচ্চারণ) জনপ্রিয়তা পায়। তারপর ছায়ানটের ষাটের দশকের রমনা বটমূল এর অনুষ্ঠান এবং নারায়নগঞ্জ আর্ট কলেজের মঙ্গল শোভা যাত্রায় ভড় করে বৈশাখের উত্থান হতে শুরু করে। আশির দশকে মাকসুদের “ মেলায় যাইরে” গানের জনপ্রিয়তায় হারিয়ে যেতে শুরু করে অঘ্রাণ, বাংলার আদি নববর্ষ আর তার খালি স্থান পূরণ করতে থাকে সুর্যদেবের কৃপা ধন্য পহেলা বৈশাখ। বিশ্বের তাবদ ঐতিহ্য পরায়ন জাতি নববর্ষ উদযাপন করে শীতল আবহাওয়ায় আর আমরা করি গরমে ঘেমে, সকালে করা রোদে আমরা মঙ্গল শোভা যাত্রায় যাই। বৈশাখ হুট করে কিন্তু আসেনি তাই বলে, বৈশাখ আমাদেরই। এখন তো আরো বেশি মিশে গেছে রক্তে, বৈশাখ আমাদের অহংকার, বাঙ্গালিত্বের প্রতীক। কিন্তু অঘ্রাণ কই? আদি নববর্ষ কই? আদি নববর্ষ এখন ৪টাকার ডাক টিকিটে। আবার অবাক!!!!!! (ছবিতে দেখে নিন) ২০০৮ সালে মানে ৪২৪ বছর পর জাতীয় কৃষি দিবসের স্বীকৃতি দিয়ে বাংলার মাটিতে প্রত্যাবর্তন পহেলা অঘ্রাণের মানে আমাদের আদি নববর্ষের। পুনারায় নববর্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন হলেও নবান্ন পালন কিন্তু অসম্ভব কিছু না। বছরে দুটো বাঙালির উৎসব জাতীয় পরিসরে হলে ক্ষতি কি? চারুকলা যদি মঙ্গলশোভা যাত্রার উদ্যোগ নিতে পারে তাহলে এতগুলো দেশের কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি পারে না একত্রিত হয়ে এটা আয়োজন করতে? কৃষি আর অঘ্রাণ যে অঙ্গাঙ্গী সহদোর। চারুকলা আর ছায়ানটকেও সঙ্গে নিলাম আরেকবার, তাদের ছাড়া তো বাঙালি উৎসব পূর্নাঙ্গতা পায় না। আবার যেন বাংলা ভড়ে ওঠে অঘ্রাণের ছোঁয়ায়।
জয়তু নবান্ন।
জয়তু পহেলা অঘ্রাণ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *